লন্ডনে দিনব্যাপী ‘সিলেট উৎসব’,উপছেপড়া ভিড়

61

Syl

বিলেতবাংলা,৪মার্চ: ‘প্রাণের টানে শিকড়ের গানে, এসো মাতি মিলন উৎসবে’ স্লোগান দিয়ে লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয়েছে দিনব্যাপী ‘সিলেট উৎসব’। পূর্ব লন্ডনের ব্রাডি আর্টস সেন্টারে ৪ মার্চ  রোববার স্থানীয় সময় বেলা আড়াইটায় উৎসবের উদ্বোধন করেন ব্রিটেনে বাংলাদেশের হাই কমিশনার নাজমুল কাওনাইন ও বাঙালি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের স্পীকার সাবিনা আক্তার। সাথে ছিলেন সিলেটের সাবেক এমপি, ব্রিটেনের এক সময়ের শীর্ষ কমিউনিটি নেতা শফিকুর রহমান চৌধুরী, লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি সৈয়দ নাহাস পাশা।Syl opening

অনুষ্ঠান শুরুর পরপরই উৎসবে এসে যোগ দেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রথম বাংলাদেশী ও সিলেটি বংশোদ্ভূত এমপি রোশনারা আলী, টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র জন বিগসসহ বর্তমান ও সাবেক কাউন্সিলাররা। অনুষ্ঠানের শুরুতে কমিটির চেয়ারম্যান আনসার আহমেদ উল্লা, সেক্রেটারী আহাদ চৌধুরী বাবুর স্বাগত বক্তব্যের পর বক্তব্য  রাখেন রোশনারা আলী এমপি, টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র জন বিগস, সাবেক এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরী, টাওয়ার হ্যামলেটসের স্পীকার সাবিনা আক্তার, লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব সভাপতি সৈয়দ নাহাস পাশা, জনমত সম্পাদক নবাব উদ্দিন, চ্যানেল এস প্রতিষ্ঠাতা মাহি ফেরদৌস জলিল, চ্যানেল আইয়ের ডা: আনোয়ারা আলী, এটিএন বাংলার মমতাজ বেগম ও সত্যবাণীর প্রধান সম্পাদক সৈয়দ আনাস পাশা।

কিতা ভাইসাব কেমন আছইন বাড়ীর হক্কল ভালানি’-পরস্পরকে এমন কুশলাদি জিজ্ঞাসা, শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিচারণ, সিলেটি পুঁথি, নাচ, গান, ধামাইলনৃত্য ইত্যাদি উপভোগের মাধ্যমে জড়ো হওয়া মানুষগুলো কিছুক্ষনের জন্য হলেও যেন ফিরে গিয়েছিলেন তাদের জন্মমাটিতে যেখানে পোঁতা রয়েছে তাদের শিকড়। স্থান সংকুলান না হওয়ায় অনেককেই দীর্ঘক্ষন হলের বাইরে লাইনে দাড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে এসময়।Syl2

সার্বিক তত্বাবধানে ছিলেন উৎসব কমিটির চেয়ারম্যান আনসার আহমেদ উল্লাহ, কো-চেয়ারম্যান জামাল খান, সেক্রেটারী আহাদ চৌধুরী বাবু, ট্রেজারার এএসএম মাসুম, প্রেস এন্ড মিডিয়া সেক্রেটারী জুয়েল রাজ, সদস্য শাহ মোস্তাফিজুর রহমান বেলাল, মোসলেহ উদ্দিন আহমদ, কামাল মেহদী, আব্দুল বাছির ও বিশ্বজিত রায় অপু।

এমপি রোশনারা আলী তাঁর বক্তৃতায় সিলেটি হিসেবে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করেন, এমন মন্তব্য করে বলেন, ৭ বছর বয়সে আমি এদেশে এসেছিলাম। লেখাপড়া শেষে রাজনীতি এরপর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপি হয়েছি, কিন্তু নিজের সিলেটি পরিচয় বিসর্জন দেইনি। তিনি বলেন, জাহাজের খালাসী হয়ে আমাদের পূর্ব পুরুষরা পাড়ি দিয়েছিলেন যে ব্রিটেনে, সেই ব্রিটেন এখন আমাদেরও দেশ।

ব্রিটেনে সিলেটি তথা বাংলাদেশীদের আজকের সমৃদ্ধ অবস্থানের জন্য পূর্ব প্রজন্মের দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগ তিতীক্ষার কথা স্মরণ করে সিলেটি তথা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এই ব্রিটিশ এমপি বলেন, আমাদের পূর্ব প্রজন্মের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস আজ মাল্টিকালচারাল ব্রিটিশ সোসাইটির ইতিহাসের অংশ। রোশনারা বলেন, ব্রিটেনের মূলধারার রাজনৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আমাদের প্রজন্মের অবস্থান পূর্ব প্রজন্মের দীর্ঘ ত্যাগ তীতিক্ষারই ফসল। এই সংগ্রামী পূর্ব প্রজন্মকে অবশ্যই আমাদের স্মরণ করতে হবে। সিলেট উৎসব সেই সুযোগই করে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, এমন সুযোগ করে দেয়ার জন্য আমি ধন্যবাদ জানাই সিলেট উৎসব কমিটিকে।Syl3

হাই কমিশনার নাজমুল কাওনাইন তাঁর বক্তৃতায় বলেন, ব্রিটেনে বাঙালী কমিউনিটির আজকের সুদৃঢ় অবস্থানের পেছনে পূর্ব প্রজন্মের সিলেটিদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের বিভিন্ন দুর্যোগ দুঃসময়ে ব্রিটেন প্রবাসী সিলেটিদের ভূমিকা রাষ্ট্রও স্বীকার করে এমনটি জানিয়ে হাই কমিশনার বলেন, দেশের প্রতিনিধি হিসেবে এটি জানাতেই আমি আজ সিলেট উৎসবে এসেছি।

সাবেক এমপি ও এক সময়ের শীর্ষ কমিউনিটি নেতা শফিকুর রহমান চৌধুরী তাঁর বক্তৃতায় বলেন, ব্রিটেনে বাঙালী কমিউনিটির বসতি সিলেটিদের হাত ধরে। জাহাজী হিসেবে আমাদের বাবা-চাচারা এখানে এসেছিলেন বলেই ব্রিটিশ সমাজের মূলধারার অংশ আজ আমরা।

টাওয়ার হ্যামলেটস বারার নির্বাহী মেয়র জন বিগস উৎসবে আগত সিলেটিদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, সিলেটিরা একটি পরিশ্রমী জনগোষ্ঠি। পূর্ব প্রজন্ম ব্রিটেনের মাটিতে তাদের বসতির যে ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন, দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তারা সেই ভিত্তিকে মজবুত থেকে মজবুততর করেছেন। টাওয়ার হ্যামলেটসের উন্নয়নে সিলেটিদের অবদান আমাদের স্থানীয় ইতিহাসের অংশ।

স্পীকার সাবিনা আক্তার সিলেট উৎসবের আয়োজন করায় উদ্যাক্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এতে ব্রিটেনে বেড়ে ওঠা আমার প্রজন্মের অনেকেই শিকড় সন্ধানে উৎসাহি হবে।

বক্তৃতা পর্বের পরেই শুরু হয় সাংস্কৃতিক পর্ব। এতে ছিলো সিলেটি পুঁথিপাঠ, কবিতা, ফ্যাশন শো, বাউল সঙ্গীত, নৃত্য ও সিলেটি ধামাইল ইত্যাদি। ব্রিটেনে বসবাসরত ও জন্ম নেয়া শিল্পীরা এতে অংশ নেন। প্রখ্যাত শিল্পী গৌরি চৌধুরী, আলাউর রহমান, বাউল শহীদ, হাসি রানি এবং গৌরী চৌধুরীর ‘সুরালয়’ সঙ্গীতালয়ের গানের শিক্ষার্থী ব্রিটেনে জন্ম নেয়া শিশু শিল্পী রাফা ও শুভাঙ্গী দামসহ অন্যরা এতে অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে উল্লেখযোগ্য পর্বটি ছিল কবিতা আবৃত্তি। সিলেটের কবিদের কবিতা আবৃত্তি ও পাঠ করা হয় এ পর্বে। একুশে পদক প্রাপ্ত ও গণমানুষের কবি দিলওয়ারের কবিতা আবৃত্তি করেন রেজুয়ান মারুফ, বাংলা একাডেমীর সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ পদক প্রাপ্ত কবি মুজিব ইরমের কবিতা  আবৃত্তি করেন আবৃত্তিকন্যা শতরূপা চৌধুরী,সিলেটি আঞ্চলিক ভাষার লেখা  কবি শামীম আজাদের কবিতা  আবৃত্তি করেন বাচিক শিল্পী মুনিরা পারভীন। এছাড়া সরচিত কবিতা পাঠ করেন রেজুয়ান মারুফ, কবি হিলাল সাইফ ও আনোয়ারুল ইসলাম অভি।Syl4

অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্ব উপস্থাপনায় ছিলেন সিলেট উৎসব কমিটির সাধারণ সম্পাদক আহাদ চৌধুরী বাবু,খ্যাতনামা বাচিক শিল্পী মুনিরা পারভীন,বিশিষ্ট সংস্কৃতিকর্মী সৈয়দা সায়মা আহমেদ।সাংস্কৃতিক পর্বটি যৌথভাবে উপস্থাপনা করেন মুনিরা পারভীন ও সৈয়দা সায়মা আহমেদ।তাদের দুজনের প্রাণবন্ত উপস্থাপনায়  প্রায় ৫ শতাধিক দর্শক মুগ্ধ হয়ে যেন হলে আটকে থাকেন। কখনো সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় কখনো প্রমিত বাংলায় তাদের উপস্থাপনায় ছিল আলাদা মাধুর্য।

অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্বটি ছিল ‘সাঈদা সি’র ফ্যাশন শো’।সিলেটের কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে ফ্যাশন শো’টি মুগ্ধ করে দর্শকদের।

অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বসে খাবার-দাবারের ও পোশাকের স্টল।হলের ভেতরে ছিল চিলড্রেন কর্ণার,ফটো কর্ণার ও সিলেটের ঐতিহ্যবাহী নানা চিত্রের বর্ণাঢ্য প্রদর্শন ছাড়াও নাগরী লিপির প্রদর্শন।

রাত সাড়ে ৯টায় উৎসবের সমাপ্তী ঘোষণা করেন উৎসব কমিটির কো-চেয়ার জামাল খান।