নতুন সংকটে ব্রিটেন: ঝুলন্ত পার্লামেন্ট

23

।। রথো রাফি।।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে শেষ পর্যন্ত ঝুলন্ত পার্লামেন্টই হচ্ছে যুক্তরাজ্যে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে আসার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরুর কয়েক মাস আগেই তিনি আগাম নির্বাচনের ডাক দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য, প্রশাসনের ওপর নিজের কর্তৃত্ব আরও দৃৃঢ় করা। কিন্তু নির্বাচনের ফল শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে গেল। কনজারভেটিভরা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা তো পেলই না, উল্টো প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে তেরেসার পদত্যাগের দাবি জোরালো হলো। অন্যদিকে, আসন সংখ্যা বাড়াতে পারলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি জেরেমি করবিনের লেবার পার্টি। তাই ২০১০ সালের

পর যুক্তরাজ্যে আবারও ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হতে যাচ্ছে। একই কারণে ব্রেক্সিট নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। ঝুলন্ত পার্লামেন্টের খবরে যুক্তরাজ্যের মুদ্রাবাজারে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। পাউন্ডের দাম দ্রুত পড়ছে। শেষ বিচারে নির্বাচনের ফল স্বস্তি আনতে পারেনি দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে, বরং ডেকে এনেছে নতুন সংকট। খবর বিবিসি, সিএনএন, এএফপি ও রয়টার্সের।

ব্রিটেনের নির্বাচনের আগে অবশ্য চিত্রটা ছিল একেবারেই উল্টো। দেশের প্রায় সবক’টি নির্বাচন-পূর্ব জরিপেই এগিয়ে ছিলেন তেরেসা মে। বলা হয়েছিল, এবারের ভোটে ঐতিহাসিক জয় পেতে চলেছে কনজারভেটিভ পার্টি। গত বৃহস্পতিবার ভোটের বাক্সে উল্টো রায় দিলেন ব্রিটিশ নাগরিকরা। সর্বশেষ ফল অনুযায়ী, ৬৫০ আসনের ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ৩১৮টি আসনে জিতে সর্ববৃহৎ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে কনজারভেটিভরা। তবে সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় ম্যাজিক ফিগার অর্জনে সফল হয়নি দলটি। পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অফ কমন্সে ৩২৬টি আসন জিতলেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া যেত। সে হিসাবে মাত্র ৮টি আসনের টানে পড়ে গেল কনজারভেটিভরা। শুধু তাই নয়, আগের নির্বাচনের তুলনায় ১২টি আসন কমে গেল তাদের। বাধ্য হয়ে, দলটিকে এবার সরকার গঠন করতে হবে অন্য কোনো দলকে সঙ্গে নিয়ে। অন্যদিকে, দেশটির প্রধান বিরোধী দল লেবারের দখলে গেছে ২৬২টি আসন। আগের চেয়ে ৩০টি আসন বেড়েছে দলটির। তাই তেরেসার জন্য এ নির্বাচন কাল হলেও, করবিনের জন্য তা শাপে বর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেরেসার মুখ দুশ্চিন্তার মেঘে মলিন হলেও, করবিন এবার হাস্যোজ্জ্বল। স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টিরও (এসএনপি) আগের চেয়ে ২১টি আসন কমে গেছে। দলটি ৩৫টি আসন পেয়েছে এবার। তবে লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের (লিবডেম) ৪টি আসন বেড়েছে। তারা পেয়েছে ১২টি আসন। আর ডিইউপি পেয়েছে ১০টি আসন। অন্যান্য দল পেয়েছে ১২টি আসন। এ নির্বাচনের একটি বিশেষ দিক, যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে এবার সবচেয়ে বেশি নারী এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন ৪ কোটি ৬৫ লাখ ভোটার। এবার নতুন ভোটারের সংখ্যা ছিল চার লাখের বেশি। তার মধ্যে প্রায় ৬৮ দশমিক ৭ শতাংশ ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।

এবার ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েছে লেবার পার্টি। গত নির্বাচনের তুলনায় তাদের ভোট সাড়ে ৯ শতাংশ বেড়েছে। কনজারভেটিভ দল পেয়েছে ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট। এ হিসাবে আগের তুলনায় তাদের ভোট সাড়ে ৫ শতাংশ বেড়েছে। বড় অন্য দলগুলোর ভোট কমেছে, সবচেয়ে বেশি ১০ শতাংশ কমেছে ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির।

ভোটের ফল সামনে আসতেই ব্রেক্সিট নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। ধারণা করা হচ্ছে, ইইউর সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া প্রলম্বিত হবে। আগামি ৯ দিনের মধ্যেই ব্রেক্সিট আলোচনা শুরু হওয়ার কথা। এরই মধ্যে তেরেসার পদত্যাগের দাবিতেও সরব হয়ে উঠেছে বিরোধীরা। লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন বলেন, দেশের মানুষের মত যাচাই করতে নির্বাচনে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। মানুষ তাদের রায় জানিয়ে দিয়েছে। আমার মনে হয়, এবার প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত। নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় করবিন আরও বলেন, স্পষ্ট হয়ে গেছে নির্বাচনে আসলে কাদের জয় হয়েছে। দেশের জনগণ যারা আমাদের ওপর আস্থা রেখেছে, তাদের সেবায় সরকার গঠনে আমরাও প্রস্তুত। তিনি লেবারের সঙ্গে অন্যান্য বিরোধী দলের সংখ্যালঘু জোট গঠনের চেষ্টা করবেন বলে জানান।

শুধু তাই নয়, কনজারভেটিভ নেতাদের মধ্যেও তেরেসার পদত্যাগের দাবি উঠেছে। সমর্থন হ্রাসের কারণে তিনি যদি সামনের দিনগুলোকে পদ ছাড়েন, তবে নতুন নেতা বাছতে হবে দলটিকে।

অন্যদিকে তেরেসা মের বক্তব্য, দেশে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে হবে। তাই যতদিন কনজারভেটিভ পার্টি বৃহত্তম দল থাকবে, ততদিন অন্তত তাদের সরকার চালাতে দেওয়া উচিত। তবে বাস্তবতা হলো ভোটের এই ফল প্রধানমন্ত্রী তেরেসার জন্য বড় বিপর্যয় হিসেবেই দেখা হচ্ছে। কারণ, ক্ষমতার মেয়াদ তিন বছর বাকি থাকতেই তিনি যে বাজি ধরেছিলেন, তাতে হারতে হয়েছে তাকে। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তেরেসার হাত আগের চেয়ে অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার পক্ষে কঠোর বেক্সিটের কথা বলা এখন প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার। তিনি যে দলের সঙ্গে জোট গঠনের কথা বলছেন, সেই ডিইউপিও কঠোর ব্রেক্সিটের বিরুদ্ধে।

এদিকে তেরেসা মের নেতৃত্বে কনজারভেটিভরা কেন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল না_ এ প্রশ্ন শুধু দলীয় নেতাদের মাঝেই নয়, ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মাঝেও। অনেকেই বলছেন, নির্বাচনী প্রচারের সময় যুক্তরাজ্য তিনটি বড় ধরনের জঙ্গি হামলার মুখে পড়েছে। এর মধ্যে দুটি আবার ঘটেছে খোদ লন্ডনে। স্বাভাবিকভাবেই তেরেসার হাতে দেশ কতটা নিরাপদ তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে ব্রিটিশদের মনে। অন্যদিকে ঝুলন্ত পার্লামেন্টের কারণে তেরেসা জোট সরকার গঠনে সফল হলেও, তার সরকার স্থায়ী হবে কি-না তা নিয়েও ব্যাপক সংশয়ে ব্রিটিশ রাজনীতিবিদরা।

২০১৬ সালের জুনের গণভোটে ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দেন যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। গণভোটে এই রায়ের পর পদত্যাগ করেন ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। এরপরই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন তেরেসা মে।

http://bangla.samakal.net/2017/06/10/299738#sthash.3F3U2vmd.dpuf