ভারতে চলমান ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ আন্দোলনের দিনপঞ্জি

78

লিখেছেনঃ আনিস রায়হান

নিখিল ভারত উত্তাল। উত্তাপ এতটাই যে, অনেক আগেই তার আঁচ দেশের সীমা ছাড়িয়েছে। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে সূচিত ‘জাতীয়তাবাদবিরোধী আন্দোলন’ এখন সারা ভারতে ঘাঁটি গেড়েছে। কাশ্মীরে ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণ এবং কাশ্মীরীদের ওপর অন্যায়, নিপীড়নের বিপরীতে ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ এক সমাবেশ ডাকাকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলনের বিস্তার। আন্দোলনের ন্যায্যতা নিয়ে জাতীয়তাবাদী মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে। চলছে পাল্টা প্রতিবাদ! সারা ভারতকে বিভক্ত করে দেয়া এই আন্দোলন কেন, গোড়া থেকে বাস্তবে কী ঘটেছে, তা তুলে ধরতেই এই দিনপঞ্জি।

প্রেক্ষাপট : ২০০১ সালে দিল্লিতে পার্লামেন্ট ভবনের ওপর সন্ত্রাসী হামলার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার দায়ে আফজাল গুরুকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। ওই হামলায় ছয় জন নিরাপত্তা রক্ষী এবং এবং পার্লামেন্টের বাগানের এক মালি নিহত হন। একই সঙ্গে মারা যান হামলাকারী পাঁচ জঙ্গি। অবশ্য বিচার চলাকালে আফজাল গুরু দাবি করেছিলেন, তিনি ওই হামলার সঙ্গে যুক্ত নন। এও জানিয়েছিলেন যে, ভারত কর্তৃক কাশ্মীর শাসন তার চোখে অনৈতিক। তিনি কাশ্মীরের স্বাধীনতা প্রত্যাশা করেন। ভারত সরকারের চোখে জঙ্গি এমন কারও কারও সঙ্গে পরিচয় থাকার কথাও স্বীকার করেন তিনি।

ভারতের মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মীরা এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে বামপন্থি, বিশেষত মাওবাদীরা আফজাল গুরুর দীর্ঘ আটকাদেশ, বিচারপ্রক্রিয়া ও ফাঁসির বিরোধিতা করে। আফজাল গুরুর ফাঁসিকে তারা একটি ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবেই দেখে। আফজাল গুরুর গ্রেফতার, বিচারপ্রক্রিয়া ও দণ্ড ঘোষণা, সবক্ষেত্রেই আইনের খেলাফ দেখতে পান তারা। পার্লামেন্ট হামলার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এনকাউন্টার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য কুখ্যাত দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল দাবি করে যে, তারা ঘটনার আসল পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে পেয়েছে। এ ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে ১৫ ডিসেম্বর দিল্লি থেকে অধ্যাপক এস এ আর গিলানি, কাশ্মীরের শ্রীনগর থেকে শওকত গুরু ও তার চাচাতো ভাই আফজাল গুরুকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর গ্রেফতার করা হয় শওকতের স্ত্রী আফসান গুরুকে।

পার্লামেন্টে হামলার ঘটনা ভারতে এতটা উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল যে, আফজাল গুরুর সপক্ষে কোনো আইনজীবী পাওয়া যায়নি, এটা ছিল ভারত সরকারের ভাষ্য। তাই তার কোনো আইনজীবী ছিল না। আদালত এক জুনিয়র আইনজীবীকে নিয়োগ দিলেও তিনি একটিবারের জন্যও আফজাল গুরুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। আফজালের সমর্থনে কোনো সাক্ষীকেও হাজির করা হয়নি। তার হয়ে কেউ রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের জেরাও করেনি। দীর্ঘ ১২ বছর তিনি দিল্লির তিহার জেলে কঠিন প্রহরার মধ্যে নিঃসঙ্গ জীবন কাটান। ২০০৫ সালের ৫ আগস্ট রায়ে সুপ্রিমকোর্ট আফজাল গুরুকে তিনবার যাবজ্জীবন ও দুইবার মৃত্যুদণ্ড দেয়। শওকতের সাজা হয় ১০ বছরের, বাকিরা আগেই খালাস পান।

ঐতিহাসিক ওই রায়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট স্বীকৃতি দেন যে, আফজাল গুরুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ করা যায়নি। আদালত বলেন, ‘এই মামলাকে ঘিরে অনেক ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও বলতে হয়, এতে অপরাধ সংঘটনের সপক্ষে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।’ আরও বলা হয়, ‘ওই ঘটনায় বিপুলসংখ্যক হতাহত এবং এতে গোটা জাতি আলোড়িত হয়েছে। সমাজের সম্মিলিত বিবেক সন্তুষ্ট হবে যদি অভিযুক্তকে ফাঁসি দেয়া হয়।’ (‘As is the case with most conspiracies, there is and could be no evidence amounting to criminal conspiracy… The incident, which resulted in heavy casualties, had shaken the entire nation, and the collective conscience of society will only be satisfied if capital punishment is awarded to the offender.’) আফজাল গুরু ফাঁসি কার্যকরের আগে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগও পাননি। দিল্লি পুলিশ চিঠি পাঠানোর কথা বলে, তবে সেই চিঠি কারও হাতে আদৌ পৌঁছেছে কিনা তার খোঁজ তারা নেয়নি। আফজালের মৃতদেহ তার পরিবারকে দেওয়া হয়নি। তাকে তিহার কারাগার চত্বরে দাফন করা হয়।

বিচারের পুরো সময় ধরে আফজাল গুরুর পাশে ছিল কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় ফাঁসি কার্যকরের দিন থেকে পূর্ব সতর্কতা হিসেবে কাশ্মীরের দশটি জেলায় কারফিউ জারি করা হয়। কিছু এলাকার ক্যাবল টেলিভিশন ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় নিরাপত্তা বাহিনী। সরকারি আশঙ্কাকে সত্যি প্রমাণ করে টানা কয়েকদিন বিক্ষোভে উত্তাল থাকে পুরো কাশ্মীর।

 

০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ : এ বছরের ০৯ ফেব্রুয়ারি আফজাল গুরুর নামের সঙ্গে জড়িয়ে যায় দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথম সারির এই বিশ্ববিদ্যালয়টি সারা ভারতে প্রগতিশীল আন্দোলন ও বামপন্থিদের পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত। ঘটনার সূত্রপাত মাওবাদীদের আশীর্বাদপুষ্ট ছাত্র সংগঠন ডেমোক্র্যাটিক স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (ডিএসইউ) ডাকা প্রতিবাদ সমাবেশকে কেন্দ্র করে। আফজাল গুরুর তৃতীয় হত্যাবার্ষিকীতে তার ফাঁসির প্রতিবাদে ‘দ্য কান্ট্রি উইদাউট পোস্ট অফিস’ শিরোনামে এক প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সমাবেশ আহ্বান করে তারা। কিন্তু বিজেপির ছাত্র সংগঠন অখীল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে নালিশ জানায় জঙ্গির পক্ষে সমাবেশ বন্ধ করার জন্য। সমাবেশ শুরুর ২০ মিনিট আগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সমাবেশের অনুমতি প্রত্যাহার করে নেন। এ সময় ডিএসইউর নেতা উমর খালিদ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের কার্যালয়ে গিয়ে সভাপতি কানহাইয়া কুমারের কাছে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ সমাবেশের মতো শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালনে সহায়তা চান। কানহাইয়া তখন অন্য সংগঠনের নেতাদেরও একত্রিত করেন। তারা একজোট হন গণতান্ত্রিক এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে সভা করার অধিকার রক্ষায়। কানহাইয়া এআইএসএফ (অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস ফেডারেশন) এর সদস্য, যেটি কিনা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) ছাত্র সংগঠন।

সংগঠনগুলো অধিকাংশই কাশ্মীর এবং আফজাল গুরু ইস্যুতে ডিএসইউ’র মতামতের বিরোধী ছিল। কিন্তু তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সপক্ষে এগিয়ে আসে সমাবেশস্থলের দিকে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বাধায় মাইক টানানো যায়নি। কাছাকাছি স্থানে জড়ো হতে থাকে এবিভিপির কর্মীরা। তারা ‘কাশ্মীর আমাদের, জঙ্গিদের নয়’ বলে স্লোগান দিতে থাকে। এদিকে ডিএসইউর সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে আসা অনেক কাশ্মীরী ছাত্রও যোগ দেয়। এবিভিপির স্লোগানের বিপরীতে তারা স্লোগান দেন, ‘আমরা কী চাই, আজাদী-আজাদী’। সভা এগিয়ে চলতে থাকে, প্রতিবাদকারীরা স্লোগান দিতে থাকেন আফজাল গুরুর ফাঁসির বিরুদ্ধে, সেনাবাহিনীর যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাবের বিরুদ্ধে এবং বিজেপির উগ্র ধর্মান্ধতা ও বড় ধনীদের শোষণ, লুটপাটের বিরুদ্ধে।

একই দিনে কাশ্মীর ছিল নির্বাক। ‘স্তব্ধ কাশ্মীর’ শিরোনামে পরদিন কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা অতি সংক্ষিপ্ত একটি খবর ছাপে। তাতে বলা হয়, ‘আফজল গুরুর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর দিনে বন্ধ পালিত হলো কাশ্মীরে। ২০১৩ সালের ০৯ ফেব্রুয়ারি তিহার জেলে ফাঁসি হয় সংসদ হামলায় দোষী সাব্যস্ত আফজলের। সে দিনটি মনে রেখেই আজ কাশ্মীরজুড়ে বন্ধের ডাক দিয়েছিল বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো। ডাকে সাড়াও মেলে। মঙ্গলবার দিনভর বন্ধ থেকেছে উপত্যকার বাজারহাট, দোকানপাট। সরকারি অফিস, ব্যাঙ্কে দরজায় ছিল তালা। রাস্তায় যানবাহনও তেমন চোখে পড়েনি।’

১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ : পার্লামেন্টে হামলার ঘটনায় দেশদ্রোহের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ও পরে খালাস পাওয়া দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক এস এ আর গিলানি উপস্থিত হন দিল্লি প্রেসক্লাবে। সেখানে এক অনুষ্ঠানে আফজাল গুরুর সমর্থনে স্লোগান দেওয়া হয় এবং গিলানি সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

এদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এবিভিপি সমর্থকরা একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। যাতে দেখা যায় যে, আগের দিন জেএনইউতে একদল শিক্ষার্থী ভারতবিরোধী স্লোগান দিচ্ছে, এমনকি পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগানও শোনা যায়। ভিডিওটি প্রকাশের পর আফজাল গুরুর ফাঁসির সপক্ষের শক্তিগুলো তীব্র নিন্দা জানায়। যদিও জেএনইউ’র আন্দোলনকারী নেতৃবৃন্দ ভিডিওটি সাজানো এবং পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগানদাতারা এবিভিপির এজেন্ট বলে দাবি করে।

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ : জেএনইউতে অ্যান্টি ন্যাশনালিস্টরা একজোট হচ্ছে, এই মর্মে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠতে থাকে। বিজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, জঙ্গিরা জেএনইউ’র অ্যান্টি ন্যাশনালিস্টদের পক্ষে কথা বলছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণাও দেন তিনি। আরেক বিজেপি নেতা অরুণ জেটলি হুঙ্কার দেন দেশদ্রোহীদের দমন করার।

এদিন বিজেপির ছাত্র সংগঠন এবিভিপি বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে। ঘটনা তখনও কেবল জেএনইউতে আটকে থাকলেও বিজেপি এটিকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার নীতিতে এগোয়। জেএনইউতে জাতীয়তাবিরোধী ও পাকিস্তানের পক্ষে, জঙ্গিদের পক্ষে স্লোগান দেয়া হয়েছে বলে দেশজুড়ে জোর প্রচারণা শুরু করে বিজেপি।

১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ : কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কানহাইয়া ও উমর খালিদসহ জেএনইউ’র ২০ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ গঠন করে। বিশ্ববিদ্যালয় ও হোস্টেলগুলোতে পুলিশ সাদা পোশাকে রেইড দেয়। গ্রেফতার হন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সভাপতি কানহাইয়া কুমার। তাৎক্ষণিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এবিভিপি কানহাইয়াসহ সকল রাষ্ট্রদ্রোহীর বিচারের দাবিতে সভা-সমাবেশ করে। ক্যাম্পাসে অন্য সংগঠনগুলোর তুলনায় এবিভিপি ছোট হওয়ায় এই বাদানুবাদ সংঘর্ষে গড়ায়নি। শুক্রবার পুলিশ যখন ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রনেতাকে গ্রেফতার করছে, শহরে তখন প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন।

 

সংবাদ মাধ্যমগুলো পরদিন জানায়, ছাত্রনেতা কানহাইয়া কুমারের মা অঙ্গনওয়াড়ির কর্মী। মাসিক আয় সাড়ে তিন হাজার। বাবা পক্ষাঘাতে সাত বছর শয্যাশায়ী। মা আর দাদা মণিকান্তের রোজগারেই চলে সংসার। বিহারের বেগুসরাই জেলা থেকে গণমাধ্যমে ধ্বনিত হয় মীনাদেবীর কাতর আর্তি, ‘দয়া করে আমার ছেলেকে সন্ত্রাসবাদী বলবেন না।’

বিভিন্ন পত্রিকা ও টিভিতে গুরুত্ব পেতে শুরু করে জেএনইউ। গোটা দেশ দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদল ছাত্রদের পক্ষে, তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চায়। আরেকদল ছাত্রদের বিপক্ষে, তারা দেশদ্রোহীদের বিচার চায়।

দুপুর থেকেই পুলিশ নানাভাবে দিল্লির কাশ্মীরী ছাত্রদের অপদস্থ করছে বলে খবরে প্রকাশ। পুলিশি হয়রানির জেরে আতঙ্কে কাশ্মীরী ছাত্ররা বাইরে বের হওয়া বন্ধ করে দিচ্ছে। নয়াদিল্লির এক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়ার কথায়, ‘আমাদের পরিচয়পত্র এবং অন্যান্য তথ্য খুঁটিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। সঙ্গে জেএনএউ বিক্ষোভ নিয়েও জেরা করা হচ্ছে। এমনকী আজ সকালে মেট্রো স্টেশনেও এক কাশ্মীরী শিক্ষার্থীকে অন্তত ২০ মিনিট ধরে জেরা করা হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে চিন্তিত অভিভাবকরা জানাচ্ছেন, এমন চললে মাঝপথেই পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য হবে ছেলেমেয়েরা।’

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ : সংবাদ মাধ্যমগুলো জানায়, ছাত্রনেতা কানহাইয়া কুমারের তিনদিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। সারা ভারত উত্তাল হয়ে ওঠে। জেএনইউর সাবেক শিক্ষার্থী ছিলেন সেনাবাহিনীর এমন কিছু কর্মকর্তা উপাচার্যকে চিঠি দিয়ে জানান, দেশদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়া হলে তারা তাদের সার্টিফিকেট ফেরত দেবেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে তারা বলেন, দ্রুত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়া হলে তারা পদকও ত্যাগ করবেন।

বিপরীতে আন্দোলনরতরা সেনা কর্মকর্তাদের ক্ষোভ ও পুরস্কার ফেরতের আকাক্সক্ষা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এর আগে ৬৮ বছরে ভারতে কম অন্যায় হয়নি। কিন্তু কোনোদিনই সেনা কর্মকর্তারা পদক-ডিগ্রি ফেরত দেয়ার কথা ভাবেনি। গণমাধ্যমগুলো পুরো ঘটনাবলিকে ভারতপন্থি আর ভারতবিরোধী এমন রূপ দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা!

একই দিন সিপিআইএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি মন্তব্য করেন, মাত্র দু’সপ্তাহ আগে জেএনইউতে বিজেপি তাদের নিজের লোককে উপাচার্য করে এনে বসিয়েছে। তারপরই হয়তো ব্যাপারটা এভাবে সাজানো হয়েছে যাতে ক্যাম্পাসে হস্তক্ষেপ করার পথ প্রশস্ত হতে পারে।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনন্ত কুমার জেএনইউর ঘটনাকে জাতীয়তাবিরোধী আখ্যা দিয়ে বলেন, দোষীদের কড়া শাস্তি দিতে হবে। দেশদ্রোহীদের নিশ্চয়ই শাস্তি দেবে সরকার। আফজাল গুরু ও অন্য সন্ত্রাসবাদীদের পক্ষে যারা স্লোগান দেয় তাদের শাস্তি থেকে নিস্তার নেই।

কাশ্মীরী ছাত্ররা ফেসবুকে নিজস্ব মতের সপক্ষে ব্যাখ্যা দেন। তারা উল্লেখ করেন, ১৯৯০ সালের পর থেকে কাশ্মীরে জন্ম নেয়া প্রতিটি মুসলিম মনে করেন ভারত অর্থ দখলদার। কারণ কাশ্মীরে নিয়োজিত আছে পাঁচ লাখ ভারতীয় সেনা। তারা ২০১৩ সালে প্রকাশিত অরুন্ধতী রায়ের এক প্রবন্ধ থেকে পরিসংখ্যান হাজির করেন, ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবিতে সংগ্রামরত কাশ্মীরীদের জঙ্গি আখ্যা দিয়ে এখন পর্যন্ত ৬৮ হাজার কাশ্মীরীকে (মুসলামানকে) হত্যা করা হয়েছে এবং ১০ হাজার গুম করা হয়েছে। নির্যাতিত হয়েছে আরও অন্তত এক লাখ লোক।’ প্রকৃত সংখ্যা এর তিনগুণ বলে দাবি করেন তারা।

এদিন জম্মু-কাশ্মীরের কুপওয়ারা জেলায় নিয়ন্ত্রণ রেখার কাছে চৌকিবাল এলাকার জনরেশি গ্রামে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাঁচ জঙ্গিকে হত্যার দাবি করে। গ্রামটিতে রাতভর অভিযান চালায় সেনা ও পুলিশ। তাতে পাঁচ জঙ্গিকে খতম করা সম্ভব হয়েছে বলে বিবৃতি দিয়ে জানায় ভারতীয় সেনাবাহিনী। জঙ্গিদের পাল্টা আক্রমণে দুই সেনা জওয়ানের মৃত্যু ঘটেছে বলেও জানানো হয়।

 

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ : রবিবার ছুটির দিন হলেও জেএনইউ চত্বর ছিল সরগরম। পুলিশের বাড়াবাড়ি এবং কেন্দ্রের অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদে সন্ধ্যায় একটি মিছিল বের করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। প্রায় হাজার দুয়েক বিক্ষোভকারী সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

দিল্লিতে সিপিএমের সদর দফতর এ কে গোপালন ভবনে একদল দুষ্কৃতি হামলা চালিয়ে দলীয় সাইনবোর্ডে কালি লাগায় এবং ঢিল ও পাথর ছোড়ে। তাদের সকলকেই ধরে ফেলা হয়েছে। মাথায় অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দল ‘আম আদমি পার্টি’র টুপি থাকলেও পুলিশ জানিয়েছে, ধৃতরা সকলেই সঙ্ঘ পরিবারের সদস্য! পুলিশের একটি সূত্রের বক্তব্য, জেএনইউর ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানোর ‘শাস্তি’ হিসেবেই এই হামলা। ঘটনায় ক্ষুব্ধ সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেন, ‘টুইটের জবাব পাথরে! আমাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা চলছে। আজ আমরা। কাল কারা?’

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এদিন মুখ খুলেছে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন। গত ক’দিন ধরে সরকার এবং তাদের ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন মহল থেকে যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমালোচনা করা হচ্ছে, তার প্রতিবাদ জানিয়ে সংগঠনের বক্তব্য, এই বিশ্ববিদ্যালয়কে যেন দেশবিরোধী আখ্যা না দেওয়া হয়। সংগঠনের প্রতিনিধি অজয় পট্টনায়েকের মতে, পুলিশি বাড়াবাড়ির কোনো প্রয়োজন ছিল না। শিক্ষক ও ছাত্রদের যৌথ প্রতিবাদের মুখে আজ সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ পাহারা সরিয়ে দেওয়া হয়। ইতোমধ্যেই জেএনইউ-এর প্রতিবাদী শিক্ষকদের পাশে দাঁড়িয়ে বিবৃতি দিয়েছে ৪০টি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন। বিভিন্ন টিভি ও পত্রিকায় বিতর্ক অনুষ্ঠান ও অসংখ্য নিবন্ধ ছাপা হয় আফজাল গুরু, জেএনইউ ও কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ স্পষ্টই জানিয়ে দিলেন, ‘দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) কিছু ছাত্রের ভারতবিরোধী স্লোগান দেওয়ার ঘটনায় সরাসরি মদদ রয়েছে পাকিস্তানে ঘাঁটি গাড়া সন্ত্রাসবাদী সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার।’

ঘোষণা ছাড়াই ক্যাম্পাসে ছাত্ররা কানহাইয়ার মুক্তির দাবিতে ক্যাম্পাস টানা অবস্থান ও প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করতে থাকেন। সন্ধ্যায় তাতে যোগ দেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি বলেন, দেশবিরোধী ছাত্ররা নয় বরং যারা তাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করতে চায় দেশবিরোধী তারাই। রাহুল গান্ধীকে এদিন কালো পতাকা দেখিয়ে বিক্ষোভ জানায় এবিভিপির সদস্যরা।

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ : এদিন সকালে ছাত্রনেতা কানহাইয়া কুমারকে আদালতে হাজির করানো হয়। এ দিন তার তিন দিনের পুলিশি হেফাজতের মেয়াদ শেষ হয়। কানহাইয়ার মুক্তির দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘটের ডাকও দেওয়া হয়। ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি শিক্ষকদের একাংশ ওই ধর্মঘটে শামিল হয়েছেন। গোটা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে দেওয়ালে দেওয়ালে চলছে প্রতিবাদী পোস্টার সাঁটানোর কাজ। ছাত্রদের সমর্থনে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে মিছিল করেন শিক্ষকরাও।

এদিন কানহাইয়া কুমারের আরও দু’ দিনের জেলহাজতের নির্দেশ দেন পাতিয়ালার আদালত। এ সময় আদালতে এজলাসের মধ্যেই জেএনইউর শিক্ষক-ছাত্র এমনকী সাংবাদিকদেরও পুলিশের সামনেই পেটায় বিজেপি সমর্থক আইনজীবী ও সমর্থকরা। আদালতের বাইরেও বামপন্থি ছাত্র-যুব নেতাদের মারধর করে তারা। কানহাইয়াকে আদালতে পেশের আগেই এজলাসে চড়াও হন বিজেপি-সমর্থক আইনজীবীরা। আদালতের বাইরে সিপিআইয়ের যুব নেতা আমিক জামেইকে মারধর করেন বিজেপি বিধায়ক ও পি শর্মা।

এআইএসএফ-এর সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ কুমারকেও মারধর করা হয়। সিপিএম এবং সিপিআই অফিসে ফোন করে হুমকিও দেওয়া হয়েছে। আদালত চত্বরে নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে সুপ্রিমকোর্টের দ্বারস্থ হন আক্রান্তরা। এর প্রেক্ষিতে আদালত পরবর্তী শুনানির দিন পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে নির্দেশ দেন। জেএনইউর শিক্ষক-ছাত্র-সাংবাদিকদের ওপর হামলাকে ‘সামান্য ঘটনা’ বলে মন্তব্য করেন দিল্লির পুলিশ কমিশনার।

ব্রিটেনের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণ-এশিয়া এবং ভারত বিদ্যা সংক্রান্ত পঠন-পাঠনের জন্য আলাদা বিভাগ রয়েছে। রয়েছেন প্রচুর শিক্ষকও। সেই শিক্ষকদের অনেকে মিলে জেএনইউর বিক্ষোভরত ছাত্রদের সমর্থনে এদিন একটি বিবৃতি পেশ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পুলিশের হানা এবং পুলিশের হাতে ছাত্রদের হেনস্থার তীব্র নিন্দা জানান তারা।

১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ : কানহাইয়া কুমারকে গ্রেফতারে সৃষ্ট বিতর্কের মধ্যেই একই অভিযোগে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রভাষক এসএআর গিলানিকে গ্রেফতার করা হয়। রাষ্ট্রদ্রোহ ও অন্যান্য অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, গিলানিকে সোমবার রাতে থানায় তলব করা হয়। এরপর বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদের পর মঙ্গলবার ভোরে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাকে শারীরিক পরীক্ষার জন্য আরএমএল হাসপাতালে নেওয়া হয়।

জেএনইউর ঘটনার তদন্তভার জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার (এনআইএ) হাতে তুলে দেওয়ার দাবি উঠেছিল। সেই দাবির সপক্ষে জমা পড়া আবেদন এদিন খারিজ করে দেয় দিল্লি হাইকোর্ট। আদালতের মতে, মামলাটি এনআইএর হাতে তুলে দেওয়ার পক্ষে এখনও যথেষ্ট অপরিণত। কাজেই দেশদ্রোহিতার অভিযোগে ধৃত কানহাইয়া কুমারের মামলার তদন্তভার আপাতত দিল্লি পুলিশের হাতেই থাকছে। দিল্লি পুলিশ ঘটনার যথাযথ তদন্ত করছে না, এই অভিযোগে গোটা ঘটনার তদন্তভার এনআইএর হাতে তুলে দেওয়ার আবেদন জানিয়ে দিল্লি হাইকোর্টে এক জনস্বার্থ মামলা করা হয়। শুধু এনআইএ নয়, বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবিও জানানো হয় ওই আবেদনে। কিন্তু, এ দিন বিচারপতি বিডি আহমেদ এবং আর কে গউবার ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়ে দেয়, জেএনইউ মামলার তদন্ত দিল্লি পুলিশই করবে। ছাত্ররা আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমের কাছে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘পুলিশ মিথ্যা রিপোর্ট দিবে জেনেও তারা পুলিশের হাতেই সব ছেড়ে দেয়! আমরা কেন বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছি তা তারা আমলে নেয় না।’

এদিন বিকেলের একটি মিছিলকে ঘিরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে উত্তেজনার শুরু। জেএনইউর আন্দোলনের সমর্থনে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে মিছিলের উদ্যোগ নিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন জন শিক্ষার্থী। কিন্তু সেই মিছিলে আফজাল গুরু এবং এস এ আর গিলানির সমর্থনে বিচ্ছিন্নতাবাদী স্লোগান শোনা গিয়েছিল। বুধবার সকালে আফজাল গুরুকে শহিদ ঘোষণা করে পোস্টারও পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার জেরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর।

দেশজুড়ে ছাত্রদের পক্ষে-বিপক্ষে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার-প্রচারণা। বিজেপি বিষয়টিকে মুসলিম, জঙ্গি ও বিচ্ছিন্নতা ইস্যু হিসেবে সামনে রাখতে চায়। অন্যদিকে কংগ্রেসের অবস্থান হচ্ছে, সরকারকে একটু বেকায়দায় ফেলতে পারলেই তারা খুশী! আম আদমিরও একই অবস্থান। এদিকে বামপন্থিরা এটাকে দেখছেন তাদের ওপর মোদি সরকারের নির্যাতন হিসেবে। কারণ জেএনইউ আদতে বামপন্থিদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত!

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ : বিজেপিকে বিপাকে ফেলে অব্যাহতি নিলেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের ছাত্র শাখার তিন নেতা। এবিভিপির এই তিন নেতা অভিযোগ করেছেন, দল ও কেন্দ্রীয় সরকার যেভাবে জেএনইউ কাণ্ড মোকাবিলা করছেন, তা ‘অন্যায় ও অনৈতিক’। বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি রাহুল যাদব, সম্পাদক অঙ্কিত হন্স এবং সংযুক্ত সম্পাদক প্রদীপ বিবৃতিতে বলেছেন, ভারতবিরোধী স্লোগান তোলার বিষয়টি আইনিভাবে মোকাবিলা হতে পারে। কিন্তু যেভাবে ছাত্রদের ওপর বিজেপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা হামলা চালিয়েছেন, তা নিন্দনীয়। আদালত চত্বরে ছাত্রদের মারধরে অভিযুক্ত বিধায়ক ও পি শর্মার শাস্তিও চেয়েছেন তারা। বিবৃতিতে ছাত্ররা বলেছেন, ‘জাতীয়তাবাদের অর্থ গুন্ডামি হতে পারে না।’ জেএনইউ বন্ধ করার দাবিরও বিরোধিতা করেছেন ছাত্রনেতারা। বিজেপি নেতারা অবশ্য একে বামদের চাপে মাথা নত করা হিসেবে দেখেছেন।

এদিন পর পর দু’বার এক দল তরুণ আচমকা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঢুকে পড়ে। জাতীয় পতাকা নিয়ে ‘ভারত মাতার জয়’ স্লোগান দিতে দিতে তারা ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সায়েন্সের ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সভায় গিয়ে হামলা চালায়। বাইরে থেকে আসা ওই দলটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বিজ্ঞান শাখার কিছু আরএসএস ও এবিভিপি সমর্থককে দেখা যায়। তবে হামলার কথা অস্বীকার করে এবিভিপি জানায়, দেশবিরোধী আন্দোলনের প্রতিবাদ জানাতে তারা মিছিল করেছেন।

 

এদিন কানহাইয়া কুমারকে ১৪ দিনের জেল হেফাজতে পাঠান দিল্লির পাতিয়ালা হাউজ কোর্ট। আইনজীবীদের একাংশের তৈরি করা তীব্র বিশৃঙ্খলায় আদালতে ঢোকার সময়েই এ দিন আক্রান্ত হয়েছেন জেএনইউ ছাত্র সংসদের সভাপতি কানহাইয়া। তাকে দু’বার আক্রমণ করে বিজেপি সমর্থক ওই আইনজীবীরা। নির্বিচারে চলে কিল, চড়, ঘুষি। গুরুতর জখম হয়েছেন ওই ছাত্র নেতা। যদিও আগে থেকেই সুপ্রিমকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল আদালত চত্বরে নিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে। সুপ্রিমকোর্টের পক্ষ থেকে পর্যবেক্ষক হিসেবেও কয়েকজন এদিন পাতিয়ালা কোর্টে আসেন। তাদের সম্মুখেই আক্রমণের শিকার হন কানহাইয়া। জলকামান, বিশাল বাহিনী নিয়ে এদিন আদালতের বাইরে হাজির ছিল দিল্লি পুলিশ এবং সিআরপিএফ। কিন্তু, ঘটনার সময় তাদের ভূমিকা ছিল কার্যত দর্শকের।

তার আগে দিল্লি পুলিশের মাধ্যমে প্রকাশ্যে এসেছে কানহাইয়া কুমারের এক বিবৃতি। কানহাইয়া তাতে লেখেন, ‘আমি ভারতের সংবিধানে বিশ্বাস রাখি এবং আমার স্বপ্ন হল সংবিধানের প্রস্তাবনাকে সম্পূর্ণ রূপে বাস্তবায়িত করার কাজে আমি যেন অংশ নিতে পারি। আমি ভারতের একতা ও অখণ্ডতাকে মানি এবং এর বিরুদ্ধে কোনো রকমের অসাংবিধানিক বক্তব্যকে সমর্থন করি না। ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটেছে, যার আমি নিন্দা করছি। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া ভিডিও দেখে জানা গিয়েছে যে জেএনইউতে কিছু জেএনইউর ও কিছু বহিরাগত অসাংবিধানিক স্লোগান দিচ্ছেন। এই স্লোগানকে আমরা সমর্থন করি না এবং আপনাদের সবার কাছে আমার আবেদন যে এই বিষয় নিয়ে দেশ, সমাজ তথা বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শান্তি ভঙ্গ করবেন না।’

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ : জেএনইউ নিয়ে এদিন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তালিকায় ছিলেন কংগ্রেস সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধী থেকে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। এদিন দুপুর একটা নাগাদ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেন রাহুল। তার সঙ্গে ছিলেন রাজ্যসভা এবং লোকসভায় কংগ্রেসের একাধিক সাংসদ।

আদালত চত্বরে কানহাইয়ার ওপর হামলা ও আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে পুলিশের নীরব ভূমিকা পালনকে কেন্দ্র করে ভারতের বিচার বিভাগ ও আইনের শাসনের দুরবস্থা সব মহলে আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। খবরে বলা হয়, সোমবারের ঘটনায় বিক্রম চৌহান নামে এক আইনজীবীর দিকে আঙুল উঠেছিল। এ দিনও সংঘর্ষের পিছনে রয়েছেন বিক্রমই। তিনি আদালত চত্বরে বিজেপি ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। তার সঙ্গে বিজেপির একাধিক শীর্ষ নেতার ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখা যায়। তার সঙ্গী আইনজীবীরা সুপ্রিমকোর্টের পাঠানো পর্যবেক্ষকদেরও ঢিল ছুড়েছিল। তাদের লক্ষ্য করে পাকিস্তানের দালাল বলে সেøাগানও দেয়া হয়। মোদি সরকার বিচার বিভাগ ও পুলিশকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করছে বলে ছাত্ররা প্রকাশ্যে বিবৃতি দেয়। এমনকি দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল দিল্লি পুলিশের দায়িত্ব নিজেদের হাতে চেয়ে ফের প্রশ্ন তোলেন।

যাদবপুর থেকে শুরু করে সারা দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে কানহাইয়ার মুক্তির দাবিতে প্রতিবাদ। অন্যদিকে সারা দেশে বিজেপির বিক্ষোভ। দেশবিরোধীদের বিরুদ্ধে এদিন থেকে দেশের সব ক’টি ব্লকে বিজেপি আন্দোলন শুরু করছে বলে কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়। জেএনইউ’র পথে যাদবপুরের যে ছাত্ররা হাঁটছে তাদের পরিণতিও একই হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা রাহুল সিংহ। তার মন্তব্য, ‘দেশদ্রোহীদের সবক শেখাতে ধোলাই দেওয়াই সঠিক রাস্তা।’

পুলিশকে দিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা তদন্ত করানোর দাবি তোলে বিজেপি। তবে উপাচার্য এদিন জানিয়ে দেন, ‘তদন্তের প্রয়োজন হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজেই তা করাবেন। বাইরের কাউকে ডাকা হবে না। ওই দিন মিছিলে এ রকম কিছু ঘটে থাকলে তা কোনও ছোট গোষ্ঠী করে থাকবে। কিন্তু এ জন্য গোটা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে কালিমালিপ্ত করা উচিত নয়।’ এর পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ছাত্র বা ইউনিয়নের কাউকে এই ধরনের স্লোগান দেওয়ার ঘটনায় চিহ্নিত করা গেলে উপাচার্য আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করতে চান। সুরঞ্জনবাবু বলেন, ‘পুলিশ দিয়ে কখনো বিশ্ববিদ্যালয় চালাইনি। চালাবও না।’

বিভিন্ন সংগঠন এর সঙ্গে জড়িয়ে গেলেও সুকৌশলে এ বিতর্ক থেকে দূরে থাকে মমতার দল তৃণমূল। এখন পর্যন্ত তার সরকার বা দলের নেতাদের কেউই এ নিয়ে কোনো পক্ষের হয়ে কথা বলেননি।

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ : জেএনইউয়ের বিবাদ গড়াল পাটনার রাজপথেও। ছাত্র সংগঠন এআইএসএফ, এসএফআই, আরজেডিসহ সাতটি সংগঠনের কর্মী-সমর্থকরা রাজ্য বিজেপি অফিসের সামনে বিক্ষোভ দেখাতে গেলে এদিন দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। পুলিশ বিক্ষোভকারী ছাত্রদের লাঠিপেটা করে এলাকা ছাড়া করে। সংঘর্ষের জেরে পাটনা শহরের কেন্দ্রপথে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ নিরীহ পথচারীদের মারধর করেছে বলেও অভিযোগ ওঠে।

কানহাইয়ার হয়ে মামলা লড়তে আসা সোলি সোরাবজি, রাজু রামচন্দ্রন, রাজীব ধবনের মতো প্রবীণ আইনজীবীরা সরাসরি সুপ্রিমকোর্টে জামিনের আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এদিন আদালতে কানহাইয়ার নিরাপত্তা ও পাতিয়ালা হাউস কোর্টের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির যুক্তি দেখিয়ে সুপ্রিমকোর্টকে জামিনের আর্জি শোনার অনুরোধ করেন তারা। কিন্তু আদালত কানহাইয়াকে জামিন দেয়নি তাই নয়, শুনানিতেই অস্বীকৃতি জানিয়েছে তারা। বিচারপতিরা বলেন, ওই আদালতের ‘অস্বাভাবিক’ পরিস্থিতি সম্পর্কে তারাও অবহিত। কিন্তু সেক্ষেত্রে হাইকোর্টে যাওয়া উচিত ছিল। কানহাইয়ার আইনজীবীরা যুক্তি দেন, পাতিয়ালা হাউস কোর্ট ও দিল্লি হাইকোর্ট একই চত্বরে। তাই তারা নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন। সরকারি আইনজীবীরা পাল্টা বলেন, হাইকোর্টে নিরাপত্তার সমস্যা নেই। বিচারপতিরা তখন বলেন, ‘আমরা এমন কোনো বার্তা দিতে চাই না যে, সুপ্রিমকোর্টই একমাত্র নিরাপত্তা দিতে পারে, বাকি আদালত পারে না’। সরাসরি জামিনের আবেদন শুনতে অস্বীকার করলেও দিল্লি হাইকোর্টে কানহাইয়াসহ অন্যদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য কেন্দ্র ও দিল্লি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিমকোর্ট।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে দাঁড়াল ছ’টি ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়। অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ, এডিনবরা, নটিংহাম ও ইস্ট অ্যাংলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দ্য স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড অ্যাফ্রিকান স্টাডিজ এবং কিঙ্গস কলেজ একটি যৌথ বিবৃতি পেশ করেছে। সেই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের আটক ও সাসপেন্ডের ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন।’

 

‘সাপোর্ট উমর খালিদ’ স্লোগান তুলে ইন্টারনেটে জোর প্রচারণা শুরু। জেএনইউ শিক্ষার্থীদের দাবি, কানহাইয়া কুমার ভারতবিরোধী কোনো স্লোগান না দিলেও তিনি গ্রেফতার হয়েছেন। কিন্তু উমর খালিদসহ অসংখ্য শিক্ষার্থী নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ থেকেই ‘ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, ধ্বংস হোক নিপাত যাক’ স্লোগান তুলেছেন। এ কারণে এবং উমর খালিদ মুসলিম হওয়ায় তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে পুলিশ। দিল্লি পুলিশ ঘোষণা দিয়েই রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি চালাচ্ছে। অন্য রাজ্যগুলোতেও দেশবিরোধীদের খোঁজা হচ্ছে বলে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে জেএনইউ শিক্ষার্থীরা উমর খালিদকে বাঁচাতে সব মহলের মনোযোগ দাবি করেছে।

‘কার ঘরে নিভে গেছে প্রদীপের শিখা কবে, আফজাল গুরু শোনো শ্রীনগরে দেখা হবে। ফাঁসিতে বুলেটে বুটে ইতিহাস ফ্যালে পিষে, সেই ইতিহাসই বাঁচে একা দোয়েলের শিসে।’ জেএনইউ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সমর্থনে এমনতর গান বেঁধে এদিন বিপাকেই পড়েন প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী কবির সুমন। তার ফেসবুক প্রোফাইল এদিন কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপে বন্ধ করে দেয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। কবীর সুমনের কলমে-কণ্ঠে-সুরে প্রতিবাদ মোটেই নতুন নয়। কিন্তু তার ফেসবুক প্রোফাইল ব্লক করে দেওয়ার মতো ঘটনা আগে ঘটেনি। এর বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র প্রতিবাদ শুরু হলে দ্রুতই আবার তার প্রোফাইলটি খুলে দেয়া হয়।

জেএনইউর ছাত্ররা ধর্মঘট অব্যাহত রেখেছেন। এদিন আন্দোলনকারীরা ভারতে অসহিষ্ণুতা, সাম্প্রদায়িকতা ও দেশপ্রেমের নামে উগ্র ফ্যাসিবাদের বিস্তার ঘটানোর দায়ে সরকারকে অভিযুক্ত করেন। গুজরাট দাঙ্গার জন্য দায়ী, হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী মোদির কাছে ভালো কিছু প্রত্যাশা করেন না বলে ছাত্ররা গণমাধ্যমকে জানান। আন্দোলনের পাশে দেশ-বিদেশের অনেকেই সমর্থন নিয়ে এগিয়ে আসায় ধন্যবাদ জানিয়ে শিক্ষার্থীরা দাবি করেন এর মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে, বর্তমান সরকার দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ চায় না।

তথ্যসূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, দ্য হিন্দু, দ্য স্টেটস্ম্যান, আজকাল, জিটিভি অনলাইন।