বজলুর রহমান ও অবশ করা সেই দুঃস্বপ্ন

129

 

জোবাইদা নাসরীন

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমার কেমন জানি লাগা শুরু হয়। বিশেষ অনুভূতির কোনো নাম নেই। এটি শুরু হয়েছে ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারির পর থেকেই। বিশেষ করে ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকেই আমার মন অবশ হতে থাকে, মন-মাথা কোথায় যেন স্থির হয়ে যায়। আমার চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায় এক দুঃস্বপ্ন, যা আমাকে অবশ করে, বিক্ষিপ্ত করে। আমি সেই অবশ হওয়া জীবনটাকে আমার মধ্যে বসাতে চাই, কিন্তু পারি না। আট বছর আগের এক দুঃস্বপ্ন আমাকে তাড়া করা শুরু করে। আমি তার থেকে দূরত্বে দৌড়াই, কারণ আমি সেই দুঃস্বপ্নকে এখনও সত্য মনে করতে পারি না। সেই যে আট বছর আগের এক ২৬ ফেব্রুয়ারির কিশোরী রাত, আমি কম্পিউটারে কিছু একটা লিখছিলাম, পাশে পড়ে থাকা মোবাইলটা বেজে উঠল। অতি কাঙ্ক্ষিত ফোন। ফোনের ওপাশ থেকেও উষ্ণতা জানান দেওয়া কণ্ঠ। ফোনের ওপাশ থেকে বলছেন, ‘কীরে টুনটুনি, কী করছিস?’ মেকি অভিমান আমার কণ্ঠে, তোমার সঙ্গে কথা বলব না। বললেন, সারাদিন ব্যস্ত ছিলেন, বিকেলে গিয়েছিলেন রমনায় হাঁটতে, তার পর স্নান সেরে খেয়ে এই মাত্র বের হলেন। যাচ্ছেন ঢাকা ক্লাবে। আমার শিশুতোষ অভিমানে ঋদ্ধ এক বাবা। তার ঠিক ঘণ্টাখানেক বাদেই আবারও ফোন। আমার এক বন্ধু সাংবাদিকের। জানতে চাইলেন, আমি এখন কোথায়? বারডেম কি-না? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, বারডেম কেন? সে বুঝদার। কথা বাড়াল না। ফোন রেখে দিলেন। তার একটু পর বন্ধু প্রিসিলার ফোন, ‘আপনি কি বাসায়? তাড়াতাড়ি বারডেম যান, বজলু ভাই মারা গেছেন।’ আমি ধীর, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বললাম, ‘কীসব বলছেন, একটু আগেই তো ফোনে কথা হলো, উনি ঢাকা ক্লাবে আছেন।’ প্রিসিলা আমাকে টিভি অন করতে বললেন। টিভি খুলে সংবাদের স্ক্রলে তাকালাম। কিন্তু আমি তো কিছুই পড়তে পারছি না। একি সম্ভব!

সে এক অবিশ্বাস্য মুহূর্ত। সে একপালক সময়, জীবন। সেই সময়টি আমার ছিল না, জীবনটিও নয়। জীবনটি যখন আমার শরীরে ভর দিয়েছে, তখন আমি নিজেকে আবিষ্কার করেছি বারডেমের লাশঘরে; ঈর্ষণীয় ভঙ্গিমায় শুয়ে থাকা এক রাজপুত্তুরের পাশে। কিন্তু তিনি আমার সঙ্গে কথা বলছেন না। অথচ কী আশ্চর্য, এই ঘণ্টাখানেক আগে আমার সঙ্গে রাজ্যের আলাপ করলেন। অভিমানী মেয়ের রাগ ভাঙিয়ে এখন কি-না নিজেই অভিমানের আতর মেখে শুয়ে আছেন, চলে গেছেন চিরঘুমের দেশে। এই রাতেই অ্যাম্বুলেন্সের বুকে চড়ে গেছেন নিজের গ্রাম শেরপুরের নকলায়। সকালেই ফিরে এসেছেন রমনা অ্যাপার্টমেন্টের কমপ্লেক্সে। তার পর সবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে গেছেন নিজের ঠিকানায়।

এই সবকিছুই আমার সেই দুঃস্বপ্নের অংশ। আর যাকে ঘিরে এই দুঃস্বপ্ন, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক, দৈনিক সংবাদের সাবেক সম্পাদক বজলুর রহমান। বর্তমানের অনেক পত্রিকার সম্পাদকদের সম্পাদক। খেলাঘরের চিরতরুণ ভাইয়া। তিনি ছিলেন এই দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পাদকদের একজন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ নামের যে পত্রিকা বের হতো, তিনি সেটা সম্পাদনা করতেন। চলনে-বলনে ছিল সি্নগ্ধতার রশ্মি। সদা ফিটফাট, ধীরস্থির; কিন্তু অত্যন্ত শাণিত বক্তব্য।

আমার সেই দুঃস্বপ্নের রাতকে তাড়িয়ে, বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে চাই সেই সময়টাতে, যেখানে বাবা-মেয়ের হরেক রকম বায়না, আছে মমতার বুকজড়ানো গল্প, জীবন যেখানে সাবলীল স্নেহের, ভালোবাসার। তাই তো সবাই মরে গেলেও বাবারা মরে না। জানো, অনেক দিন হলো আমি কোনো স্বপ্ন দেখি না, এমনকি অন্য কোনো দুঃস্বপ্নও না। কারণ, সেই ২৬ ফেব্রুয়ারির দুঃস্বপ্নটি কেমন যেন চোখে মিশে আছে, আমি চোখ মেললেই তা দেখি। তাই তো পালা জীবনে দুঃস্বপ্নের ভার বড্ড বেশি।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়