ভুয়া মালিকের দখলে গুলশান-বনানীর আরও ৩৭ বাড়ি

28

অমিতোষ পাল

রাজধানীর গুলশান-বনানীর ৩৭টি বাড়ির জাল কাগজপত্র তৈরি করে দখলে রেখেছেন প্রভাবশালীরা। এসব বাড়ির জায়গা ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে প্লট আকারে বরাদ্দ দিয়েছিল তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি)। পাকিস্তানি নাগরিকরা এসব প্লট বরাদ্দ পেয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর তারা বাংলাদেশে ফেরেননি। এগুলোর মালিক ডিআইটির উত্তরসূরি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। কিন্তু সুযোগসন্ধানী অসাধু লোকজন বাড়িগুলো দখল করার পর কোনোটি জাল কাগজপত্রবলে ভুয়া মালিকের করায়ত্তে, কোনোটি বছরের

পর বছর মামলার জালে জড়িয়ে রেখে প্রভাবশালীরা ভোগদখল করছে। এসবের পেছনে রাজউক ও ক্ষমতাধর লোকজনের দুর্নীতি আছে। রাজউকের সূত্রমতে, এসব প্লটের আয়তন ১০ কাঠা থেকে দুই বিঘা পর্যন্ত, যেগুলোর প্রতিটির দাম এখন ৫০ কোটি থেকে ২০০ কোটি টাকা।

উচ্চ আদালতের রায়ের পর গত বুধবার গুলশান এভিনিউর ১৫৯ নম্বর বাড়ি থেকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে উচ্ছেদ করে রাজউক। সেই বাড়িও জনৈক পাকিস্তানি নাগরিক এহসান বরাদ্দ পেয়েছিলেন। এরপরই মওদুদ আহমদ তার ভাই মঞ্জুর আহমদের নামে জাল দলিল তৈরি করে দীর্ঘ ৪৫ বছর বাড়িটি দখলে রেখে বসবাস করছিলেন।

রাজউকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, স্বাধীনতার পর গুলশান-বনানীতে শতাধিক প্লট ভুয়া মালিকদের দখলে চলে গেছে। রাজউকের তালিকায় অনিষ্পন্ন ৩৭টি প্লট আছে। এর কোনো কোনোটির মালিকানা দাবি করে সাত-আটজন রাজউকে হাজির হচ্ছে। এসব প্লটের নকশা অনুমোদন রাজউক বন্ধ রেখেছে। দখলদাররা পাকিস্তান আমলের একতলা-দোতলা বাড়ি ভেঙে বহুতল ভবন করেছে এবং করতে চাইছে।

জানা যায়, ২০০৮ সালের পর রাজউক অনুসন্ধান চালিয়ে এ রকম ৩৮টি প্লট-বাড়ির সন্ধান পায়। এর মধ্যে গুলশানে একটি বাড়ি দখলে নিয়ে সেখানে রাজউক বহুতল ভবন বানিয়ে ফ্ল্যাট আকারে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যগুলোর ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

জানতে চাইলে রাজউকের বোর্ডসদস্য (প্রশাসন) আবদুর রহমান বলেন, এ ধরনের প্লটের প্রায় প্রতিটির ক্ষেত্রেই মামলা চলছে। মামলা থাকায় নিলামে বিক্রি করাও সম্ভব নয়। এসব মামলায় রাজউক জিতবে; কিন্তু মামলার ফয়সালা না হলে কিছু করা যাচ্ছে না। রাজউকের পক্ষে রায় হলে সঙ্গে সঙ্গেই রাজউক নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে।

রাজউকের একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে এ রকম ১৮টি প্লট-বাড়ি পানির দামে রাজউক বিক্রি করে দেয়। এ ঘটনায় মামলা হলে সাবেক পূর্তমন্ত্রী মির্জা আব্বাস ও রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান শহিদ আলম, ইকবাল উদ্দিনসহ ডজনখানেক কর্মকর্তা জেলে যান। এদের কয়েকজন এখনও জেলে।

রাজউক সূত্রের খবর অনুযায়ী গত বুধবার এলাকায় সরেজমিন কয়েকটি বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দখলদাররা বাড়ির মালিকানা জানান দিচ্ছেন। কেউ নিজে থাকছেন। কেউ ভাড়া দিচ্ছেন। আবার কয়েকটিতে কেবল নিরাপত্তাকর্মী রাখা হয়েছে। গুলশানের ১০৩ নম্বর রোডের ১৩ নম্বর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ডুপ্লেক্স বাড়ির প্রধান ফটকে একটি বিদেশি কুকুর বেঁধে রাখা হয়েছে। বাড়ির মালিকের সঙ্গে কথা হলে মাহবুব আলী পরিচয় দিয়ে তিনি জানান, তার বাবা বাড়িটি ১৯৬৯ সালে বরাদ্দ পেয়েছিলেন। বাড়িটি কীভাবে রাজউকের বেদখলী তালিকায় ঢুকল তা তিনি বুঝতে পারছেন না। তবে তিনি বলেন, মনে হয় ভুল হয়েছে।

১০১ নম্বর সড়কের ১৩ নম্বর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকটি বেশ বনেদি কায়দায়। সামনে ইংরেজিতে লেখা ‘টু-লেট, অনলি ফর ফরেনার্স’। সেখানে কোনো ফোন নম্বর নেই। যোগাযোগের জন্য ই-মেইল ঠিকানা দেওয়া আছে, ‘ঢ়ধফসধারব@িমসধরষ.পড়স্থ। ভেতরে অনেক গাছগাছালিসহ একটি ডুপ্লেক্স ভবন। ভেতর থেকে তালাবদ্ধ। বাড়িসংলগ্ন চা বিক্রেতা জানান, বাড়িতে মালিক থাকেন না। একজন সিকিউরিটি গার্ড আছেন। তাকে অবশ্য ডেকে পাওয়া গেল না।

১১৫ নম্বর রোডের ১০ নম্বর প্লট খুঁজতে গিয়ে এ সড়কে ১০ নম্বর কোনো হোল্ডিংয়ের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে ১১ নম্বর হোল্ডিংয়ের পাশের হোল্ডিংয়ের নম্বর দেওয়া আছে ২/এ। ফটকটির দারোয়ান জানান, এখানে মালিক নেই। তবে একই সড়কের ৩২ নম্বর প্লটে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একটি বিশাল বহুতল আবাসিক ভবন উঠেছে। বাইরের সাইনবোর্ডে লেখা, ‘বাস্তবায়নে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউক, নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কুশলী নির্মাতা লিমিটেড।’ খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই প্লটটিই কয়েক বছর আগে মামলায় জিতে রাজউক অবৈধ দখলমুক্ত করে ফ্ল্যাট বানিয়ে বিক্রির কাজ করছে।

গুলশানের ৩ নম্বর রোডের ৭২ নম্বর প্লটের সন্ধান করলে দেখা যায়, সেই রোডে ৭২ নম্বর নামের কোনো হোল্ডিং নেই। তবে ক্যাফে লাউঞ্জ নামের একটি রেস্টুরেন্টের সামনে লেখা, ‘দি ফ্রেন্ডস হাউস লিমিটেড (দি মিরাজ)-এর পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব তানভীর আজাদ পিটিশনার কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য রেসপন্ডেন্টের বিরুদ্ধে রিট পিটিশন নং ৯২৮/২০১৬ দাখিলের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন কর্তৃক রুল ইসু করেন। পরবর্তীতে সকল রেসপন্ডেন্টের যাবতীয় কার্যক্রম স্থিতাবস্থা রাখার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। সকলের জ্ঞাতার্থে আদালতের নির্দেশ মান্য করার জন্য অনুরোধ করা হলো।’ পাশে উদৃব্দত ফোন নম্বরে যোগাযোগ করলে তানভীর আজাদ বলেন, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন আছে। তারা একটি নোটিশও টানিয়ে রেখেছেন।

রাজউকের তালিকায় দখলদার :গুলশানের ১৪ নম্বর রোডের ৪ নম্বর বাড়ি। পুরনো (এসডবি্লউ-সি-১৩)। চারপাশে উঁচু করে দেওয়া এই বাড়ির জাল দলিলকারী হিসেবে জনৈক ফাতেমা জোহরার নাম রয়েছে। ৪৪ নম্বর সড়কে ৩০এ নম্বর বাড়ি। পুরনো (সিডবি্লউএন-বি-০৬)। রাজউকের খাতায় জমির মালিক মাক্তার আহমদ আনসারী। ৪১ নম্বর সড়কের ৬ নম্বর বাড়ি। পুরনো (সিডবি্লউএন-১-৪৩)। জাল দলিলকারী হিসেবে হাবিবা সুলতানার (ফালু) নাম রয়েছে। ১১ নম্বর সড়কের ৩ নম্বর পুরনো সিসডবি্লউ(এ)৩০। রাজউকের খাতায় এটির জাল দলিলকারীর নাম সৈয়দ আহমেদ হাসমী। বনানীর ডি ব্লকের ১৩ নম্বর রোডের ৪৭ নম্বর প্লট (ডি-৪৭, রোড-১৩, বনানী)। রাজউকের খাতায় জায়গাটি জাল দলিল করে দখল নিতে সচেষ্ট আছেন আবসার আলম ওসমানী। বনানীর জি ব্লকের ৭ নম্বর রোডের ৩১ নম্বর (ব্লক জি-৩, রোড-৭, বাড়ি ৩১)। রাজউকের তালিকায় জায়গাটির জাল দলিলকারী সাইদ নুরুল গনি। গুলশানের ৯৩ নম্বর রোডের ১৫/সি প্লটের (পুরনো সিইএন(এ)-১৫/সি) জাল দলিল করে দখল করেছেন এম এম জলিল খান। ৯৬/৯৩ রোডের ১৯ নম্বর প্লটের (সিইএন-বি-১৭) জাল দলিল করে দখল করেছেন মো. ওহীদুল নবী, ১০১/১০৩ নম্বর রোডের ১৩ নম্বর প্লট (সিইএন-ডি-২০) দখল করেছেন নেছার মোহাম্মদ খান। ১০৮ নম্বর রোডের ১৪ নম্বর প্লট (পুরনো ১৮/সি ও ১৮/ডি) দখল করেছেন টিএ খান, ১০৮/১১২ নম্বর রোডের ১ নম্বর প্লট (সিইএন-জি-১৬/বি) দখল করেছেন আরিফুল হাসান। ১০৯ নম্বর রোডের ৪ নম্বর প্লট (সিইএন-এইচ-০৪) দখল করেছেন মো. শাহাবুদ্দিন, ১১৫ নম্বর রোডের ১০ নম্বর প্লট (সিইএন-এইচ-৩২) দখল করেছেন হারুন নেছা, ১১৬ নম্বর রোডের ৯ নম্বর প্লট (সিইএস-এ-৪৭) দখল করেছেন বিলকিস বানু, গ নম্বর রোডের ৮০ নম্বর প্লট (সিইএস-এফ-০২) দখল করেছেন নীঘাত পারভিন। ৪৯/ক নম্বর সড়কের ১ নম্বর প্লট (সিডবি্লউএন-এ-০১) দখল করেছেন আসাদুজ্জামান ও শওকত আলী চৌধুরী। ৪৯ নম্বর রোডের ১ নম্বর প্লট (সিডবি্লউএন-এ-০২) এস এম এ তাকী ও শাহীন কোরাইশী। ৪৭/৪৮ নম্বর সড়কের ২ নম্বর প্লট (সিডবি্লউএন-এ-১৮এ/বি) রোশনআরা বেগম। ৪১ নম্বর রোডের ৬ নম্বর প্লট (সিডবি্লউএন-এ-৪৩) দখল করেছেন হাবিব সুলতানা জায়েদী। ৪৪ নম্বর সড়কের ৩০/এ নম্বর প্লট (সিডবি্লউএন-বি-০৬) দখল করেছেন মোক্তার আহম্মদ আনসারী। ৪৪/গ নম্বর সড়কের ৩০/এ নম্বর প্লট (সিডবি্লউএন-বি-২৮) দখল করেছেন হোসনে আরা বেগম। গ নম্বর সড়কের ১১৩ নম্বর প্লট (সিডবি্লউএন-বি-৩৪) দখল করেছেন এস কে রেজা চৌধুরী, গ নম্বর সড়কের ১০৫ নম্বর প্লট (সিডবি্লউএন-সি-০৩) দখল করেছেন মুস্তারী বেগম। গ নম্বর সড়কের ৭৯ নম্বর প্লট (সিডবি্লউএস-এ-০৮) দখল করেছেন আবদুল্লাহ ভাই। ১৬/২১ নম্বর সড়কের ৬ নম্বর প্লট (সিডবি্লউএস-সি-০৫) দখল করেছেন শামসুল হক। ৩ নম্বর সড়কের ৭২ নম্বর প্লট (এনই-এ-০১) দখল করেছেন মো. কেরামত আলী। ৭১/৭৪ নম্বর সড়কের ৯ নম্বর প্লট (এনই-বি-১/এ) দখল করেছেন ইউসুফ আলী খান। ৮৭ নম্বর সড়কের ৪ নম্বর প্লট (এনই-এম-০৪) দখল করেছেন এম এ ছাত্তার। ৫৯ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর প্লট (এনডবি্লউ-ই-০২) দখল করেছেন হাফিজা বেগম। ৫৪ নম্বর সড়কের ১৩ নম্বর প্লট (এনডবি্লউ-আই০৩) দখল করেছেন আবদুল মালেক। ৫৩ নম্বর সড়কের ১২ নম্বর প্লট (এনডবি্লউ-আই-০৬) দখল করেছেন মাহবুব আনাম। ৫০ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর প্লট (এনডবি্লউ-কে-১১) দখল করেছেন মোস্তফা হায়দার। গ-১১ নম্বর সড়কের ৩৫ নম্বর প্লট (এসডবি্লউ-এ-২৯) দখল করেছেন আফসার উদ্দিন। ১১ নম্বর সড়কের ৩ নম্বর প্লট (এসডবি্লউ-এ-৩০) দখল করেছেন সৈয়দ আহমেদ হাসমী। ১৪ নম্বর সড়কের ৪ নম্বর প্লট (এসডবি্লউ-সি-১৩) দখল করেছেন ফাতেমা জোহরা। ২/১ নম্বর সড়কের ২ নম্বর প্লট (এসডবি্লউ-এইচ-৭) দখল করেছেন রওশন আরা বেগম গং। ৪৬/৫২ নম্বর সড়কের ২৭ নম্বর প্লট (জিএনসি/এ-৪৫) দখল করেছেন মো. নাঈম। বনানীর সি ব্লকের ৬ নম্বর সড়কের ৬ নম্বর বাড়ি (সাবেক বাড়ি নং ৯৪) দখল করেছেন মো. নেহাল উদ্দিন। ডি ব্লকের ১৩ নম্বর রোডের ২৫ নম্বর বাড়ির (পুরনো ৪৭) দখল করেছেন আবসার আলম ওসমানী। ই ব্লকের ১৭/এ, ১২ নম্বর সড়কের ১২ নম্বর বাড়ি (পুরনো ৩৮) দখল করেছেন মো. আইয়ুব আনসারী। আই ব্লকের ৩ নম্বর রোডের ২৮ নম্বর বাড়ি (পুরনো ১৪) দখল করেছেন ওয়াহিদুর রহমান। জি ব্লকের ৭ নম্বর রোডের ৩১ নম্বর বাড়ি (পুরনো ২৩) দখল করেছেন সাইদ নুরুল গনি। এ ছাড়া ২২ দিলকুশার প্লটটি জাল দলিল করে দখল করেছেন জনৈক আবদুল জলিল ও ৫৪ মহাখালীর প্লটটির জাল দলিল করে দখলে রেখেছে ইউনাইটেড ট্রেডিং করপোরেশন।

– See more at: http://bangla.samakal.net/2017/06/09/299480#sthash.KEMgD66Z.dpuf