ভূত/ গল্প

177

।। বিনায়ক দেব জয়।।

আজ প্রচন্ড গরম পড়েছে, ভাদ্র মাসে এমনিতেই গরম পড়ে খুব বেশি। কিন্ত  আজকের দিনের গরম যেন তাল পাঁকা রোদের গরম। বিকেলের দিকে যদিও এক পশলা বৃষ্টি হয়েছিল তার পরেও প্রচন্ড গরম। রয়েছে লোডশেডিং একেবারে রুটিন করে, গরমের দিনে বিদ্যুৎঅলাদেরও মনে হয় মাথা গরম থাকে, তাই নিয়মিত শর্ট সার্কিট হয়। এটা অবশ্য রইস আলীর কথা। সে ফাতেমা কে বলছে ” এই কারেন্ট আলা এরার মাথার ঠিক নাই, জিগাইলাম কারেন্ট কোন সময় আইবো, তারা কয় কারেন্টরে জিগাও – আমরা কিতা জানি। সবগুলা ফাজিল| “

ফাতেমা হচ্ছে রইছ আলীর স্ত্রী| তারা ময়মনসিংহের লোক| ভাগ্য বদলানোর আশায় সিলেটে চলে আসে| তারপর বিয়ানীবাজারে স্থায়ী হয়ে যায়| রইছ আলী সারওয়ার সাহেবের বাড়ির কেয়ারটেকার| দীর্ঘদিন এই অঞ্চলে থাকতে থাকতে সিলেটি ভাষাও মোটামুটি শিখে ফেলেছে| রইছ আলী মাঝ বয়সী লোক| বিশস্ত প্রকৃতির| সে সরওয়ার সাহেবদের বাড়িতে আছে দীর্ঘদিন|

এবার সরওয়ার সাহেব সম্পর্কে একটু বলে নেই| সরওয়ার সাহেব থাকেন লন্ডনে| চাকরি সূত্রে সপরিবারে| সিলেটের বিয়ানীবাজার পৌরসভার দশগ্রামস্থ অঞ্চলে তাদের পৈতৃক বাড়ি| সামার ভ্যাকেশনে দেশে আসছেন পুরো পরিবার নিয়ে ছুটি কাটাতে| সারওয়ার হোসাইনের স্ত্রী রাবেয়া খাতুন| দুই মেয়ে অরুন্ধতী এবং আরা|

ভরা পূর্ণিমা চলছে এখন| পাকা উঠোনে খালি গায়ে বসে আছেন সারওয়ার সাহেব| হাত পাঁখা মাঝে মাঝে নাড়ছেন| তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি খুব এনজয় করছেন| সারওয়ার সাহেব একটু জোরে ডাকলেন ” রইছ আলী চা আনতে অত সময় লাগে কিতা| কোন সময় কইলাম “|

“ভাইজান আনরাম অখন উ ” রইছ আলী উত্তর দিলো।

চা নিয়ে এলো রইছ আলী| চা এর কাপ থেকে ধুঁয়া উঠছে| সাথে মুড়ি কাঁচা মরিচ আর পেঁয়াজ দিয়ে মাখা|

” তোমার ভাবী কই| কিতা কররা “

” ভাবী ফাতেমার লগে রান্না ঘরে আছইন| দেখাইয়া দিরা কিতা রান্না হইত|”

” এখন একটু বাবুর বাজার যাও| গিয়া দেখ ভালা মাছ পাওয়া যায় নি | তাজা বড় বোয়াল খাইবার ইচ্ছা করের |”

বাবুর বাজার বিয়ানীবাজার থেকে ২ মাইল দূরে বসে | ভালো মাছ পাওয়া যায় | তবে যেতে হয় একটু দেরি করে রাতে | রাত ৯/১০ টার দিকে| স্থানীয় জেলেরা রাঙাউটিতে থাকে | তারা বিকেলের দিকে মাছ ধরতে বিলে যায় আর সেই মাছ নিয়ে আসে বাজারে |রাত ৮/৯ টার দিকে | রইছ আলী বাজারের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে | সরোয়ার সাহেব বললেন–

” রইছ আলী -অরুন্ধতি আর আরা কিতা করের ” |

” ভাইজান অরুন্ধতি এয়ার ফোন কানো লাগাইয়া ড্রয়িং রুমে আছৈন আর আরা রান্না ঘরে ভাবীর লগে | “

অরুন্ধতী সরওয়ার সাহেবের বড় মেয়ে | ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করে এখন একটা নামি দামী স্কুলে পড়ায়, গ্রামার স্কুল | সে গান শুনতে ভালোবাসে | ভাল বাংলা বলতে না পারলেও খুব ভালো বুঝে এবং একজন ভালো শ্রোতা |

রবীন্দ্র সংগীত তার খুব পছন্দের গান | খুব সুন্দরী বলতে যা বোঝায় – একেবারে চোখ ধাঁধানো | সে এই রকমই একজন | তাকে নিয়ে বিস্তারিত আরেক দিন বলবো । তার আই ফোনে জগতের সকল বিখ্যাত শিল্পীদের গান রেকর্ড করে রাখা | রবীন্দ্রনাথের গানের রয়েছে বিশাল ভান্ডার।

সরওয়ার  সাহেব উঠোন থেকে ডাক দিলেন “অরুন্ধতী মা তুমি কোথায়? এদিকে একটু আসতো”

তারা দুই মেয়ের সাথে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলেন যাতে করে তারা বাংলা শিখতে পারে শুদ্ধ করে। বিলেতে যেহেতু প্রধান ভাষা ইংলিশ তাই বেশির ভাগ ব্রিটিশ বাঙালি ছেলে মেয়েরা শুদ্ধ করে বাংলা বলতে পারে না। অরুন্ধতী সাধারণত ইংরেজীতেই কথা বলতে পছন্দ করে। অরুন্ধতী উত্তর দিল

” ইয়েস ডেডি আই এম কামিনং “.

সে ধীর পায়ে ড্রয়িং রুম থেকে বেরিয়ে আসল

”   What can I do for you Dady?”

” অনেক কিছুই করতে পারিস আমার জন্য . But first thing is can we talk in bangla? যে কয়দিন দেশে থাকবি বাংলায় কথা বলবি.”

” ঠিক আছে বাবা, বলবো, বল কেন ডেকেছো “

” তোর ফোনে কি শ্রীকান্তের গাওয়া ” আকাশ ভরা সূর্য তারা ” গানটা আছে.

” অবশ্যই বাবা। এটা আমার খুব পছন্দের একটা গান “

সরওয়ার সাহেব গান শুনতে শুনতে অন্য ভুবনে চলে গেলেন।

রান্না ঘরে রাবেয়া খাতুনের কাজ প্রায় শেষ। রাতের খাবার রেডি। ইলিশ মাছের সর্ষে বাটা, ইলিশ মাছের ডিম্ ভাজি, টারকা ডাল আর আলু ভাজি আজকের রাত্রের মেনু । আরা চুপ চাপ মার্ পাশে দাঁড়িয়ে সব কিছু দেখছিল। মোমবাতি আর পূর্ণিমার আলোয় যেন এক রহস্যময় আবহ চারিদিকে।

আরা মাকে জিজ্ঞেস করলো– মা কখন ডিম ভাজি খাবো।

সে ইলিশ মাছের ডিম খাওয়ার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী।  রাবেয়া আরাকে বাবার পাশে গিয়ে বসতে বলে বাথরুমে ঢুকলেন। একটা কুইক শাওয়ার করবেন। শরীর ঘেমে একেবারে একাকার।

কিরিন্ড দাদীর বাড়ি দশগ্রামেই। সরওয়ার সাহেবের বাড়ি থেকে তিন বাড়ি পশ্চিমে।  কিরিন্ড দাদীর পুরো নাম রমাপদ কর্মকার।  কিন্তু সবাই তাকে কিরিন্ড দাদী বলে ডাকে এবং চিনে।  বাপ দাদার ব্যবসা ছিল কামারি ব্যবসা।  কিন্তু কিরিন্ড কেন চুল কাটার ব্যবসা শুরু করলো সেটা জানা নেই।  বাজারে তাদের এয়ার কন্ডিশন সেলুন, মডার্ন হেয়ার স্টাইল। চালায় ছোট ছেলে কার্তিক। বড় ছেলে রানা দুবাই তে থাকে সপরিবারে।

কিরিন্ড দিনে এখন বাড়িতেই থাকে। বাড়িতে টুকটাক সবজি চাষ, চারিদিক পয় পরিষ্কার রাখা, এইগুলো নিয়েই ব্যস্ত থাকে।  দুপুরে খেয়ে দিয়ে একটু ঘুম।  পাঁচ টার দিকে ঘুম থেকে উঠে প্রথমে চা এবং পরে কিছুক্ষন হুক্কা টানে। তারপর বাজারে যায়।  সন্ধ্যায় সেলুনে গিয়ে বসে কিছুক্ষন।  ৮ টার দিকে ক্যাশ বাক্স থেকে টাকা নিয়ে দৈনন্দিন বাজার করতে যায়।  এটাই হচ্ছে তার রুটিন।  মাঝে মধ্যে বকুলের স্টলে চা খেতে যায়। আজও চা খেতে গেল সেলুন থেকে বের হয়ে।

চা ষ্টলে ঢুকতেই রইছ আলী ডাক দিলো কিরিন্ড দাদীকে।

-” কিরিন্ড দাদী ওবায় আইও “

–              ” রইছ আলী নি, দেখলাম না কয়দিন “

–              বকুলের স্টলের কাঠের বেঞ্চিতে বসতে বসতে কিরিন্ড রইছ কে জিজ্ঞেস করে।

–              ” সরওয়ার ভাইজান আইছন তো লন্ডন থাকি, একটু বেস্ততার মাঝে যার কয়দিন থাকি .”

–              ” সরওয়ার বাড়িতে আইছননি, জানতাম না তো, কাইল আইমুনে দেখা করাত ।”

–              কিরিন্ড বলল-

–              চা খাওয়া হয়ে গেলে দুজনে মাছ কিনতে বাবুর বাজারের দিকে রওয়ানা হলো।

রাবেয়া রইছ আলীকে ১০হাজার টাকা দিয়েছিলেন। ৭/৮ হাজার টাকার মধ্যে ভালো বোয়াল কিনার জন্য। বাকি টাকা দিয়ে পাবদা আর মলা মাছ কিনার জন্য বলেছিলেন। সাথে কিনতে হবে আমড়ার বৌল। মলা মাছ আর আমড়ার বৌল দিয়ে কড়ুয়া সরওয়ার সাহেবের ভীষণ প্রিয়। রাবেয়া নিজেও খাওয়ার মেন্যুতে একটা টক ডিশ পছন্দ করেন।

সরয়ার সাহেবের চোখ বন্ধ দেখে রাবেয়া খাতুন বললেন ” তুমি কি বসে বসে ঘুমিয়ে পড়লে নাকি “

                -“আরে না, গান শুনছি চোখ বন্ধ করে, এই পূর্ণিমা, মৃদু মন্দ বাতাস, এইগুলো তুমি আর কোথায় পাবে, Essex এ এই পরিবেশ কুনোদিনো পাবেনা “

                -” তা ঠিক বলেছ, দেশের আনন্দই আলাদা, যদিও অসহ্য গরম, মশার জ্বালাতন আর লোড শেডিং, তারপরেও দেশে আসলে অন্য রকম ভালো লাগে। ” রাবেয়া বললেন।

                -” আরা তোর কি ভাল লাগছে মামনি?”

                -” ইয়েস ড্যাডি আমার সবকিছু খুব ভাল লাগছে “।

অরুন্ধতি বলল-“বাবা তুমি কেন বাংলাদেশ ছেড়ে ইংল্যান্ড চলে গেলে, আমার তো মনে হয় তুমি বাংলাদেশ-ই বেশি পছন্দ করো। “

” offcourse  young lady . আমার চোখে আমার দেশ হচ্ছে সবচেয়ে সুন্দর, the বেস্ট place ইন the ওয়ার্ল্ড, কিনতু রিয়ালিটি রে মা higher স্টাডিস এর জন্য বিলেতে গেলাম আর ফেরা হলোনা। চাকরি পেয়ে গেলাম পড়াশোনা শেষ হতেই। বাবা মা দুজনেই চাইছিলেন আমি দেশে ফিরে আসি। আজ উনারা কেউই নাই “।

কিরিন্ড দাদিকে বিয়ানীবাজার রেখে রইছ আলী চলে যায় বাবুর বাজারের দিকে।আশা যদি ভাল বোয়াল মাছ পাওয়া যায়। ইদানিং বাজারে খুব ভাল সাইজের মাছ সচরাচর দেখা যায়না। ভাল মাছ পেতে হলে বাবুর বাজার ই বেস্ট।

আজ মাছের যোগান বেশ ভালো। অনেক গুলো বড় মাছ উঠছে বাজারে। ময়না মিয়ার কাছে একটা বড় বোয়াল দেখা গেলো। ময়না মিয়া পুরোনো মাছের ব্যাপারী। বোয়াল টা এখনো লড়ছে। রইছ আলী ময়না মিয়াকে জিজ্ঞেস করল-

-“বোয়াল ইগু কত”

“১২ হাজার। ইতা হকলে কিনার মাছ নায়। এক্যেবারে তাজা। এব লড়ের” ময়না বললো-

রইছ আলী বললো “ছয় হাজারে দিতায় নি দেওতে দিলাও”

ময়না মিয়া যেন একটু রেগে গেল।

” খাইছলায় নি মাছ কুনোদিন, না খাইতায়, ৬ হাজার টেকার মাছ তো ইগুর পেট হামাইজাইবো “

রইছ আলী দেখল মাছ ওয়ালা তার দামকে পাত্তাই দিচ্ছে না।

যাই হউক শেষ পর্যন্ত ৮ হাজার টাকায়  দফা রফা করে মাছ টা ঝুলিয়ে হাতে নিলো। অন্য বাজার শেষ করে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিল।

রইছ আলী খালি রিকশা দেখে উঠলো। বললো-দশগ্রাম যাও।

হাজির বাড়ীর সামনে এসে রইছ আলী রিক্সা থেকে নেমে গেল।সামনে খোলা মাঠ। মাঠের ভিতরের রাস্তা ভাঙা। হেটে যাওয়াই শ্রেয়।

বিস্তৃত মাঠ। মাঠ পেরোলেই দাসগ্রাম। পাশেই লোলা নদী।

একটা ভটভটি নাও শব্দ করতে করতে চলে গেলো। তারপর আবার সবকিছু শুনশান। মাঠের মাঝখানে একটা বিশাল কদম্ব ফুলের গাছ। শনি মঙ্গল বারে অনেকেই নাকি ওই  গাছে ভুত দেখেছে। রইছ আলী একটু শিউরে উঠলো। হাতে মাছ, ভুত প্রেত নাকি মাছের গন্ধ পেলে উতলা হয়ে উঠে।

রইছ আলী ভাবল আজকে কি বার, আজকে তো সোমবার, একটু নিশ্চিন্ত হয়েই যেন সে হাটা ধরল আবার।

নিজেকে সাহস দিতেই যেন একটু জোরে একটা গান ধরল।

” রূপালী নদীরে

রূপ দেইখ্যা তোর হইয়াছি পাগল”।

রইছ আলী হটাৎ করে থমকে দাঁড়ালো। ও আল্লাহ বা পাশের ঝুপের আড়ালে ওটা কি!  জোৎস্নার আলোয় পুরো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, ওটা এদিকে আসছে। রইছ আলীর বুক ধড়ফড় করতে লাগল। সে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো-

” কে? অন কে “

” আমি কিরিন্ড “

রইছ যেন দম ফিরে পেল।

” কিরিন্ড দাদী ই ঝুপড়ার আড়াল কিতা করো “?

” পেট আখতা করি এমন বেদনায় ধরছিল, পেট পাতলা করাত ওউ ঝুপ হামাইগেছলাম।”

রইছ আলী দেখলো কিরিন্ড দাদীর  পা একটু তাল বেতাল। গাঁজা টানছে মনে হয়।

” মাছ টা  তো ভালা অইছে ” কত নিলো “

“10 হাজার টেকা”। একটু বাড়াইয়া বললো রইছ আলী।

কিরিন্ড বলল বেশি নিছে, তবে মাছ তা তাজা আছে।

” জেলান ঝুলাইয়া নিরায়, তারা কেউরে ডাকিয়া না আনলেউ অয়, কদম গাছ সামনে, বহুতেও  তারারে দেখছইন “।

কিরিন্ড  দাদীর এই কথায় রইছ আলীর ভয় যেন দ্বিগুন হয়ে গেল।

যদিও ভরা পূর্ণিমা তবুও চারপাশে রহস্যময় গা ছমছমে ভাব . কিরিন্ড আপন মনে বিড়বিড় করে হাটছে। রইছ আলীর চোখ কদম গাছের দিকে। একটা পেঁচা গা ছমছমে শব্দ করে কোথায় যেন ডেকে উঠলো। রইছ আলী কদমের ডালে কিসের একটা নড়াচড়া দেখতে পেল। সে কিরিন্ডকে জিজ্ঞেস করল কিছু।

-“কিছু দেখরায় নি তুমি, কদম গাছর ডাল “

-“না আমিত কুন্তা দেখিয়ার না ” কিরিন্ড না তাকিয়েই বললো।

রইছ আলী দেখলো একটা বিশাল আকৃতির লম্বা কি যেন গাছ থেকে নেমে আসছে, সাদা আলখাল্লা পরা।

” আল্লাহ রে আমারে বাঁচাও আমারে বাঁচাও ” গগণ বিদারী চিৎকার দিয়ে মাছ আর হাতের ব্যাগ ফেলে দিয়ে রইছ আলী পাগলের মত দৌড় দেয়।

” কিতা হইল কিতা হইল ” এই বলে কিরিন্ড রইছ আলীর ফেলে দেয়া মাছ আর ব্যাগ হাতে নিয়ে পিছন পিছন দৌড়াতে লাগল।   ভয় দ্রুত সংক্রামিত হয়। কিরিন্ড প্রচন্ড ভয় পেয়েছে।

রইছ আলী আমারে বাঁচাও আমারে বাঁচাও বলতে বলতে ফুরকান মৌলানার বাড়িতে গিয়ে উঠলো। মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ল আর বলতে লাগল

-“আমারে বাঁচাও আমারে বাঁচাও “

চিৎকার শুনে ফুরকান মৌলানা বেরিয়ে এলেন। হাতে টর্চ। কাছে গিয়ে দেখলেন রইছ আলী বিড়বিড় করছে।

-“রইছ আলী ও রইছ আলী, কিতা বিড়বিড় কর”? ফুরকান রইছকে ঝাঁকুনি  দিলেন।

-“কিতা অইছে .”

ফুরকান মৌলানা দেখলেন রইছ  আলীর মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে আর বিড় বিড় করছে। হুশ আছে এখন। শরীর কাঁপছে।

-“নুরী একগ্লাস পানি লইয়া সকাল আও, এ আল্লাহ এরে তো ভুতে ধরছে “।

কিরিন্ড দাদী রইছের পিছন পিছন দৌড়ে ফুরকান মৌলানার বাড়িতে ঢুকলো। হাতে তার বিশাল বোয়াল মাছ আর বাজারের  থলে। সে ফুরকান মৌলানাকে বললো

-“রইছ ভুত দেখিয়া ডরাই গেছে।  আমরা একলগে, বাজার থাকি আইয়ার,  আখতা হে পাগলের মত দৌড় দিল “।

ফুরকান বললেন-“এরে ভুতে ধরছে, শলতা পোড়া দিতে হইব, রইছ ও রইছ”। ঝাকুনি দিলেন রইছকে ফুরকান, মুখে পানির ঝাপটা দিলেন।

রইছ ফুরকান মৌলানার মুখ চিনতে পেরে যেন একটু আস্বস্ত হল।

-“আমারে বাঁচাও চাচা আমারে বাঁচাও, কদম গাছ থাকি লম্বা কিতা লামিয়া আর, আমারে বাঁচাও”।

ফুরকান আর কিরিন্ড রইছের মাথায় পানি দিলেন অনেক্ষন। তারপর ধরাধরি করে বাড়িতে নিয়ে গেলেন।

সরওয়ার সাহেব বারান্দায় পায়চারি করছেন। এখনো লোড শেডিং চলেছে। কারা যেন বাড়িতে আসছে। কাছে আসতেই দেখলেন ফুরকান  মৌলানা আর কিরিন্ড দাদী রইছ আলীকে ধরাধরি করে নিয়ে আসছেন।

ফুরকান সরওয়ারকে বললেন-“এরে ভুতে ধরছে, ডরাইছে খুব বেশি,  মুখ দিয়া ফেনা বারর, শৈলতা পড়া দেওয়া লাগব “।

-“আগে ভাল করি দেখি কিতা হইছে, রইছ রইছ”। ডাকলেন সরওয়ার সাহেব।

রইছ বললো- আমারে বাঁচাও আমারে বাঁচাও।

রইছ আলীর স্ত্রী ফাতেমা কান্না শুরু করে দিল

-“আল্লাহ রে এখন কি হইব, ও আল্লাহ”।

সরওয়ার সাহেব ফাতেমাকে ধমক দিলেন।

-“কান্দার কিচ্ছু নাই ফাতেমা, একটু ডরাইছে, আর কিচ্ছু না, ঘর নিয়া রইছরে একগ্লাস গরম দুধ দেও, সব ঠিক হই যাইব”।

ফুরকান বলল-দুধ খাওয়াইয়া লাভ নাই,এরে ভুতে ধরছে, ভুত ছাড়াইতে হইব।

সরয়ার সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন- “তুমরা অখন বাড়িত যাও,  কাইল দিন দেখা যাইবো কিতা করা যায়।

কিরিন্ড দাদী সরওয়ার সাহেবকে বলল-“সারওয়ার মাছ কিতা করতায়,  ভুতর নজর লাগছে, পালাই দিতায় নি”।

তার মনে হয়তো আশা এরা মাছ না নিলে সে নিয়ে নেবে।

সরওয়ার বললেন- “অত বড় মাছ পালাই দিতাম কেনে, যাওবা দাদী কিতা যে কও”।

কিরিন্ড আর ফুরকান বেরিয়ে পড়ল। সরওয়ার সাহেবের বাড়ি থেকে বেরিয়ে ফুরকান কিরিণ্ডিকে বলল-

-“লন্ডন থাকিয়া মাথা এক্কেবারে গেচ্ছে, যে রুগর যে চিকিৎসা, আমার কিতা”।

কিরিন্ড বলল- বিড়ি থাকলে একটা দেও মৌলানা, বিড়ি টানি টানি বাড়িতে যাই।

সরওয়ার সাহেব বারান্দায় হাটতে হাটতে ভাবছেন আসলেই কি ভুত, অতিপ্রাকৃত বা অশরীরী বলে কিছু আছে। লন্ডনে যদিও এগুলো তেমন শোনা যায়না, গ্রামে-গঞ্জে মানুষ এখনও খুব জোরে-শোরে ভূত বিশ্বাস করে, ভূত মানে কি? যা গত হয়ে গেছে। অর্থাৎ যা অতীতে ছিল। সাধারণ মানুষ ভাবে অতৃপ্ত আত্মা অর্থাৎ যে আত্মার সদগতি হয় নি সে অশরীরী ঘুরা ফেরা করে। মাঝে মাঝে শরীর ধারণ করে। সরওয়ার  ভাবছেন তিনি কি প্রভাবিত হচ্ছেন? আইনস্টাইনের থিয়রি অফ রিলেটিভিটির যুক্তি কি এখানে প্রয়োগ করা যায়।

রইছ আলীর গোঙানির শব্দ শুনে সরওয়ার সাহেবের ঘুম ভাঙল। ভোর ৫ টা  এখন। সূর্য্যদেব আকাশে উদীয়মান। চারিদিক পরিষ্কার। রইছ আলী গুঙিয়ে গুঙিয়ে বলছে-

-“সবটির মাথা মটকাইয়া খাইমু, আমার লগে ইয়ার্কি, মাথা না ভাঙছি তো আমার নাম মণিকা নায়”।

ফাতেমা চিল্লাইয়া উঠলো-“আল্লা রে কিতা হইল আবার “

মণিকা কে? ভাইজান দেখিযাউক্কা আইয়া”।

সরওয়ার সাহেব রইছ আলীর ঘরে গিয়া দেখলেন তার  দৃষ্টি অস্থির। চোখ লাল।

” গুঙাচ্ছে আর বলছে আমি মণিকা , আমার লগে ইয়ার্কি .

ফুরকান মৌলানাও আসছেন আবার। এসে দেখলেন রইছ গুঙাচ্ছে আর বলছে- আমি মণিকা।

ফুরকান বললেন-“এরে মণিকার ভূতে ধরছে, খুব বজ্জাত ভুত, খুব জ্বালায়”।

চিৎকার চেঁচামেচি শুনে গ্রাম শুদ্ধ লোক এসে জমা হয়েছে। কিরিন্ড দাদীও আছে এইখানে। সে সবাইকে বলছে কিভাবে ঘটনাটা  ঘটল। বলা বাহুল্য যে গল্পের শাখা প্রশাখা কেবলি বাড়ছে।

ফুরকান মৌলানা সরওয়ার সাহেবকে বললেন- রইছ আলীর ভুত ছাড়ানোর জন্য শলতা চিকিৎসা দরকার। এই পদ্ধতিতে রুগীর নাক দিয়ে শলতার ধোঁয়া ঢুকানো হয় এবং এই ধোঁয়ার কারণে ভুত পালিয়ে যায়, এটাই সবাই বিশ্বাস করে।

সরওয়ার সাহেব হা না কিছু বললেন না।

ফুরকান পাশের দুই যুবককে বললেন- রইছকে শক্ত করে ধরতে। রইছের স্ত্রী নুরী একটা লেম আর শলতা নিয়ে আসলো।

ফুরকান রইছ আলীর নাক দিয়ে ধুঁয়া উঠা শলতা  ঢুকাচ্ছে আর রইছ আলী প্রচন্ড শক্তিতে হাত পা ছুটাতে চাইছে।

একজন যুবক বল ‍-

-“আল্লা এর গায়ে এতো জুর কি থাকি আইলো, সামলানি জারনা”।

আরো দুই জন রইছকে শক্ত করে ধরল। রইছ আলীর চোখ দুইটি রক্তবর্ণ। সে গোঁঙাচ্ছে আর বলছে-

-“ফুরকান তোর মুন্ডু যদি আমি চিবাইয়া না খাইছি তাইলে আমি মনিকা না”।

রইছের হুঙ্কার বাড়তেই আছে। ফুরকান দোয়া পড়ছেন আর বিড়বিড় করছেন।

ফুরকান যেই আবার শলতা ঢুকাইতে গেছেন রইছ আলী হাত ছাড়াইয়া ফেললো। ঝাপ্টে সে ফুরকানের হাত ধরল আর কামড়ে ধরল ফুরকানের হাতে।

ফুরকান কোনো রকমে হাত ছাড়াইয়া বাপরে বাপ্ বলে দৌড় দিয়ে পালিয়ে গেল। রইছ আলীর চিৎকারে বাড়ি কাঁপছে।

অনেক্ষন ধস্তাধস্তির ফলে রইছ আলীর শক্তি নিঃশ্বেষ হয়ে গেল। সে নেতিয়ে পড়ল এবং ঘুমিয়ে গেল।

রাবেয়া সরওয়ারকে বললেন- এইসব বুজরুঙ্গি দিয়ে কাজ হবে না। তুমি ডাক্তার ডাক, ভুত টুত ওগুলো কিছু না।

কেউ একজন গিয়ে ডাক্তারকে নিয়ে আনলো। ডাক্তার চেক করে বললেন ভয়ের কিছু নাই।  হেলুসিনেশন থেকে ভয় পেয়েছে, হিস্টিরিয়ার মতো হয়েছে, ইনজেকশন দিচ্ছি, ঘুম হলেই আর বিশ্রাম হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

ডাক্তার চলে গেলেন। রইছ আলী ঘুমাচ্ছে। বাড়িতে শুনশান নীরবতা। অরুন্ধতী এয়ার ফোন কানে লাগিয়ে গান শুনছে আর আরা ipad এ কি দেখছে। রাবেয়া ভাবছেন বোয়াল মাছ টা কি ফেলে দিবেন। এ্যা তিনি কি ভাবছেন! তিনিও কি ভুত প্রেত বিশ্বাস করা শুরু করলেন!

সরওয়ার সাহেব বারান্দায় পায়চারি করছেন। কিরকম একটা অস্বস্তি পুরো বাড়ি জুড়ে।বাড়ির সামনে শিমুল গাছ থেকে অনেকগুলো কাক একসাথে কা কা করে ডেকে উঠল। একটা বড় ডাল হঠাৎ করে ভেঙে পড়ল কুনো বাতাস ছাড়া-ই। রইছ আলীর ঘরে কে হাসে এরকম। একেবারে অট্ট হাসি। কে হাসে? ফাতেমা না? ফাতেমাই তো, দুরে আকাশ কাল ধোঁয়ায় ছেয়ে গেছে। ফাতেমার অশরীরী হাসিতে বাড়ি কাঁপছে। একটা বিষন্নতা যেন সরওয়ার সাহেবকে গ্রাস করলো। দ্বিধা-দ্বন্ধে পড়ে গেলেন।এক সময় ভাবলেন,এবারে বিলেতে গেলে আর ফিরবেন না।