জামায়াত নিয়ন্ত্রণ আরও খর্ব হচ্ছে ইসলামী ব্যাংকে

46

  ।।আবদুর রহিম হারমাছি।।

১৪ মে:দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াইয়ের মধ্যে ব্যাংকটির মানব সম্পদ বিভাগের প্রধানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে জনসংযোগ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা বিভাগের প্রধানকেও।

১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধের জন্য দায়ী জামায়তে ইসলামীর নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংকটিতে সরকারি উদ্যোগে হস্তক্ষেপের পর থেকে গত পাঁচ মাসে রাজনৈতিক দলটির সমর্থকদের সঙ্গে নতুন ব্যবস্থাপনার মধ্যে টানাপড়েন চলছিল।

শনিবার ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সভায় জামায়াত সমর্থক তিন কর্মকর্তার ভাগ্য নির্ধারিত হয় বলে দুজন পরিচালক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন।

তারা জানান, মানব সম্পদ বিভাগের প্রধান (ইভিপি) মাহবুব আলমকে অন্য বিভাগে বদলি করা হয়েছে। জনসংযোগ এবং সিএসআর বিভাগের প্রধানকেও বদলির সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এছাড়া সভায় এবার যাকাতের ৪৫০ কোটি টাকা ব্যাংকের উদ্যোগে সরাসরি বিতরণের পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর যাকাত তহবিলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ইফতারের ১৩ কোটি টাকা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সারা দেশে বিতরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।

ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যানের পদ ছাড়তে অধ্যাপক সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার পর কড়া নিরাপত্তার মধ্যে শনিবার পরিচালনা পর্ষদের সভায় যোগ দেন তিনি।

ভাইস চেয়ারম্যান সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ ভাইস চেয়ারম্যান সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ

বৈঠক শেষে আহসানুল আলম পারভেজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাকে হুমকি দেওয়ার পর গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ ও র্যা ব সদস্যদের নিরাপত্তায় বোর্ড সভায় যোগ দেই। সভায় আমাকে হুমকির বিষয়ে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। এবং আমাকে যথাযথ নিরাপত্তা দিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে অনুরোধ জানানো হয়।”

তিনি বলেন, “ইসলামী ব্যাংক আবারও স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত সমর্থকদের কব্জায় নেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। আমি সেটা ঠেকাতে গিয়েই নানা ধরনের হুমকির মুখে পড়েছি। কিন্তু আমি ভয় পাই না, হাল ছেড়ে দেব না। সব কিছু মোকাবিলা করে জামায়াত-স্বাধীনতাবিরোধীদের এই ব্যাংক থেকে বিতাড়িত করা হবে।”

ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের আরেক সদস্য অধ্যাপক কাজী শহীদুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দুই রাজাকার হুমায়ুন বখতিয়ার এবং অধ্যাপক বোরহানকে পরিচালনা পর্ষদে ফের ফিরিয়ে আনতেই পারভেজ সাহেবকে হুমকিসহ নানা ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। তারা দুজনই জামায়াতে ইসলামীর লোক এবং সাবেক পরিচালক।”

হুমায়ুন বখতিয়ার এখনও ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন বলে জানান শহীদুল আলম।

তিনি বলেন, “সামনে জাতীয় নির্বাচন। জামায়াত সমর্থক রাজাকারা চাইছে নির্বাচনের মাধ্যমে পট পরিবর্তন হলে তারা আবারও ব্যাংকটির দখল নেবে। সে কারণেই নানা ষড়যন্ত্র করছে তারা।”

দেশের কয়েকটি শিল্প গ্রুপ ব্যাংকটির বেশিরভাগ শেয়ার কিনে নিতে চাইছে বলে গুঞ্জন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বড় লোকেরা তো অনেক কিছুই কিনতে চায়। এক্ষেত্রেও চাইতে পারে।”

ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আরাস্তু খান সম্পর্কে শহীদুল আলম বলেন, “চেয়ারম্যান নির্দলীয় লোক। উনি কোনো সমস্যা নয়। আমরা যেমন ব্যাংকটির ভালো চাই, চেয়ারম্যানও তেমনি চান।”

অধ্যাপক কাজী শহীদুল আলম অধ্যাপক কাজী শহীদুল আলম

পরিচালনা পর্ষদের সদস্য শহীদুল বলেন, “ব্যাংকটিতে অনেক দক্ষ কর্মকর্তা রয়েছে। তাদের ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারলে এই প্রতিষ্ঠানটিকে আরও ভালো করা সম্ভব।”

বড় কয়েকটি গ্রুপের ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেনার ‘গুজব’ প্রসঙ্গে সৈয়দ আহসানুল আলম বলেন, “এ বিষয়টি নিয়ে অপ্রচার চালানো হচ্ছে। ধূম্রজাল সৃষ্টি করা হচ্ছে। এটা ষড়যন্ত্রেরই একটা অংশ।”

তিনি বলেন, “আমরা পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব নেওয়ার পরও গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ পদগুলোতে জামায়াতের সঙ্গে সরাসরি যুক্তদের পদায়ন করা হচ্ছিল। এ কাজুটি সুকৌশলে করছিল আরেক জামায়াত সমর্থক মানব সম্পদ বিভাগের প্রধান মাহবুব আলম। সে কারণেই তাকে এ পদ থেকে বদলি করা হয়েছে।”

একইভাবে জনসংযোগ এবং সিএসআর বিভাগের প্রধানদেরও বদলি করা হবে বলে জানান তিনি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, “জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তারা বিজ্ঞাপন খাতে যে বিশাল অংকের অর্থ খরচ করত, তার সিংহভাগই ব্যয় করত স্বাধীনতাবিরোধী ও জামায়াত সমর্থক মিডিয়ার পেছনে। এটা আর হতে দেওয়া হবে না। সে কারণে এখানেও পরিবর্তন আনা হবে।

“সিএসআরের অর্থও একইভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় জামায়াতের লোকজনের পেছনে খরচ করা হত। সেটাও আর করতে দেওয়া হবে না।”

নতুন নিয়োগ, বদলি এবং পদায়ন সবকিছুই এখন কঠোরভাবে মনিটর করা হবে বলে জানান সৈয়দ আহসানুল আলম।

ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে পদত্যাগের জন্য হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে বৃহস্পতিবার জানান সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ, যিনি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যাংকটি পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসছেন।

ব্যাংকটিকে স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে যাওয়া ঠেকাতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “আমাকে বন্দুকের ভয় দেখানো হচ্ছে। আজ (বৃহস্পতিবার) বিকেল ৫টার মধ্যে আমাকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে।”

জামায়াতে ইসলামীর বেশ কয়েকজন নেতার ‘সংশ্লিষ্টতা’ থাকা ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ে কয়েকটি পরিবর্তন হয় গত জানুয়ারিতে। সাবেক সচিব আরাস্তু খান ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান হন, ভাইস চেয়ারম্যান পদে আসেন নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ। সে সময় ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদেও পরিবর্তন আসে।