কবি মুজিব ইরমকে দেখেছি,তাঁর কবিতা দেখিনি। ‘ইরমকথার পরের কথা‘ পাঠ-৩

109

 

কবি মুজিব ইরমকে দেখেছি,তাঁর কবিতা দেখিনি। না, কথাটা এরকম কেউ বলবে না। পাঠকরা জানেন-তাঁর কবিতার উচ্চতা হিমালয়ের উচ্চতম শিখর এভারেস্টকে ছুঁয়ে ফেলার প্রয়াসী কতটুকু। মুজিব ইরমের এভোরেস্ট অভিযানটা এরকমই দুর্দান্ত। ব্যক্তিগত নয়-কাব্যধারায়। তাই কি না এমনি প্ররোচনা। কেন বলতে হবে এরকম,এতো বেহিশেবী কথা? অনেকে ভেবে নিতে পারেন-এটা তো বেশি করে বলে ফেলা হলো।

মুজিব ইরমের কাব্য চিহ্নায়ন এতো সহজ নয়,যদিও খুব সহজ বাক্য বিন্যাস,কথার জাদুচেরা,গ্রাম্য পরশ মাখিয়ে বুনে যান কবি মাটিমাখা চরণ।

কবি মুজিব ইরম বাংলা কাব্য মন্ডলে উদিত নয়া নক্ষত্র। অবিরাম নির্মাণ, কাব্য-ধুপছাঁয়ায় সৃষ্টি করেন পাঠকের অধিবাস। তাঁর কাব্যসৃষ্টির বিভা সেই নক্ষত্রের ঝলকানি,আলোর বাগান। তাই, পাঠানুসঙ্গে কেঁপে ওঠে বুক,বিপন্নতা কিংবা অস্তিত্ব বিলীন নয়,নিজেকে স্পর্শ করার তুমুল কীর্তনে। আসুন, ডুব দিয়ে দেখি, পাঠক হওয়া যায় কি না ইরমসংহিতা,শ্রীহট্ট কীর্তন,কবি বংশ ও চম্পূকাব্যে।

কাব্যশিল্পী মুজিব ইরমের কাব্যসমগ্রের পাঠ-নিমগ্ন নির্যাস ধারাবাহিক প্রকাশ করছে বিলেতবাংলা ২৪ডট কম। লিখছেন–হামিদ মোহাম্মদ। পাঠক সঙ্গে থাকুন।-সম্পাদক,বিলেতবাংলা।10374497_1535441016718842_9129727781448312452_n

ইরমকথার পরের কথা-৩

 

 গোপন কোনো বাসনা যখন প্রবল প্রার্থনা হয়ে ওঠে তার নাম কি দেয়া যায়! এ প্রার্থনার কি কোনো রঙ আছে? কি নাম হবে সেই রঙের আদলে!  প্রেমে পড়ার তুফান, প্রেমিকাকে পাওয়ার ঝড়। প্রেমিক হওয়ার সঙ্গীত গীত হয় যুবক কণ্ঠে বছরব্যাপী! পথে-ঘাটে কে যেন  শিষ দিয়ে যায়, কার বা দোষ!

এমনি  ‘ইরমকথার পরের কথা‘ কাব্যগ্রন্থের পেটে তোলপাড় কত,আলোড়ন ওঠে কবিতার পর কবিতায়।

এরকম দোষের দিনে কবি লিখেন ‘পড়শিনীকে নিয়ে আবারো দু‘চার ছত্র।‘ কবি লিখেন–‘তুমি উপযুক্ত হলে-এ খবর রটে গেল পাড়ায় পাড়ায়।‘

এ বলে কি শেষ! আরো বলেন–‘সে বছর আমাদের গাঁয় কত কিছু হল! ঘুমটাপরা চন্দনীরা উঁকিঝুঁকি দিল শুধু তোমাদের বাড়ি। লটকে থাকল বিবাহযোগ্য চাঁদ তোমাদের ঘাটে। লেখাবিলে পলো বেয়ে সকলেই ফিরে আসে, তোমার প্রযতেœ তারা রাঙিয়ে বাতাস। . . .পুবের পতিতে হয় ষাঁঢ়ের লড়াই।‘

কবি মুজিব ইরম তার কাব্য প্রেমিকার কীর্তনে সারা গাঁ-গেরাম নানা আয়োজনে মত্ত হওয়ার কথা কবিতায় তুলে আনেন অভিন্ন বর্ণনায়। কবি তার অর্ন্তদৃষ্টি দিয়ে অনুধাবন করেন এতো কোলাহল,এতো আয়োজন কার জন্যÑসে তো একজনকে ঘিরে।প্রতিটি বাক্য রচিত হয়,কবি রচনা করেন আবহচিত্র। যে চিত্র ভরে ওঠে তুমুল আয়োজনে।

‘ ঘুমটাপরা চন্দনীরা উঁকিঝুঁকি দিল শুধু তোমাদের বাড়ি।‘ এ অচ্ছেদ্য বাক্যটি নির্দেশ করে প্রেমময় বার্তা। পরক্ষণেই কবি বলেন– ‘লটকে থাকল বিবাহযোগ্য চাঁদ তোমাদের ঘাটে।‘ এই বর্ণনায় পুষ্পিত হয়ে ওঠে তরুণীদের রমণী হয়ে ওঠা এবং রমণীর পরিপূর্ণ হওয়া।

‘লেখাবিলে পলো বেয়ে সকলেই ফিরে আসে, তোমার প্রযতেœ তারা রাঙিয়ে বাতাস।‘

 কবি এখানে কি বলতে চান? পাঠক বুঝতে দ্বিধান্বিত হবার সুযোগ নেই। প্রেমিক পুরুষরা পলো বায়,মাছ ধরে,গান গায়–সবই যেন একজনের জন্যে,যে নাকি সোমত্ত হয়েছে মাত্র।সুক্ষè এই স্পন্দন ধ্বনিত এই বাক্যে– ‘লেখাবিলে পলো বেয়ে সকলেই ফিরে আসে–তোমার প্রযতেœ তারা রাঙিয়ে বাতাস।‘

যৌবন যেখানে উচ্ছল,প্রেম যেখানে টলটলে ¯িœগ্ধ–সে গ্রাম সব আকাল মাড়িয়ে এক ঋদ্ধ সমৃদ্ধ জনপদ। কবি দিব্য  চোখে দেখেন  এই চঞ্চল সময়কে। বলেন–

‘. . .সে বার বন্যা হয়নি আর। হয়নি আকাল কার্তিকের মাসে। প্রতিটা ঘরে যুবতি গাভীরা দুগ্ধবতী হয়। পুকুরগুলো ভরে ওঠে রোদ তাড়ানো মাছে। আমাদের পাড়ার উপযুক্ত মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি যাবে-বাড়ি বাড়ি তুমি এসে করে গেলে গীত।‘

 আরো উদ্ধৃতি–‘সে বছর আমাদের গাঁয় যাত্রাপালা হলে তোমার কণ্ঠেও বেজে উঠল গুনাই বিবির পালা। . . .তোমার চলার পথে উলুধ্বনি ঝরে। চরণধ্বনিতে বাজে আগমনী গান। সেই থেকে ফি-বছর আমাদের পরগনায় যতোসব মেলাবান্নি হয়, বসে যত ফকিরি আসর-সবখানে জপ হয় তোমার লাবণ্য। আমাদের বাজারের সব কৌতূহলী লাবণ্যের দোকান, সকলি তোমার তরে দরজা খুলে রাখে। তেপথী মুখে যত পাড়ার তরুণ শিস দেয় তোমাকে দেখে, ছুঁড়ে মারে চিঠি, ধরে ফিল্মের গান-হয়ে গেল সকলি সুবোধ।‘

এরপরে কবি বলেন–‘এ গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় কত কিছু হল-কেবল তোমাকে ঘিরে! আমারি হল না কিছু! হল না দাঁড়িয়ে দেখার মুগ্ধ অবসান। সেই থেকে তোমার অদৃশ্য বাড়ি মাঝে মাঝে দূর দূর লাগে। এ কোন মাজেজা বলো পুষে রাখো চারপাশে, তোমার ছায়ার!‘

গ্রাম্য জীবন এতো মুগ্ধ করা কবির কাছে,যেখানে প্রেম এক অদৃশ্য নদী হয়ে বহমান। দুধাল গাই‘র বিচরণ,যাত্রাপালার হুলস্থুল সবই ঐ সোমত্ত মানসীকে ঘিরে। কবি শুধু সব আয়োজন,সব চাঞ্চল্যের দর্শক। কখনও দেখার মুগ্ধ অবসান হয় না। কবির কাছে মানসীর  অদৃশ্য বাড়ি মাঝে মাঝে দূর লাগে। কবির  ঘোরলাগা চৈতন্য বিষাদিত হয়। বলেন–‘এ কোন মাজেজা বলো পুষে রাখো চারপাশে, তোমার ছায়ার!‘

পরের স্তবকে রয়েছে আরো ছনমনে দীপ্তিমাখা। ‘. . .ফাগুন বলেই বুঝি দখিনের সব হাওয়া ছুঁয়ে আসে তোমাদের পুকুরের কলকল ধ্বনি। হাসির রকম দেখে বুঝে ফেলি এরকম ধ্বনিপুষ্প তোমাদের উঠানেই ঝরে। আর কখনো ফর্সা চাঁদ ডাক দিলে চেয়ে দেখি সেও থাকে তোমাদের মধ্য আকাশে।‘

 কবির বিশ্বাস,অনুমান,সব বুঝে ওঠা একজনকেই ঘিরে।প্রকৃতিও ঘিরে আছে এই একজনকে। সব ভালো ঘটনাও ঘটে চলেছে তাকে নিয়েই। সেই  বোধ, সেই বিশ্বাস থেকে বলেন ‘. . .ফাগুন বলেই বুঝি দখিনের সব হাওয়া ছুঁয়ে আসে তোমাদের পুকুরের কলকল ধ্বনি।‘

‘দু-একটা পাখি যা-ও ডেকে ওঠে ভোরে তা-ও জানি তোমাদের উঁচুডালে থাকে। একটাও যদি ফোটে ফুল, পাখি করে গান, তোমাদের ছায়া ছাড়া আর কী এমন স্মরণ করতে পারি! কিছুটা প্রশ্রয় পেয়ে যদি বা গায় কেউ আনন্দ সংগীত, তাও তো তোমাদের খিলকি দিয়ে পালিয়ে বেড়ায়।‘

‘যে জমিতে থাকে কিছু হৃষ্টপুষ্ট ধানের ফলন, এ জমি তোমাদের না হয়ে অন্য কারো হতেই পারে না! যদি কোনো সন্ধ্যা নামে আনন্দ সংগীতে, বুঝতে হবে তোমাদের প্রশ্রয়ে সে ভুলে গেছে সীমানার ঘের। তোমাদের বাড়ি লিখতে গিয়ে মনে হল যা কিছু হয়েছে লেখা তাও তো তোমাদের চিরায়ত দান। এ পথ কেমনে তবে তোমাদের ছায়াশূন্য মায়াশূন্য হয়!‘

উপরের দুটো উদ্ধৃতিই আচ্ছন্ন করে তুলে পাঠককে।যা কিছু ঘটে সবই যেন এক উজ্জ্বল আঁধারের টানে।উঁচু ডালে পাখির ডাক,একটাও যদি ফুল ফোটে, কোনো আনন্দ সঙ্গীত,হৃষ্টপুষ্ট ধানের ফলনÑসবই কবির মানসীকে নিয়ে অথবা  তার কল্যাণে কিংবা তার বর্তমান হওয়ায়।

‘ফাঁড়িপথ‘ কবিতায় আরো তৃষ্ণা ঝওে পড়ে। কবি বলেন–‘আমাদের বাড়ির পাশে তোমাদের ঘর। এরি মাঝে ফাঁড়িপথ নিত্য আসা-যাওয়া।…জিজ্ঞাসিলে বলো তারে পথের হদিস। যে পথে বাতাস এলে নুয়ে পড়ে কমনীয় ধুলা-সে পথ অপথ হয়। তার মাঝে বাস করে কতিপয় সুখ। আর কিছু উষ্ণপ্রীতি, চিরায়ত পাওয়া।‘

কবির মন কিছুই মানে না। নিত্য সেই ফাঁড়ি পথটাই হয় জীবনের উষ্ণপ্রীতি এবং চিরায়ত পাওয়া।

তাই বলেন–‘সখি রে, এরি মাঝে ফাঁড়িপথ নিত্য আসা-যাওয়া।‘

কবির বোধের তলায় খেলা করে অনন্য সব বোধপাখি।যে পাখি কখনো নোলক,কখনো হয় কপালের টিপ আবার হয়ে ওঠে মায়াগাছ। ‘ফুল চেনার সহজ পাঠ‘ কবিতায় তাই তেখি এর নানা রূপ।

কবিতা–‘ফুল চেনার সহজ পাঠ’ এর ছত্রগুলো–

‘একটা নোলকফুল ফুটে রয় আমার বাগানে। আমি তাকে নারীগাছ বলে ভুল করে বসি। হাওয়া এলে নড়ে ওঠে নাকের বেশর। কপালের টিপ। আমি তাকে মায়াগাছ ভেবে ঘরে তুলে আনি।’

এরপর বাগান হয়ে যায় ‘কুহেলী দুপুর’।‘বউগাছ’ ভেবে নিয়ে যান ঘরে। শেষ ছত্রে–

‘এ বাগান কুহেলী দুপুর। রোদপাখি নিত্য করে গান। সে যদি পালকি চড়ে নেমে আসে বাগানবাড়িতে, তাকে আমি বউগাছ বলে ভেবে নিতে পারি।’

‘ভ্রমণসংহিতা ৩য় খ- অথবা ছবি তোলার গল্প’ কবিতায় ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে।এখানে স্মৃতিরা খেলা করে,অনিন্দ্য চিত্র তৈরি হয়। কবি বলেনÑ‘আমিও ছবির ছবি, উড়ে গিয়ে বসে পড়ি স্মৃতির মাচায়।’ স্মৃতিকে আকড়ে ধরে বলেনÑ. . . .‘এইসব ছবি তুমি তুলে নিয়ে স্মৃতিগুলো উসকে দিয়ে গেলে।’

কবিতার ২,৩,৪,৫ স্তবক ছবি সম্পর্কিত একে একে চিত্রিত হয়েছে হৃদছোঁয়া উচ্চারণে–

২ ॥

. . . .‘তোমার চোখের কোণে সঞ্চিত প্রেমের রূপ বারবার করে গেল খেলা। আমিও নতুন করে দেখে নেই তারে।

তুমি না ফিরলে এবার কখনো এ-রূপ আমার হতো না গো দেখো!’

৩ ॥

. . . .শিশুর চাঞ্চল্য থেকে নোটের ছাপানো দৃশ্য, সব কিছু এসে পড়ে মুগ্ধতার স্ন্যাপে। এসবের পাশ ঘেঁষে আমিও আটকা পড়ি ইতিহাসের ফ্রেমে।

তুমি এসে এইবার এইসব ইতিহাস বড়ো বেশি জ্যান্ত করে দিলে!

এ গ্রন্থে বিশিষ্ট কবিতা ‘মনুমুখ’। তার শেষ ছত্রে ফুটে আছে বুক নাড়া দেয়া কথা। ছত্রটি–‘মনু নদীর গাঙচিল আমি শূন্যে দিলাম উড়া’ ।

এক সময় কবি বিদেশে পাড়ি দেন অথবা কবির কল্প চরিত্র বিদেশবাসী হয়ে খুঁজতে থাকে আপন নিলয়। তাই কবি বলেন– ‘মনু নদীর গাঙচিল আমি শূন্যে দিলাম উড়া’ ।

নতুন ঠিকানায় পা ফেলার  পর যা যা ঘটে এমনি অসংখ্য তিলোত্তমা বর্ণনার পর কবি বলে ওঠেন–‘এ পাড়ার রমণীরা হাওয়া ভালোবাসে। আমি বাসি রোদ।’

বিদেশের অনুজ্জ্বল সূর্যকে নিয়ে আরো অনেক বিচিত্র বোধ জড়িয়ে পড়ে কবির মর্মেÑ‘এ গ্রামের সূর্যকে আমি চাঁদ ভেবে ভ্রম করে বসি।’

আত্মতৃপ্তি নিয়ে কবি বলেন–‘এ যেন মেঘের কোনো গ্রাম। এ গ্রামে সূর্যটা রোজ মেঘের পুকুরে নেমে ডুব দিয়ে থাকে। ইচ্ছা হলে ভিজা চুলে মাঝে মধ্যে উঁকিঝুঁকি মারে। ফলে ভিজা ভিজা রোদ আসে আমাদের ঘরে।

এ মেঘের গ্রামে কখনো আসে না ছায়া, মিঠামিঠা রোদ। কোথায় হারালো তারা? -আমি তাই হারিয়ে খুঁজি প্রকৃত মেঘের চেহারা।’

সেখানেও খুঁজে  বেড়ান রোদ.চাঁদ,সূর্য এবং হাওয়া। পেয়েও যান তার তৃষ্ণার কাঙ্খিত চাঁদ। যে চাঁদ সব দেশে আছে। টেরেসড হাউসের ফাঁক গলে নেমে আসে কবির আঙিনায়। শেষ পঙক্তিতে এর  প্রোজ্জ্বল উপস্থিতি দেখিÑ‘এ গ্রামের আকাশে আজ পুন্নিমার চাঁদ। টেরেসড হাউসের ফাঁক গলে নেমে আসছে ধবধবে আলো। ভরা চাঁদে বিলি কেটে হাত ধরে হাঁটি। হাতের ইঙ্গিতে চাঁদ নেমে আসে আমাদের বাড়ি।’