মন খারাপের সেই মেয়েটি

85

।। রোকসানা আখতার ।।

আজকাল সোশ্যাল মিডিয়াতে গৃহকর্মী নির্যাতনের খবরগুলো পড়ে আমার বানুর কথা খুব মনে হয়। জানিনা বেঁচে আছে কিনা মেয়েটি। আমি তখন কলেজে পড়ি। বিকেলে কলেজ থেকে এসে দেখি আমাদের বাসায় পনেরো ষোল বছরের একটা মেয়ে। আম্মাকে জিজ্ঞেস করতে বললেন বাসার গেটের কাছে এসে কাঁদতে ছিল । কাজ চাইছিল। আম্মা বললেন মেয়েটার কেউ নেই। সেদিনের পর থেকে বানু আমাদের বড় পরিবারের আরেক সদস্য হয়ে গেল। আস্তে আস্তে জানা গেল যে, সে যখন এক বা দুই মাস বয়সের ছিল তখন যে বাসায় সে কাজ করতো উনারা ওকে রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়ে ছিলেন ।কে বা কারা রাতের আধারে উনাদের বাসার সামনের রাস্তায় ওকে ফেলে গিয়েছিল। সেই বাসার কর্তীর ছিল দয়ার শরীর। ওকে সেই অবস্থায় ঘরে নিয়ে লালন পালন করে এতবড় করেছিলেন। সে ওই বাসায় আস্তে আস্তে ঘরের কাজ সাহায্য করতে লেগে যায় যখন মোটামোটি বয়স নয় দশ বছরের। উনারা ওকে হুজুর রেখে আরবী শিক্ষা দেয়ার প্রয়াস করেছিলেন ইত্যাদি। যখন বানু টিনএজ সে এক রিকশা ওয়ালার প্রেমে পড়ে এবং একদিন যথারীতি ধরা পড়ে যে সে প্রেগনেন্ট। তাকে এবরশন করিয়ে সুস্থ করে তোলা হয়।

বছর খানেক পর আবার সে আরেক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। যা হউক আম্মা উনাদের বাসায় খবর পাঠিয়েছিলেন এই মর্মে যে উনাদের বাসার গৃহকর্মী মেয়েটা আমাদের বাসায় আছে চাইলে উনারা নিয়ে যেতে পারেন। উনারা রাজি হন নি কারণ সে খুব চঞ্চলমতি। আমি এবং আমার বোন যে রুমে থাকতাম সেখানে একটা চোকি পেতে তার থাকার ব্যবস্থা হয়।কিন্তু কিছুদিন পরই দেখা যায় সে বাড়িতে আসা ইলেকট্রিশিয়ান, মাছ ওয়ালা তরকারি ওয়ালা সবার সাথে ভাব করে। তাকে আম্মা বুঝান,আব্বা বুঝান আমরা বোনরাও নসিহত করি।সে মনোযোগ দিয়ে শুনে। বাসায় লেইস ফিতা ওয়ালা আসলে আমাদের সাথে তাকেও চুড়ি,পাউডার,লিপস্টিক কিনে দেয়া হয়। সে সাজতে খুব ভালবাসত। কিন্তু সকাল বিকাল ছুত নাতায় বাসার বাইরে সারাক্ষণ থাকতে চাইতো।

মাঝে মাঝে আমাদের বাসার ওয়াল বেয়ে কোন কোন রাখাল টিনএজ ছেলে সন্ধ্যায় কল তলায় নেমে এসে তার সাথে দেখা করত। কয়েকদিন ধরে পড়ার পর আম্মা বললেন- তার বাইরে বেশি যাওয়ার দরকার নেই, কিনা কি হয়। তার মন ঠেকানোর জন্য তাকে আরো আদর যত্ন করা হয়। আম্মা বলেন- অসহায় মেয়ে আদর যত্ন পায়নি তেমন হয়তো, তাই কি করবে বুঝে না। একদিন সে ঘোষণা দিল তাকে বাড়ির বাইরে বেশি একা যেতে দেয়া হয় না আমরা তাকে খারাপ মেয়ে ভাবি। সে চলে যাবে। আমাদের এলাকারই আরেক বাসায়। সে চলে গেল। কেমন একটা মায়া পড়ে গিয়েছিল ওর জন্য। মনটা তাই সবার খারাপ হয়ে গেল।

তারপর অনেক দিন পর বড় ভাবি তখন হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালের ডাক্তার । হাসপাতাল থেকে বিকেলে বাসায় ফিরে খাওয়ার টেবিলে বসে কথা বলতে বলতে বললেন আজ বানু হসপিটালে ভর্তি হয়েছে । সঙ্গে একটা মাস ছয়েক এর বাচ্চা কোলে। ওর ব্রেইন টিউমার হয়েছে। চোখে দেখতে পায়না বেশি। ভাবি চিনতে পেরে কথা বলতেই খুব কান্না কাটি করেছে। একটা মহিলা ওর সাথে ছিল, সে ওর বাচ্চাটা দেখাশুনা করছিল। মনটা আমাদের ভারাক্রান্ত হয়ে গিয়েছিল। পরে হসপিটালে কিছুদিন থেকে চলে যায়। এরপর আর কিছু জানিনা। মাঝে মাঝে মনে হয় মেয়েটার কথা। (ছবি: প্রতীকী)

লন্ডন, ১৪ জুলাই ২০১৭।