টক অব দি টাউন-ছান্দসিক

478

।। হামিদ মোহাম্মদ।।

গত ক‘দিন ধরে লন্ডনে মুখেমুখে ঘুরছে ছান্দসিকের হাজার বছরের বাংলা কবিতা-‘উল্লাসে সংকটে‘ আয়োজন নিয়ে প্রশংসামুখর কথা। কী এমন আয়োজন,এতো মাতামাতি।

 লন্ডনে নিয়মিত না হলেও অনেক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন হয়ে থাকে। এসব আয়োজনে কমবেশি অনেকেই উপস্থিত হন,উপভোগ করেন, প্রশংসাও করেন। কিন্তু কোনো অনুষ্ঠানকে ঘিরে পঞ্চমুখ হওয়া এই প্রথম।19601571_1474292575969192_8706161136010994492_n

মুনিরা পারভীন লন্ডনে সুপরিচিত মুখ। চ্যালেন এস এর সংবাদ পাঠিকা। হাস্যোজ্জ্বল মানুষ হিসেবে নন্দিত। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তির ডাক পড়ে।তার হাতেই সম্প্রতি গড়ে ওঠে আবৃত্তি সংগঠন ছান্দসিক। এ সংগঠনে জড়ো হয়েছেন তাদের আবৃত্তি শিক্ষক শ্রী হেমচন্দ্র ভটাচার্যের ক‘জন ছাত্রছাত্রী।

হাজার বছরের বাঙলা কবিতা-উল্লাসে সংকট‘র আয়োজনে হেমচন্দ্র ভটাচার্যকে স্মরণ করে নিবেদিত প্রথম অনুষ্ঠানটি ছিল যেমন আবেগ তাড়িত তেমনি ছিল বাঙালির হাজার বছরের নানা বাকবদলের কথায় ঋদ্ধ।

অনুষ্ঠানটি সবার দৃষ্টি কাড়ে তার মনোমুগ্ধকর উপস্থাপনা ও শিল্প ব্যঞ্জনা।আবৃত্তির সাথে নৃত্য সংযোজন,বাঁশির সুরলহরী,তবলার তরঙ্গায়িত শব্দছন্দ,কীবোর্ডের হৃদস্পর্শী সিম্পনি উপস্থিত শ্রোতা দর্শকদের সম্মোহিত করে।

গত ক‘দিনে যারা-ই এ নিয়ে কথা বলেছেন,তাদের সকলেরই প্রতিক্রিয়া ছিল দীর্ঘদিন পরে একটি ভালো অনুষ্ঠান উপভোগ করার মুগ্ধ প্রকাশ।কেউ বলেছেন-মুনিরা যে ভালো একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপন করবে এটা আমাদের বিশ্বাস ছিল,তা-ই হয়েছে। অনেকে বলেছেন‘উল্লাসে সংকটে‘ নামটি-ই মনকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।সেই সঙ্গে হাজার বছরের কবিতাও একটি লংজানিং-এটাও একটি ইতিহাসের নানা বাকবদলের আমূল দ্যোতনার প্রতিফলন-তাও টেনেছে অনেককে।unnamed-file-1

অনেকের মতে,মুনিরা পারভীন বিলেতে গত ১৪ বছর ধরে বসবাস করছে। এতোদিনে সাংস্কৃতিক অঙনে কাজ করার সুবাদে যে ভিত রচিত হয়েছে,এ  ধরনের একটি অনুষ্ঠানকে সফল করে তোলার পেছনে-তাও একটি উপাদান। সাংবাদিক আহাদ হোসেন বাবু বলেন,আমি অসুস্থ থাকায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারিনি,সবার আলাপ থেকে মনে হচ্ছে একটি ভালো অনুষ্ঠান উপভোগ থেকে বঞ্চিত হলাম। সাংবাদিক তানভীর আহমেদ বলেন, অনুষ্ঠানের পরে প্রকাশিত নিউজে উপস্থিত অতিথিদের নামের তালিকায় অনেকের নাম ছিল না। এতে কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাতে মনে হচ্ছে অনুষ্ঠানটি ভালো ছিল।

সংস্কৃতিকর্মী আফতাব হোসেইন বলেন, অনেক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যাই স্রেফ দায় থেকেই।কিন্তু এ অনুষ্ঠানে গিয়ে মনে হয়েছে দায় থেকে বেশি ছিল তৃপ্তিবোধ। অনেক দিন পরে একটি ভালো অনুষ্ঠান উপভোগ করে তৃপ্তি পেলাম।সাংস্কৃতিক নেতা সৈয়দ এনামুল ইসলাম এক আলাপে বলেন,ভালো অনুষ্ঠান হলে শ্রোতার অভাব হয় না।শ্রোতা দর্শকদের ভীড় প্রমাণ করে তা-ই।এরপর পারফর্মার সবাই ছিলেন সিলেটের।মুনিরার বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, তারা প্রমাণ করলেন সিলেটের মানুষ সিলেটী আঞ্চলিক ভাষায় শুধু কথা বলে না, তারা ভালো উচ্চারণ ও শুদ্ধ বাঙলায় কথা বলতে পারদর্শী।

কমিউনিটি নেতা মাহমুদে রউফ বলেন,আমি অনুষ্ঠান উপভোগ করে মুগ্ধ হয়েছি। আগামী যে কোনো অনুষ্ঠানের অপেক্ষায় থাকবো।সাংবাদিক আবু মুসা হাসান ও নিলুফা ইয়াসমীন ও প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। সাহিত্য ও ইতিহাস গবেষক ফারুক আহমেদ বলেন,মুনিরাকে আমার অকৃত্রিম অভিনন্দন,এরকম একটি অনুষ্ঠান গত বিশ বছরেও দেখিনি। অনুষ্ঠানটি বহুদিন মনে থাকবে, কবিতাকে আবৃত্তির মাধ্যমে  যে শক্তিশালী শিল্পরূপ দেয়া সম্ভব তা ছান্দসিক প্রমাণ করেছে।

সাবেক কাউন্সিলার শহীদ আলী অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন সস্ত্রীক। যে কোনো অনুষ্ঠানে সহধর্মিণী ফাতেমা নার্গিসকে নিয়ে হাজির হন। দুজনই খুব মননশীল নির্বিরোধ শ্রোতা বা দর্শক। তিনি মুনিরাকে বললেন,এ অনুষ্ঠানটি টিকেট দিয়ে দেখা উচিত ছিল। কিন্তু সে ব্যবস্থা ছিল না। আমি ও আমার  স্ত্রীর পক্ষ থেকে ২০ পাউন্ড দিলাম।

আর সোস্যাল মিডিয়ায় অনুষ্ঠান সম্পর্কে প্রশংসার অন্ত ছিল না। সোস্যাল মিডিয়ায় ভিডিও সংযোগে বাংলাদেশের বিভিন্নস্থান এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে তথা যুক্তরাষ্ট্র,ইউরোপ,মধ্যপ্রাচ্য,অস্ট্রেলিয়া কানাডা থেকে সরাসরি হাজার হাজার দর্শক অনুষ্ঠানটি উপভোগ করেছেন।তাদেরও ভালোলাগার কথা ফেইসবুকে উঠে এসেছে।

অনুষ্ঠান উপভোগ করা এ1-1কজন প্রতিক্রিয়ায় জানালেন,মুনিরা পারভীন অনুষ্ঠান শেষে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে  যে বক্তব্য রাখেন,তা ছিল অপূর্ব। তার কথা বলার ধরণ ও বক্তব্য পরিবেশনা ছিল অত্যন্ত গোছানো ও উচ্ছল এবং প্রাণবন্ত। সাধারণত কোনো অনুষ্ঠান শেষে উদ্যোগতাদের বক্তব্য কেউ শুনতে চায় না। কিন্তু মুনিরা পারভীনের বক্তব্যটি স্রেফ বক্তব্য ছিল না,এটা ছিল আরেকটি কবিতা।

তবে আবৃত্তির পর দর্শকদের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বক্তব্য প্রয়োজন ছিল না বলেই অনেকে মৃদু সমালোচনা করেছেন। অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া বাঁশিওয়ালার বাঁশি মাঝে মাঝে বেসুরো হয়ে ওঠা এবং আলো প্রক্ষেপনের ত্রুটির কথাও সমালোচিত হয়েছে।

সুদুর বার্মিংহাম ও ব্রিস্টল থেকে কবিতা আবৃত্তিতে অংশ নেয়া আফসানা সালাম,রাজিব জেবতিক ও ফারহানা মনির মনকাড়া আবৃত্তির প্রশংসা কম ছিল না। লন্ডনে বাসিন্দা আবৃত্তিকার ও কবি রেজুয়ান মারুফ, জাকী চৌধুরী,তাহেরা চৌধুরী লিপি, শতরূপা চৌধুরী  এবং জিয়াউর রহমান সাকলেনের আবৃত্তি শোনে প্রয়াত হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের সফল গুরুর মর্যাদাই তারা সমুন্নত রেখেছেন বলেই মন্তব্য ছিল প্রশংসায় ভরা।

আর অনুষ্ঠানটির হাজার বছরের কবিতায় কেন্দ্রীয় ধার বা চেতনা ছিল,যে সত্যবাণীটি বন্দিত হয় তা ছিল-‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই‘। এরকম পরিচ্ছন্ন চিন্তার স্পন্দন নিয়ে অনুষ্ঠানটি উপভোগ করা শ্রোতারা ছান্দসিকের আরেকটি মনমাতানো কবিতা আবৃত্তির  অনুষ্ঠোনের অপেক্ষায় থাকলেন।

লন্ডন,৮ জুলাই ২০১৭।