বড়দিন এবং হাসানের জন্মদিন

167

(প্রথম আলো’তে আমার লেখাটি পড়ে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক পূর্ব কোণ’র সাবেক বার্তা সম্পাদক নাসিরুদ্দিন চৌধুরী জানতে পারেন আবু মুসা হাসানের জন্মদিন ২৫ ডিসেম্বর। সেই সঙ্গে লেখাটি তাঁর স্মৃতিতে  নাড়া দেয় । ফেইস বুক থেকে বিনানুমতিতে বিলেতবাংলা’র পাঠকদের জন্যে ছড়িয়ে দিলাম। ছবিগুলো আমার দেয়া। -হামিদ মোহাম্মদ।)

।।নাসিরুদ্দিন চৌধুরী।।25659592_248968555638040_7702502718866517405_n

বড়দিন মানি। মানতেই হয়। কারণ যিশু। সেদিন যে তিনি ধরায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। মানবজাতিকে যাঁরা উদয়ের পথে, আলোর ঝর্ণাধারায় এবং বন্ধন-শৃঙ্খল-সংস্কার থেকে মুক্তির অšে¦ষণে, সত্য ও ন্যায়ের দিকে আবাহন করেন, তাঁদের জন্মদিন বড়দিনই বটে। তাঁদের জন্মতিথি মানবজাতির জন্য পুণ্যতিথি। যিশু তো মানবজাতির ত্রাতা। ক্রুশবিদ্ধ যিশুর জন্মদিন গভীরতর, মহত্তর, শ্রেয়তর ব্যঞ্জনা আনে। মানবজাতির মঙ্গলের জন্য এমন নিঃশব্দে, নীরবে, নির্বিবাদে যাঁরা জীবন বিসর্জন দিতে পারেন, তাঁরা মহামানব, পরম পুরুষ।

পঁচিশে ডিসেম্বর সেই মহিমান্বিত দিন। সমগ্র বিশ্ব এখন উৎসবের ডালি সাজিয়ে বড়দিনকে স্বাগত জানাচ্ছে। ডিসেম্বর যেন যিশুরই মাস। অবশ্য বাঙালি জাতিরও বিজয়ের মাস, গৌরবের মাস। ডিসেম্বরের শুরু থেকেই বড়দিনকে বরণের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। তৃতীয় সপ্তাহ থেকে বড়দিনের আমেজ। তবে আরো আগে থেকে

bty

জাতীয় প্রেসক্লাবের বার্ষিক  দাবা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী আবু মুসা হাসান পুরষ্কার গ্রহণ করছেন প্রেসক্লাবের তৎকালীন সভাপতি হাসান শাহারিয়ারের কাছ থেকে।

চলতে থাকে বড়দিনের ছুটি কাটাবার নানা পরিকল্পনা, উদযোগ-আয়োজন।

এই একটি দিনটিকে বরণের জন্য অনেক দিন ধরে চলে কত আয়োজন, আড়ম্বরের ঘটা। কত ধুমধাম, হল্লোড়। পঁচিশে ডিসেম্বর আসবে বলে তার আগমন পথের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষাÑ বেলুন, জোনাকজ্বলা ক্রিসমাস ট্রি, কেক নিয়ে অপেক্ষমান সান্তাক্রজ, আলোর বন্যায় ভেসে থাকে চরাচর।

দুই সহ¯্র অস্টাদশ বর্ষীয় বড়দিন দুয়ারে কড়া নাড়ার আগেই আমার সম্মুখে আনন্দের আর একটি উপলক্ষ এসে হাজির। কালকেই জানা হলো মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক আবু মুসা হাসানও এদিনই জননীর জঠর থেকে জন্মভূমির স্পর্শ পেয়েছিলেন। হাসানের জন্মদিনও আমার জন্য আনন্দের একটি উপলক্ষ, উৎসবময় একটি দিন। ব্যক্তিগত আনন্দও সমষ্টির সঙ্গে ভাগাভাগি করে উপভোগ, উদযাপনের কারণ থাকতে পারে। হাসানের জন্মদিনে আমার সে কথাই মনে হচ্ছে। কেননা হাসান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধার জন্মদিনই জাতির জন্য আনন্দের বার্তা বহন করে আনে। মুক্তিযোদ্ধারা জাতির গৌরব; বলা হয় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। সুতরাং বাঙালি জাতির একজন শ্রেষ্ঠ সন্তানের জন্মদিন পঁচিশে ডিসেম্বর; আশার ছলনে ভুলি অধুনা লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক আবু মুসা হাসান।329706_239820796083082_1419920519_o

       স্মারক নোটের একপাশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের ছবি এবং অপর পাশে বিধ্বস্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়ন এবং কমিউনিস্ট পার্টির স্পেশাল গেরিলা ইউনিটের সদস্যদের দেশ গড়ার শপথ। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী শহীদ মিনারের মিনারগুলো গুড়িয়ে দিয়েছিল। এই ছবিটি প্রয়াত ফটো সাংবাদিক রশীদ তালুকদারের তোলা। 

সত্তরের অন্তিমকালে আশির প্রদোষে আমাদের দেশে যারা সাংবাদিকতায় পদার্পণ করেন, তাদের মধ্যে হাসান অবশ্যই অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন সাংবাদিক। লন্ডনে যদি বাঁধা না পড়তেন, তাহলে হাসান সাংবাদিকতায় আরো নাম, যশ কুড়াতে পারতেন। এমনিতেই তিনি বড় মাপেরই একজন সাংবাদিক; তবে তাঁর বড়ত্ব কোথায় তার হদিস দেবার পূর্বেই ইস্টদেবতা তাঁর জন্য যে বিলেতবাস লিখে রেখেছিলেন, সেটা কে জানতো।

হাসান সাংবাদিক যত বড়ই হোন; কাজ করেছেন কিন্তু তিনি তাঁর চেয়ে অনেক বড়, এদেশের তিনজন প্রবাদপ্রতিম সাংবাদিকের সঙ্গে। যাঁদেরকে মনে করা হয় পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের সাংবাদিকতার ভূমি কর্ষণে উত্থিত শাল্মলী তরু। দু’জন তো অবশ্যই এই উপমার হকদার; অন্যজনও ন্যূন কিসে। দু’জন কে জি মুস্তাফা ও ফয়েজ আহমদ; অন্যজন আতাউস সামাদ। কে জি মুস্তাফা বলতেন মধ্যÑপঞ্চাশ ও মধ্যÑ ষাট দশকে এদেশ তিনজন শ্রেষ্ঠ রিপোর্টারের আবির্ভাব প্রত্যক্ষ করে। এই ত্রিমূর্তির একজন ফয়েজ আহমদ; বাকি দু’জন হচ্ছেন এনায়েত উল্লাহ খান মিন্টু ও শহীদুল হক।

কে জি মুস্তাফা ও ফয়েজ আহমদের সঙ্গে হাসান কাজ করবার সুযোগ পায় চট্টগ্রামের দৈনিক পূর্বকোণ পত্রিকায়। ১৯৮৬ সালে চট্টগ্রাম থেকে দৈনিক পূর্বকোণ প্রকাশিত হলে কর্তৃপক্ষ বিখ্যাত এবিএম মূসার পরামর্শে কে জি মুস্তাফাকে সম্পাদক নিযুক্ত করেন। কে জি মুস্তাফা বললেন তাঁর ফয়েজ আহমদকে চাই। সমস্যা হলো ফয়েজ আহমদ কিভাবে পূর্বকোণে কাজ করবেন? দুজনেই তো প্রায় সমবয়সী। কে জি মুস্তাফা সম্পাদক হলে ফয়েজ আহমদকে তাঁর মর্যাদার সঙ্গে মানায় এমন কোন পদ দিতে পারলে তিনি আসবেন। কে জি মুস্তাফাই একটা মাঝামাঝি ফর্মূলা দিলেন; সেটা হলো ফয়েজ আহমদ আবাসিক সম্পাদকের পদমর্যাদায় ঢাকা অফিসের অধ্যক্ষ হবেন। এই ফর্মূলায় ফয়েজ আহমদ রাজি। এক লহমায় পূর্বকোণের স্ট্যাটাস কত উঁচুতে উঠে গেল। কে জে মুস্তাফা সম্পাদক, ফয়েজ আহমদ ঢাকায় আবাসিক সম্পাদকÑএমন কম্বিনেশন কি ভাবা যায়? বাস্তবে তাই ঘটলো। কে জি সাহেবদের সমসাময়িক অনেক বাঘা বাঘা সম্পাদক, সাংবাদিক তখনো বেঁচে; তাঁদের চোখ তো ছানাবড়া।hasan5

     খেলা শুরুর আগে আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনের ক্লনটার্ফ ক্রিকেট গ্রাউন্ডে বিসিবির পরিচালক জালাল ইউনুসের সাথে

ফয়েজ আহমদ তখন রাজনৈতিক অঙ্গণে ভীষণ অ্যাকটিভ। হাসিনা-খালেদা দুই নেত্রীর কনসেপ্ট তখন এসে গেছে, ফয়েজ আহমদ দু’ নেত্রীর মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করছেন- এমন কথা ভেসে বেড়াচ্ছিলো ঢাকার বাতাসে। তিন জোটের রূপরেখা নিয়েও নাকি তিনি নেপথ্যে কাজ করছেন। ফয়েজ আহমদ দিনভর এবং যামিনীর মধ্যভাগও প্রায় অতিক্রান্ত হওয়ার সময়ে পূর্বকোণ অফিসে উদয় হতেন এবং হাসানকে বলতেন চট্টগ্রাম অফিসে লাগাও। তখনো ল্যান্ড ফোনের যুগ। হাসান এতক্ষণ তীর্থের কাকের মতো ফয়েজ ভাইয়ের পথের পানে চেয়ে চেয়ে হা পিত্যেশ করছিলো। এবার তাঁর ধড়ে এবং দিলে পানি আসলো। অকুল পাথারে পেলেন কুলের দেখা। ফোন ধরিয়ে দিলে ফয়েজ ভাই প্রথমে কে জি সাহেবের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কথাবার্তা সেরে ফোনে আমাকে ধরে বললেন, নাসির, চটজলদি ডিকটেশন নিতে পারে এমন কাউকে দাও তো। আমি কখনো নাসির (রিপোর্টার, বর্তমানে পদস্থ সরকারী কর্মকর্তা), কখনো ওয়াজেদ (বর্তমানে ইত্তেফাকের সিনিয়র রিপোর্টার), কখনো সারওয়ার (বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক), কখনো বিশ্বজিৎ (বর্তমানে দৈনিক প্রথম আলোর এসোসিয়েট এডিটর), কখনো কায়সার (বর্তমানে দৈনিক প্রথম আলোর জয়েন্ট এডিটর), কখনো তাহেরকে (বর্তমানে দৈনিক পূর্বদেশের জয়েন্ট এডিটর) দিতাম। ফয়েজ ভাইর নিউজ নিতে বললে রিপোর্টার বা সাব এডিটরদের গায়ে জ্বর এসে যেতো। কারণ সেদিন তার কম্মো হতো সারা। ফয়েজ ভাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা টেলিফোনে নিউজ বলে যেতেন। তিনি তো বলে খালাস, যাকে লিখতে হতো, তার যত জ্বালা। টেলিফোন সেট গরম হয়ে যেত, কানে ধরে রাখতে সমস্যা হতো। সবচেয়ে বড় সমস্যা হতো লিখতে লিখতে হাত ব্যথা হয়ে যেত। ফয়েজ ভাই’র তো আর নিউজ লেখা নেই। তিনি টেলিফোন ধরে পূর্বকোণ অফিসের ছাদের দিকে তাকিয়ে চিন্তা করে মনে মনে সংবাদ তৈরি করতেন, আর তৈরি হলে তাকে বাক্যে অনুবাদ করে টেলিফোনে বলে যেতেন। এদিকে চট্টগ্রাম অফিসে আমাদের সব কাজ সারা, হাত পা গুটিয়ে বসে আছি। শুধু কানটা সজাগ টেলিপ্রিন্টারে কোন শব্দ হয় কিনা সেটা শোনার জন্য। কে জি সাহেব ডামির কাগজ সামনে নিয়ে বসে আছেন। তাঁর ফয়েজ কি নিউজ দেয় সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করছেন। আমিও জড়োসড়ো হয়ে বসে।

প্রতি রাতে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। ওদিকে ঢাকা থেকে নিউজ দেরি করে আসার কারণে পত্রিকা ছাপিয়ে ভোরে হকারের কাছে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়ে যায়। হকাররা গালমন্দ করে, কোন কোনদিন আমাদের বিক্রয় কর্মীর গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করে না। পূর্বকোণের চেয়ারম্যান ইউসুফ চৌধুরী সাহেব আমার ওপর একচোট নেন। কিন্তু কে জি সাহেবকে কিছু বলবেনÑ ইউসুফ সাহেব কেন, বাংলাদেশেও কার ঘাড়ে ক’টা মাথা ছিলো?

বয়সের অক্ষমতাজনিত কারণে ফয়েজ ভাই স্বেচ্ছা অবসর নিলে হাসানই হলেন পূর্বকোণ ঢাকা অফিসের সর্বময় কর্তা। কিন্তু পরিস্থিতির কোন উন্নতি হলো না। ফয়েজ ভাই’র শাগরেদি করার কারণে কিনা জানিনা, হাসানও বিলম্বেই নিউজ পাঠাতে লাগলেন। মৎ প্রতি ইউসুফ সাহেবের চোটপাট জারি রইলো। আমি হাসানের মনোযোগ আকর্ষণ করলে তিনি বললেন এগারটার আগে ঢাকায় নিউজ ম্যাচিওর করে না। ঢাকায় রাজনৈতিক নেতাদের বাসায়, ড্রয়িং রুমে রাজনৈতিক আলোচনার আসর বসে মধ্যরাতে। তখনই যত নাটক হয়। অনুসন্ধানী রিপোর্টাররা ঘাগু গোয়েন্দার মতো গন্ধ শুকে শুঁকে সোর্স ধরে ব্রেকিং নিউজের আশায় সেইসব বাসায় ঢু মারেন অথবা আশে পাশে ওঁৎ পেতে থাকেন। ষাটের দশকে আইয়ুব-মোনায়েমের জমানায় রিপোর্টারদের এমনি মধ্যরাতের অভিসারের অনেক চমকপ্রদ কাহিনী পাওয়া যাবে ‘মধ্যরাতের অশ্বারোহী’ ফয়েজ আহমদের গ্রন্থে। তিনি তো ভাসানীকে অনুসরণ করে করে বিনা পাসপোর্টে ইউরোপেও হাজির হয়ে গিয়েছিলেন। ‘ভাসানী যখন ইউরোপে’ গ্রন্থের লেখক ও কে জি মুস্তাফার বড় ভাই খোন্দাকর মোহাম্মদ ইলিয়াসও কী? আমি শিওর নই।

বিলম্বে নিউজ দিলেও হাসান পূর্বকোণকে প্রচার সংখ্যার পিক-এ নিয়ে গিয়েছিলেন। অন্তত দুটি নিউজের কথা আমি বলতে পারি। সে দুটি নিউজের জন্য পূর্বকোণের সুনাম বৃদ্ধির পাশাপাশি অনেক কাটতিও বেড়ে গিয়েছিলো। একট নিউজ হলো, সংসদে একবার অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিলো? কারণটা এখন আর আমার সঠিক মনে নেই। অনেক দিন ধরে সংসদ বসে না। দুই প্রধান জোটের মধ্যে চরম ভুল বোঝাবুঝি। একদিন সেই অচলাবস্থার অবসানও ঘটলো। তবে সেটা রাত ৪ টার সময়। তিন জোটের মধ্যে সমঝোতা হলো, অবসান ঘটলো অচলাবস্থার। সেই নিউজ ধরানোর জন্য হাসান ৪টা পর্যন্ত সংসদে বসে ছিলো; আমিও এদিকে চট্টগ্রাম অফিসে রাত জেগে বলে আছি। ৪টার পর পর সংসদ থেকে পাঠানো হাসানের নিউজ ব্যানার হেডলাইন দিয়ে আমি পত্রিকা ছাপিয়েছি। পুরো পত্রিকা মেক-আপ করে শুধু ফার্স্ট লিডটা বসানোর জায়গা খালি রেখে আমি অপেক্ষা করছিলাম। বাংলাদেশের কোন পত্রিকা সেই নিউজ কাভার করতে পারে নি। করা সম্ভবও নয়। শুধু হাসান আর আমি দুই মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক সুঃসাহসী হয়ে সংবাদটি ধরাতে পেরেছিলাম। পূর্বকোণ সুধী মহলের সমাদর লাভ করেছিলো। ইউএনবির শামীম এখন কোথায়? তিনিও তখন একজন অনুসন্ধিৎসু রিপোর্টার হিসেবে সবার নজর কেড়েছিলেন।

জিল্লুর রহমান যেদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হলেন, দ্বিতীয় ঘটনাটা ঘটলো তাঁকে নিয়ে। জিল্লুর রহমান সাহেবের ব্যাপারে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে আওয়ামী লীগ কাউন্সিলের রাত কাবার হয়ে গিয়েছিলো। হাসান আমাকে অ্যালার্ট করে রেখেছিলেন। আমি সব কাজ সেরে শুধু ফার্স্ট লিড বসানোর জায়গাটি খালি রেখ বসে ছিলাম। তখন রাত সাড়ে তিনটা বা সাড়ে চারটা হবেÑকাউন্সিল জিল্লুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করলো। হাসান অবিলম্বে শুধু সেই ইনফরমেশনটা আমাকে ফোনে দিলেন। সম্মেলনের পূর্ণ বিবরণ আগেই পাঠিয়েছিলেন হাসান, আমি সেগুলি কম্পোজ করে রেখেছিলাম। এখন মাথাটা পাওয়ার পর তা’ জুড়ে দিয়ে হেডলাইন করে পাঠাকের হাতে গরমাগরম খবর পরিবেশন করলাম। পাঠক গোগ্রাসে সেই খবর চেটেপুটে খেলো। পূর্বকোণের সার্কুলেশন পৌঁছে গেলে এভারেস্টের চূড়ায়।

পূর্বকোণের সঙ্গে হাসানের হানিমুন পর্ব সম্ভবত বছর আটেক চলেছিলো। পূর্বকোণে যদি তাঁর পেশা জীবন বাঁধা পড়তো, তাহলে হাসান পরে আরো যেসব কীর্তি স্থাপন করেছেন, সেগুলি হয়তো হতো না। একানব্বই সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিবিসি’র বিশ্বখ্যাত রিপোর্টার ও ভাষ্যকার মার্ক টালি একটি ডকুমেন্টারি নির্মাণ করার উদ্যোগ নিলে হাসান তাঁর সঙ্গে কাজ করতে পূর্বকোণ ছেড়ে দেন। পরে আবার ইউসুফ চৌধুরীর অনুরোধে পূর্বকোণে ফিরে যান এবং চুরানব্বই সালে ফাইনালি পূর্বকোণ অধ্যায়ের অবসান ঘটান।

এরপর ঢাকা থেকে ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রকাশিত হলে তিনি সেখানে যোগ দেন। ওই পত্রিকায় কর্মরত থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধু কন্যার প্রথম মেয়াদের শাসনকালে তিনি দ্বি-সহ¯্রাব্দে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাই কমিশনে ‘প্রেস মিনিস্টার’ নিযুক্ত হয়ে লন্ডনে যান। কিন্তু বছর না ঘুরতেই জিয়া-পতœী দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে হাসানের ডিপ্লোম্যাটিক অ্যাসাইনমেন্টের অকাল পরিসমাপ্তি ঘটে। পরে তাঁর গুণবতী অর্ধাঙ্গিনী (বেটার-হাফ-এর বাংলা কি হয়?) নীলুফা ইয়াসমিনের ওঅর্ক পারমিটের ভিত্তিতে পুনরায় লন্ডনে পাড়ি জমান। সেই থেকে রাণীর দেশে একজন বাসিন্দা হয়ে  বিলেতে বসবাস করছেন।