মাসুদ ভাইয়ের স্মরণে

81

।।ডা. আনোয়ার হোসেন।।

১৯৬১ সনের আগস্ট মাসে নটেরডেম কলেজ থেকে আই এসসি পাশ করে যখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হলাম তখন আমার মনে হল আমার অনেকদিনের প্রতিক্ষিত  এবং পছন্দের জায়গায় পৌঁছে গেছি। সেখানে এমন এমন কয়েকজন বয়োজ্যোষ্ঠ ‘ভাই’ ‘আপা’দের সান্নিধ্য পেলাম যাদের ¯েœহ এবং আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়েছিলাম এবং আজও ওনাদের কথা মনে হলে মুগ্ধ হয়ে যাই। এদের মধ্যে দু’একজন ছিলেন রোল মডেল বা অনুকরণীয় ব্যাক্তিত্ব। এমনি একজন ছিলেন মাসুদ আহমেদ,আমাদের মাসুদ ভাই। ছোটোখাটো মানুষটি কিন্তু কথা ও কাজে বড় মাপের একজন। ওনাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ ও সৌভাগ্য হয়েছিল প্রথম বছরেই যখন আমরা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচনে অংশ নিই। তখনই দেখলাম বাংলা ভাষার উপর ওনার কতটা দখল,সাহিত্যে উনি কত সাবলীল। বিভিন্ন প্রতিবাদী সভায় ওনার বক্তৃতা ছিল শোনার মত। জ্বালাময়ী সেই বক্তৃতায় কখন বুকের রক্ত দিয়ে দিবেন  কখনো বা কব্জির রক্ত। সেটা ডাক্তারদের দাবি-দাওয়ার আন্দোলনেই হউক অথবা মোনায়েম খান,আইয়ূব খানের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধেই হউক। শহীদ দিবসে ওনার বক্তৃতা শুনেছি,ছাত্র রাজনীতিতে ছিল ওনার সক্রিয় ভূমিকা।

বড় বড় কাজে যেমন উনি নেতৃত্ব দিতেন তেমনি করে ছোট কাজেও ওনার উতসাহ কম ছিল না। ১৯৬২ সালে আমরা ‘বলাকা’ নামে একটি দেয়াল পত্রিকা বের করেছিলাম,সেখানে ওনার সার্বিক  সহযোগিতা পেয়েছিলাম। মাসুদ ভাই ছিলেন কবি সাহিত্যিক এবং গল্প লেখক। মেডিক্যাল কলেজের বার্ষিক মিলন উতসবে, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে ওনার পদচারণা ছিল সর্বক্ষণ। অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তিই হউক অথবা নাটক মঞ্চায়ন হউক মাসুদ ভাইয়ের ভূমিকা অবশ্যই থাকতো। ওখানেই নাটকে অংশ গ্রহণ করার আমার প্রথম হাতে খড়ি। পরে উনি নাটক রচনায় মনোনিবেশ করেন। অনেকগুলি নাটক লিখেছেন উনি। সে কথায় পরে আসছি।

ছাত্ররাজনীতির কথা আগেই উল্লেখ করেছি। আর সেই সুবাদে ওনার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতাদের সাথে যোগাযোগ ছিল। যতটা আমার মনে আছে মাসুদ ভাই ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের নামকরা একজন।

এরপর অনেকদিন ওনার সাথে দেখা সাক্ষাত,যোগাযোগ ছিল না। ১৯৬৯ সালের শেষের দিকে আমি বিলাতে চলে এলাম। নিজেকে গুছিয়ে নিতে সময় লাগল, গ্লাসগোতে আর এক বড় ভাইয়ের বাড়িতে। মাসুদ ভাই তখন বিবাহিত। হাসি এবং মাসুদ ভাই স্কটল্যান্ডে কাজ করেন। ওখানে যেটা আমার নজরে পড়েছে সেটা হল হাসি আর মাসুদ ভাইয়ের দৃষ্টান্তমূলক দাম্পত্য সম্পর্ক। হাসির অনুমতি ছাড়া উনি কিছুই করতেন না, সেটা খাবার ব্যাপারেই হউক আর কোনো কিছু কেনার ব্যাপারেই হউক। আমাদের অনেকেরই ওনাদের কাছ থেকে অনেক শেখার ছিল,উপলদ্ধি করার ছিল।

বিলাতের সাহিত্য অঙ্গনে ডা. মাসুদ আহমেদের আগমণ পরিলক্ষিত হল এবং অতি অল্প সময়েই ওনার অনেক প্রকাশনা,গল্প কবিতার বই প্রকাশিত হল। কিছু দিনের মধ্যেই কবি ও লেখক হিসেবে পরিচিতি পেলেন। কয়েকটা পুরস্কারও অর্জন করেছেন তিনি। পরে নাটক লেখার দিকে মন দিলেন। আমরা অনেকই ঢুকে গেলাম ওনার নাটকের চরিত্রে। উনি বলতেন আমাদের কথা মনে রেখেই উনি নাটক লিখতেন। যে কোনো ভূমিকায় ভাল অভিনয় করতে  কিম্বা কাকে কোথায় ভাল মানাবে সেই চিন্তা মনে রেখেই নাটক লিখতেন। শুধু কি নাটক লেখা,নাটক পরিচালনা করা, নাটকের মহড়া,মঞ্চ সাজানো, শিল্পীদের মেকআপ, দেয়া ইত্যাদি সবকিছুতেই ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাছাড়া অনুষ্ঠানের প্রোগ্রাম ছাপানোর ব্যাপারে আমাদের কোনো চিন্তা ছিল না। ওনার বাড়িতেই প্রোগ্রাম ছাপানোর বন্দোবস্তও ছিল। আমরা ধরেই নিতাম উনি এ কাজটি নিজেই করবেন এবং করতেনও তাই।

সংগঠক হিসেবে মাসুদ ভাইয়ের অবদান ছিল অনেক। তিনি প্রথম দিকে ‘বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন’র সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে নিজ হাতে গড়া মেডিক্যাল সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক,সভাপতি সবই ছিলেন। সোসাইটিকে ভালবাসতেন মনপ্রাণ দিয়ে। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত উনি ছিলেন সোসাইটির সভাপতি।

ব্যক্তিগতভাবে বলতে গেলে মাসুদভাই ছিলেন আমার জীবনের একটি জ্বলন্ত আলোকবর্তিকা। উনি আমার বড় ভাইয়ের মত ছিলেন। খুব ¯েœহ করতেন আমাকে এবং  আমার স্ত্রীকেও। জানি না ওনার মধ্যে কি ছিল। আমাকে কিছু করতে  বললে কিছুতেই রাজি না হয়ে পারতাম না। তা সে নাটকেই হউক,কবিতা আবৃত্তি, কৌতুক অথবা গান। অনেক কথাই মনে পড়ছে। ওনার সাথে দু’বার হলিডে তে গিয়েছিলাম।একবার চীন দেশের ইয়াং সি নৌবিহার। জাহাজে একটা অনুষ্ঠান হবে বিভিন্ন দেশ থেকে  আসা লোকদেরকে নিয়ে। আমি বিলাত থেকে আসা বাংলাদেশী গ্রুপকে নিয়ে একটা ছোট অনুষ্ঠান করবো। মাসুদ ভাই শুনেই বললেন,‘আমার কেবিনে রিহার্সেল হবে এবং আমি তোমাদেরকে পরিচয় করিয়ে দেবো।’ উনি স্বতস্ফূর্তভাবে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক হলেন। তখনই আবার দেখলাম ওনাদের দাম্পাত্য সম্পর্কের গভীরতা। জাহাজ এক বন্দরে নোঙর করল। মাসুদ ভাই বললেন, ‘হাসির দিকে নজর রেখো,ওর জন্য একটা সারপ্রাইজ গিফট কেনা হয়নি। কাছের দোকানে যাচ্ছি। আমি কোথায় গেলাম বল না।’এই হল আমাদের মাসুদ ভাই। ওনার গুণাবলি বলে শেষ করা যাবে না। উনি ছিলেন ¯েœহপ্রবণ,মুক্ত মনের সুন্দর মানুষ। ওনার ব্যক্তিগত ব্যবহারের মধ্যে উদারতা এবং মাধুর্য্য ছিল। দ্বিতীয় হলিডেটা  ছিল দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনা, চিলি ও ব্রাজিলে ৫/৭ বছর আগে। সেখানেও মাসুদ ভাই গল্প করে, রসভরা কৌতুক শুনিয়ে সবাইকে জমিয়ে রাখতেন সে জাহাজেই হউক অথবা ট্যাঙো নাচের অনুষ্ঠানে।

এরপর গত কয়েক বছর আমাদের দেখা হত পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে, পহেলা বৈশাখে,অথবা শহীদ দিবসে। গত বছর মাসুদ ভাই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অসুখের তীব্রতা ক্রমশই বেড়ে গেল। ডাক্তার হাসপাতালে ছোটাছুটি, একদিন সবই শেষ। গত বছর এই সময় পুর্নমিলনী উতসবের আগে আমাদের প্রিয় মানুষটি, রসিক কবি নাট্যকার মাসুদ ভাই আমাদের সবাইকে শোক সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন অজানা না-ফেরার দেশে। আমরা শোকাহত মর্মাহত। মাসুদ ভাই এতো তাড়াতাড়ি চলে গেলেন,কোনোদিন ভাবিনি। আমার মনে হচ্ছে,আমরা গন্তব্যের পথ হারিয়ে ফেলেছি। উনার শুন্য স্থান পূরণ হবে কি করে আমাদের কাছে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ওনাকে স্মরণ করবো শ্রদ্ধার সাথে। মাসুদ ভাই আপনি ভাল থাকুন।