আমার প্রাণের শহর

73

।। রোকসানা আখতার ।।

গতকাল রাতে আমাদের হবিগঞ্জের এক ছোটবোন এর সাথে কথা বলছিলাম। লিখে খুব কম। কিন্তু ওর শব্দ চয়ন,বাক্য গঠন, বিষয়, বিশ্লেষণ এবং আবেগের যে অপূর্ব  বিন্যাশ থাকে সেটা মনে রাখার মতো। একই শহরের মানুষ আমরা। তাই ওই শহরের প্রতিটি রাস্তা পুকুর,ডোবা ,গাছপালা, নদী,সাঁকো এবং মানুষ জনের সাথে  সমানভাবে পরিচিত। দুজনেই স্মৃতিচারণে মেতে উঠেছিলাম। কথার ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে ওর সচেতনতা, বিশ্লেষণ, দৃঢ় মতামতে ওর স্বচ্ছ চিন্তা ভাবনাগুলো ফুটে উঠছিলো। হবেই না কেন । যে শহরে আমরা বেড়ে উঠেছি সেই শহরের সামাজিক  অবস্থান ,প্রকৃতি,অসম্প্রদায়িক এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশ-ই আমাদের শৈশবে সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল।

 আমাদের প্রানের শহর হবিগঞ্জ। এখনো চোখে ভাসে পুরাতন হসপিটালের কাঠ গোলাপের গাছগুলো। যেখানে খেলার সাথীদের নিয়ে কোচড় ভোরে  সাদা হলুদে মিশেল কাঠগোলাপের ফুল কুড়িয়ে নিয়ে  মালা গাঁথা হত। কোর্টের সামনে অনেক উঁচু কৃষ্ণচূড়া গাছগুলোতে ফাগুনের আগুন-লাগা রঙে ফুটে থাকতো। আমাদের বাসার পাশে যেখানটায় দাঁড়িয়ে বিস্তীর্ণ হলুদ সরিষার মাঠ পেরিয়ে বিলে উড়ে যাওয়া সাদা বলাকা আর খোয়াই নদীর উঁচু বাঁধ দেখা যেত, ঠিক সেখানটায় দুটো উঁচু শিমুল গাছের লাল ফুলের মাঝখান থেকে  বসন্তে কোকিলের মিষ্টি ডাক আমার এখনও কানে বাজে। সবুজবাগে  গফুর চাচাজির বাসার বকুল তলা। দল বেঁধে বকুল ফুল কুঁড়াতে যেতাম স্কুলে গ্রীষ্মকালীন ছুটি ঘোষণার আগেরদিন,সেই কুঁড়িয়ে আনা বকুল ফুলের মালা গেঁথে স্কুলে ক্লাস টিচার ছুটির নোটিশ পড়ার সাথে সাথে আমাদের হাততালির মধ্যে দিয়ে উনার গলায় পড়িয়ে দিতাম।

আহা আমার প্রাণের শহর তুমি কি আগের মতোই আছো নাকি অনেক বদলে গেছো। সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত বীজ আর নৈতিক অবক্ষয়ের বিষাক্ত থাবা তোমাকে গ্রাস করেনি তো! তুমি আগের মতই থেকো। আমার যে আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। জীবন সায়াহ্নের শেষ সময়টায় যে আমি তোমার কোলে মাথা রাখতে চাই। তোমার মাটিতে আমার আপনজন,শৈশব,কৈশোরের ঘ্রাণ মিশে আছে যে। তোমার কথা ভাবলে তাই চোখের জলে ভাসি। সব বদলে গেছে সব। তাই তো তোমাকে নিয়ে ও ভয় হয়। আমার প্রাণের শহর তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তুমি আগের মতোই থেকো! (ছবি: প্রতীকী)

লন্ডন, ১৬ জুলাই ২০১৭।