কবি মুজিব ইরমকে দেখেছি,তাঁর কবিতা দেখিনি। ‘ইরমকথার পরের কথা‘ পাঠ-২

103

 

কবি মুজিব ইরমকে দেখেছি,তাঁর কবিতা দেখিনি। না, কথাটা এরকম কেউ বলবে না। পাঠকরা জানেন-তাঁর কবিতার উচ্চতা হিমালয়ের উচ্চতম শিখর এভারেস্টকে ছুঁয়ে ফেলার প্রয়াসী কতটুকু। মুজিব ইরমের এভোরেস্ট অভিযানটা এরকমই দুর্দান্ত। ব্যক্তিগত নয়-কাব্যধারায়। তাই কি না এমনি প্ররোচনা। কেন বলতে হবে এরকম,এতো বেহিশেবী কথা? অনেকে ভেবে নিতে পারেন-এটা তো বেশি করে বলে ফেলা হলো।

মুজিব ইরমের কাব্য চিহ্নায়ন এতো সহজ নয়,যদিও খুব সহজ বাক্য বিন্যাস,কথার জাদুচেরা,গ্রাম্য পরশ মাখিয়ে বুনে যান কবি মাটিমাখা চরণ।

কবি মুজিব ইরম বাংলা কাব্য মন্ডলে উদিত নয়া নক্ষত্র। অবিরাম নির্মাণ, কাব্য-ধুপছাঁয়ায় সৃষ্টি করেন পাঠকের অধিবাস। তাঁর কাব্যসৃষ্টির বিভা সেই নক্ষত্রের ঝলকানি,আলোর বাগান। তাই, পাঠানুসঙ্গে কেঁপে ওঠে বুক,বিপন্নতা কিংবা অস্তিত্ব বিলীন নয়,নিজেকে স্পর্শ করার তুমুল কীর্তনে। আসুন, ডুব দিয়ে দেখি, পাঠক হওয়া যায় কি না ইরমসংহিতা,শ্রীহট্ট কীর্তন,কবি বংশ ও চম্পূকাব্যে।

কাব্যশিল্পী মুজিব ইরমের কাব্যসমগ্রের পাঠ-নিমগ্ন নির্যাস ধারাবাহিক প্রকাশ করছে বিলেতবাংলা ২৪ডট কম। লিখছেন-হামিদ মোহাম্মদ। পাঠক সঙ্গে থাকুন।-সম্পাদক,বিলেতবাংলা।10374497_1535441016718842_9129727781448312452_n

ইরমকথার পরের কথা-২

মানুষের জীবনটা তাল,ছন্দের সমারোহে বয়ে চলা এক চলমান দৃশ্যান্তর।যার গতি অবাধ্য পোষ না-মানা। তার মাঝে দেহটা একতারা।কবি মুজিব ইরমের ‘ইরমকথার পরের কথা‘র অন্তরধ্বনি এমনি এক জগতকে ইঙ্গিত করে,বহন করে নিরন্তর।‘দেহতত্ত্ব‘ কবিতার মরমিয়া অনুসন্ধানে এর গোপন আবাসÑযা জীবনভর বাজে।তবে এমন প্রাপ্তিটা অনেক সময় বেখবরই চিহ্নিত হয়। কিন্তু না, কবি বেখবর নন। ‘দেহতত্ত্ব‘ কবিতাটি থেকে উদ্ধৃতি দিলেই আরো স্পষ্ট হবে তার চিন্তা ও আত্মখনন। যেখানে প্রেম এক গোপন আবাস তৈরি করেছে,ফুটেছে ফুল হয়ে।‘দেহতত্ত্ব‘কবিতায় কবি বলেন-

‘এ দেহটা একতারা, তাকে বাজাই জীবনভর…‘।

কবি নিজস্ব বোধ এবং এর যন্ত্রনার আরো আত্মলগ্ন বর্ণনা দেন কবিতায়-

‘দেহে যে ফুটেছে বাস, চম্পার ঘ্রাণ। নাগিনী কন্যার দেহে সেই কবে ফুটেছিল বলে অপবাদে, অপমানে করেছিল শাপ। আজ এই দেহের ভিতর দেখি তার সেই গোপন আবাস। এ দেহটা একতারা, তাকে বাজাই জীবনভর…।‘

কিন্তু  এরপর আরো এক ঘোরলাগা মরমিয়া স্বাদ কবিতায় গেরুয়া বসনের ছায়া ছড়ায়। আধ্যাত্মিকতার মায়াজাল বিস্তৃত হয়।ঐশ্বরিক নিরাকার কায়া উদ্দীপ্ত হয়।  আত্মিক খনন তৈরি হয় মন ও মননে।কবিতাংশে প্রবেশ করলেই তার স্পর্শ মেলে।

‘ঘাড়েতে দংশিলে নাগ তাগা বাঁধবি কোথা? দেহ তো আপন নয়, নয়তো পরের। তবু যে হয় না পাওয়া-সে তো এক নিরালোকে ধাঁধা। দেহ জর্জর দেহঘামে-বান্ধিছে বাসা কোন শঙ্খচূড় কায়া! এরি মাঝে দেহবাস নিত্য আসা-যাওয়া। তার মাঝে ভিটাবাড়ি, তার মাঝে ঘর।‘

কিন্তু পরের কবিতায় কবি আর আধ্যাত্মিক ঘোরে থাকেন না। জাগতিক ব্যঞ্জনায় ফিরে আসেন।অতি সাদামাটা প্রেমের আখ্যান ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেন পাঠকের জন্যে নির্ভেজাল। ‘৯-এর দশক কিংবা একটি নির্ভেজাল প্রেমের কবিতা‘ ই সেই স্পন্দন তৈরি করে।

উদ্ধৃতি-‘মাধবী এসেই আর বলে না তো যাই! হাসে আর বাসে। রূপকথা বলে-সেই যে ছিলাম আমি ফুলে আর ডালে, তোমাদের কালে! সেই যে হল না ঝড় বোশেখের মাসে! ঝড় হয়ে নেমে আসি বাসে। সেই থেকে বাসে আছি। ঘাসে আছি। পার্কে থাকি বসে। কখনো লোকালে উঠি। খুঁজি আশপাশে।

. . . . . .এ দুপুরে আমি আর যাবো না তো ছাই! বড্ড পাগল বেশে যে কিছুটা চাই। খুঁজে আমি পাই। মাধবী এসেই আর বলে না তো যাই!‘

 প্রেম যে জীবনের অংশ,কখনোই বিচ্ছিন্ন হওয়া যায় নাÑতার পাগল করা বর্ণনা এই স্তবকে।যদিও আমাদের সমাজে প্রেমকে নিয়ে  লুকোচুরি বিদ্যমান,তা কি হয়?‘বড্ড পাগল বেশে যে কিছুটা চাই। খুঁজে আমি পাই। মাধবী এসেই আর বলে না তো যাই!‘

পরের কবিতা‘বাদল দিনের হাওয়া‘ এমনি এক চিত্রময় প্রেমসিক্ত বুনন।

‘বর্ষার হাওয়া চিটারি করেছে। ধাক্কা মেরেছে তোমার দরজায়। কাল আমি যাইনি তো! দিব্যি এই বাদল দিনের হাওয়া। বাদলা মাথায় নিয়ে, তিন বাড়ির লাগোয়া পথে কাদা পার হয়ে তবেই না তোমার মঞ্জিল। তবেই না তোমার আস্তানা। এর ভিতর সাঁকোও আছে। আছে সাপ। পিছলা বিপদ। তুমি খিলকির ফাঁক দিযে যে শিসের শব্দ শোনেছ, সে অন্য কোনো ঢং। ডালিমের গাছ। পুদিনা পাতার ঝাড়। ভাটি ফুলের জঙ্গল। কবর স্তব্ধতা। দোষী বৃক্ষ। ঝিরঝির বৃষ্টি। এসব পেরুলে তবেই না তোমার কেবলা।‘

কবি কিভাবে পৌছেন তার দয়িতার কাছে। কত পথ মাড়ান। কবি বলেন-‘ সবে তো নিশির ডাক। পুকুরের পাশ ঘেঁষে, গোপাটের পেটনা মাড়িয়ে ধলপ্রহরের বিল। তুমি আছ। সাতগাঁও জানে।‘

কবি এরপর একের পর এক  চিঠি লিখেন দয়িতাকে।চিঠির ‘সংযোজন পাঠ ‘এ বলেন কবি-

১. এতটা নীলের মাঝে তুমি শুধু শুভ্র সকাল। তুমি শুধু ঘুম ভাঙা রোদ। উঠতি পুরাণ।

২. একটা চিঠির রঙ ফিকে হয়ে এলে, আমি কেন পাখি হয়ে যাই!‘

কবির মনের মাঝে যে প্রেমধ্বনি,নানা ছল ছুতায় বেড়ে চলে হন হন করে,অনেক উতলা দিন পেরিয়ে কবি বলেন মনের কথা। ‘পড়শিনী‘ কবিতায় তা রঞ্জিত হয়ে ওঠে।

‘পড়শিনী‘ কবিতার উদ্ধৃতি-‘এই যে কালিজিরার আইল দিয়ে খয়েরি বাছুরটিরে দৌড়ে নিয়ে যাও, আমি তার ঘাসফুলগুলো তুলে নিয়ে আসি। আমাদের হাঁসগুলো তোমাদের পুকুরেই থাকে। তোমাদের রাতাটিও দাপিয়ে বেড়ায় আমাদের বয়েসী উঠান। আমাদের দুধসাদা মুরগিটা মাঝেমধ্যে হয়ে যায় হাওয়া। খয়েরি বকনাটিকে গোসল করিয়ে দেই আর ভাবি-তুমি আজ গোসল করতে আসবে তো শানবাঁধানো ঘাটে! তোমাদের বাইর বাড়ির বাতি আলো দিয়ে ফর্সা করে আমাদের পথ। শিস দিয়ে ফিরে আসি বাড়ি। কসম, তুমিই আমার ফিরতি বাতাস যাকে আমি বুকে ভরে রাখি।‘

দ্বিতীয় ফর্দে এসে বলেন-

‘২ ॥ এ গ্রামের সব ঝিঙাফুল কেন যে তোমার বাড়ি সন্ধ্যা হলে ফোটে, আমি তার গোপন খবর কিছুই জানি না! এ কোন বাতিনি মন্ত্র তুমি জানো, হিজলের সব ফুল রাঙিয়ে রাখে তোমার ঘাটের একমাত্র সন্ধ্যাকালীন জল! আমি তার মারেফতি বুঝেও বুঝি না।‘

প্রথম স্তবকের পর আরো মনকে নাড়া দেয়া উচ্চারণ নড়ে চড়ে ওঠে। উদ্ধৃতি-

‘এ গ্রামের কতো ঘাট! কত কত সন্ধ্যা নামে সেই সব ঘাটে। অথচ এমন রাঙা আলো কেন যে তোমার ঘাটেই কেবল ফুটে ফুটে থাকে, এ মর্ম বুঝতে আমার কতটা কাল বসে বসে যাবে!‘

তৃতীয় ফর্দে কবির অপেক্ষা আরো দীর্ঘ হয়।বসে থাকেন আলুক্ষেতে,বাখরের ডোবায়।

‘৩ ॥ নিরলে পাহারা দেই রবিশস্যের মাঠ। আর গোপনে কামনা করি তোমার বকরি যেন খেতে আসে আমাদের আলুক্ষেত, বাখরের ডোবা।‘

কবি নিজেই জানেন না এ কোন ইচ্ছাদোষ।বর্ণনায় উঠে আসে নিরলস যত চাওয়া।

‘এ কোন ইচ্ছাদোষে কেবলি ঘুরে আসি মক্তবের মাঠ! কুয়াশাঘেরা পথের পানে চাই যদি বা বেরিয়ে আসো তুলে নিতে পেঁয়াজের পাতা, রাই সরষের শাক। যাবতীয় দুধউরি ভরে আছে তোমাদের ঝাড়। এতসব রাঙাশিম, লালসাদা বেগুনি উরির ঝাঁক তোমার হাতের স্পর্শে পরে থাকে মায়ার পোশাক।‘

কবির দেখা শেষ হয় না।পাওয়াও হয় না। আড়ালে বসে থাকেন কোনো এক কুহক টানে। উদ্ধৃতিতে স্পষ্ট হবে এর শিহরণÑযা  পাঠককে আলোড়িত করেই নয়,আচ্ছন্ন করে থাকে পাঠের পর পাঠ।কিন্তু এ কবিতার

উদ্ধৃতি গুলো এক সাথে যদি পড়ি,তাহলে যে  মেজাজ তৈরি হয়,তাকে স্পর্শ করা সহজ। যেমন-

‘দাওয়ায় বসে বিছরা ফেরত এই যে তুমি বেছে দিচ্ছ কলমির শাক আর তুলছ বিশেষ কণ্ঠভরা সুর, এই দৃশ্য দেখছি বসে কিছুটা আড়ালে। তোমার বাড়ির পাশে ভাঙাপুলে বসে। যে তুমি একটু পরে ঘাটে ফিরে যাবে, ধুয়ে আনবে সন্ধ্যাকালীন পা। সারাটা পথের ঘাস ফুটে রবে স্পর্শমায়া মেখে। আমি তাকে ছুঁবো বলে এ সন্ধ্যাকে আরো সন্ধ্যা হতে বলি।‘

৪ ॥

‘তোমার বাড়ির পাশে দেখা হল আধফোটা আলো। তুমি যতসব খুদ পানা গেল বর্ষায় দিয়েছ আদর মেখে, শামুক আর ঝিনুক যত দিয়েছ তাদের স্নেহমাখা হাতে, তারা আজ কাটছে সাঁতার আমাদের ঝিলে।

এই রাঙ্গাদৃশ্য চোখে বেঁধে বসে আছি তোমার চুড়ির শব্দ মর্মে গেঁথে ফিরব বলে বাড়ি। কী সুরেলা ধ্বনি বর্ষিত হবে ঝিলরাঙানো ডাকে! সুপারিরাঙা ঠোঁটে, অবাধ্য শাড়ি সামলাতে সামলাতে যে তুমি আড়চোখে দিয়ে যাবে ডাক, কী সাধ্য আছে আমার ছায়া হয়ে ফিরে যাই এইসব হাঁসেদের ঝাঁকে!’

৫ ॥

‘ফিনফিনে হাওয়া আসে। নড়ে ওঠে শিমুলের ডাল। করইয়ের বিচি। তোমার ঘরের ছাদে, জানলার পাশে, এ কোন ধ্বনিমায়া বেজে ওঠে রোজ-।‘

আমি বনেলা ঘাসের মাঝে বসে বসে গায়ে মাখি তোমার জানলা হয়ে ফিরে আসা আধুনিক সুর। তোমার জানলা বুঝি বুঝে গেছে ‘. . .।‘

৬ ॥

খালের ওপর সতর্ক যে বাঁশের হাকম, সে যেন পাহারা দেয় তোমার চলার। তার নিচে পানাফুল, দারকিন্দা মাছেদের নিত্য যাতায়াত . . .।

এখানে আসে না মাছ আমি তবু রোজ রোজ জাল ফেলে রাখি। যদি তুমি বড়শি বাইতে নেমে আসো কোনো এক বিকালবেলার ঘাটে, আমি তবে যাবতীয় মাছের আধার নিয়ে তৈরি হয়ে রবো।

৭ ॥

আশ্বিনের বিকাল বুঝি এমনই হয়! কিছুটা উদাসী করে মন। এই যে বসেছি এসে পশ্চিমের বন্দে। খালের কিনার ঘেঁষে। পায়ে হাঁটা পথে। চারপাশে ফসলের মাঠ। কুয়াশার জাল. . .কেউ বা নাইওরি নিয়ে ফিরে আসে বাড়ি। কাপড়ে আড়াল করা রিঙহুডে ঘর ফিরতি নববধূ করে যায় সন্ধ্যাকে আড়াল।

এই সব দৃশ্যকথা দেখি আর ভাবি-এই যে নামল সন্ধ্যা আমাদের গাঁয়, তোমার ঘরের পাশে যতসব জোনাক পোকা করে যাবে গান, আমি তাদের আলোকসম তোমার চোখের তারায় যেন ভিজে উঠি রাতের সাহসে।

৮ ॥

জারা জামিরের গাছগুলো কেন যে তোমার পাকঘরের জানলা ঘেঁষে থাকে, কেন যে জানলা খুলে দাও তুমি ছালনে বাগার-এমন মায়াবী শব্দে তেলের কড়াইয়ে ঢাল রসুনের বাটা, বাজার ফিরতি মানুষেরা রান্নার সুগন্ধী মেখে করে যায় তোমার হাতের কেবলি সুনাম! কেন যে তোমার পাকঘর তিন গেরামের পথের পাশে হল!

আমিও গোপনে গোপনে বাজার ফিরতি কোলাহল মেখে তোমার কথাই ভাবি, আর তোমার জানলায় টোকা মারার অসীম সাহস বুকে বেঁধে রাখি। কোনো এক মধ্যরাতে হাওয়া নয় ঠিক ঠিক আমি দেখো সব কিছু তুচ্ছ করে দিয়ে উঠবো শিস। তোমার ঘরের কোণে। শ্রাবণের রাতে।’

আমার এ আলোচনায় ‘পড়শিনী‘ কবিতার সব ফর্দগুলোই উদ্ধৃত করতে হয়েছে। কেন এমন বেহিসেবী পাঠক আমি? কেননা,কবিতার ভেতরে যে মঞ্জুরিত উন্মনা চিত্র,শব্দ আর বাক্যের কারুকাজ রয়েছে তা ব্যাপক উদ্ধৃতি ছাড়া উপলদ্ধি করা আমার সাধ্যের বাইরে। উদ্ধৃতি থেকে স্বর্ণময় কথন নিয়ে যদি আরো কিছু নক্ষত্রকে ধরতে চাই, তাহলে কেমন হয়?

প্রথম স্তবকে ছত্রটি অতি সহজ অথচ পাঠকের বুকের মাঝে উচাটন সৃষ্টি করে।  ছত্রটি- ‘কসম, তুমিই আমার ফিরতি বাতাস যাকে আমি বুকে ভরে রাখি।‘ কবির কাছে প্রেমিকার যে কোনো দৃশ্য বা অদৃশ্য অধিবাসই হয়ে ওঠে কবির বাড়ি ফেরার উপাদান। আর এ উপাদান ‘ফিরতি বাতাস‘ বুকে ধরে রাখেন। যেন মহান কোনো প্রাপ্তি,ধন।

এরপর ‘আমাদের বয়েসী উঠান‘। জন্মের পর থেকে যে উঠান কবির জীবনের সাথে লেপ্টে আছে,তার বর্ণনা এখানে যেন এক আলোর ছটা।

কবি  অভিভূত হন,দয়িতার বাড়িতে দেখেন গ্রামের সব ঝিঙেফুল যেন ফুটে। আসলেই কি তাই? হয়তো না,বাস্তবে ফোটে না। কিন্তু কবির অর্ন্তদৃষ্টিতে ফোটে।ভাবেন প্রকৃতির  কোনো গোপন ইশারায় এসব ঘটে।

 ‘গ্রামের সব ঝিঙাফুল কেন যে তোমার বাড়ি সন্ধ্যা হলে ফোটে, আমি তার গোপন খবর কিছুই জানি না!‘

এ গোপন খবর না জানার পরেই কবির আরো বিস্ময়। কবি দেখেন হিজলের সব ফুল রাঙিয়ে রাখে দয়িতার ঘাটের সান্ধ্যকালীন জল। কবির কল্পনার গভীরতা, অনুভুতির ধার এতোই বিস্ময়য়মাখা পাঠকও বিস্মিত না হয়ে পারেন না।

বর্ণনাটি এ রকম-‘এ কোন বাতিনি মন্ত্র তুমি জানো, হিজলের সব ফুল রাঙিয়ে রাখে তোমার ঘাটের একমাত্র সন্ধ্যাকালীন জল! আমি তার মারেফতি বুঝেও বুঝি না।‘

কবি আরো আলোড়িত কথা বলেন-‘এমন রাঙা আলো কেন যে তোমার ঘাটেই কেবল ফুটে ফুটে থাকে, এ মর্ম বুঝতে আমার কতটা কাল বসে বসে যাবে!‘

কবি এতো আত্মমগ্ন, প্রেমের টানে অস্থির- কামনা করেন দয়িতার বকরি যেন আসে আলুক্ষেতে,বাখরের ডোবায়‘। সেই সঙ্গে বকরিকে নিতে যদি আসে সেই প্রিয়তমা,তাহলে দেখা তো হবেই। ছত্রটি-‘গোপনে কামনা করি তোমার বকরি যেন খেতে আসে আমাদের আলুক্ষেত, বাখরের ডোবা।‘

 হাটের বা হাটে যাওয়ার রাস্তার পাশে প্রেমিকার বাড়ি। পথে যাওয়া মানুষ রান্নার সুগন্ধে বিভোর হয়। এই ছত্রাংশটি উদ্ধৃত করলেই বুঝা যােেব এর শক্তি। ‘বাজার ফিরতি মানুষেরা রান্নার সুগন্ধী মেখে করে যায় তোমার হাতের কেবলি সুনাম!‘

এই সুগন্ধী সুনাম কবিকেও ঘুমোতে দেয় না। সুগন্ধী সুনামের নাম যদি হয় প্রেম,প্রাণের নিকষিত হেম-তাকে কী করে বিচ্ছিন্ন ভাবা যায়! কবি ভেবেই চলেন- হিজলের ফুল, ঘাটে ফুটে ওঠা রাঙা আলো আর বাখরের ডোবায় কার জন্যে যেন গোপন বাসনা-প্রার্থনা হয়ে ওঠে।