বাঙালি জাতিও হারিয়ে যেতে পারে

34

।। হামিদ মোহাম্মদ ।।

একা যুদ্ধ করা যায় না। একা একজনের  সাথে হাতাহাতি,মল্লযুদ্ধ বা কুস্তি বড়জোর করা যায়। তবে খুন করতে হলে একজনই একজনকে খুন করতে যথেষ্ট।

যত যুদ্ধই হউক,সবই অমানবিক। চেঙ্গিস খানের উত্থানের ইতিহাস কে না জানে? প্রতিপক্ষের নৃসংশতার  প্রতিশোধ নিতে  গিয়ে এক সময় বিশ্বের ত্রাস হয়ে ওঠেছিলেন চেঙ্গিস খান।বীর খেতাবও পেয়েছিলেন। বিশ্বের কয়েক কোটি মানুষকে হত্যা করেছিলেন চেঙ্গিস খান।তবুও বীর।দেশের পর দেশ দখল করেছিলেন,তবে রাজ্য গড়েননি।ভারতে দস্যুরানি খ্যাত ফুলনদেবী গণধর্ষণের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে শত শত লোককে হত্যা ও  লুটপাট,ডাকাতি করে ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন। এই মহিলার জেদ তাকে বিশ্ব পরিসরে পরিচিতি এনে দেয়।

রূপার ধর্ষণকারিরা কি ভেবেছিল চেঙ্গিস খান বা দস্যুরানি ফুলন হয়ে ওঠবেন তিনি। নিশ্চয় ধস্তাধস্তি হয়েছে। এমন শক্তি বা এমন মনোবল তারা দেখেছিল রূপার প্রতিরোধের ভাষায়-তাকে হত্যা না করলে তাদের বিপদ হতে বাধ্য। আমার মনে হয় এই শক্তিটাই রূপার শিক্ষিত আচরণ।তারা টের পেয়েছিল রূপা শিক্ষিত, তাকে ছেড়ে দিলে বাপদাদাসহ চৌদ্দগোষ্ঠীকে নাকানিচুবানি খাওয়াবে সে। সুতরাং তাকে ঘাড় ভেঙে মেরে ফেলে দাও। তারা এতো নির্বিঘ্ন হয়েছিল,পরের দিন ঠিকই ডিউটিতেও যোগ দেয়,গাড়ি নিয়ে যথারীতি রাস্তায় বেরোয়।

অপরাধ আরেকটি অপরাধের জন্ম দেয়। এ সোজাসাপটা কথা সকলেই বুঝে। এ কথাটি পালটাপালটি অপরাধকে বুঝায়।  কিন্তু তাদের অপরাধ এক তরফা।একের পর এক।একটা অপরাধ আরেকটা অপরাধ করতে ধাবিত করে। ধর্ষণ,হত্যা এবং  পরের দিন ভালো মানুষ সেজে  দিব্যি কাজে বেরোনো। আইনকে তোয়াক্কা না করা,আইনকে ভয় না করা।এটাও আরো বড় অপরাধ।

নিম্ন আয়ের এই মানুষগুলোও বেপরোয়া আইনের প্রতি। ধনে বা ক্ষমতায় শক্তিশালি না হলেও শক্তিধর।

প্রথমেই আমি শক্তির কথাই বলছিলাম। শক্তি এমনই এক জিনিস,যার মহিমা অসীম।এই মহিমার নামই দাম্ভিকতা।কথা হলো,সমাজে একজন দুজন দাম্ভিক হতেই পারে।

কিন্তু ভয়টা হচ্ছে,সাধারণ মানুষ যখন কোনো বিচার পায় না,তখন সমাজে দাম্ভিকতার প্রসার ঘটে, বা পুরো  সমাজটাই দুষিত হয়ে পড়ে।এখানে ধনী গরীব কোনো বিষয় নয়,এ অপ-শক্তিটাই সবার গজিয়ে ওঠে–মগজে,ব্যবহারে,জীবন-যাপনে চর্চা শুরু হয়।ধীরে ধীরে সমাজটাই বেপরোয়া হতে বাধ্য।

প্রশ্ন হচ্ছে,আমরা এসব মানুষের জন্ম দিবো কেন?লালন করবো কেন এদের?কারা লালন করেন?

আমার জানা দুতিনটা ঘটনা বললে,পরিষ্কার হবে বিষয়টি।উত্তর   বেরিয়ে আসবে। বুঝতে সহজ হবে।

আমার এক বন্ধুর একটি ফার্নিচারের ব্যবসা ছিল। তার দোকানের এক কর্মচারির গল্প। কিশোর বয়সের এই কর্মচারি দুমাস কাজ করে মাত্র। তারপর উধাও। কিছুদিন পর আশেপাশে কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। তিনি তার দোকানের পুরোনো কর্মচারিকে জিজ্ঞেস করলেন,এসব ঘটনা  কারা করে তোমার কি কোনো আ্ইডিয়া আছে? সে মুসকি হেসে উত্তর দিল,আমাদের দোকানে কাজ করেছে এই ছেলেটি।একদিন আপনি তাকে ধমক দিয়েছিলেন নাকটানার জন্য। সে এখন বড় ছিনতাকারি। সে আরো বললো,বড় বড় রাজনৈতিক নেতারা তাকে সমীহ করে চলেন।কয়েকজনের নামও বললো।বন্ধুটির চোখ চড়কগাছ। কর্মচারি হেসে আরো বললো,নেতারা ভাগ পান। তার টার্গেট মিস হয়না বলে আরো কদর বেশি।পুলিশও ভাগ পায়।

গত বছর আমার এক বীর মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুর শহরে কেনা একখণ্ড জমি দখল হয়েছে। খবর এলো,সরকারি দল বিরোধী দলের লোকেরাই মিলেমিশে দখল করেছে।শুধু তার নয়,পাশের আরো কয়েকটি প্লটও দখল হয়েছে। প্লটের মালিকরা প্রত্যেকেই সমাজে ভালো অবস্থানের  লোক। কিন্তু রাজনৈতিক অবস্থান নেই।

সুতরাং শক্তিটা কোথায়? বুঝতে হবে আমরা কোথায় যাচ্ছি। কয়েকদিন আগে এক অনুষ্ঠানে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেছিলেন,‘কেউ আর তার কাজে সন্তুষ্ট নয়।বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক,সাংবাদিক,ব্যবসায়ী সকলেই এমপি মন্ত্রী হতে চায়। সমাজটাই এমন অস্থির হয়ে পড়েছে নিজের অবস্থান থেকে নিজ নিজ  ক্ষেত্রে শীর্ষে যাওয়ার চিন্তা কেউ করে না।’

এই শিক্ষককে কথা বা বক্তব্য থেকে যা বুঝতে পারি–সর্বাবস্থায়,এই বেপরোয়া সমাজে আমরা বাস করছি। রূপার  মতো নীরিহ মানুষ, তারপর মেয়ে মানুষ সে তো মশা বা পিঁপড়ে। তাকে চলন্ত বাসে একা পেয়ে ধর্ষণ করে, ঘাড় ভেঙে ফেলে দেয়া তো সহজ।

কারণ,রূপা যাদের মানুষ ভেবেছিল,তারা মানুষ নয়,সেই মানবিকতা বিসর্জন তারা দিয়েই সমাজে বাস করছে। আদলটা শুধু মানুষের,মনটা পশুর।পশুর চেয়েও  অধম।পশুও এসব করে না।

শেষে এই কথাটাই বলতে চাই,যুদ্ধটা তো একা রূপা করে জিততে পারেনি। আমরাও পারবো না।

সম্প্রতি প্রধান বিচারপতিও একটি রায়ে এ কথাটিরই প্রতিধ্বনি করে বলেছেন,‘দেশে আমিত্ব’র প্রভাব বেড়েছে।এই আমি আমিত্ব বা দাম্ভিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে জাতিকে,জাতীয় নেতৃত্বকে।তারপর রূপারা নির্বিঘ্ন হবে।অন্যতায় বহু জাতির মতো বাঙালি জাতিও হারিয়ে যাবে। ইতিাহাসই এর সাক্ষী।

লন্ডন,১ সেপ্টেম্বর ২০১৭।