পথে পথে দেবালয়

305

হান্স হার্ডার |

অষ্টাদশ শতকে নির্মিত দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির বাঙালি টেরাকোটা মন্দিরবাংলাদেশের মন্দির ও তীর্থগুলো অনতি অতীতে নির্মিত। তবে অনেক ক্ষেত্রেই এগুলোকে বহু পুরোনো বলে দাবি করা হয়। ১৮ শতকে নির্মিত দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির বাঙালি টেরাকোটা মন্দির-স্থাপত্যের সবচেয়ে জমকালো নিদর্শন। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বাংলাদেশের বৃহত্তম দুই শহর। দুই শহরেই দুর্গামন্দির আছে। এই মন্দিরগুলোর নাম থেকেই শহর দুটোর নাম উদ্ভূত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির দেশের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হিন্দু মন্দির। এটি নির্মাণ করা হয়েছে সম্ভবত ১২ শতকে। ঢাকার উত্তর দিকে অবস্থিত সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরও একই সময়ে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। চট্টগ্রামের চট্টেশ্বরী মন্দির অতটা বিখ্যাত না হলেও দাবি করা হয় যে এটিও উল্লিখিত মন্দির দুটির সমবয়সী। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, মন্দিরগুলোর দাবি করা বয়সের সঙ্গে সেগুলোর বিরাজমান কাঠামো সংগতিপূর্ণ নয়।

বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের আরেকটি প্রখ্যাত তীর্থস্থান চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড। এটি ৫২টি শক্তিপীঠের (ঐশ্বরিক নারীশক্তির আসন) অন্যতম হিসেবে খ্যাত, যা দেবীর শরীরের বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, এখানে শিবের স্ত্রী সতীর একটি দেহাংশ এসে পড়ে ছিল। স্ত্রীকে হারানোর দুঃখ ও ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে শিবনৃত্য (তাণ্ডব) শুরু করলে সতীর দেহের একটি অংশ এখানে এসে পতিত হয়। এই তীর্থটির অবস্থান সীতাকুণ্ড পাহাড়ে। সেখানে বিভিন্ন দেবীর নামে উৎসর্গিত আরও কয়েকটি মন্দির আছে। পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত চন্দ্রনাথ (শিব) মন্দিরটি সেই মন্দিরগুলোর শিরোমণি।

এখানে স্থানীয়ভাবে চন্দ্রনাথমাহাত্ম্য নামে একটি পুস্তিকা পাওয়া যায়। তাতে বলা হয়েছে, এক ধোপা একদিন আবিষ্কার করে যে তার গরুটি রোজ রোজ গোয়ালঘর থেকে পালিয়ে গিয়ে সীতাকুণ্ড পাহাড়ের চূড়ায় একটি নির্দিষ্ট পাথরের ওপর দুধ ছিটিয়ে দেয়। ধোপা স্বপ্নে জানতে পারে, শিব সেই জায়গাটিতে আবিভূর্ত হয়েছেন। তার ওপর প্রত্যাদেশ আসে যে জায়গাটি যথাযথভাবে দেখভাল করে রাখতে হবে। সে ত্রিপুরার রাজার কাছে গেলে রাজা শিবলিঙ্গ তাঁর রাজধানীতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু রাজার সৈন্য, এমনকি হাতিও সেটি সরাতে ব্যর্থ হয়। এর পর শিব রাজার সামনে আবিভূর্ত হয়ে তাঁকে বলেন, এই মন্দিরটির সঙ্গে তিনি এমনভাবে বাঁধা যে তাঁকে এখান থেকে আর সরানো যাবে না। শিব রাজাকে বলেন, তিনি বড়জোর তাঁর শক্তি ব্যবহার করে ভোর পর্যন্ত যতটা সম্ভব, রাজাকে ততটা নিয়ে যেতে দিতে পারেন। এরই ফলে ত্রিপুরার উদয়পুরে কালীমন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। এর অবস্থান সীতাকুণ্ড থেকে ত্রিপুরার রাজধানী যাওয়ার পথে।

পর্যটক ফ্রান্সিস বুকানান ১৭৯৮ সালে জায়গাটি পরিদর্শন করে জানান, তিনি যে প্রাসাদ দেখেছিলেন, সেটা তত দিনে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তবে এর আংশিক সংস্কার করা হয়। তিনি সেখানে পৌরহিত্যের প্রথাও নথিভুক্ত করেছিলেন। তিনি দাবি করেন যে কয়েক প্রজন্ম ধরে সেখানে পশু বলি দেওয়া হয়নি (দেখুন: ফ্রানসিস কুকানান ইন সাউথইস্ট বেঙ্গল (১৭৯৮): হিজ জার্নি টু চিটাগং, দ্য চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস, নোয়াখালী অ্যান্ড কুমিল্লা, ভিলেম ভ্যান শেন্ডেল)। সীতাকুণ্ড প্রাথমিকভাবে শৈব-শাক্ত সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান হলেও বতর্মানে হিন্দুদের সব সম্প্রদায়ের মানুষই সেখানে ভিড় করেন। ফাল্গুন মাসে সীতাকুণ্ডে শিবের সম্মানে শিবচতুর্দর্শী মেলা হয়।

বাংলাদেশি হিন্দুদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের পালিত আচারের মধ্যে সাধারণত তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। দুই দেশেই দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। শুধু সীতাকুণ্ডের মতো স্থানীয় তীর্থসংলগ্ন অঞ্চলেই সুনির্দিষ্ট প্রথার চল দেখা যায়। সূর্য ও সাপ পূজার ক্ষেত্রে পূর্ববাংলার সুনির্দিষ্ট আচারের তালিকা পাওয়া যাবে এ ভট্টাচার্যের দ্য সান অ্যান্ড দ্য সারপেন্ট বইয়ে। তাতে যে উদাহরণ দেওয়া হয়েছে সেগুলো ২০ শতকের শুরুর দিকের। বইয়ে সেসবের যে বর্ণনা দেওয়া আছে, তা এখন আর দেখতে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ।

মন্দিরের গায়ে বসানো মৃৎশিল্পের নমুনাবড় বড় উপাসনালয়ের বাইরেও বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে অনেক ছোট ছোট মন্দির ও আশ্রম আছে। এগুলো প্রতিষ্ঠা করেছেন স্থানীয় সন্ন্যাসী বা সাধুরা। কখনো কখনো আবার তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশ্যেও এ ধরনের তীর্থপীঠ স্থাপন করা হয়েছে। এর অনেকগুলো এখন পরিণত হয়েছে বৃহৎ হিন্দু প্রতিষ্ঠানে। স্বামী অদ্বৈতানন্দ পুরি মহারাজের আশ্রম তারই একটি।

স্বামী অদ্বৈতানন্দ পুরি মহারাজ জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৩ সালে, চট্টগ্রামে। তাঁর প্রথম জীবনের বিবরণ পাওয়া যায় উপাখ্যানে (দেখুন:ঋষি অদ্বৈতানন্দ, ডি দেওজানি)। তিনি ছিলেন জগদানন্দ পুরির শিষ্য। বিশিষ্ট কবিগানের শিল্পী ও গীতিকার রমেশ শীলও তাঁকে গুরু বলে মেনেছেন ও তাঁর উল্লেখ করেছেন। এসব আশ্রমে রচিত ভক্তিমূলক গানের বিষয়বস্তু, কাঠামো ও সাংগীতিক বৈশিষ্টে্যর সঙ্গে প্রভাবশালী সুফি ভক্তিমূলক গানের ধারার মিল আছে। ক্যাসেট ও সিডিতেও এখন সেসব পাওয়া যায়। বস্তুত এসব ভক্তিমূলক গানের অভিন্ন ভিত্তি হচ্ছে জনপ্রিয় লোকগান—তা সে হিন্দু, বৌদ্ধ বা সুফি যে ঘরানারই হোক না কেন। উদাহরণ হিসেবে গুরুদাস ফকিরের আশ্রমের কথা বলা যায়। তিনি ১৯ শতকের একজন হিন্দু সন্ন্যাসী। শোনা যায়, তিনি চট্টগ্রামের সুফিসাধক আমানুল্লাহ মাইজভান্ডারির সঙ্গে একত্রে প্রায়শ্চিত্ত করেছিলেন।

এই সাধুদের অনেকেই আবার অন্তত আঞ্চলিক খ্যাতি অর্জন করেছেন। পূর্ব ও পশ্চিম বাংলায় তাঁদের নামে আশ্রমের নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। যেমন বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার লোকনাথ ব্রহ্মচারী বাংলাদেশেও ব্যাপক জনপ্রিয়। বলা হয়ে থাকে, তিনি নাকি ১৬০ বছর (১৭৩০-১৮৯০) বেঁচে ছিলেন। তাঁর জন্মের সময় ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন আজকের মতো ছিল না। আবার কলকাতার কাছাকাছি দক্ষিণেশ্বরের রামকৃষ্ণ পরমহংস (১৮৩৬-১৮৮৬) ও তাঁর শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দও (১৮৬৩-১৯০২) বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। বাংলাদেশে স্বামী বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মিশনের বেশ কয়েকটি শাখা আছে। ভক্তিবেদান্ত প্রভুপাদের প্রতিষ্ঠা করা ইসকনের শাখাও বাংলাদেশে রয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে পূর্ববাংলার সাধুসন্তরাও পশ্চিম বাংলায় কল্কে পেয়েছেন। এর সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে শ্রীরাম ঠাকুর (১৮৬০-১৯৪৯)। জানা যায়, রাম ঠাকুর ফরিদপুরের ডিঙামানিক গ্রামে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কিশোর বয়সেই তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিকতার উন্মেষ লক্ষ করা যায়। ১২ বছর বয়সে তাঁর মধ্যে দেখা যায় অলৌকিকতার গুণাবলি। সীতাকুণ্ডে তীর্থভ্রমণের সময় তিনি তাঁর এক কাকিকে মাঙ্গলিক গাছড়া খুঁজে দেন। প্রাচীনকালের এক সিদ্ধপুরুষ রাম ঠাকুরকে স্বপ্নে তাঁকে দীক্ষা দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে নোয়াখালীতে পাচক হিসেবে কাজ করার সময় তাঁর অলৌকিকতার আরও নিদর্শন প্রকাশ পায়। তিনি খাওয়া-দাওয়া একদম ছেড়ে দিয়ে পারমার্থিক অনুসন্ধানের জীবন বেছে নেন। ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন দেশের নানা পথে ও প্রান্তরে। পরিপূর্ণ সাধু ও তান্ত্রিক হওয়ার লক্ষ্যে যে সন্ধানযাত্রায় তিনি বেরিয়েছিলেন, তার অংশ হিসেবে হিমালয়েও যাত্রা করেন। ফরিদপুরে ফেরার পর পরিবারের তাড়নায় তিনি তাঁর প্রথম জীবনের কলকাতা-নিবাসী এক শিষ্যের মেয়েকে বিয়ে করেন। রাম ঠাকুর তাঁর জীবদ্দশাতেই বিপুল খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর মৃত্যুর অনেক আগেই রাম ঠাকুরের ভক্তকুল কৈবল্যধাম নামে চট্টগ্রামে একটি আশ্রম স্থাপন করে। ১৯৪৯ সালে তিনি নোয়াখালীর চৌমুহনীতে দেহত্যাগ করেন। সেখানে তাঁর সমাধিও স্থাপন করা হয়। রাম ঠাকুরকে তাঁর শিষ্যরা কৈবল্যনাথ ও সত্যনারায়ণের অবতার বলে গণ্য করেন। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ-বাংলার এই দুই অংশেই কৈবল্যধাম আশ্রমের শাখা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

 

অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন

হান্স হার্ডার: বিভাগীয় প্রধান, আধুনিক দক্ষিণ এশীয় ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় জার্মানি