সকাল বেলার পাখি

404

।। হামিদ মোহাম্মদ ।।

শিশুদের আচরণে আমরা খুব আনন্দ পাই,আবার  কোন কোন সময় বিরক্তও হই।তবে বিরক্ত হওয়ার চেয়ে আনন্দই পাই বেশি।আমরা সকলেই তো শিশুদের সাথে খেলতে ভালোবাসি। চটজলদি তাদের বন্ধু হয়ে যেতে পারি। আনন্দদান বা আনন্দ করা ছাড়াও কোন কোন শিশু এতোই মজার ও অবাক করা ঘটনা ঘটায় বা করে বসে সত্যিই চমকে যেতে হয়।এরকমই হার না-মানা এক উচ্ছ্বল শিশুর গল্প শুনুন।

সাংস্কৃতিক জগতে ব্যস্ত ছাড়াও ফুলটাইম চাকরিজীবী এক সাহসিকার তিন বছরের  এক শিশুপুত্রের গল্প। তার যত কাণ্ড,বেজায় মজার। সে কোন কিছু খেতে চাইলে তাকে সে জিনিসটি দেয়ার পর বলবে–না ওটা খাবো না,বায়না ধরবে আরেকটা। সেটা দিলে বলবে না ঐটা।লাল গ্লাসে পানি দিলে বলবে সাদা গ্লাসে খাবে,সাদা গ্লাসে দিলে বলবে সবুজ গ্লাসে,সবুজ গ্লাসে দিলে বলবে হলুদ গ্লাসে—এই হলো তার কাণ্ডকারখানা।

তার মা তাকে স্কুলে দিয়ে সকালে অফিসে যান।বাবা প্রত্যেকদিন বিকেলে স্কুল থেকে নিয়ে আসেন।এক দিন মা গেলেন স্কুল থেকে আনতে,তখন সে বেকে বসলো–না, সে মায়ের সাথে যাবে না,বাবা নিতে হবে।স্কুলের টিচারও বুঝিয়ে দিতে পারলেন না। বাবা ছিলেন এদিন গাড়িতে বসা। বাবা এসেই নিলেন।বাবা প্রতিদিন এসে নেন।আজও নিতে হবে। সে তার রুটিন পাল্টাবে না।

 কিন্তু এ বিপদ কাটার পর নতুন বিপদ। সে গাড়িতে চড়ে বাসায় যাবে না। প্রতিদিন হেঁটে যায়। আজও সে হেঁটে যাবে। গাড়িতে যাবে না। টিচার আবার বুঝালেন। কোনো সাধাসাধিই মানতে নারাজ। অনেক বুঝানোর পরে গাড়িতে উঠলো,তবে কান্না থামালো বাড়ির দোরগোড়ায় গিয়ে। এখানেও তার রুটিন।

 কোথাও গাড়িতে যাচ্ছে। বলবে টেনে যাবে। ট্রেনে গেলে বলবে বাসে চড়বে। তবে,‘সি টু সি’ ট্রেনকে বেশি ভালোবাসে।তার যে কোন বিষয় নিয়ে কান্না থামাতে হলে বা মা ছেলেকে তার বাবার কাছে রেখে কোথাও যেতে চাইলে তার কান্না থামাতে বা মাকে ভুলতে মৌহোষধ হলো ‘সি টু সি’ ট্রেন। ‘সি টু সি’ ট্রেন দেখাবে বললেই,এমনি কোথায় তা দেখতে ছোটে। তখন মা কোথায় গেল, না থাকলো–খবর নেই।

এমনি আরেকটি শিশুর কথা বলতেই হয়।পূর্ব লন্ডনের রিসমিক্স সেন্টারে একটি  অনুষ্ঠানে গেছি। হলের সামনে দাঁড়িয়ে আড্ডা হচ্ছে। এমনি সময় এক ইংরেজ শিশুকন্যা বায়না ধরলো ছবি তুলবে। হাত দিয়ে মাকে দেখিয়ে বললো, ঐ প্রিন্সেসদের সাথে ছবি তুলবো। যাদের সাথে ছবি তুলবে বললো তারাও বিষয়টি বুঝে ঝটফট  বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নিয়ে পোঁজ দিলেন। মেয়েটি এতোই খুশি হলো তার  হাস্যোজ্জ্বল ছবি না দেখলে বুঝার উপায় নেই।এই বাচ্চাটির ‘মন’টাকে পাঠ করতে গিয়ে এদিন চমকে উঠি। 23434995_1468200586633855_6364629189476443449_n

আবার ফিরে আসি আমার মূল গল্পের ক্ষুদেমনির কাছে।  প্লাটফরমে দাঁড়ানো। পরের ট্রেনে হয়তো কোথায় যাবেন।অন্য গন্তব্যের ট্রেন যাচ্ছে,সে কান্না শুরু করে দেবে,ট্রেন চলে যাচ্ছে বলে। তার কথা হলো ট্রেন চলে যাচ্ছে আর সে দাঁড়িয়ে আছে, তা হয় না।কোথায় যেতে হবে,তা বিষয় নয়,তাকে ট্রেন চড়তে হবে। এটা হয়তো স্বাভাবিক ঘটনা।কদিন আগে তার জেদধরা ও কান্না থামানোর জন্য এক ইংরেজ তরুণী এক মার্কেটে তাকে বেলুনসহ অনেক উপহার দেয় এবং শেষ পর্যন্ত কান্না থামাতে প্রস্তাব করে তাকে বিয়ে করতে সে রাজী কিনা।এই হলো সেই ক্ষুদে রহিম বাদশা। কোনো কোনো সময় কী জন্যে সে জেদ ধরেছে তা বলতে চায় না।বড়দের কোনো কিছু তার পছন্দ না হলেই এমনটি করে, উল্টে যায়।Iham_n

যখন ঘরে যায় তখন কি শান্ত থাকে? ঘরের সব কিছু ওলটপালট,তছনছ করেও নিস্তার নেই।মা কিংবা বাবা অনবরত বলছেন,বারণ করছেন, বাবা ওটা ধরো না,ঐটা নয়।আর দমায় কে? তার ছটফটানি কে দেখে!এতো ছটফট, অস্থিরতা,চৈ চৈ করা বালক শিশুটি হয়তো একদিন এ ঘুণেধরা সমাজ ও ম্রিয়মান পৃথিবীটাকে পাল্টে দিতে পারে।

এসব আচরণ করা শিশুকে নিয়ে কেউ কেউ ঘাবড়ে যেতে পারেন। আমার বন্ধুটিও ঘাবড়ে যেতে পারেন।

কিন্তু না,ঘাবড়াবার কিছুই নেই। যে শিশু যত বেশি প্রশ্ন করে,এটা ওটা নিয়ে জ্বালাতন করে সে শিশু তো উদ্ভাবক,মেধাবী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

আমাদের এ বন্ধুটি দম্পতির এমনি ভরসা,বিরক্ত হওয়ার কিছু নেই।ছেলেটি আইনস্টাইন কিংবা স্টিফেন হকিংকে মেধায় একদিন ছাড়িয়ে যাবে হয়তো। বা কোন এক সেরা বিজ্ঞানি হবে, অথবা বড় দার্শনিক।

শিশুরা তো বড়দের ফলো করে।বড়োরা যা করেন,যা বলেন তাই শেখে। কিন্তু আমাদের সব কিছু,সব বিষয় যে শিশুরা সহজে শেখে না।তাকে নিজের মত করে শিখতে দেয়া জরুরি,নতুন কিছু করার সুযোগ করে দেয়া অতি প্রয়োজন।।কারণ এ শিশুই নতুন পৃথিবী গড়বে,তার নতুন চিন্তা চেতনায় আবিষ্কারে,ভাবনায়।

আমরা ছোটবেলায় ‘আমি হবো সকালবেলার পাখি’ কবিতা পড়েছি।কবিতার একটি ছত্র–‘আমি যদি না-জাগি মা কেমনে সকাল হবে।’

এই সরল উক্তি,সরল বাক্য সব শিশুদের মনে জেগে আছে।কিন্তু আমরা নানা বাঁধন,বেড়াজালে আটকে দিই শিশুর এই আকুতি বা বড় অর্থে মেধার কান্নাকে।

একটি শিশু যখনই কাঁদে বা কেঁদে ওঠে,তখনই বুঝতে হবে তার চাওয়ার বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান।সে যা চাইছে তা আমরা দিচ্ছি না।

আমরা হয়তো অনেকেই জানি না,শিশুকে কোন কিছু করতে বা বলতে না দিয়ে বার বার বাঁধা দিলে শিশুটি এক সময় অবদমিত হয়ে যাবে বা যেতে পারে। হয়তো মনে করবে, সে যা করছে তা দোষের বা দোষণীয়। এক সময় তার সৃজনশীলতা লুপ্ত হয়ে যাবে,নিজেকে গড়ে তোলার আকাঙ্খা বিলুপ্ত হয়ে মানসিকভাবে পঙ্গুত্ববরণ করতে পারে।

তাই, শিশুদেরকে ‘হ্যাঁ’ বলেই গড়ে তোলার ক্ষেত্র প্রস্তুত রাখা চাই। বিশ্ব শিশু দিবসের স্লোগানটাও শিশুকে ‘হ্যাঁ’ ’বলা।

বিলেতে অবশ্য,স্কুলে বা পরিবারে বাচ্চাদের বিকাশে অবারিত সুযোগ দেয়া হয়। মনোযোগ দেয়া হয় তার চাওয়ার প্রতি। বাচ্চাদের মানসিক বিকাশে সর্বোচ্চ প্রণোদনা যেমন স্কুলে দেয়া হয়,তেমনি পরিবারেও।তার ক্রিয়েটিভিটিকে গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষণীয় খেলনাও দেয়া হয়। যা খুশি তা খেলতেও দেয়া হয়। এই শিশুটি খেলতে খেলতে একদিন বড় কেউ হয়ে ওঠে,‘থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে দেখবো এবার জগতটাকে।’ জগতকে দেখেই ছাড়ে।

এতো কিছু বলার পর হয়তো মনে আসবে শিশুটি কে। এই শিশুটি আর কেউ নয়,বাচিক শিল্পী ছান্দসিক’র কর্ণধার মুনিরা পারভীনের তনয় ইলহাম। মুনিরা যখন কোনো অনুষ্ঠানে যান তখন ইলহামের সঙ্গ দেন তার বাবা আরিফুর খন্দকার।

এই না-থামা,না-ছোড় ইলহাম একদিন আমাদের বেপরোয়া সমাজকে রাস টেনে ধরবে,হয়তো বাগে আনবে অসুর শক্তিকে। আর,কষ্টাতুর মর্ত্যকে শান্তির বাগানে রূপান্তর ঘটালে অবাক হবো না। সে যে আমাদের সকালবেলার পাখি। জানি,ক’দিন পর সেও বলবে—আমার নাম ইলহাম,আমি একটি কবিতা পড়বো। সে কবিতা হবে সমাজ বদলের।