সৈয়দ হিলাল সাইফের ‘খোঁচাকথা’র পাঠ: পাড় ভাঙার ধ্বনি

544

 || হামিদ মোহাম্মদ ||

Khucha Kota 2_n

কবিতা ও ছড়াকে আলাদা ভাবা হয় না। কিন্তু এর বক্তব্য ও গড়নকে শৈল্পিক দৃষ্টিতে দেখলে ছড়ার অস্তিত্ব ভিন্নভাবে টের পাওয়া যায়।ছড়া সাহিত্য কাব্য সাহিত্যের গোত্রভুক্ত হলেও তার বৈপ্লবিক দিক এবং সাহসী উচ্চারণ পাঠককূলকে স্পর্শ করে সরাসরি। বাংলাসাহিত্যের বড় বড় কবিরা যখনই সমাজকে সরাসরি বিশ্লেষণ ও অঙুলি নিদের্শ করতে চেয়েছেন তখনই ছড়া’র আশ্রয় নিয়েছেন।মধ্যযুগের কবি মদনমোহন তর্কালঙ্কার,কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,কাজী নজরুল ইসলাম,সুকুমার রায় থেকে শুরু করে হাল আমলের তরুণ কবিরা এ মাধ্যমটিকে কথা বলার ধনুক হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

কবি সৈয়দ হিলাল সাইফ বাংলাসাহিত্যের এ ধারালো মাধ্যমে সুপরিচিত অথচ নির্লিপ্ত একজন ছড়া নির্মাতা।ইতোপূর্বে আমরা তার ছড়া গ্রন্থ ‘ হাহ হা’(প্রকাশকাল ২০০৬) ও হিলাল সাইফ ডট কম (২০১১)দুটি গ্রন্থ পাঠ করেছি।এরপর তৃতীয় প্রকাশনা ‘খোঁচাকথা’। এ গ্রন্থখানি পাঠে এক নতুন দিগন্তকে ছুঁয়ে দেখার প্রয়াস জাগে।নতুন স্বাদের আকাঙ্খাও মগজে কিলবিল করে—যার মাঝে ঝালমিষ্টি টক আর জাগিয়ে দেয়ার প্রচ্ছন্নতা বিদ্যমান।Syed Hilal

‘খোঁচাকথা’র ছড়াগুলো সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও চলতি পথে দেখা নানা অসংগতিকে কবি সৈয়দ হিলাল সাইফ বেশ মুন্সিয়ারার সাথে আমাদের উপহার দিয়েছেন। প্রতিটি ছড়া পাঠে মনে হয় এই যেন আমি পাঠকও এখানে জড়িয়ে আছি বা পাঠক দেখছেন সমাজে বিদ্যমান এসব চিত্র। কোনো কোনো ছড়া এমনই মনে হয় আত্মসমালোচনার একটি মাপকাটি। ছড়া সাহিত্যের এই প্রবণতাও কি কম প্রয়োজন? সাহিত্যকে সমাজের আয়না ভাবলে সৈয়দ হিলাল সাইফের ছড়া এক প্রচ্ছন্ন কারুকাজ বা শিল্প—যা আয়নায় নিজের মুখ দেখা।

‘খোঁচাকথা’কে হিরন্ময় হাতিয়ার না ভেবে উপায় নেই—এই জন্য যে নিজেকে আবিষ্কার করার এক ধরনের গবেষণাগার হিসেবেই ধরে নেয়ার প্রাকার বা প্রকরণ যোগ হয় পাঠক মনে।

এই প্রাকার বা প্রকরণটি কি?তা একটু পাঠ করেই দেখা যাক।ছড়া১, ‘সকল কথাই বলে যদি/ঠ্যারে ঠ্যুরে অনুমানে/ কন তো তারে জন্ম দিছে/গরিলা না হনুমানে?’। এ উচ্চারণ আয়নায় মুখ দেখা হয় শুধু এক আতসী আয়নায় নিজেকে দেখা।

ছড়া২, ‘সত্যি করি কস না সখি/হাতে নিছোস কার বালা?/আজকে যদি মিথ্যা বলিস/ঘটাই দিয়াম কারবালা!’

এ ছড়াটিও সমাজের আন্ত:কথন নির্ণিত।মনের অজান্তে আমরা প্রেম উপখ্যান এভাবেই রচনা করি নিয়ত।এ রকম প্রশ্ন নিয়ে চলাফেরা করি,সমাজে বিচরণ করি,নিজের সাধুতাকে যাচাই করে তৃপ্ত হই।

ছড়া৩, ‘আমার তো নাই সায় সম্বল/বিশেষ কোনো পুঁজিও নাই/তাই তো আমি চৌদ্দ তারিখ/ভালোবাসা খুঁজিও নাই’।

পরের ছড়াটি ছড়া ৪, ’গড়ছি আমি আস্তানা/লাভই আছে,খাস্তা না/ যদিও জানি আখেরাতের/ওটা কোনো  রাস্তা না।’

ছড়া ৫, ‘ধরলে বলিস নাটক তোরা/না ধরলে কস পালক/কবে তোরা সত্য কবে/ এই হারামির বালক’।

ছড়া ৯,দুতাবাসে থাকা যতো দুতেরে/ওই ঘরে আছর করে ভুতেরে/যার দ্বারে যায়/তার বুলি গায়/ কি কথা কই পুতেরে।’

এরকম অনেক ছড়া বুক কাঁপিয়ে দেয়।যেমন– ছড়া ৩৪,শুনলে যাদের কথাবার্তা/ উঠতো ভরে চিত্ত/ এখন ওদের মুখের ভাষায়/ ভয় করে যে নিত্য।’

ছড়া ৫৬,ভালো কথা বলতে গেলে/স্বর করে ভাই উঁচা/আশেপাশে লোক যে ভাবে/ দিচ্ছো কথার খোঁচা।’

ছড়া ৬১,আমি এখন আগের চেয়ে/ভালোয় আছি/অন্ধকারের প্রলেপ ভেঙে/. আলোয় আছি।’

ছড়া ৬৪, কী বলি মোন ওরে দুষ্টু/নির্বাচন কি হয়নি সুষ্টু?/সব যদি তর হইলো লুট/কে দিছে ক এত ভোট?’

ছড়া ৬৫, এ যেনো এক হরি লুটেরার দেশ/জনগণ শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে/ কার চে কে কম আর বেশ।’

ছড়া ৬৬, আমাদের ভেতর আর বাহিরের গুণে/কখন যে ধরে গেছে বুঝিনি তা ঘুণে/দধি বুঝে খেয়ে আছি ঘটি ভরা চুনে/ মুখ বুজে পরে থাকি সব জেনে শুনে।’

ছড়া ৬৭, ওরে ও ভাই কেরামত!/আগে যদি জানতাম আমি/ করতাম তোমায় মেরামত।’

আমরা সমাজকে মেরামত করতেই ব্যস্ত অথবা মোটেই মেরামত করতে চাই না। বুঁদ হয়ে পড়ে থাকি বা তোয়াক্কাই করি না।

সমাজের এই টানাপোড়ন চলবে এবং চলছেই। সামাজকে ভেঙে নতুন নির্মাণের এমন খোঁচাটাই  ‘খোঁচাকথা’র মূল কণ্ঠস্বর।এ কণ্ঠ কবে ছাপিয়ে ওঠেবে,ভাসিয়ে নেবে আবর্জনা কবি সে বেদনা নিয়েই পাঠকের দরজায় কড়া নেড়েছেন।

আমরা কি দরজা খুলবো?না বসে থাকবো বদ্ধ ঘরে!হয়তো জেগে উঠবো,পৃথিবীটা যে সব মানুষের,সীমানাহীন বসবাস।

কবি হিলাল সাঈফের সঙ্গী পাঠকরা এমনি করতালি দিয়ে একজোট হওয়ার আকাঙ্খা ছড়িয়ে দিক বিশ্বময়। কবি দিলওয়ারের ভাষায় ‘পৃথিবী স্বদেশ যার আমি তার সঙ্গী’।

কবি হিলাল সাইফের ‘খোঁচাকথা’র সঙ্গী আমরা।

প্রচ্ছদের ছত্র ‘অন্ন ত্রাণ পরিধান/ টিভি এলে করি দান/আর না আর না মৌসুমী কান্না. . ’ মিথ্যে হউক। বইটি হাতে নিলেই আলাদা মায়া লাগে।এতো সুশোভন ‘খোঁচাকথা’মন কেড়ে নেয় তার অবয়ব।

অরূপ বাউল মজাদার প্রচ্ছদ উপহার দিয়েছেন। উৎসর্গপত্রে জীবন সাথী সৈয়দা আম্বিয়া রহমানকে বলেছেন–‘এই কথা কেউ আর কয় না/তার সাথে ‘খোঁচা কথা হয় না।’

সৈয়দ হিলাল সাইফের পাড় ভাঙার ধ্বনি ‘খোঁচাকথা’ প্রকাশ করেছেন শীতলপাটি প্রকাশন, জিন্দাবাজার সিলেট।প্রচ্ছদ অরূপ বাউল।সেপ্টেম্বর ২০১৭।

প্রচ্ছদের ভেতরের কভারে উৎকীর্ণ কথা যা খোদাই করা ‘আমায় তুমি ধরায় রেখে/খুঁজতে আছো নাসায়/হাত বাড়ালেই কাছে পেতে/একটু ভালোবাসায়’। সেটা যেন আমাদের সমাজ জীবনে সত্য হয়।

সৈয়দ হিলাল সাইফের জন্ম ১৯৭৯ সালে। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার বিখ্যাত সৈয়দপুর গ্রামে।বর্তমানে বিলেতবাসী।