মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে ‘মানুষের মুক্তি’কেই বুঝায় ছান্দসিক-এর ‘বীরাঙ্গনা’ উপস্থাপনের আলোচনায় সুধীজনের মন্তব্য

342

বিশেষ প্রতিবেদক, লন্ডন ২৬ মার্চ: মুক্তিযুদ্ধ শব্দটির সাথে যে ‘মুক্তি‘ কথাটি রয়েছে এটিই আমাদের মূল চেতনা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে আমরা যা বুঝাই,তা হলো ‘মানুষের মুক্তি’। স্বাধীনতার পরেই আসে মুক্তি কথাটা।বঙ্গবন্ধু ৭মার্চের বক্তৃতায় বলেছিলেন,‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’ এ কথার ভেতরেই অর্ন্তনিহিত রয়েছে ‘মুক্তি’।

মহান মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনি কর্তৃক সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ নারী নির্যাতন তথা আমাদের নির্যাতিত মা-বোন অর্থাৎ বীরকন্যাদের হোমহর্ষক কথন,ঘটনাসমূহের আত্মজৈবনিক বর্ণনার বিবরণ ছান্দসিক কর্তৃক পাঠ উপস্থাপন পর্বে মূল আলোচনায় এ কথা বলেন ইউএনডিপির ডাইরেক্টর বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী  ড.সেলিম জাহান।

২৫ মার্চ সন্ধ্যা ৬ টায় পূর্ব লন্ডনের ভ্যালেন্স রোডের শাহ কমিউনিটি সেন্টারে ছান্দসিক-এর পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হয়  ‘বীরাঙ্গনা’ পাঠ।  ছান্দসিক-এর প্রধান সংগঠক আবৃত্তি শিল্পী  মুনিরা পারভীনের পরিকল্পনা,গ্রন্থনা ও নির্দেশনায় বীরাঙ্গনা পাঠে  অংশ নেন ছান্দসিক-এর বাচিক শিল্পীদের মধ্যে মুনিরা পারভীন,তাহেরা চৌধুরী লিপি,শতরূপা চৌধুরী ও অতিথি আবৃত্তিকার সোমা দাস। বিশিষ্ট গীতিকার শেখ রানাও গানে এবং কথায় অংশ নেন। সমগ্র অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন আবৃত্তিকার রেজুয়ান মারুফ ও ভূমিকা পর্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ছান্দসিক-এর অন্যতম ব্যক্তিত্ব  কবি হামিদ মোহাম্মদ।

অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জাতিসংঘের ইউএনডিপিতে কর্মরত মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ড. সেলিম জাহান,মুক্তিযুদ্ধের শাণিত ইতিহাসের কলমযোদ্ধা কবি শামীম আজাদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু মুসা হাসান,সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রধান  সম্পাদক মোহাম্মদ বেলাল আহমেদ এবং লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নাহাস পাশা।Chandosik2

ড.সেলিম জাহান তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটির সাথে যে ‘মুক্তি‘ কথাটি রয়েছে এটিই আমাদের মূল চেতনা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে আমরা যা বুঝাই,তা হলো ‘মুক্তি’। স্বাধীনতার পরেই আসে মুক্তি কথাটা।বঙ্গবন্ধু ৭মার্চের বক্তৃতায় বলেছিলেন,‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।‘ এ কথার ভেতরেই অর্ন্তনিহিত রয়েছে ‘মুক্তি’। তিনি আরো বলেন, আজকের বীরাঙ্গনা কথনে ‘মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিভাষ্য’ ছান্দসিক-এর মূল থিম।‘অশ্রুভাষ্য’ও একটি থিম আছে।তবে ছান্দসিক-এর অগ্নিভাষ্যই যথার্থ।অশ্রু নয়,প্রতিবাদ।সাহস করেই মুক্তির কথা বলতে হবে।প্রকৃত মুক্তি আনতে হবে।

কবি শামীম আজাদ একাত্তরের স্মৃতি তর্পন করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কান্না জড়িত কণ্ঠে বান্ধবী শামীম,যিনি মুক্তিযুদ্ধের ক্ষরণ নিয়ে কানাডা প্রবাসী,তাঁর আত্মজৈবনিক স্মৃতিচারণসহ মুক্তিযুদ্ধকালিন মানসিক নির্যাতনে ভুক্তভোগী প্রতিটি নারীর মতো তিনিও একজন নারী হিসেবে কীভাবে তিলে তিলে দগ্ধ হয়েছিলেন,সেই স্মৃাতিকেই বর্ণনা করেন।

মুক্তিযোদ্ধা আবু মুসা হাসান বক্তব্য প্রদানকালে কাঁন্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন,আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধে গেলাম,মা-বোনদের সাথে নিলাম না,ফেলে গেলাম হায়নাদের হাতে, আমরা তাদের সুরক্ষা দিতে পারিনি। এটা আমাদের ব্যর্থতা।

প্রতিক্রিয়া বক্তব্যে মোহাম্মদ বেলাল আহমেদ বলেন,আমার শিক্ষা জীবনে হাতে খড়ি যার হাতে হয়েছিল তিনি মুক্তিযুদ্ধের একজন নির্যাতিতা।আমি দেশে গেলে তাকে সময় করে দেখে আসি। কিন্তু দু:খের বিষয়,ক্ষমতাসীনরা তাঁর ভিটেবাড়ির একটি অংশ দখল করে নিয়েছে। কেউ তাঁর পাশে দাড়ায়নি।এই ক্ষত বহন করে আমি আছি,যেন আমরা তাঁর কেউ নই।

সৈয়দ নাহাস পাশা বলেন,বিলেতে আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে বীরাঙ্গনাদের এসব ত্যাগের কাহিনি স্কুলসমূহে গিয়ে তুলে ধরতে হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের  প্রকৃত ইতিহাস জানাতে হবে।

ছান্দসিক-এর পক্ষে আবৃত্তিকার মুনিরা পারভীন সমাপনি বক্তব্যে বলেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের মা-বোনদের নির্যাতন করেছে,তাদের ধিক্কার জানাতে এবং নির্যাতিত ও শহীদদের  সম্মান জানাতে, সেই সঙ্গে–এ সব অপরাধে যুক্ত নরপশু যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি ঘৃণা জাগ্রত করতে আমাদের এ উদ্যোগ। আরো চাই এদের সর্বোচ্চ শাস্তি। আজকের এ অনুষ্ঠান এসব অঙ্গীকারকে শক্তিশালি করার সংকল্প আমাদের উদ্দেশ্য।Chandosik3_n

অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে এবং  অনুষ্ঠানকে সফল করতে যারা  নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মুনিরা পারভীন বলেন, এরকম সহযোগিতা পেলে ছান্দসিক আরো বড়ো পরিসরে এ ধরনের অনুষ্ঠান করতে সর্বদা প্রস্তুত।

পাঠের সাথে সঙ্গীত পরিবেশনে যোগ দেয়া অতিথিকণ্ঠ শেখ রানা বলেন, এ ধরনের অনুষ্ঠানে সঙ্গীতকে যুক্ত করা আসলেই কঠিন কাজ। অনেক সাহসের ব্যাপার। মুনিরা পারভীন আমাকে এমনভাবে সাহস যুগিয়েছেন,যা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। উল্লেখ্য, শেখ রানা নতুন প্রজন্মের কাছে একজন জনপ্রিয় ও নন্দিত গীতিকবি। তাঁর গান এ প্রজন্মের মুখে মুখেই বলা যায়।

অতিথিকণ্ঠ সোমা দাস বলেন,‘বীরাঙ্গনা বিষয়টিই আমার জানা ছিল না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এমন লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছিল,তা সত্যিই ভয়ানক। আজকে বীরাঙ্গনাদের কথন পাঠে অংশ নিয়ে আমি অনেক সমৃদ্ধ হয়েছি। আমি কলকাতার মেয়ে, কিন্তু লন্ডনে বাংলাদেশের বাঙালিদের সাথে থাকতে পারায় আমি বাঙালিই থাকছি।

অনুষ্ঠানের শেষে ছান্দসিক-এর অন্যতম সদস্য কবি ময়নূর রহমান বাবুল উপস্থিত সুধীজনদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বক্তব্য রাখেন।

এদিকে,আবৃত্তিকার রেজুয়ান মারুফ-এর সাবলীল উপস্থাপানও ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রাণ।তাঁর উপস্থাপনা ও বীরাঙ্গনা পাঠ এতো মন ছোঁয়া ছিল, প্রতিটি পাঠ শেষে শ্রোতা-দর্শকবৃন্দ কোনো হাততালি দেননি। কেননা,উচ্চারণগুলো এমনই ছিল,যেন বেদনাই ঝরে ঝরে সকলকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল।

ছান্দসিক-এর এ ব্যতিক্রমী উপস্থাপনাটি বিলেতের ব্রিটিশ-বাঙালি নব প্রজন্ম এবং যারা মুক্তিযুদ্ধে মা-বোনসহ সমগ্র বাঙিালির ত্যাগকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান তাদের জন্য শিক্ষণীয় বলে সুধীজনরা মন্তব্য করেন।

অনুষ্ঠানে মোট আটজন বীরাঙ্গনার আত্মকথন পাঠ করা হয়। বীরাঙ্গনা শেফা,বীরাঙ্গনা তারা ব্যানার্জি,বীরাঙ্গনা মীনা, বীরাঙ্গনা ফাতেমা,বীরাঙ্গনা রীনা,বীরাঙ্গনা সাফিয়া,বীরাঙ্গনা মেহেরজান  ও বীরাঙ্গনা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর আত্ম কথন।

উল্লেখ্য, সদ্য প্রয়াত বীর  মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী ও সদ্য প্রয়াত কাঁকন বিবি বীরপ্রতীকের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে অনুষ্ঠানটি উৎসর্গ  করা হয়।