‘চিৎকার’ ছড়া গ্রন্থের একটি পাঠ চিন্তন

238

।। হামিদ মোহাম্মদ।।

‘ছড়া হিরন্ময় হাতিয়ার’ কথাটি চালু সাহিত্যমহলে। ছড়ায় সোজাসাপটা উচ্চারণ।তীর্যক বক্তব্যের প্রকাশ ঘটে প্রতিটি বাক্যে। সমাজের অসংগতি তুলে ধরা,রাজনীতির ঘোর সমালোচনা,স্লোগানধর্মী শব্দক্ষেপন,মুখরোচক ও উপাদেয় নিমার্ণে যে কাব্য সৃষ্টি করেন কবিরা তা-ই ছড়া। এর ধার এতোই প্রখর পাঠকমহল দ্রুতই লুপে  নেন।এর আয়নায় সমাজকে বিশ্লেষণ আর দেখা হয়ে ওঠে এক বীর্যবান মাধ্যম।Chitkar Book_o

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে ছড়াসাহিত্যের বীর পুরুষ সুকুমার রায়, সমাজসেচতন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য এসব কবিরা সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ছড়াসাহিত্যকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। উপনিবেশ থেকে মুক্তির মন্ত্র ছিল তাদের সৃষ্টিতে সমধিক। এর ধারাবাহিকতায় ভাষা আন্দোলন,বাংলাদেশের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ,এর আগে পাক দু:শাসন থেকে মুক্তি ও রাজপথে জনতার সংগ্রামকে উপজীব্য করে ছড়া সাহিত্য এক ভিন্ন চরিত্র নিয়ে হাজির হয় বাঙালি সমাজে।

বাংলাসাহিত্যের পথপরিক্রমায় সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশে ছড়া সাহিত্যের চর্চা এক উচ্চমাত্রায় পৌঁছে। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে সমাজ পরিবর্তনের হাওয়া ছড়া সাহিত্যকে নাড়া দেয়। কবিরা সমাজের ভাঙন আর সমাজের নতুন অবয়ব বদলের সঙ্গী হন অবলীলায়। ছড়াকার শাহাদাত করিম এ সময়ের এক শক্তিশালি কলমযোদ্ধা। সমাজের পালা বদলের এ উজ্জ্বল সময়ে সমগ্র বাংলাদেশ ও  সমাজকে কাঁপিয়ে তুলেন এক ঝাঁক তরুণ লেখক ও কবিরা। শাহাদাত করিম এ সময় ও গোত্রের একজন সৃজনশীল ছড়াকার।

এ ক্ষেত্রে জাতীয় দৈনিক পত্রিকার শিশুপাতাসমূহ, বাংলা একাডেমীর শিশুকিশোর প্রকাশনা ‘ধান শালিকের দেশ, কিশোর সাহিত্য পত্রিকা ’নবারুন’সহ আঞ্চলিক ও জাতীয়ভিত্তিক সাহিত্য পত্রিকাগুলো স্বাধীনতার পর সাহিত্য আন্দোলনের ভুমিকা পালন করে।শত শত সাহিত্য সংকলনও প্রকাশনা ছিল সাহিত্য আন্দোলনকে বেগবান করতে উল্লেখ করার মতো।

শাহাদাত করিম সে সময়ের প্রায় সকল সাহিত্য পত্রপত্রিকা ও জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতায় নিয়মিত লিখতেন। তাঁর প্রথম ছড়াগ্রন্থ ‘উল্টোসিধে’। প্রথম ছড়াগ্রন্থটি প্রকাশিত হলে পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া পড়ে।এরপর বিলেতবাসী হন।

দীর্ঘ বিরতির পর  সম্প্রতি শাহাদাত করিমের দুটি ছাড়াগ্রন্থ‘ চিৎকার’ ও ‘খোঁচাখুচি’ বেরিয়েছে।আরো তিনটি বই অচিরেই বের হচ্ছে। তাঁর ‘চিৎকার’ গ্রন্থখানা হাতে নিয়ে পড়ে মনে হলো তার প্রতিটি গ্রন্থই আলাদাভাবে আলোচনার যোগ্য।

তাই,এ আলোচনায় ‘চিৎকার’এর অর্ন্তভুক্ত ছড়া নিয়ে অনুভুতি। ‘চিৎকার’নামেই বুঝায় দোহ বা প্রতিবাদ কিংবা  না-মানা। সমাজের অসংগতিকে না-মানার ‘চিৎকার’ প্রতিটি ছড়ায় প্রোজ্জ্বল।একেকটি ছড়া জ্বলজ্বল করছে একেকটি তারার মতো।

প্রথম ছড়া ‘খেটে খাওয়া’। এ ছড়াতেই যে চিৎকার তা—‘আমরা তো খেটে খাওয়া/খালি দেয় গালি সে/ফুটপাতে শুয়ে পড়ি/ ইটপাতা বালিশে/ক্ষুধা পেলে খানা চাই/চিল্লাতে মানা তাই/দূর থেকে হেসে হেসে/জোরে দেয় তালি সে।/

তোষামোদে কাটে দিন/কাটে তেল মালিশে/মজুরিটা চাইলেই/মারে কিল হালি সে/খেটে খুটে বেকারার/প্রতিকার পাই না যে/ফরিয়াদ সালিশে/’

এছড়াটিতে নিরন্ন মানুষের কাতরধ্বনি,বাকস্বাধীনতাহীনতা এবং বিচারহীনতা সামগ্রিক বিষয়টি মাত্র কয়েকটি লাইনে ফুটে ওঠেছে।ছড়া যে হিরন্ময় হাতিয়ার এর প্রমাণ এ কয়েকটি হিরন্ময় লাইন।এতো সহজভাবে বলার ক্ষমতা ছড়া মাধ্যমটি ছাড়া আর কোনো লিখিত মাধ্যম আছে বলে আমার জানা নেই।

প্রথম ছড়াটিতেই গ্রন্থের নামের প্রতিধ্বনি রয়েছে এরপরও দ্বিতীয় ছড়াটি নাম‘চিৎকার’কে আরো চিহ্নায়িত করেছে।যেমন–

‘ঘটিবাটি লোটা আর/ ভিটেমাটি গেলো/খেটেখুটে বেকারার/সবই এলোমেলো।/চুঁই চুঁই পেটে চুঁই/ফালানি রে ফালানি/সাধ্যি যে নেই আহা/চড়া দামে চাল আনি/সার নেই গ্যাস নেই/বিদ্যুৎ পানি/মুসকিলে দেশবাসী/বাড়ে পেরেশানি/বাঁচবার দাবী ওঠে জোরে দিই চিৎকার/পৃথিবীটা দেখবেই অবশেষে জিতকার/।’

এ ছড়াটিতে দেশের সংকটের চিত্র ফুটে ওঠেছে উজ্জ্বলভাবে। তৃতীয় ছড়াটিতে শোষণ ও বঞ্চনা সম্পর্কে  আরো প্রচ্ছন্নভাবে উল্লেখিত হয়েছে।।শেষ ছত্র কটি ‘দিন শেষে ঘরে ফিরি/নিয়ে ‘বাসি’ খাদ্য/পরদিন এই কাজে/ফিরে যেতে বাধ্য।’

‘টাকলু’ছড়াটি দেশের সম্পদ ব্যবস্থাপনার সংকট ও তার চিত্র এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর হেয়ালিপনার হাস্যকর দিকটি ফুটে ওঠেছে। ছড়াটি-‘বেল ফেটে রস পড়ে/পাবে কাক ভাগরে/টাকশালে উঁকিঝুঁকি/ডিজিটাল বাঘরে/সাইবার হেকিংয়ে/করে বাঘ হুমরে/টাকা নেই টাকশালে/সব টাকা গুম রে/ লাখো কোটি মোটে টাকা/ খোয়া গেছে মাত্র/টাকলু’র কথা শুনে জ্বলে ওঠে গাত্র।’

শাহাদাত করিমের ছড়ার মাঝে ভেংচিকাটা স্বভাব রয়েছে। এরকম একটি ছড়া খেতাব কিংবা পদক। ‘পয়সা দিলে দুনিয়া মিলে’/খেতাব মেলে আর/জমজমাট তো বেশ রে এখন/পদকের কারবার/‘এটু’রমা আর ‘ফেটু’র বাপও/ বাড়িয়ে গলা কয়/একটা খেতাব কিংবা পদক/না দিলে না হয়/ পাগল পাগল সবাই পাগল/একটা পদক চাই/জান বাঁচে না খেতাব ছাড়া/ কুটছে মাথা তাই।’

দেশকাল ও সাম্প্রতিক ভাবনা ও ঘটে যাওয়া ঘটনার চিত্র এবং এর অভিঘাত শাহাদাত করিমের প্রতিটি ছড়ার প্রতিপাদ্য। এমনি একটি ছড়া-বিলেতফেরত। গাঁয়ের চোরে হুড়কো ভাঙে/খিড়কি আরো ছিটকিনি/বিলেতফেরত টাউনে এসে/গড়েন দালান ইট কিনি/। ঘামের টাকায়  চোখ জুড়ানো/অট্টলিকা দালান/জঙ্গিদেরই আস্তানা হয়/আসে বোমার চালান/বিলেতফেরত মুসকিলে/তাই,ভাড়া দিতে মানা/থাকবে ফ্লাটে গরু ভেড়া/মুরগি ছাগল ছানা/মোকদ্দমায় জড়িয়ে ঠিকই/কয় কথা হুশ দিলে/ঠিক হয়ে যায় সবই পরে/ জায়গা মতো ঘুষ দিলে।’

ছাড়াগ্রন্থ ‘চিৎকার’এর মধ্যে রয়েছে মোট চল্লিশটি এরকম সমাজ ও সময়কে ধারণ করা শাণিত চিৎকার।

সাম্প্রতিক সময়ে সমাজ চিত্রে যে সংকট চলছে তা এ ধরনের ছড়ায় প্রকাশ করা নৈতিকভাবেও প্রয়োজন। সত্য প্রকাশে সব সময়ই এস্টাবলিশমেন্টর থাবা থাকে স্বাধীন  মত প্রকাশের বিরুদ্ধে। সাহিত্য এ সময় হয়ে ওঠে এই বোবা সমাজের প্রতিনিধি। চিৎকার এই বোবা সমাজকে প্রতিনিধিত্ব করছে,করবে। এই বিশ্বাস নিয়ে পাঠক শাহাদাত করিমের ‘খোঁচাখুচি’ পাঠেরও অপেক্ষায় থাকবেন।

‘চিৎকার’ প্রকাশ করেছেন প্রতিভা প্রকাশ,ঢাকা।প্রকাশ কাল আগস্ট,২০১৭। প্রচ্ছদ অংকন করেছেন সোহাগ পারভেজ। প্রতিটি ছড়া অলংকরণ করছেন প্রীতি দেব।

উল্লেখ্য, চিৎকার গ্রন্থটি আলোচনা করতে গিয়ে মনে হলো প্রাসঙ্গিক কিছু কথা।তাই,শাহাদাত করিমের বেড়ে ওঠার কাল নিয়ে দুচারটি কথা বলা প্রয়োজন বলে মনে করছি।

ষাট ও সত্তর দশকে সিলেটের সাহিত্য আন্দোলনের পুরোধা কবি ছিলেন কবি দিলওয়ার।শহর সংলগ্ন সুরমানদীর তীরে ভার্থখলায় ছিল ‘খানমঞ্জিল’ কবির বাড়ি।এই সুবাধে, এ ‘খানমঞ্জিল’ই সিলেটের সাহিত্যসংস্কৃতি চর্চা ও সাহিত্য আড্ডার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। প্রায় প্রতিদিনেই তরুণ কবি সাহিত্যিকদের ভীড় লেগে থাকতো কবি দিলওয়ারের এ বাড়িতে।

কবি দিলওয়ার মূলত কবি হলেও ছড়া লিখতেন প্রচুর। তাকে ‘ছড়ারাজা’বলা হয়। সিলেটের সাহিত্য সংস্কৃতি জগত কবি দিলওয়ারকে বলয় করে ছিল ষাট সত্তর ও আশির দশক উজ্জ্বলতর। কবি দিলওয়ারের প্রণোদনাই তখনকার তরুণ লিখিয়েদের জন্য ছিল সৃষ্টিশীল প্রবাহ। শাহাদাত করিমও কবি দিলওয়ারের ভক্তকূলের একজন। তাই, তিনিও ছড়াসাহিত্যকে প্রেরণা ও ছায়া হিসেবে বেছে নেন। এসময় কবি মাহমুদ হক ও শামসুল করিম কয়েস ছিলেন সিলেটে অগ্রজ কবি ও ছাড়াকারদের মধ্যে প্রতিভাবান। ছড়া সাহিত্যে আন্দোলনমুখী লেখালেখিতে দীপ্রপদচারণায় আরো ছিলেন কবি তুষার কর, রোকেয়া খাতুন রুবী,মোস্তাফা বাহার, বুদ্ধদেব চৌধুরী, কাদের নওয়াজ খান, অজয় পাল সেলু বাসিত,শাহাদাত করিম,বুদ্ধদেব চৌধুরী, কাদের নওয়াজ খান, অজয় পাল,ভীষ্মদেব চৌধুরী,সন্তু চৌধুরী,শেখর ভট্টাচার্য,ফতেহ ওসমানি, মাহমুদুল হক ওসমানি,সুফিয়ান আহমেদ চৌধুরী, আনোয়ার ইকবাল কচি,গোবিন্দপাল,শাহেদা জেবু,হোসনে আর হেনা,দিলু নাসের, হীরা শামীমসহ আরো অনেকে। সিলেটে শিশুকিশোর সংগঠন খেলাঘর,কঁচিকাচার মেলা,চাঁদের হাট এতোই সক্রিয় ছিল এসব সংগঠেনর প্রায় প্রত্যেকেই লেখালেখিতে যুক্ত ছিলেন। শাহাদাত করিম চাঁদের হাট-এর সিলেট শাখা গড়ে তুলেন১৯৭৬ সালে। এবং জেলা সংগঠক হন।তার পরিচালনায় চাঁদের হাট সিলেটের শিশুকিশোর সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অল্পদিনেই জনপ্রিয় সংগঠনে রূপ নেয়। এ সময় প্রতিটি সংগঠনের  নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদি আয়োজন ছাড়াও একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস,স্বাধীনতা দিবস,বিজয় দিবস ও পয়লা বৈশাখে সুশোভিত সংকলন বেরোতো।এসব সংকলন প্রকাশনা সুন্দর ও মান সম্মত করার এক ধরনের নীরব প্রতিযোগিতা ছিল উল্লেখের মত। এসব সংকলনে দেশের প্রথিতযশা লেখক ও কবিরা লিখতেন।এছাড়া সিলেট থেকে প্রকাশিত বাংলা প্রাচীনতম পত্রিকা যুগভেরীর সাহিত্যপাতা ও শিশুপাতা শাপলার মেলা বের হতো অত্যন্ত মান সম্মত।

শাহাদাত করিম ছড়াকার হিসেবে সিলেটের এই এক ঝাঁক ছড়া লিখিয়েদের মধ্যে আলাদা অবস্থান তৈরী করেন এবং সক্রিয় সাংস্কৃতিক কর্মীও ছিলেন। তাঁর লেখার বিশিষ্টতার মধ্যে  লেখার ধরনই ছিল তীর্যক,ভেংচিকাটা। প্রথম ছড়াগ্রন্থ ‘উল্টোসিধে’নামটিই এর পরিচয় বহন করে। বর্তমানে প্রকাশিত ‘চিৎতকার, ‘খোঁচাখুচি’ বইগুলোর নাম ও লেখা একই ধারার।