ছন্দের দোলায় হাজার বছরের কবিতার বন্দনা : উল্লাসে সংকটে

984

 

।। হামিদ মোহাম্মদ ।।

‘রক্তে ছন্দের দোলা, হৃদয়ে বাংলাদেশ‘ এটি স্লোগান নয়,অথচ প্রাণে এ রকম ঢেউ  খেলানো সুর ও ছন্দের বন্দনা বুকে  নিয়ে  সমবেত হয়েছে ক‘টি মুখ–যারা বিলেতে এসে নিজের অস্থিত্বের সন্ধান করছে। এ প্রেরণায় সমবেত হতে  গিয়ে তৈরি করেছে ‘ছান্দসিক‘ নামে একটি প্লাটফরম। দেশে বড় হওয়া,এক সাথে কবিতা আবৃত্তির তালিম নেয়া,তাদের আবৃত্তি গুরু শ্রী হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্যরে মন্ত্রে উদ্দীপ্ত হওয়া  এই মুখগুলো মায়াবি একটি জগত তৈরি করতে হাঁটা শুরু  করেছে। কেউ ব্রিস্টলে, কেউ বার্মিংহামে আবার অনেকে মেগাসিটি লন্ডনেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে।কিন্তু স্বপ্ন যদি ঘুমোতে দেয় না–দূর্গম প্রান্তরেও ছুটতে,অসীম আকাশ ছুঁতে কিংবা ঘুমিয়ে থাকা মানুষদের জাগাতে– জাগতিক কোনো কিছু  কি  বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়? আসলে সদিচ্ছা, প্রেরণা ও চেতনার কাছে তুচ্ছ সব।

ছান্দসিক ‘হাজার বছরের বাংলা কবিতা-উল্লাসে সংকটে‘ উপস্থাপন করছে ২ জুলাই রোববার পূর্ব লন্ডনের ব্রাডি আর্টস সেন্টারে। স্মরণ করা হচ্ছে আবৃত্তি শিক্ষক শ্রী হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য্যকে। আবৃত্তি যে একটি শক্তিশালি শিল্পমাধ্যম–তা প্রতিষ্ঠিত হলেও আজ অবধি একে আলাদা করে খুব একটা  বিবেচনা করা হয় না। অথচ কবিতা-ই শিল্পের মূল  বা মৌলিক সমৃদ্ধ শিল্প মাধ্যম। কবিতাকে সঠিকভাবে  প্রস্ফুটিত করার দুর্বলতার কারণে কিংবা শিল্পময় দীপশিখাটি প্রজ্জ্বলন করার হীনতা বা অক্ষমতার জন্যে এ মাধ্যমটি অনেকটা  উপেক্ষিত।

ছান্দিসিকের প্রাণময় মুখগুলোর মধ্যে উপেক্ষার এ বাঁধাকে অতিক্রম করার যে  বিভা জ্বলজ্বল করছে, তা প্রমাণ করে বাংলা কবিতা আবৃত্তি শুধু বাঙালি কমিউনিটিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, মূল ধারার শ্রোতা ও দর্শকদের মাঝে অতি অল্পদিনেই পৌছে দেয়ার অঙ্গীকারও রয়েছে।

তাদের উচ্চারণ–বাংলা সাহিত্যের বয়স ইতোমধ্যে হাজার বছর পেরিয়ে এসেছে। এই হাজার বছরে বাংলা সাহিত্যের ভান্ডার আজ হাজার রকম আলোয় উদ্ভাসিত। আর এই আলোকমালার সবচেয়ে উজ্জ্বল ও প্রধান অংশটির নাম কবিতা। বলা যায়,উনবিংশ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে শুধু কবিতাই রচিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্য তথা বাংলা কবিতা, বাংলা গান যা নিয়েই কথা বলি– ‘চর্যাপদ‘কে-ই আমাদের ভিত্তি মনে করতে হবে, এখানেই দাঁড়াতে হবে।

 চর্যাপদের কবি কাহ্নপাদ থেকে সাম্প্রতিকতম কবিদের মধ্যে রুদ্র মুহাম্মদ শহীল্লাহর কবিতা অর্ন্তভুক্ত রয়েছে হাজার বছরের কবিতা‘য়। ‘কাকে রেখে কাকে ছুঁই‘এ কঠিন দশা ছিল তাদের। বাছাই করা কঠিন হলেও  বাংলা সাহিত্যের  খ্যাতিমান  সহস্রাধিক কবিদের মধ্যে বাছাই করে কুড়িজন কবির কবিতা নেয়া হয়েছে।

ছান্দসিকের জয়গান হলো–চন্ডিদাসের ‘শোনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই‘। বাছাই করেছেন  নীতিকবিদের কবিতা।

ষোড়শ শতাব্দীর কবি জ্ঞানদাস। কবি রাম প্রসাদ সেন এর ‘মন রে কৃষি কাজ জানো না‘

পাখি  সব করে রব,রাতি পোহাইলো/কাননে কুসুম কলি সকলি ফুটিলো/ রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে/ শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে/ . . । মদনমোহন তর্কালঙ্কারের  তাঁর প্রভাত কবিতায় এমন-ই মনকাড়া উচ্চারণ রয়েছে কবিতাপাঠে।

এরপর লোকসাহিত্য। লোকসাহিত্য মূলত কৃষ্টি,সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করতে বিশেষ ভুমিকা রেখে চলেছে। এই অপার সাহিত্য রচনা বা সৃষ্টি হয়েছে বা হচ্ছে  নিরক্ষর ও অল্প শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে। সহজিয়া বৈষ্ণব ও বাউল ধারায় ফকির লালন সাঁই,গগন হরকরা, কাঙাল হরিনাথ,রাধারমণ. . . হাছনরাজা থেকে আরম্ভ করে বর্তমান সময়  পর্যন্ত এই লোকধারার কবিরা বাংলা সাহিত্যের যে ব্যাপ্তি ঘটিয়েছেন–তা অমর। এ অমর লোকসাহিত্যে প্রকাশ ঘটেছে–মানবপ্রেম,আধ্যাত্মিকতা, মানবিকতার জয়গান, দর্শন, চিন্তা ও চেতনার বিকাশ। লালন সাই‘র চরণ রয়েছে আবৃত্তির এ ধারায়।

 লোক সাহিত্যের  ভিত রচিত হওয়ার পরেই রয়েছেন বাংলা সাহিত্যের এক ধ্রুবতারা। তিনি  কবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত। তিনি-ই প্রথম কবি যিনি সৃষ্টি করেন অমিত্রাক্ষর ছন্দ। লেখেন বাংলাভাষায় সফল  ট্রেজেডি মহাকাব্য‘মেঘনাদবধ‘। তাঁর রয়েছে ‘বঙ্গভাষা‘ কবিতা।

 কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাসাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। বিশ্বপরিসরেও তিনি অন্যতম  সেরা কবি। তিনি একাধারে কথাসাহিত্যিক,কালজয়ী সঙ্গীত স্রষ্টা,নাট্যকার,অভিনেতা,কণ্ঠশিল্পী চিত্রকর,প্রাবন্ধিক,সর্বোপরি দার্শনিক। রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব, কবিগুরু ও বিশ্বকবি অভিধায় ভূষিত করা হয়। ১৯১৩ সালে সাহিত্যে বিশ্বনন্দিত  নোবেল পুরস্কার পান।তাঁর কটি কবিতা আবৃত্তিতে বেছে নেয়া হয়েছে।

 ছড়া কবিতার অনবদ্য সৃষ্টির স্রষ্টা সুকুমার রায়।সুকুমার রায়ের ছড়া রয়েছে আবৃত্তির মধ্যে। এইভাবে একে একে বাংলা সাহিত্যের তারকাদের মধ্যে রয়েছেন  কবি কাজী নজরুল ইসলাম,জীবননান্দ দাশ,সুকান্ত ভট্টাচার্য,জসীম উদ্দিন,শক্তি চট্টোপাধায়,সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়,পূর্ণেন্দু পত্রী,সব্যসাচী,শামসুর রাহমান,সৈয়দ শামসুল হক,আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, শহীদ কাদরী ও রুদ্র মুহাম্মদ শহীল্লাহ।

হাজার বছরের কবিতার ‘উল্লাসে সংকটে‘ পরিবেশনায় আবৃত্তি করবেন–মুনিরা পারভীন, রেজুওয়ান মারুফ,আফসানা সালাম,ফারহানা মনি, শতরূপা চৌধুরী,জিয়াউর রহমান সাকলেন,তাহেরা চৌধুরী লিপি ও রাজিব জেবতিক। তবলায় রয়েছেন-গৌতম কুমার সিকদার, বাঁশি বাজাবেন মখলিসুর রহমান,নৃত্য পরিবেশন করবেন সোনিয়া সুলতানা, সাউন্ড  ব্যবস্থাপনায়  সামসুল জাকী স্বপন ও স্টেজ শিল্প সংযোজনে আছেন মো. আবদুস সামাদ।