সব ব্যাখ্যা করা যায় না ভোট দিয়ে

36

শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদারের লেখাটি পড়ে মজে গেলাম। বিষয়টি বুঝা ও শেখার। বিলেতবাংলা’র পাঠকদের ছড়িয়ে দিলাম।-হামিদ মোহাম্মদ।

।। শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার।।

23376165_10155704201104303_9219319332920531495_n

আমার পশ্চিমবঙ্গের অনেক বন্ধুরাই ভাবে আসামের বামপন্থী আন্দোলন ও সংগঠন নিয়ে আমার এত গল্প, এত আবেগ কেন? ভোটে তো একটা সিট‌ও জেতে না। আজকাল আবার জামানত‌ই থাকে না বেশিরভাগ জায়গায়। তবু!! হ‍্যাঁ, তবু। ছাত্র আন্দোলনের মধ‍্য দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টিতে আসার পর যিনি আমার হাতে পার্টি কর্মসূচি তুলে দিয়েছিলেন তাঁর নাম গোপেন রায়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিপ্লববাদী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে আন্দামানে দ্বীপান্তরিত হয়েছিলেন। ওখানেই কমিউনিজমে দীক্ষা। মুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন থাকার জন‍্যে নয়। চলে যাচ্ছি বলতে। বাইরে অপেক্ষারত অচিন্ত‍্য ভট্টাচার্যের সাথে সঙ্গে সঙ্গেই বেরিয়ে এসেছিলেন। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থেকে চলে এলেন শিলচরের পার্টি কমিউনে। পরিবারের খবর আর সারা জীবন নেন নি। জানতেন‌ও না দেশভাগের পর কে কোথায় গেছে। শ্রমজীবী মানুষকে পরিবার করেই সারা জীবন কমিউনে কাটিয়েছেন স্বল্পাহারে আর সামান‍্য পোশাকে। স্বশিক্ষিত গোপেনদার কাছে তাঁর আরশোলা-লাঞ্ছিত মাদুরের শয‍্যায় বসে এঙ্গেলসের ‘পরিবার ব‍্যক্তিগত মালিকানা রাষ্ট্রের উদ্ভব’ বুঝেছি। রামকৃষ্ণের শাস্ত্রপাঠদানের মত লোকায়ত ভাষায়। আমাদের এজির দেখাশোনা করতেন টাটা কোম্পানির চাকরি হেলায় ছেড়ে আসা ইঞ্জিনিয়ার আইনজীবী ক্ষুরধার মেধার নূরুলদা। সিলেটের প্রথম কমিউনিস্টদের একজন আজমীরীগঞ্জ স্বদেশী মেল ডাকাতির রূপকার দিগেন দাশগুপ্তকে পেয়েছি সকাল বিকেল। স্নেহ পেয়েছি তাঁর। রূপকথার গল্পের মত কমিউনের বারান্দায় বসে শুনেছি বিপ্লববাদের কথা, গোড়ার যুগের পার্টির কর্মকাণ্ডের কথা, চীন যুদ্ধের সময়ে কারাবাসের কথা, জরুরি অবস্থায় আত্মগোপনের কথা। দেখেছি মাটির মানুষ মনীষ ভট্টাচার্যকে। টিলার ওপর সাধারণ একটা কুটিরে থাকতেন এই নেতা। জেলা কমিটির সভায় এলে সক্কালবেলা মনীষদাকে নিয়ে খুরশেদকাকুর চায়ের দোকানে যেতাম। শুনতাম স্বদেশী বিপ্লববাদের গল্প। করিমগঞ্জ রামকৃষ্ণ মিশনে সাধু সেজে আত্মগোপন করা দিগেনদার কাছে প্রথম রিভলবার দেখার গল্প। ছিলেন কৃষকনেতা রুক্মিনীদা। সুনামগঞ্জে বাড়ি। হাসনরাজার গল্প বলতেন। বলতেন কৃষকনেতা সাধু দামের কথা। আমি যখন স্কুলে ফাইভে পড়তাম তখন বাহাত্তরের ভাষা আন্দোলন। আমাদের মিছিলে নিয়ে যাওয়া হত। সবাই বলত, বাংলা ভাষা জিন্দাবাদ। দুজন তখনই নজর কাড়ে। তারা বাংলা ভাষা জিন্দাবাদ শুনলেই সঙ্গে সঙ্গে জুড়ে দিত, মাতৃভাষা জিন্দাবাদ। বলত, সর্বস্তরে মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। দেশে জরুরি অবস্থা এলে এদের সকলের স্থান হল কারাগারে। কলেজে ভর্তি হলাম। জরুরি অবস্থা শেষ। ইন্দিরার বিদায়। জেল থেকে ছাড়া পেল এই ছাত্রনেতারা। এদের দুজন অরূপদা, দুলালদা ছাত্র আন্দোলনে আমার পথ নির্দেশক। পরে যখন আসাম আন্দোলন শুরু হল। সারা ব্রহ্মপুত্র উপত‍্যকা জুড়ে অসমীয়া ভাষী বাম ছাত্রকর্মীদের উপর নেমে নৃশংস আক্রমণ। নির্বিচারে খুন হল। গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে দাদার কাছে বেড়াতে গিয়ে দেখেছি তাদের। মনোরঞ্জনদা, জগন্নাথদা, মিহিরদা, পবিত্রদা আরো কত। সকলে অসমীয়া, সকলে বামপন্থী। আসুর চোখে বাঙালির দালাল। তখন গুয়াহাটির পার্টি অফিসে গেলে দেখতাম পাশাপাশি বসে আছেন অচিন্ত‍্যদা, নন্দেশ্বরদা। কমরেডরা আড়ালে বলত লেনিন আর স্তালিন। দেখতাম উদ্ধবদাকে, ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রথম শ্রেণির স্নাতক, চাকরির হাতছানি ছেড়ে সর্বক্ষণের রাজনৈতিক কর্মী। তা ছাড়াও দেখেছি হেমেনদাকে। শিলচরে গেলে এখনও দেখি দীপকদাকে। ভাবলে আমার আজ‌ও শিহরণ হয়, এক সময়ের পলিটবুরো সদস‍্য, ‘উত্তরপূর্বের মেধা’ বীরেশ মিশ্রের রাজনৈতিক ক্লাস করেছি। ২০১১ সালে বর্ধমানে আক্রান্ত হয়ে যখন ৩৪ ঘন্টা অনশন সংগ্রামের পর হাসপাতালে দেখতে এসেছিলেন শ্রদ্ধেয় অশোক ব‍্যানার্জী। হাসপাতালের কেবিনে ঢুকেই বললেন, লাল সালাম তাদের যারা তোকে তৈরি করেছে। মুহূর্তে আমার চোখের সামনে এই মানুষগুলির দীর্ঘ মিছিল চোখে ভেসে উঠল।

ওই ধারার‌ই ছিলেন প্রভাংশুদা। কলেজ অধ‍্যাপক। শ্রমিক আন্দোলন করেছেন। জেল খেটেছেন। চাকরি থেকে দীর্ঘদিন সাসপেন্ডেড ছিলেন কর্তৃপক্ষের সাথে লড়ে। এমনকী নিজের দল থেকে বিযুক্ত করে নিয়েছিলেন বন্ধুদের সাথে নিজেকে স্থানীয় নেতৃত্বের সাথে লড়তে গিয়ে। ওই পর্বে এ দল, ও দল করেন নি। ফিরে এসেছেন সসম্মানে নিজের দলেই। শুধু আপোষহীনতা নয়, আত্মত্যাগেও সর্বাগ্রে। অবসর গ্রহণের পর যে টাকা পেয়েছেন তা থেকে ১৬ লক্ষ টাকা দিয়েছেন পার্টিকে। প্রায় ১০ লক্ষ টাকা দিয়ে নিজের গ্রামে একটি অসাধারণ ভাষা শহীদ স্মারক তৈরি করিয়েছেন।
চলে গেলেন প্রভাংশুদা।

সব আবেগ, সব গল্প কি ভোটেই থাকে? কী করে ব‍্যাখ‍্যা করব, কেন দীপকদা অসুস্থ শুনলে অস্থির হয়ে যাই, কেন প্রভাংশুদার মৃত‍্যু শূন‍্য করে দেয়, কেন আমার একটা সাধারণ স্ট‍্যাটাসে হেমেনদা লাইক দিলে মনটা সারাদিন উৎফুল্ল থাকে।
সব ব‍্যাখ‍্যা করা যায় না ভোট দিয়ে!