তাগা

222

।। রফিকুল হাসান ।।

আমার বা কব্জিতে বাঁধা সাতরঙের সু পেঁচানো সুতোর তাগা দেখে ছেলেবেলার বন্ধু হেসে বললো, শেষ পর্যন্ত তুইও তাগা বাঁধলি। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে মানুষ কত কিছু না করে, তাগা বাঁধা তো সামান্যÑ জবাব দিলাম আমি।তারপর প্রায় অজুহাতের সুরেই বললাম,তবে তুই যদি এই তাগা বাঁধার ইতিহাস শুনিস,তবে যা ভাবছিস তা আর তোর মনে রইবে না।

কয়েকদিন প্রায় অচেতন থাকার পর আইসি ইউতে আমাকে নেয়া হয়েছে বিশেষ ওয়ার্ডে। পূর্ব লন্ডনের সেইন্ট বার্থলোমিও হাসপাতালের হ্যামাটো অনকোলজির ৪ তলার বিশেষ কামরায়। ১৬ শতকের ঐতিহ্যবাহী হাসপাতালের এক ধারে এই নতুন দালান।কামরার চার দেয়ালের এক দেয়াল পুরোপুরি কাঁচের।পর্দা টানলে দেখা যায় গার্কিন আর সেইন্ট পলসএর চূড়া। এছাড়া চারদিকে শুধু দালান আর দালান। কংক্রিটের বনের মাঝে দু’একটা পাতা শুন্য গাছের উঁকি দেয়া ডালপালা। হাসপাতালের কেবিনের বদলে জেলখানার কামরা মনে হতো আমার। সীমিত দর্শার্থী শুধু আসতে পারে আমাকে দেখতে। তাও আবার তাদের পরতে হবে গাউন। মুখ ঢাকতে হবে মুখোশে হাসপাতালে। রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা আমার প্রায় নি:শেষ হয়ে গেছে। তারই জন্য এই রক্ষা বলয়।

তেত্রিশ কিলোগ্রামের আমার দেহটা নিয়ে তাকিয়ে থাকি কাঁচের দেয়ালের দিকে।বরফ পড়ে,গলে যায় কখনো কখনো,ঝলমল করে রোদ। ব্যথা বেদনা যন্ত্রনা উপেক্ষা করে ভাবি কী অদ্ভুত সমন্বয় এই লন্ডনে। একদিকে ঐতিহাসিক সেইন্ট পলস ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আর তার পাশেই আধুনিক স্থাপত্যের গার্কিন। আর এই গার্কিনে ঈশ্বরকে সরিয়ে আসন করে  নিয়েছে পুঁজিবাজারের প্রফেটরা।কী বিস্ময়কর পরস্পর বিরোধী সত্ত্বার অবস্থান এই বিশ্ব নগরীতে।

স্ত্রী কন্যা ছাড়া প্রিয়জনেরা আমাকে দেখবার জন্য এসে নার্স-স্টেশন থেকে ফিরে যায়। তাদের শুভ কামনার কথা পৌঁছে দেয় নার্সরা। মনে মনে ভাবি ভাগ্যবান আমি নইলে এই হাড় কাঁপানো শীতে ওরা আমায় দেখতে আসবে কেন?

এমনি একদিন পুরোনো বন্ধু, নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ কেন্ট থেকে  এসেছে আমাকে দেখতে। ডাক্তার বলে সহজে সরাসরি এসেছে কামরায়। তার কিছু আগে এসেছে আমার এক শ্রীলংকার বৌদ্ধ বন্ধু বো ভিথারানা। আমার  স্বদেশী বন্ধু খুব ধার্মিক। আমার অবস্থা জেনে ওর চোখ ছলছল করে উঠেছে। বৌদ্ধ বন্ধুর চিন্তিত মুখও আমার চোখ এড়ালো না। কথা বলতে কষ্ট হয় আমার। শুকনো মুখে জিভ আটকে যায়Ñহাঁপিয়ে উঠি। কৃত্রিম থু-থু মুখে ঢেলেও  কাজ হচ্ছে না। তাই দু’জনে আমাকে নিবৃত করেছে কথা বলার। বো ভিটারানা আমার বৌদ্ধ বন্ধু বললেন, রফিক গতকাল আমি গিয়েছিলাম আমাদের উপাসনালয়ে,তোমার জন্যে একটা কিছু এনেছি তা নেবে কি? তোমার কোনো আপত্তি না থাকলে সেটা দিতেই এসেছি।

আমার মুসলমান ডাক্তার বন্ধু আলতো করে হাতে তুলে নিলো আমার ডান হাতটা। তারপর অনুচ্চ কণ্ঠে তেলাওয়াত করতে থাকলো সুরা নাস ও সুরা এখলাস।

বা হাতটি হাতে তুলে নিয়েছে বো ভিটারানা। পেঁচিয়ে বেঁধে দিচ্ছে সাতরঙের রাখীর মত তাগাটা। উচ্চারণ করছে প্রার্থনামন্ত্র। কানে আসছে ‘বুদ্ধোং স্মরনং মঙ্গললম গোচ্চামি।’

দু’হাত দু’বন্ধুর হাতে। আমার শরীরে বয়ে গেল এক অপূর্ব শিহরণ। ওদের দু’জনের শুভ কামনা যেন মুহূর্তে আমার শরীর থেকে মুছে ফেললো সব ক্লান্তি,সব অবসাদ। সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা।

অবাক হয়ে শুনছিলো আমার পুরোনো বন্ধু।আমি বললাম, দোস্ত এই শেষ নয়। বিচিত্র লন্ডনে অনেক বিচিত্র অভিজ্ঞতা আমাদেরকে আপ্লুত করে। আমার অসুস্থতায় দেখেছি জাতি ধর্ম নিবির্শেষে মানুষ উজাড় করে দিয়েছে তাদের বিশ্বাসের প্রার্থনা।

অক্লান্ত পরিশ্রমী নার্স, মধ্য বয়েসী কেয়ারার প্রার্থনা করেছে চার্চে। আমার ¯ী¿কে সাহায্যকারি তামিল উমা পুজো দিয়েছে মন্দিরে।হাসাপতালের বাঙালি ফিজিওথেরাপিস্ট রাজ দু‘মাস পরে আমাকে দাঁড়াতে দেখে মুখ উজ্জ্বল করে বলেছে,ডাক্তার খান আই এম ভেরী হ্যাপি টুডে।

আমার দু’বন্ধুর প্রার্থনার দু’দিন পর আমার চিকিতসক অধ্যাপক সকালে এসেছে সদলবলে আমাকে দেখতে। আমার দিকে তাকিয়ে তার হাসিমাখা মুখটায় শান্তনা পাচ্ছি আমি। আমাকে পরীক্ষা করে বললেন,তোমার বোনম্যারো স্টাডির রিপোর্ট পেয়েছি আজ। আমি খুবই আনন্দিত তুমি ভালো রেসপন্স করছো মি. খান। তবে আমি হলফ করে বলতে পারি না এটা আমাদের চিকিতসার ফল,না তোমার বন্ধুর বাঁধা ঐ তাগার জন্য। জুনিয়র ডাক্তারা সবাই হেসে উঠলো। তবে ওর স্পেশালিস্ট রেজিস্ট্রার আবার ডাক্তার ওয়ালিদ বললো, অবশ্যই আমাদের চিকিতসার জন্যই রেসপন্স করছে রোগী।

বেশ ক’দিন পরে স্বস্তি পেলাম। ডাক্তাররা রুম থেকে যখন বেরিয়ে যাচ্ছিলো তখন ডা. ওয়ালিদ আমার কানের কাছে মুখ এনে বললো, ইনশাহআল্লাহ ইউ উইলবি অলরাইট ডা.খান।