চিন-ভারত সীমান্তে যুদ্ধের মহড়া না শক্তির প্রদর্শনী : প্রতিবেশী দেশে এর প্রভাব

50

-রফিকুল হাসান

”পৃথিবীর ছাদ ” বলে পরিচিত তিব্বতের ৩৫ কিলোমিটারের এক সমতল ভূমির নাম ডকলাম।সরকারি ভাবে এটা চিনের অংশ।  ছুরির  মতো এই জায়গাটি ঢুকে পড়েছে পশ্চিমে সিকিম পূর্বে ভুটানের মধ্যে দিয়ে ভারতের  উত্তর  সীমান্তে।

ভারতের স্থল ভূমি মুরগির গলার মত নেপালকে পশ্চিমে রেখে ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে ডোকলামের দোর গোড়ায়। এই মুরগির গলার দক্ষিণে  নেপাল আর বাংলাদেশের মধ্যে মাত্র ১৫ মাইলের শিলিগুড়ি করিডোর। ১৫মাইলের এই স্থল ভূমির কাছেই বিক্ষাত মাওবাদী আন্দোলনের ঐতিহাসিক  নকশাল বাড়ী।  এই পথেই উত্তর বঙ্গের সঙ্গে শিলিগুড়ি ,দার্জিলিং এবং উত্তর পূর্ব ভারতের সেভেন সিস্টারে একমাত্র স্থল যোগযোগ।

এতো দিন এই সমতলের গ্রীষ্মের সবুজ ঘষে চোড়ে বেড়াতো পাহাড়ি গরু ‘ইয়াকের ‘ পাল। মাথা ব্যথা ছিলোনা কারো এই সমতল জায়গাটি নিয়ে। সিকিম , ভুটান, নেপাল কেউ কথা বলেনি ১১ হাজার ফুট উচতার  চারণ ভূমি নিয়ে।

চিনের অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় নড়েচড়ে বসলো ভারত। আমেরিকার  স্যাটেলাইটে ছবি তুলে ভারতকে সতর্ক করলো স্যাম চাচা। ‘দেখছোনা চীনারা চওড়া রাস্তা বানাচ্ছে  ডকলামে  ”.

ডকলামের ডেগার দিয়ে কেটে ফেলবে তোমাদের মুরগির গলা ”.তার পর বিচ্ছিন্ন হবে তোমাদের উত্তর পূর্ব উপজাতীয় অঞ্চল। ”

প্রথম প্রথম চল্লো কূটনীতিক পর্যায়ে প্রতিবাদ। ”না তোমরা এই সমতলে সামরিক সমাবেশ করে  আমাদের উত্তর পূর্ব রাজ্য গুলো বিচ্ছিন্ন করবার জন্য পায়তারা করছো , এ টা হতে দেবোনা আমরা ‘.চিনারা বললো  আমার অঞ্চলের উন্নতি সাধনী আমাদের উদ্দেশ্য। তোমাদের উদ্বেগের কারণ কি?

তবু থেমে থাকলোনা সামরিক সমাবেশ।  উত্তরে চিনাদের পিপলস আর্মি দক্ষিনে ভারত ও সিকিমের ভূমিতে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীর উল্লেখ যোগ্য সমাবেশ।ভাষ্যকার দের  বর্ণনায় ভুটান আদৌ  জানলোনা তাদের দেশে সামরিক সমাবেশ করেছে ভারত  চিন সীমান্তে। আশ্রিত দেশ তাই নির্বাক তারা।  নিয়মিত চলতে থাকলো ধাক্কা ধাক্কি। আর সম্প্রতি ভারতীয় বাহিনীর চীন ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ। সতর্ক করে প্রতিবাদ করেছে চীন.. তবে বোঝা যায় চিনারা যুদ্ধ চায় না , কিনতু তা বিশ্বাস করতে চাইছেনা ভারতের চীন বিরোধী মোদী সরকার।

সেনাপতিরা উস্কে দিচ্ছে সরকারকে।  বোঝাচ্ছে ‘দেখছোনা চিনার ঘিরে ফেলছে আমাদেরকে। উত্তরে তিব্বতে সমাবেশ, নতুন সিল্ক রুট , লাদাখ অঞ্চলে পাকিস্তানিদের নিয়ে পাঁয়তারা। নেপালে মাও বাদী দের বিজয় , পূর্বে বাংলাদেশিদের হাত করতে চাইছে কুনমিং থেকে চট্টগ্রামে ১৭৩ কিলোমিটার ট্রেন লাইনের প্রস্তাব। বঙ্গপোসাগরে  গভীর নৌ বন্দর করে খবর দাড়ি করার পরিকল্পনা। বিনি পয়সায় সাবমেরিন দিয়ে গুপ্তচরের কাজ চালাবে আমাদের উপর. শ্রীলংকায় নৌ ঘাঁটি করে পুরো ভারত সাগরের প্রাধান্য করতে চেয়েছে চীন. রাজা প্রাকশাকে সরিয়ে সেটা বন্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে ভারত ”

ছোট বেলা থেকেই চিনের বিরুদ্ধে ভীষণ ক্ষোভ মোদির কাজেই তাকে দলে টানতে মোটেই বেগ পেতে হয়নি আমেরিকার।  বহু বিলিয়নের আধুনিক সমরাস্ত্র ভারতের কাছে বেচেছে আমেরিকা। পারমাণবিক চুক্তি হোয়েছে ভারতের সঙ্গে। শধু বিশাল জনগোষ্ঠীর বাজার হিসেবেই নয় ভারতকে চীন ঠেকানোর সহায়ক হিসেবে দেখছে আমেরিকা।  হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্দালয়ের একজন অধ্যপকের মতে বিশ্ব শক্তির প্রাধ্যনের মেরুকরণে আমেরিকাকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে নইলে হারাতে হবে সৃষ্ট শক্তির সম্মান।

শক্তির এই খেলায় যোগ দিয়েছে ইসরাইল।  তাই প্রথম ভারতীয় প্রধান মন্ত্রী হিসাবে সে দেশ সফর করেছেন মোদী। ইসরাইলে বসবাসকারী ৭০ হাজারের ভারতীয় বংশধর ইসরাইলের নাগরিকরা উল্লসিত হয়েছেন , বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে নাতানিহুর সরকার বিক্রি করছে সবচেয়ে আধুনিক ড্রোন টেকনোলজি ও মোসাদের বিশ্ব বিখ্যাত গুপ্তচর বৃত্তির সহযোগিতা। ১৭০ মিলিয়ন ভারতীয় মুসলমানদের এবং বহু অমুসলিমদের প্যালেস্টানের সমর্থন  এখন মোদির কাছে  মূল্যহীন।

তবে ভারত চীন সীমান্তের এই উত্তেজনা অনেককেই ১৯৬২ সালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।  নেহেরু তখন ভারতের প্রধান মন্ত্রী। উত্তর পূর্বাঞ্চলের সেনাপতি, মার্কিন পন্থী  জেনারেল কাউল মন্ত্রী সভায় চীনের কল্পিত আগ্রাসনের প্রতিরোধ করার জন্য অনুমতি চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কৃষ্ণমেনন বিরোধিতা করেন। কাউল সর্বসমুখেখে  কৃষ্ণমেননকে দেশদ্রোহী বলে আক্ষায়িত করেন।নেহেরুর প্রতিবাদ না করায়  পদত্যাগ করেন কৃষ্ণমেনন। অকারণে এই যুদ্ধে ভীষণ ভাবে পরাজিত হয় ভারত। রাশিয়ার জন্য আমেরিকা সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারেনি। ভারত  চিনি ভাইভাই হয়েযায় হিন্দি – চীনা  ভয় ভয় ।উল্লসিত হোন তৎকালীন  আমেরিকার রাষ্ট্র দুত হেনরি চেস্টার বোলজ।

গুজব আছে এই পরাজয়ের কারণেই নাকি অপমানিত বোধ করে মৃত্যু বরন করেন নেহেরু । মোদির তখন ১২ বছর বয়স।  দেশপ্রেমে উদ্ভাসিত হয়ে তিনি চিনের বিরুদ্ধে লেখেন এক জ্বালাময়ী কবিতা।

১৯৬২ আর ২০১৭এর মদ্ধে অনেক তফাৎ আছে. ভারত চিন দুটো দেশি এখন পারমাণবিক শক্তি। ভারতের আছে ১২০টি নিউক্লিয়ার ওয়ার হেড চিনের ২৭০টি। ভারতের পদাতিক বাহিনীর সংখ্যা হলো ১.৩ মিলিয়ন চিনের ২.২ মিলিয়ন। চীনের যুদ্ধ বিমানের সংখ্যা হলো ২৬৫৬ ভারতেরর ১৪৮৫। চীনের সংখ্যাধিক্য থাকলেও ভারতের বন্ধু এখন আমেরিকা। নেহেরুর প্রধান বন্ধু ছিলো রাশিয়া কিন্তু চিনের ব্যাপারে রাশিয়ানদের বৈরিতা তখন শুরু হয়নি।  তাই ভারত এখন আর নিজেকে কোনোক্রমেই আপেক্ষিক ভাবে দুর্বল মনে করছেনা ।৬২এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবার হয়তো এটাই যোগ্য সময় বলে ভাবছে ভারতের মৌলবাদী গোষ্ঠী। আর তাদেরকে উৎসাহ দেবার জন্য ট্রাম্পতো এক পায়ে দাঁড়িয়ে।

তবে ভারত ও  চিনে এখনো হয়তো  প্রজ্ঞাবান রাজনৈতিক আছেন যারা সর্বাত্মক আত্মঘাতী সংঘর্ষে লিপ্ত হতে চাইবেন না আর এটাই সবার প্রত্যাশা।

তবে বাংলা ভাষায় একটি প্রবাদ আছে ”রাজয়  রাজায় যুদ্ধ হয় উলুখড়ের জীবন যায় ”. বৃহৎ শক্তির এইসংঘাতে উল্লেখ যোগ্য প্রান্তিক দেশ গুলো হচ্ছে সিকিম, ভুটান  নেপাল আর ভৌগোলিক ভাবে প্রধান বাংলাদেশ। তারা ইচ্ছে থাকলেও কোনো একটি দিকে ঝুকলে নাখোশ হবে অন্যদল।  তাই নেপাল যখন শিলিগুড়ি কোররিডোরের মধ্য দিয়ে রেলপথে মংলা বন্দরের সুবিধার আবেদন করে তখন ভারত চীনের ভূত দেখে। তেমনি ভাবে কুনমিং চট্টগ্রাম রেল পথ হয়তো রয়ে যাবে স্বপ্ন।

অথচ ভারত তার উত্তর পূর্ব অঞ্চলে যাবার জন্য ট্রানসিট চাইলে আমাদেরকে মানতেই হবে এতে আমাদের লাভ ক্ষতি যাই হোক না কেন..

তাই হয়তো বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে  সিমিত ভাবে স্বাধীন । তাদের সারভোমত্ব বাধা রইবে প্রতিবেশী বৃহৎ শক্তির হাতে যতদিন না তারা স্বাবলম্বী হয়ে না উঠবে।

-লন্ডন  ২অগাস্ট ২০১৭