আমার কৃষক- ১

72

 

 

।। শামীম আজাদ ।।

আমি তারে মিস করি

আমি খালি তাহারে তুকাই।

এপিং ফরেস্ট জুড়ে রুদালী ডাহুকী উড়ে

সারা রাত পড়ে থাকে শরীরে উঠান।

না মাজি দাঁতের আসন, না খুঁজি নতুন পিন্দন

তিন দিন বাসী জামা গায়েতে বসাই

আর আমি তোমারে তুকাই।।

আমার ৪৩ বছরের সাথী হারিয়ে কিছু দিনের জন্য দেশে এসেছি ‘মন ভাল করার জন্য। গত ক’বছর শুধু ঘর আর হাসপাতাল করে যে একটা টানা ম্যারাথন রেইসে ছিলাম তাতে হঠাৎ ব্রেইক পেয়ে হাত পা’র জোড়াগুলো যেন তরল হয়ে গলে যাচ্ছে। সবই সমুদ্রের বিছানায় ভাসছে। এখানে ঘুম ভাঙে বনানীর পাখি ও নির্মান কর্মীর হাতুড়ির শব্দে আর শয্যা পাশে মির্জাপুরের চা এর সুগন্ধে। চোখ ফোটেতেরো বছরের আনাহিতার চুম্বনে। আমি আছি সুকন্যা ঈশিতার কাছে। তবে ভাসতে ভাসতেই বুঝেছি মন আসলে সময়ের মলমেই সারে- অন্য কিছুতে না।

নিজ ভবিষ্যত আয়ূর একটা হিসেব করে মনে হল বড়জোর আর পনর বছর হয়তো এরকম যাবে! স্বাস্থ্য এমন থাকলেও সৃষ্টিশীল থাকতে পারবো হয়তোবা আর সাত বছর! প্রতি বছর একখানা বই লিখলেও মাত্র সাত খানা বই, হয়তোবা তাও না। চোখে এখন মাছি ওড়া উড়ি করে, হাঁটু ও হাড় কথা বলাবলি করে, দাঁতের গাছগুলোর দাঁড়ানোর স্থানে এখন লোহার পাথর ঠেকা। যা যা আজাদের হয়েছে বারো বছর আগে এখন তার সবই একটু একটু করে হতে শুরু করেছে।

আমাদের বয়সের মাঝের এই নীল দরিয়ার দৈর্ঘ্য নিয়ে অনেক হাস্য করেছি! কতবার বলেছি বিবি খাদিজা-মোহাম্মদ গ্যাপটুকু তোমরা পুরুষরা পালটে দিয়ে সামাজিক ব্যবস্থা করে নিজেদের প্রোটেক্ট করে ফেলেছো। বলতাম তাতে তোমরা কিন্তু মূলত লুজার হয়েছো। আমরা সবংসহা হয়ে গেছি। তোমাদের গড় আয়ু কমেছে, অশক্ত হয়েছো, বউ কোন কারণে আগে মরে গেলে এক দিনও কিচ্ছু করতে পারো না। আরেক বউ লাগে , বলতাম এখন দৈবাত আমার কিছু হলে মশাই তোমার কিন্তু খবর আছে! মিষ্টি হেসে বলতো, জানি। টেবিলটা তোমরা পাল্টাতে দিলে কেন?

এ সত্যি অদ্ভূত ব্যাপার সে কখনো পুরুষ প্রজাতির এ সুবিধাবাদী বিধি ব্যবস্থা ফাঁদার পক্ষে সাফাই গাইতো না। আমি বিস্মীত হয়ে ভাবতাম ব্যাপারটি কি? একেবারে এক সামন্ত প্রথায় বড় হওয়া এ লোকটি এমন হল কি করে? সে কি বিলেতি শিক্ষা ও বিলেতে সময় যাপনের জন্য? কিন্তু লন্ডনেইতো দেখি কত শত বিলেতপাশ প্রথার পিঠে মাথা রেখে ঘুমোয়। বিলেতের প্রথম জীবণে আমাদের পার্থ রোডের বাড়িতে কাপড় ইস্ত্রি, কার্পেট পরিষ্কার, গার্বেজ ফেলার মত পেশীর কাজ করতো ছেলেরা। আমার বালক পুত্র ও আজাদ। আমরা মেয়েরা করতাম কাটাকুটি, রান্না, কাপড় ভাঁজ, ঘরে রঙ দেয়ার মত নরম কাজ। আসলে দাম্পত্য মূলত এক যৌথ খামার। সে ছিল আমাদের খামারের সহযোগী কৃষক।

আমার কৃষকের গ্রামের বাড়ি ছিল সন্দীপ। সন্দীপ!! আমার কাছে তখনো ঐ শব্দ এক ব্যাপক জলে ভাসা ব্যাপার। সন্দীপ মানেই শেল্টারবিহীন বন্যা, উরির চর। গাড়ী-ঘোড়াহীন, লাইট-‌ ফ্রীজহীন লন্ঠণময় এক সিনেমাহল বিহীন গাঁ। হাওয়াইর ভাইভ ও সিনেমার মত অসংখ্য নারকেল আর সুপারীর হু হু হাওয়া। রাতে নিশ্চয়ই বাংলা উপন্যাসে পড়া গ্রামের জোনাক জ্বলা অন্ধকার। টিনের চালে টুব করে বড়ই বা আমড়া পড়লে মনে হবে জাম্বুরা পড়েছে। বাইরে মাইলকে মাইল শুধু ধান, কলাই, খেজুর গাছ।

বিয়ের পর পরই ঈশিতা পেটে আসায় ঐ রহস্যময় দীপে আমার যাওয়া হয়নি। কিন্তু গল্প শুনেছি আজাদের কাছে। সন্ধ্যায় গুলশানে হাঁটতে হাঁটতে আমাদের লেইকের পাড়ের বাসা থেকে গোলচত্তর যেতে যেতে। বর্ষায় এমনি কাদা হয় যে অভিবাসিতরা গ্রামে যাবার জন্য পছন্দ করে ‘সুদিন’। শীতের সময়টাকে দ্বীপবাসীরা ডাকেন সুদিন বলে। সুন্দর না! আমার কাছে তা অতি সুন্দর লাগে। তো সুদীনে সকাল ঊঠানে শীতের সাময়িক রান্নাস্থল ‘বেড়াইত’র ভেতরে বাড়ি মাতিয়ে ম ম গন্ধে জ্বাল হতে থাকে খেজুরের রস। ঘন সোনালী সেই ‘মিডা’ দিয়ে ফু দিয়ে দিয়ে ছিঁড়ে খেতে হয় চিত্তল হিডা। কখনো তা খাওয়া হয় জাইল্যার মাঝের ঝোলে। সে চিতুইপিঠা যেমন মচমচে তেমন লাছধরা। হাতে উঠিয়ে চোখের সামনে ঝোলালে বাদামী ফুটোগুলো দিয়ে দেখা যায় ওপাড়। এদিকে বাড়াইতের ফুটো দিয়ে দেখা যায় পেছনের শীতল ঘাটলা। জলে পড়ে আছে পাড়ের আম, কাঠাল ও বাকুড়ের সবুজ ছায়া।