সুনামগঞ্জ শিল্পকলাএকাডেমীতে হচ্ছে কবি সঞ্জয় স্মারকস্তম্ভ

30

।। সঞ্জিব দে।।

১৩ মে: মহাভারতের প্রথম বাংলা অনুবাদক মহাকবি সঞ্জয়ের স্মারকস্তম্ভ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করা হয়েছে। মহাকবি সঞ্জয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানা না গেলেও তাঁর অনুদিত বাংলা মহাভারতের নিদর্শন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত আছে। গবেষকদের মতে মহাকবি সঞ্জয় ছিলেন সুনামগঞ্জের অধিবাসী। তাহিরপুর উপজেলার লাউড় এলাকা ছিল তাঁর জন্মস্থান। যদিও মহাকবি সঞ্জয়ের রচিত বাংলা মহাভারত এখন বাজারে দুর্লভ। সঞ্জয় লাউড় নামেও এই মহাকবি পরিচিত। মহাকবি সঞ্জয়ের স্মৃতি জাতীয়ভাবে স্মরণ এবং তাঁর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে গবেষণার কাজে উদ্যোগী হওয়ার জন্য শনিবার সন্ধ্যায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তন প্রাঙ্গণে স্মারকস্তম্ভ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম। স্মারকস্তম্ভের নকশা করেন ‘ক্ষেত্র স্থপতি’ নামক স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান।

প্রতিষ্ঠানটির স্থপতি আহমেদ আনহার বলেন, ভূবন বিখ্যাত জাত মহাকাব্য মহাভারতের সর্বপ্রথম বাংলায় অনুবাদ করেন মহাকবি সঞ্জয়। সংস্কৃত ভাষায় রচিত মহাভারতের অন্য কোন ভাষায় এটিই প্রথম অনুবাদ। প্রায় ৫০০ বছর পূর্বে জন্ম নেয়া মহাকবি সঞ্জয় বাংলায় মহাভারত অনুবাদের মাধ্যমে আদি জনক-ভাষা সংস্কৃতের সঙ্গে বাংলা ভাষার সম্পর্ককে আরো ভাব গাম্ভীর্যময় ও দৃঢ় করেন। মহাকবি সঞ্জয়ের সেই প্রয়াসকে এই স্মারকস্তম্ভে স্থাপত্যের ভাষায় প্রতীকায়িত করা হয়েছে। এই স্মারকস্তম্ভে পরষ্পরñেদী  দুটি দেয়াল সংস্কৃত ও বাংলা ভাষার সম্পর্ককে প্রতিনিধিত্ব করে।’

কবি ও গবেষক ড. মোহাম্মদ সাদিকের দাবি, বাংলায় মহাভারতের আদি অনুবাদক সুনামগঞ্জের তাহিরপুর অর্থাৎ লাউড়ের মহাকবি সঞ্জয়। মহাকবি সঞ্জয়ের মহাভারতে লাউড়ের নিপতি রাজা ভগদত্ত এবং সৈন্যবাহিনীকে মহাভারতের যুদ্ধে অংশগ্রহণের পরিচয় পাওয়া যায় এবং তিনি রাজা ভগদত্তকে বহুবার ‘লাউড়-ইস্বর’ বলে সম্বোধন

করেছেন -‘অঙ্গবীর পড়িল সকলে দিল ভঙ্গ’। ত্বরিৎ গমন সব ভীমের আতংক ॥ তাহা দেখি ভগদত্ত ‘লাউড়-ইস্বর’। চড়ি সুপ্রস্তিক হস্তি দাইল সত্বর ॥

সঞ্জয়বিষয়ক এই গবেষণালব্ধ তথ্য বাংলা সাহিত্য চর্চা তথা  মধ্যযুগের সাহিত্যের আদি নিদর্শনসমূহের একটি। অধ্যাপক ড. মুনীন্দ্র কুমার ঘোষ সম্পাদিত কবি সঞ্জয় বিরচিত মহাভারত ১৯৬৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত হয় এবং সেখানে গবেষক কবির পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন -‘সঞ্জয় লাউড়ের এই বরদ্বাজগোত্রীয় বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করেন।’

সঞ্জয় সংক্রান্ত এই গবেষণাকর্ম ভারতে সম্পাদিত হওয়ায় আমাদের দেশে এই বিষয়ক আলোচনা এখনও সীমিত। আমাদের দেশে মহাকবি সঞ্জয়কে নিয়ে আরও গবেষণা আবশ্যক। সুনামগঞ্জের সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রাচীণ ইতিহাস আলো করে দাঁড়িয়ে আছেন মহাকবি সঞ্জয়।

উল্লেখ্য, সিলেট অঞ্চল প্রাচীনকালে যে কয়টি রাজ্যে বিভক্ত ছিল তার অন্যতম লাউড় রাজ্যের রাজধানী ছিল তাহিরপুরের হলহলিয়ায়। এখনও ওখানে রয়েছে প্রাচীন নিদর্শন। হলহলিয়া লাউড় এলাকার নিকটবর্তী। বর্তমান লাউড়েরগড়কে ঘিরে ভারত সীমান্তবর্তী যে বাংলাদেশি ভূখন্ড বিস্তৃত রয়েছে সেখানে শ্রীচৈতন্যের অন্যতম পারিষদ অদ্বৈত মহাপ্রভুর জন্মস্থান। মধ্যযুগীয় বৈষ্ণব সাহিত্যের অনেক অমরকীর্তি এই এলাকায় এবং এলাকার মানুষের হাতে রচিত হয়েছে। প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে সেইসব ঐতিহাসিক নিদর্শন লুপ্তপ্রায়।

জেলা শিল্পকলা একাডেমী’র সম্মুখভাগে শনিবার সন্ধ্যায় মহাকবি সঞ্জয়ের স্মারকস্তম্ভ উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম। এসময় জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. শামছুল আবেদীন, সাংস্কৃতিক সংগঠক অঞ্জন চৌধুরী, রুনা লেইছ, সাংবাদিক পঙ্কজ দে, সাংবাদিক খলিল রহমান, স্থপতি আহমেদ আনহার, জেলা কালচারাল অফিসার আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী পাভেল, জেলা উদীচী’র সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, ডা. এসএমএমএ জব্বার ফারুকী, অ্যাড. প্রসেনজিৎ দে, বাউল শাজাহান, অনিশ তালুকদার বাপ্পু, অরুণ তালুকদার প্রমুখ।