কবি শুভেন্দু ইমাম: এক আপসহীন সাহিত্য সখা

1822

।। হামিদ মোহাম্মদ ।।

নিজে দু‘লাইন শুদ্ধ লেখা এবং অন্যকেও শুদ্ধ লেখায় অনুপ্রাণিত করা শুভেন্দু ইমামের জুড়ি কম বা মেলা ভার। এটা  আমার কথা নয়-সিলেটের অনেক বিদগ্ধজনেরই কথা। সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতে সৃষ্টিশীল  শুভ্র চেষ্টা এতোটা-ই তীব্র এবং ধারালো,-তার মতো সজাগ কতজন আছেন, জানা নেই। ১৯৮১ থেকে ২০১৭ দীর্ঘ পদচারনায় শুভেন্দু ইমাম এমনি এক  শুভ্র সৃষ্টিশীল জগত বুকের মাঝে লালন করা মানুষ-যিনি শুধু সিলেটে সীমাবদ্ধ না-থেকে বড়ো পরিসরে আলোচিত হওয়ার যোগ্য। কিন্তু শুভেন্দু ইমাম নিতান্ত-ই প্রচার বিমুখ একজন সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাধক। তাকে নিয়ে মাতামাতি  খুব একটা পছন্দ করেন না। কিন্তু সকলেরই সখা শুভেন্দু ইমাম।

গত বছর ২০১৬ সালের গোড়ার দিকে, সহসা  লন্ডনে উতকণ্ঠিত খবর ছুটে আসে-শুভেন্দু ইমাম স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন। হাসপাতালে শয্যাশায়ী। লন্ডনে তার অনেক সুহৃদ-বন্ধু,পরিবারের সদস্য, স্বজন টেলিফোনের পর টেলিফোন করছেন দেশে। চিকিতসার খোঁজ খবর নিচ্ছেন প্রতিদিন। আমিও খবর নিতে বার বার ফোন করেছি পাশে থাকা তার ডাক্তার পুত্র,জীবন সাথী রাহী ইমামের কাছে। দীর্ঘ চিকিতসার পর রক্ত-মাংশের শুভেন্দু ইমামকে আমরা ফিরে পেয়েছি,সুস্থ হয়েই ঘরে ফিরেছেন।

 যেহেতু, বিলেতে অনেক দূরে পরবাসী হয়ে আছি, চাইলেই দূরত্ব গোছানো যায় না,তাই মাঝে মাঝে টেলিফোনে কথা হয় শুভেন্দু ইমামের সাথে। এক সময় রাতকে দিন করে আলো আর আঁধারে ছিলাম  একে অন্যের সাথী।

৭২ থেকে ৭৪ সাল সরকারি মুরারীচাঁদ উচ্চমাধ্যমিক মহাবিদ্যালয় বর্তমান ‘সিলেট সরকারি কলেজ‘এ অধ্যয়নকালে সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে নানা আলোচনার মাধ্যমে শুভেন্দু ইমাম ও আমার মধ্যে- দুজন বন্ধু হওয়ার  চেনাজানা শুরু। একই হোস্টেলের আবাসিক ছাত্র ছিলাম আমরা। সুতরাং কাছকাছি থাকার সুযোগটাই আরো কাছাকাছি এনে দেয় দুজনকে।

এরপর আজ পর্যন্ত চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে কোনো দিন বিচ্ছিন্ন হইনি। কিন্তু ব্যক্তিগত অনেক বিষয়ে বিভিন্ন সময় মতান্তরও হয়েছে। অথচ,বন্ধন অটুটই থেকেছে,দৃষ্টিভঙ্গির হেরফের হয়নি।

১৯৭৫ সালে মো. আবদুল হান্নান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে শুভেন্দু ইমাম নামে প্রথাবিরোধী লেখালেখি শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর সমাজ বদলের হাওয়ায় তাড়িত তরুণ সমাজ। নিজেকে বদলে ফেলার তীব্র আকাঙ্খা মো. আবদুল হান্নানকেও তখন আলোড়িত করে। ফ্রয়েড,বোদলেয়ার ও জাঁপল সার্ত্র-এর মতো বিশ্বনন্দিত দার্শনিক ও চিন্তকদের  চিন্তা  মগজে জাগ্রত। মার্কস, এঙ্গেলস, মাও এবং ফিদেলের ধ্যান ও সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রাম তরুণ সমাজের  মধ্যে স্বপ্ন নয়,বাস্তবেও উপস্থিত।

এসব দর্শন ও  সংগ্রামকে অগ্রসর করার চিন্তা নিয়ে সদ্য স্বাধীন হওয়া  বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ভাবিত। এমনি ঘোরলাগা দিনে  ১৯৭৭ সালে  মো. আবদুল হান্নান আমার কাছে চিঠি লিখলেন  কবিতা চেয়ে।

‘চিতকার‘ নামে কবিতাপত্র বের করছেন,সঙ্গে আছেন কবি আবু বকর সিদ্দিক,কবি নাসিমা সুলতানা, জাফর তালুকদারসহ তরুণ কবিরা। পত্র যোগাযোগ ছিলো তখন একমাত্র তৃপ্তিদায়ক মাধ্যম। নিয়মিত এ যোগাযোগ ছিলো আমাদের মধ্যে। কবিতা পাঠালাম। মাসখানেক পরে চিতকার এলো মুদ্রিত হয়ে। প্রচ্ছদে হাফ ডজন যুবকের আড্ডার অদ্ভুত এক ছবি। কয়েকজোড়া জুতোশুদ্ধ পদ এলোমেলোভাবে  টি-টেবিলের ওপর । আর ভেতরের কবিতায় সৃষ্টির উন্মাদনা। এ অসাধারণ সংকলনটি কী যে ভালো লাগলো ।এরপর  চিতকার দুতিন সংখ্যা বেরিয়েছিলো। সব সংখ্যাই ব্যতিক্রমী।IMG_1791 1

শুভেন্দু ইমাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়েন অনার্স শেষ করে সম্ভবত ৭৮ সালে। আরো বড়ো পরিসরে জীবনকে পল্লবিত করতে ছুটে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভর্তি হন এম এ শেষ বর্ষে। এর মধ্যে কবি শুভেন্দু ইমাম কবিতা লেখা কমিয়ে দিলেন। ইতোমধ্যে তাঁর  সৃষ্টি-সন্ধানি  ভাবনা জগত দখল ও  মোহগ্রস্ত করেছেন প্রিয় শিক্ষক গল্পকার হাসান আজিজুল হক,শীর্ষেন্দু,শিবনারায়ণ রায় ও হূমায়ূন  আজাদের মতো প-িতজন।

কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা নিয়ে তাঁর অসাধারণ চিঠি, শিবনারায়ণ রায়ের মুগ্ধকরা অভিজ্ঞানধর্মী বক্তৃতার সারমর্ম ঋদ্ধ তার লেখা পত্রসমূহ তখন আমার চোখকেও খুলতে  সহায়ক হয়। বিশ্ববীক্ষা ও বিশ্বসাহিত্য পাঠে শুভেন্দু ইমামের আগ্রহ অপ্রতিদ্বন্ধী। এ ধরনের অনুসন্ধানি ও পাঠক্রিয়া সমৃদ্ধ শুভেন্দু ইমামের কয়েকটি পত্র আমার লেখা ‘শিকড়ের দিনগুলি ও অন্যান্য‘ বইয়ে মুদ্রিত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ শেষে ১৯৮১ সালে শুভেন্দু ইমাম আসেন সিলেটে। কর্মক্ষেত্র এবং  কিছু করার তাগিদ থেকে নিজের শহর হিশেবে সিলেটকে বেছে নেন। অল্পদিনেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পাকাপোক্ত করেন নিজের অবস্থান। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ দেশে সামরিক শাসন জারি হয়। দেশে সামরিক শাসন জারি ও সামরিক শাসনের প্রচ্ছন্ন  প্রশ্রয় এবং এর ছায়াতলে মৌলবাদের  উত্থান  পীড়িত করে আমাদের। মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধে যুক্ত  জামায়াতে ইসলামী দলের সক্রিয় হয়ে ওঠার নিরাপদ ক্ষেত্রও তৈরি হয় এ সময়। সাপ্তাহিক  যুগভেরীতে সাহিত্য পাতা দেখা ও আমার কাজ করার সুবাদে সাহিত্য সংস্কৃতিকর্মীদের আড্ডা বসতো নিয়মিত। আর এ আড্ডা থেকেই আমরা একজোট হলাম প্রতিবাদী সংগঠন শিকড় সংস্কৃতি চক্র গড়ে তোলার। পূর্ব পীর মহল্লার আফতাব হোসেইনের বাসায় ১৯৮৩ সালের ১ জানুয়ারি এক সংক্ষিপ্ত বৈঠকে শিকড় যাত্রা শুরু করে। শুভেন্দু ইমাম সভাপতি ও হামিদ মোহাম্মদ সেক্রেটারি এবং অন্যান্য কুড়ি জনের মতো  সংস্কৃতিকর্মী, কবি ও  লেখক  সংগঠনের সদস্য।

সিলেটের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মৃয়মান প্রগতিশীল ধারাকে জাগ্রত করা, মৌলবাদের উত্থানকে রুখে দাঁড়ানো,অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশসহ নতুন সংগ্রামী ধারার  শুরু হয় শিকড়ের প্রতিটি কার্যক্রমে।শিকড়ের প্রতিবাদী ও সংগ্রামী অনুষ্ঠান সমূহের ব্যাপকতায় সিলেটের সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতে  জামায়াত সমর্থিত ও পরিচালিত তখনকার বিভিন্ন সংগঠনের আধিপত্য খর্ব হতে শুরু করে। রাজনৈতিক দল সমূহ তখন সামরিক শাসনের বিধিনিষিধের কারণে নির্জীব, কর্মী ও নেতারা আত্মগোপনে। শিকড় রাজনৈতিক দলসমূহকে জাগ্রত ও যুক্ত করে প্রতিবাদী কার্যক্রমে। এতে সামরিক শাসনের ছত্রছায়ায়  গজিয়ে ওঠা দালাল শ্রেণী ও জামায়াতে ইসলামসহ মৌলবাদী সংগঠনগুলো অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। শিকড়ের নিয়মিত কার্যক্রমে মৌলবাদ ও সামরিক শাসন বিরোধী  যে চেতনার বীজ রোপিত হয় তা ৯০ এর গণঅভুত্থানে রাজনৈতিক দল সমূহের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শক্তি যোগায়।

অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল- ‘স্বৈরাচার বিরোধী কবিতা পাঠের আসর‘ মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী স্বরচিত কবিতা ও আবৃত্তি‘, ‘১৪ ফেব্রুয়ারির ছাত্র আন্দোলন ও পরবর্তী রাজিনীতির গতিধারা‘ সেমিনার‘ ও ‘প্রতিবাদের কবিতা‘ ইত্যাদি।এছাড়া প্রতিবাদী কবিতা ও বিভিন্ন মননশীল রচনা সমৃদ্ধ ‘শিকড়‘ সংকলন সংগঠনের পক্ষ থেকে নিয়মিত কয়েক বছর প্রকাশিত হতে থাকে। যে সংকলনগুলো সুধীমহলের পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে। বলা অধিক হবে না, সিলেটে আবৃত্তিকে জনপ্রিয় ও  শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে শিকড় অগ্রনী ভুমিকা পালন করে। এই স্রোতধারায়  সিলেটে চর্চা বৃদ্ধি পায়,বহু  সংখ্যক আবৃত্তি সংগঠন গড়ে ওঠে এবং অনেক আবৃত্তিশিল্পী জাতীয় ক্ষেত্রেও সুনাম লাভ করেন ।

এরই মধ্যে সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমীর কারচারাল অফিসার হিশেবে শুভেন্দু ইমাম যোগদান করেন। শিল্পকলা একাডেমীর কার্যক্রম ইতোপূর্বে  সীমাবদ্ধ ছিলো সরকারি বড়কর্তাদের সফরকালিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন ও তাদের মনোরঞ্জনদান। কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর হাতে ছিলো এর পরিচালনা কমিটি। সরকার এ সময় দেশব্যাপী  শিল্পকলা একাডেমী সমূহের নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের ঘোষণা দিলে শুভেন্দু ইমাম কায়েমী স্বার্থবাদীদের খপ্পর থেকে শিল্পকলা একাডেমীকে উদ্ধারের পদক্ষেপ নেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের  যুক্ত করতে কৌশলে কাজ শুরু করেন। এখানেও শিকড়ের কর্মীরা  প্রগতিশীল লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীদের সমবেত করতে উদ্যোগী হয়। উদীচী,খেলাঘরসহ সমমনা সংগঠনগুলো এতোদিন অলিখিতভাবে শিল্পকলা একাডেমীর কার্যক্রমে নিষিদ্ধ ছিলো। আমাদের উদ্যোগে  প্রগতিশীল সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্য থেকে নতুন সদস্য সংগ্রহের অভিযান চলে। সদস্য সংখ্যা, মেধা,শক্তি ও সামর্থ্য সঞ্চয়ের  মাধ্যমে কমিটির  নির্বাচনে  শিল্পকলা একাডেমীর পূর্ণ প্যানেলে প্রগতিশীল সংস্কৃতিকর্মীদের কর্মীদের বিজয়ী করা সম্ভব হয়। এ সময়  নেপথ্যে শুভেন্দু ইমাম কাজ করেন এবং  প্রকাশ্যে, বিশেষত সক্রিয়ভাবে প্যানেলভুক্ত হয়ে প্যানেলকে জিতিয়ে আনতে প্রফেসর বাহাউদ্দিন জাকারিয়া, সংস্কৃতিকর্মী মাহবুব আহসান চৌধুরী, সামসুল আলম ও হামিদ মোহাম্মদ অন্যতম ভূমিকা রাখেন।

প্রফেসর বাহাউদ্দিন জাকারিয়া সেক্রেটারি মনোনীত হন। প্রফেসর জাকারিয়ার নেতৃত্বে এবং শুভেন্দু ইমামের কর্মোদ্যোগে বাংলার লোকসংস্কৃতি, বাউলধারা ও ঐতিহ্যিক শিল্পচর্চা এবং শুদ্ধসঙ্গীতধারার বিকাশের লক্ষ্যে শিল্পকলার নিয়মিত অনুষ্ঠানমালার আয়োজন নতুন প্রেরণার সঞ্চার করে। নৃত্যকলা, নৃত্যনাট্য,পঞ্চকবির গান,খেয়াল ঠুমরি,আবৃত্তি চর্চার নতুন ধারার সূচনা হয়। ধীরে ধীরে  শিল্পকলা একাডেমী হয়ে ওঠে প্রজ্ঞাবানদের  লীলাক্ষেত্র, সৃজনশীলতার চারণভূমি। নতুন নতুন শিল্পী তৈরী হতে থাকে। এই ধারাবাহিকতায় সিলেটে বহু সংখ্যক সাংস্কৃতিক ও নাট্য-নৃত্যকলা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। দেশের সর্বত্র সিলেটের সুনাম বৃদ্ধি পেতে থাকে। বর্তমানে  সিলেটকে যে সুস্থ  শিল্পচর্চার ক্ষেত্র হিশেবে মনে করা হয়, এর মূলে শুভেন্দু ইমামের অবদান অসামান্য। শুদ্ধ, সুস্থ এবং মানসম্মত সাংস্কৃতিক যে কোনো আয়োজনে আপস করেননি বলেই সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সিলেটের এই  বিশেষত্ব।

এদিকে, শিল্পকলা একাডেমীর সরকারি  চাকরি হওয়ায় ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠনের সাথে প্রকাশ্যে যুক্ত থাকতে না-পারলেও নেপথ্যে কোনো কোনোটির নিষ্ঠাবান কর্মী ছিলেন শুভেন্দু ইমাম। উদীচী ও শিকড় তাঁর নিষ্ঠা ও কর্ম থেকেই নিয়মিত উদ্দীপনা পেয়েছে।

কবি শুভেন্দু ইমামের বড় কাজগুলোর মধ্যে সিলেটের লোক সংস্কৃতি বিকাশে অপরিসীম অবদান। বাউল কবি শাহ আবদুল করিমকে সাধারণ থেকে নাগরিক ঘরানায় নিয়ে আসা-এ রকম একটি বিরল কাজ। শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে লেখালেখি,বিভিন্ন প্রণোদনা,গানের বই প্রকাশ ও উতকৃষ্ট মানের আলোচনার মাধ্যমে তার কর্ম ও স্বকীয়তাকে তুলে ধরা এবং পরিচিত করা উল্লেখ্যযোগ্য।  দিরািই উপজেলার ‘উজান ধল‘ শাহ আবদুল করিমের জন্মগ্রাম। উজানধলে  ‘আবদুল করিম জন্ম উতসব পালন‘ শুরু করার মূল প্রস্তাবক ও বাস্তবায়নে প্রধান উদ্যোগী ভুমিকা পালন করেন শুভেন্দু ইমাম। সিলেটেও শাহ আবদুল  করিম উতসব নিয়মিত তারই হাতধরে উদযাপিত হয়ে আসছে।  এসব কর্মযজ্ঞের প্রেক্ষিতে একজন অন্তরালের বাউল কবি শাহ আবদুল করিমের একুশে পদক লাভ করতে সহায়ক হয়। দেশে বিদেশে শাহ আবদুল করিম পরিচিতি পান শুধু বাউল নন, একজন মানবতাবাদী দার্শনিক কবিও,তাঁর  বহুবিধ  খ্যাতি বৃদ্ধি পায়। শুভেন্দু ইমামের কর্মশীলতা দেখলে মনে হবে,শাহ আবদুল করিম ছাড়াও  অন্যান্য বাউল কবিদের গান ও সৃষ্টিকে নাগরিক, শিক্ষিত জনের গোচরে নিয়ে আসা,বিকশিত করা যেন শুভেন্দু ইমামের  কাজ। সৃজনশীল সংস্কৃতি চর্চায়  অবদান রাখার ক্ষেত্রে তাই তাঁর জুড়ি নেই।

শুভেন্দু ইমাম নামটিও সাংস্কৃতিক কাজ করতে সরকারি চাকরিজীবীর ক্ষেত্রে তাঁর অনেকটা সহায়ক ছিলো। সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দুই নামেই পরিচিত। তবে মূল নামটির বদলে  শুভেন্দু ইমাম নামটি সাহিত্য সংস্কৃতিবানদের প্রিয় হয়ে ওঠে।

এখনো,একটি ক্ষেত্রে শুভেন্দু ইমামের বিকল্প সিলেটে বর্তমানে নেই বললেই চলে। ক্ষেত্রটি হলো পুস্তক বা বই সম্পাদনা। গত কুড়ি বছরে  যে সমস্ত উন্নতমানের  গ্রন্থ সিলেট থেকে বেরিয়েছে সবগুলোতেই তাঁর আপসহীন সম্পাদনার পরশ যুক্ত। শুদ্ধ,উন্নত ও আধুনিক ভাষার কারিগর শুভেন্দু ইমাম। শুদ্ধ ভাষা  ব্যবহারে তাকে আপস করতে কেউ দেখেনি। নির্ভুল বই  মুদ্রনের জন্যও তাঁর দক্ষতাকে কাজে লাগাতে অনেকেই উদগ্রীব থাকেন।

২০১৭ একুশে বই মেলায় শুভেন্দু ইমামের লেখা ‘লালন প্রসঙ্গ‘ তীক্ষ্ন‘ চিন্তার প্রক্ষেপণ ঋদ্ধ  একটি বই বেরিয়েছে-যে বইটি তার দীর্ঘ দিনের পড়া ও সাধনার ফল।

তবে, ১৯৮৬ সালে একমাত্র কবিতার বই‘তোমার উদ্ধার নেই‘ প্রকাশিত হয়। বইটি পাঠকপ্রিয়তা পেলেও শুভেন্দু ইমাম কেন যেন কবিতা লেখা বা অন্য লেখালেখিও থামিয়ে দেন। অনেক দিন পর ২০১০ সালে-‘শাহ আবদুল করিম পাঠ ও পাঠকৃতি‘ শুভেন্দু ইমামের সম্পাদনা  বের হয়। এতে অনন্য বীক্ষা সমৃদ্ধ দীর্ঘ  ভূমিকা লেখেন শুভেন্দু ইমাম।এছাড়া  সিলেট বিভাগ কর্তৃপক্ষের  উদ্যোগে শাহ আবদুল করিমের লেখা গান নিয়ে ‘শাহ আবদুল করিম রচনা সমগ্র‘ বের হয় ২০০৯ সালে। এ গ্রন্থখানা প্রকাশনায়  শুভেন্দু  ইমামের যত্ন, নির্দেশনা ও সহযোগিতা ছিল উল্লেখ করার মতো।এ গ্রন্থের গান সংকলন ও গ্রন্থনে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

এর আগে, ১৯৯৭ ও ২০০৬ সালে ‘বৃহত্তর সিলেটের ইতিহাস‘দু‘খন্ড প্রকাশিত হয়। এ দু খন্ড ইতিহাস গ্রন্থ প্রকাশনার ক্ষেত্রে মূলত শুভেন্দু ইমামের প্রাণদ কর্মপ্রচেষ্টাই ছিল সর্বাধিক। অন্যতম সম্পাদক হিসেবেও তার দায়িত্ব তখন আরো বেড়ে যায়। ইতিহাস চর্চা ও  গবেষণার ক্ষেত্রে অনেকের কাছেই  এ দুটি গ্রন্থ বহুল আদৃত  একটি আকর গ্রন্থ।IMG_1787 1

শুভেন্দু ইমাম আরো অনেক কিছু,অনেক বিষয়ের নিরব প্রণোদনা দিয়ে সমৃদ্ধ করছেন সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে। আপসহীন শুভেন্দু ইমামের মনের মাঝে উতকৃষ্ট ও মানসম্মত বইয়ের তৃষ্ণা ছিল চিরাচরিত। এই তৃষ্ণা থেকেই সিলেটে ‘বইপত্র‘ নামে মানসম্মত বইয়ের দোকান প্রতিষ্ঠা করেন।  ইমদাদুল হকের মত জনপ্রিয় লেখকের বই বিক্রি করেন না। যদিও এই  ধরনের জনপ্রিয় লেখকদের বই রাখলে কামাই হতো বেশি। কিন্তু টাকা কামাই নয়,জ্ঞান বিতরণ ছিল মূল উদ্দেশ্য। এমন কি পাইরেসি বইও বিক্রি হয় না ‘বইপত্র‘এ। কবি শামসু রাহমান,কবি মোহাম্মদ রফিক ‘বইপত্র‘এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেছিলেন-ঢাকা কেন পশ্চিম বঙ্গেও এতো মননশীল বইয়ের দোকান নেই। তারা সিলেটে এলে মুগ্ধ হয়ে অনেক দুর্লভ বই এখান থেকে  কিনেছেন।তাই, যারা জানেন তাকে,যারা তার ছড়ানো আলোয় স্নিগ্ধ হয়েছেন,তারা সকলেই বলবেন – শুভেন্দু ইমাম, এক আপসহীন সাহিত্য সখা।

১৬ জুন ২০১৭,লন্ডন।