মাসুদ আহমেদকে যেমন দেখেছি

94

।। ডা. মুসতাফিজুর রহমান ।।

সচক্ষে দেখার আগে,তাকে জেনেছিলাম কাগজের মাধ্যমে।সেটা আনুমানিক ১৯৫৫ সাল হবে। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে দুটি দৈনিক বাংলা কাগজে সপ্তাহে একদিন ছোটদের ছড়া,কবিতা,গল্প প্রকাশের জন্য দুটিপাতা নির্দিষ্ট থাকতো। ছোটদের জন্য একটি মাসিক পত্রিকা ছিল,নাম ‘আলাপনি’এবং পশ্চিম বাংলা থেকে ‘কিশলয়’ নামের একটি মাসিক পত্রিকাও আসতো। এই কাগজগুলিতে মাঝে মাঝে একটি নাম চোখে পড়তো ‘মাসুদ আমেদ’। সেই সময় পশ্চিম বাংলা’য় ‘আহমেদ’ শব্দটি কোনো কোনো সময় ‘আমেদ’ হয়ে লিখিত ও উচ্চারিত  হোত। উল্লেখ্য, মাসুদের এবং আমার দুজনেরই জন্ম পশ্চিম বাংলার একই জেলায়। ‘মাসুদ আমেদ’ কখন যে ‘মাসুদ আহমেদ’ হয়ে গেল তা মনে নেই।

আমাদের পরষ্পরের চাক্ষুস পরিচয় ১৯৬১ সালে,যখন আমি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হই। যদিও আমরা বয়সে সমসাময়িক,সে আমার থেকে উঁচু ক্লাশে ছিল।প্রথাগতভাবে মাসুদভাই এবং আপনি করে সম্বোধন করার বদলে, কেন জানি না আমরা প্রথম পরিচয় থেকেই ‘তুমি’ এবং একে অপরকে নাম ধরে ডাকা শুরু করি। মাসুদ দেখতে ছোটখাটো,অথবা আমাদের একই জেলায় জন্ম, কিংবা আমার বাংলা সাহিত্যে কিছুটা আগ্রহ থাকার কারণে হয়তো বা। তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী চলছে বেশ জোরেশোরেই। আইয়ূব-মোনায়েম খানদের রবীন্দ্রবর্জন নীতি উপেক্ষা করে অনেকটা প্রতিবাদের মতোই এই আয়োজন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রসংসদের সহসভাপতি জামান ভাই(ব্ল্যাকবার্নের ডা. আহমেদ জামান)এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মাসুদ আহমেদকে তখন দেখি নানাভাবে,Ñকবিতা রচনা ও আবৃত্তি,বক্তৃতা,পত্রিকা সম্পাদনা,নাট্যাভিনয় অথবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা সভা-সমিতির আয়োজনে। মেডিক্যাল কলেজের প্রথম চার বছর কেটেছে মাসুদ আহমেদের খুব কাছে থেকে তাকে জানার। অনেকটা সময় তাঁর বিভিন্ন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের সঙ্গে সহকারি হিসেবে অংশ নেওয়ার সুযোগও আমি পাই। দুর্ভাগ্যক্রমে, তখনকার প্রগতিশীল ছাত্রসমাজ রুশ বা চীনপন্থাÑএই দুই ধারায় বিভক্ত হয়। এর ধাক্কা লাগে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজেও। ফলে, আমরা দুজন দুইদিকে ছিটকে পড়ি। উষ্ণ বন্ধুত্ব সম্পর্ক শীতল হয়ে আসে। এরপর ডাক্তারি পরীক্ষা পাসের পরে ঢাকার বাইরে চলে যাওয়াতে সম্পর্কে সাময়িক বিচ্যুতি থেকেই গেল।

কয়েক বছর পর ১৯৭০ সালে আমি লন্ডনে আসি এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে এখানেই সবাই যে যার মতো অংশ নিয়েছেন। এই সময় হঠাত দেখা মাসুদ আহমেদের সঙ্গে। তিনি তখন পশ্চিম পাকিস্তানে চাকরি করতেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সপরিবারে পালিয়ে এসেছেন বিলাতে। পুরানো সখ্যতায় আবার ফিরে এলাম আমরা। বছর শেষে স্বাধীন হোল বাংলাদেশ। পেশাগত পড়াশোনা ও ট্রেনিং শেষ করে,চিকিতসা পেশার পাশাপাশি মাসুদ আহমেদ আবার ফিরে গেলেন সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চায়। যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘দেশবার্তা’ ও ‘জনমত’ পত্রিকায় তার অনেক লেখা প্রকাশিত হয়। এর মধ্য থেকে বাছাই করা কিছু গল্প নিয়ে তার প্রথম সংকলিত গল্পগ্রন্থ ‘চন্দ্রবিন্দু’ প্রকাশিত হয় ১৯৯১ সালে। এরপর আর থেমে থাকেননি। একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর নানান বইÑকবিতা,গল্প,প্রবন্ধ, উপন্যাস ও নাটক। একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘অন্যনগরে একজন’ মাসুদ আহমেদের আত্মকথা বলা চলে। বিলাতে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি জনমত পত্রিকার স্বর্ণপদক পান এবং ঢাকার বাংলা একাডেমির বিশেষ সম্মননা ‘প্রবাসী সাহিত্য পুরস্কার’ ও আজীবন সদস্যপদ লাভ করেন। নব্বই-এর দশক থেকে তিনি নাট্য রচনায় বিশেষভাবে ঝুঁকে পড়েন। এ পর্যন্ত তাঁর চৌদ্দটি পূর্ণাঙ্গ নাটক প্রকাশিত ও বিলাতে মঞ্চস্থ হয়েছে। সাহিত্য-নাটক ছাড়াও তিনি মাঝে মাঝে এদেশের বাংলা টিভি চ্যানেলগুলোতে উপস্থাপনা ও আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। বিলাতের বাঙালি ডাক্তারদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল সোসাইটির উচ্চপদের দায়িত্বে থেকেছেন অনেকদিন।মাসুদ আহমেদ সম্পর্কে আরো অনেক কিছু বলা যায়। তবে এই প্রবন্ধের কলেবর বৃদ্ধি না করে আরো দু’একটি কথা বলে এই স্মৃতিকথা শেষ করবো।

ব্যক্তিগতভাবে,স্ত্রী,দুই পুত্র ও নাতি-নাতনি নিয়ে সুখী ও গর্বিত ছিলেন মাসুদ আহমেদ। মাসুদ ও তাঁর স্ত্রী হাসি সম্পর্কে, তাদের সকল বন্ধুদের একমত। তা হোল,মাসুদ ও হাসির মতো ‘রোমাণ্টিক জুটি’ আমাদের মধ্যে আর নেই। সাহিত্যের বাইরে মাসুদ আহমেদের অন্যতম অবদান আর একটি। বিলেত প্রবাসী বাঙালি,বিশেষ করে বাঙালি ডাক্তার পরিবারের মধ্যে তিনি বাংলা সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসার করেছেনÑনাটক, কবিতা আবৃত্তি, গান, একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠান,বাংলা নববর্ষ পালন ইত্যাদির দ্বারা। পরিষ্কার শুদ্ধ বাংলায় দরাজ কণ্ঠে মাসুদ আহমেদের বক্তৃতা সবাইকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর আর একটি বিশেষ গুণ ছিল হাস্য  কৌতুক। কথায় কথায় তিনি কৌতুক তৈরি করতে পারতেনÑ যা ছোটবড় সকলকেই অনেক আনন্দ দিয়েছে। এ কারণে বন্ধুদের ছেলেমেয়েরা তাকে বলতো ‘দি মাসুদ আনকেল’। আকারে ছোট-খাটো মানুষটি। কিন্তু কাজের ও গুণের মাপে আমাদের সকলের বড় ছিলেন  মাসুদ আহমেদ।