ডা. ইমতিয়াজ আহমেদের রবীন্দ্রসঙ্গীত জগতে মুগ্ধতা: ‘লাভ এন্ড লোউনলিনেস‘

447

।। হামিদ মোহাম্মদ ।।

সম্প্রতি একটি বিজ্ঞাপন পত্র আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তারপর একটি লিফলেটও হাতে পাই। এরকম অনেক কিছুই চোখে পড়ে। বিভিন্ন সময় অনেক লিফলেটও পাই। কিন্তু সব লিফলেট তেমন নাড়া দেয় না মনকে। হাতে পাওয়া অনেক লিফলেট যথাস্থানে ফেলে দিই। সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিসের টেবিলে রাখা  লিফলেটখানা আবার হাতে নিতে ইচ্ছে হলো। মনোযোগ দিয়ে পড়তে গিয়ে আলোড়িত হলাম। বাংলা ও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সংগঠন সৌধ সোসাইটির রবীন্দ্রসঙ্গীতের একক অনুষ্ঠানের আয়োজন। একক শিল্পী ডা. ইমতিয়াজ আহমেদ।  সৌধ সোসাইটির সাথে সহ ব্যবস্থাপনায় রয়েছে  পূর্ব লন্ডনের পপলার ইউনিয়ন।

ইমতিয়াজ  আহমেদ পেশায় একজন দায়িত্বশীল চিকিতসক। ইমতিয়াজ আহমেদকে দেখলে বেশভূষা ও কথাবার্তায় কখনো মনে হবে না তিনি ডাক্তার।  কোমল চেহারা। রবীন্দ্র আবহ সর্বত্র। সবাই জানে– যেখানেই যে অনুষ্ঠানে রবীন্দ্র সঙ্গীত গাওয়া হবে সেখানে থাকবেন ইমতিয়াজ আহমেদ। যেকোনো  সিরিয়াস বা ভালো  সঙ্গীতায়োজনে তার উপস্থিতিটাও  প্রাণ এনে দেয়।

লিফলেটখানা পড়তে পড়তে মনে হলো এই লোকটার ভেতরে এতো শক্তি কোথায় থেকে আসে বা শক্তি পান কোথায়। অর্থাত স্পিরিটটা কী।

তাকে দেখলে কিংবা গান পরিবেশনের ধরণ দেখলেই মনে হবে তিনি তো শুধু গান  গেয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন না, কোথায় যেন তার নিজস্ব একটা মুগ্ধতা রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে  মোবাইল নম্বার সংগ্রহ করে যুক্ত হলাম তার সাথে। পরিচয় বিনিময়ে সময় লাগেনি,কেননা চেনা-জানা সামান্য রয়েছে।

 বললাম–আপনি কি কাজে আছেন এখন? ফ্রি থাকলে  আমাকে কি কিছু সময় দেবেন? প্রশ্ন করলেন–কেন, কোনো দরকার আছে? আমি বললাম– আপনার অনুষ্ঠান নিয়ে কিছু কথা জানতে চাই।

কুশল বিনিময়ের পর  আমি প্রশ্ন করলাম– পপলার ইউনিয়নের সহ-ব্যবস্থাপনায় সৌধ সোসাইটি আপনাকে নিয়ে রবীন্দ্র সঙ্গীতের একক অনুষ্ঠান করছে।  আপনাকে একক সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে বেছে নেয়ার পেছনে তাদের ভাবনাটা কি? বা কেন আপনাকেই তারা বেছে নিলো? রবীন্দ্র সঙ্গীত, একক শিল্পীর গান। আমার  তো মনে হয় অনেক উচ্চ ধারণা এবং প্রত্যাশা থেকে  এ আয়োজনটির উদ্যোগ।

ইমতিয়াজ আহমেদ আবেগময় কণ্ঠে বললেন, অবশ্যই অনেক উচ্চ ধারণা ও প্রত্যাশা রয়েছে।  এ প্রসঙ্গে আমি যতটুকু জানি বা বুঝি–তা রবীন্দ্রনাথ ও তার সৃষ্টির প্রতি আমার টানকেই গুরুত্ব দিচ্ছি।

আমি প্রায় কুড়ি বছর ধরে বিলেতে রবীন্দ্র সঙ্গীত গাই।  আমার উদ্দেশ্য রবীন্দ্র সঙ্গীত গাওয়া নয়  রবীন্দ্র ভাবনাকে পশ্চিমা বিশ্বে পরিচিত করা। রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়াকে এই অর্থে আমি আন্দোলন হিসেবে নিয়েছি।সৌধ সোসাইটি আমার এই  আন্দোলনকে  বেগবান করতে আমাকে বেছে নিয়েছে বলেই আমার বিশ্বাস। কেননা, সৌধ সোসাইটিও বিলেতে বাংলা গান,তার দর্শন,গুনগত মান ও উচ্চমাত্রা এবং এর স্পিরিটকে ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে। তাদের সাথে,তাদের কাজের ধরণের সাথে আমার দূরত্ব কম। তাদের কাজটাও একটি বহুমাত্রিক  আন্দোলন। রবীন্দ্র সঙ্গীত ও তার দর্শন নিয়ে কাজ করাকে আমিও আন্দোলন হিসেবে দেখছি,এই বিবেচনায় একই মোহনায় ভাবনার মিল রয়েছে। আমি মনে করি, সৌধ সোসাইটি আমার একক কণ্ঠে  রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনুষ্ঠান আয়োজন করছে এই বিবেচনা থেকেই। তবে আমি কণ্ঠ দিচ্ছি একক কিন্তু সমগ্র পরিবেশনা আমার একার নয়। এখানে ইন্সট্্রুমেন্টাল পর্যায়ে রয়েছেন যারা তারাও শিল্পী। সঙ্গে রয়েছেন পয়েট্রি রিসাইটেশনে  এরিক সিলিন্ডার, এসরাজে তিরিথংকর রায়,তবলায় ইউসুফ আলী খান,সেস্কফোনে স্লাথম,ভায়োলিনে এলিস ব্যারন ও কীবোর্ডে  অমিত দে। নিজ নিজ ক্ষেত্রে তারাও বিশিষ্ট। আমরা সম্মিলিতভাবেই এ উপস্থাপনায় রয়েছি।

আমি তাকে কিছুটা থামিয়ে বললাম– ল্যাটিন আমেরিকার বিশ্বনন্দিত নোবেল জয়ী  কথাসাহিত্যিক গার্সিয়া মার্কজএর অমর সৃষ্টি  ‘হা-্রডে ইয়ার্স অব সলিসিউড‘। রবীন্দ্রনাথের অনেক পরে মার্কজের জন্ম। মার্কজ কি রবীন্দ্র প্রভাবিত? আপনাদের আয়োজিত রবীন্দ্র সঙ্গীতায়োজনের নাম দিয়েছেন– ‘লাভ এন্ড  লোউনলিনেস‘ যার অর্থ প্রেম ও নি:সঙ্গতা। মাকর্জের সৃষ্টিরও অর্ন্তগত সুর এবং দর্শন একই।

ইমতিয়াজ উদ্দীপ্ত হয়ে বললেন–সামগ্রিক বাংলা সঙ্গীতের বিশাল জগতটিতেও রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং রবীন্দ্র দর্শন একটি প্রধান দিগদর্শন। আধুনিক বিশ্বসমাজটাতেই  রবীন্দ্রনাথ বিশিষ্ট। ‘লাভ এন্ড লোউনলিনেস‘ যার অর্থ প্রেম ও নি:সঙ্গতা। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে বিশ্ব মানবতার  এই দর্শন বিশ্বজনীন।

আসলে,এসব নিয়ে  কেউ আলোচনা করে না বা বিষয়টি খুব বেশি আলোচিত নয়– যা আজ অতি স্পষ্ট যে,  রবীন্দ্রভাবনায় আলোড়িত ও প্রভাবিত ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্য। উদাহরণ হিসেবে গার্সিয়া মার্কজের ‘হা-্রডে ইয়ার্স অব সলিসিউড‘ বাংলা অর্থ ‘ নি:সঙ্গতার একশ বছর‘। তবে রবীন্দ্র ভাবনার সাথে  একটু পার্থক্য রয়েছে।  পোস্ট মডার্নিজম বলে যাকে চিহ্নিত করা হয় তার মূল দর্শন বা ভাবনা তো অনেক আগেই রবীন্দ্রনাথে প্রস্ফুটিত। তাঁর দর্শন–প্রেমটাই সব সময় নি:সঙ্গ। মানুষের জন্য ভাবতে হলেই নি:সঙ্গতা। আমাদের লিফলেটেও এ চিন্তার যোগ বা উল্লেখ রয়েছে। ‘পোস্ট মর্ডানিজম রি-ডেফিনেশন অব লাভ এন্ড লোউনলিনেস‘।

আমি এ প্রসঙ্গে বা আমার কিছু তৃপ্তির কথা বলতে চাইলে তিনি থামিয়ে বলেন–আমি রবীন্দ্রনাথের এই দর্শনটাকে আকড়ে ধরে বুঝাতে চাই–প্রেম ছাড়া কি মানুষ থাকে? বা মানুষের কিছু থাকে? যেখানেই এই প্রশ্নটা আসবে সেখানেই রবীন্দ্রনাথ। এই শুন্যতাটা-ই ভরে দিতে, পরিপূর্ণ করে দিতে রবীন্দ্রনাথ আমাদের দরকার। বিশ্ব মানুষের দরকার। এজন্য রবীন্দ্রনাথ মানেই আন্দোলন। সৌধ এবং আমি এই আন্দোলনের রবীন্দ্রনাথের ভাষায় আনন্দলোক‘র যাত্রী।

আমি এতোক্ষণে পেয়ে গেছি ইমতিয়াজ আহমেদের মুগ্ধতা কোথায়? কী জন্যে চিকিতসা পেশার মানুষ হয়েও  সুর আর ছন্দের ভেতরে যাপন করেন। সাধনা করেন অবিরাম। ছুটে যান বিলেতের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

ডা. ইমতিয়াজ শুধু একজন কণ্ঠ শিল্পী নন, একজন ভালো কথকও। গুছিয়ে কথা বলেন। শব্দ চয়নও বিষয়ভিত্তিক ধারালো। আমি আর  প্রশ্ন না করে বা কথা না বাড়িয়ে  বললাম– সৌধ সম্পর্কে কিছু বলুন।

তিনি বললেন– দেখেন, সৌধ যে সমস্ত অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেসব অনুষ্ঠানে আমি গান শুনতে যাই। মাঝে মাঝে আমিও এ সব অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ার সুযোগ পাই। তবে সৌধের যে জিনিসটি আমাকে মুগ্ধ করে তা হলো ভিন ভাষাভাষীর মাঝে বাংলা সঙ্গীতের সংযোগ সৃষ্টি করা। আমিও সে জায়গাটিতে কাজ করছি কুড়ি বছর ধরে। সৌধ  মূলধারা ও ভিনভাষী শ্রোতাদের মাঝে বাংলা সঙ্গীতের উচ্চমাত্রা ও দর্শন, সুরও ছন্দ এবং তালকে পৌছে দিতে একটি আন্দোলন শুরু করেছে। রক্তে-মাংশে এবং  মগজ ও মননে দর্শনকে ছড়িয়ে দেয়ার এ কঠিন কাজটি কী কম ধৈর্য ও কষ্টের? একটি বিশাল সাধনার কাজ। স্বপ্ন না থাকলে সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সৌধ ও আমার স্বপ্ন এক এবং অভিন্ন।rabindranath-tagore2

আগামী শনিবার ৮ জুলাই ২০১৭ পূর্ব লন্ডনের পপলার ইউনিয়ন (সেন্টার), ২ ক্যাটল স্ট্রিট,ই-১৪ ভেন্যুতে সন্ধ্যা ৭টায় অনুষ্ঠিতব্য এ আয়োজনের প্রবেশমূল্য অগ্রিম ৮ পাউন্ড এবং ডোরে ১০ পাউন্ড।