সরদার ফজলুল করিম :স্বপ্নের অভিযাত্রা জন্মদিনের শ্রদ্ধা

114

মার্জিয়া লিপি

সরদার ফজলুল করিম বলতেন, ‘তোমরা কেউ কমিউনিস্ট না থাকলেও আমি একাই কমিউনিস্ট থেকে যাব মরণের আগেও।’ তার প্রিয় উক্তি ছিল ‘সমাজতন্ত্র, যদি লাগে দশ লাখ বছর তবুও।’ এই প্রতীকী প্রতিজ্ঞায় তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, সমাজের জন্য, সমষ্টির জন্য, দশের জন্য মঙ্গলকর ব্যবস্থায় স্বপ্ন দেখা এবং সেই স্বপ্নের জন্য জীবনব্যাপী আত্মনিবেদনেই ব্যক্তিজীবনের সার্থকতা নিহিত।

অবিভক্ত পাকিস্তান, পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল, মতবাদ ও রাজনীতি সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন প্রবন্ধে, লিখিত বক্তব্যে, প্রকাশিত-অপ্রকাশিত দিনলিপিজুড়ে রয়েছে সরদার ফজলুল করিমের বিভিন্ন আঙ্গিকে নিরপেক্ষ বাস্তবধর্মী বিশ্লেষণ। গ্রিক দার্শনিক ও তাদের মতবাদ নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন ক্লাসিক বইয়ের অনুবাদক ও রচয়িতা ছিলেন তিনি। প্লেটোর সংলাপ, প্লেটোর রিপাবলিক, অ্যারিস্টটলের পলিটিক্স, অ্যাঙ্গেলসের অ্যান্টি ডুরিং, রুশোর সোশ্যাল কনট্রাক্ট, আমি রুশো বলছি :দি কনফেশানস, সেসব দার্শনিক, এক যুগে আর এক যুগোশ্লাভিয়া, রুমির আম্মা ও অন্যান্য প্রবন্ধ, নানা কথা ও নানা কথার পরের কথা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ :আলাপচারিতায় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, চলি্লশের দশকের ঢাকা, স্মৃতিসমগ্র এবং সরদার ফজলুল করিম : দিনলিপি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

সরদার ফজলুল করিম ছিলেন শিক্ষক, বিপ্লবী, জীবনঘনিষ্ঠ দার্শনিক, সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। নিরাপদ জীবন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ইস্তফা দিয়ে বেছে নিয়েছিলেন আত্মগোপনের রাজনীতি, কারাভোগ, অনশন। কারাগার থেকে সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন পাকিস্তান গণপরিষদের। তৃতীয় মেয়াদে কারামুক্তির পর সরদার ফজলুল করিম সরাসরি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত না থেকে আমৃত্যু রাজনৈতিক বিষয়ে পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে তার শ্রেণিকক্ষে, বক্তব্যে, সভা-সেমিনারে রাজনৈতিক ভাবনার প্রতিফলন দেখা যায়। বিভিন্ন গুণগ্রাহী, শিষ্য-ছাত্র-শিক্ষকের লেখায়, প্রকাশনায় এমনকি বক্তব্যেও তার রাজনৈতিক ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সময়ে। বাংলাদেশ ও বিশ্বরাজনীতি সম্পর্কে সরদার ফজলুল করিমের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও ভাবনা-বিশ্লেষণ এ দেশের অসহিষুষ্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক চর্চার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৪৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছাড়ার পর সরদার ফজলুল করিম ফজলুল হক হলে ছিলেন। রক্ষণশীল মুসলিম লীগের উগ্র গ্রুপ মনে করত সরদার ফজলুল করিম কমিউনিজমের বীজ ছড়াচ্ছেন। এই গ্রুপের নেতা খয়ের খাঁর নির্দেশ ছিল তাকে ধরে টেনে হল থেকে বের করে দেওয়ার। এক পর্যায়ে গ্রেফতার এড়ানোর জন্য পার্টির পরামর্শে আত্মগোপনে চলে যেতে হয় তাকে। পরে পার্টির জেলা কমিটির সেক্রেটারিয়েটের সভায় আলোচনার পর তিনি কিছুদিনের জন্য কলকাতায় গিয়ে থাকতে বাধ্য হন। গ্রেফতারের ঝুঁকি এড়াতে প্রচলিত সহজ পথে না গিয়ে ঢাকা থেকে ট্রেনে পাবনার ঈশ্বরদী হয়ে পার্বতীপুর দিয়ে তিনি কলকাতায় পেঁৗছেছিলেন। দেশভাগের সংকটের কারণে অনেক হিন্দু নেতাকর্মী তখন ভারতে চলে গিয়েছিলেন। সরদার ফজলুল করিম তাদের কয়েকজনের সঙ্গে খুব কষ্টে থেকেছেন ছোট একটি ঘরে। কেউ চৌকির ওপরে, কেউবা চৌকির নিচে রাত্রিযাপন করেছেন।

কলকাতায় হঠাৎ একদিন দৈনিক ইত্তেহাদ অফিসে কবি আহসান হাবীবের সঙ্গে তার দেখা হয়। তিনি ছিলেন সরদার ফজলুল করিমের সম্পর্কে বড় ভাইয়ের মতো। বরিশাল জেলা স্কুলে পড়ার সময় থেকে আহসান হাবীবের সঙ্গে পরিচয়-জানাশোনা। পার্ক সার্কাসে কবি আহসান হাবীবের বাড়িতে আশ্রয় নেন তিনি। তবে সরদার ফজলুল করিমের রাজনৈতিক জীবন সে সময়ে আহসান হাবীবের অজানা ছিল। রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইও একই বাড়িতে থাকতেন। বেশ কিছুদিন পর এক শেষ রাতে সাদা পোশাকে কয়েকজন পুলিশ হাজির হয় সে বাড়িতে। ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের পুলিশ আহসান হাবীবকে জানায়, ইস্ট বেঙ্গলের একজন পলিটিক্যাল অ্যাবসকন্ডারকে খুঁজতে তারা এখানে এসেছেন। আহসান হাবীব পলিটিক্যাল অ্যাবসকন্ডার নেই জানালেও পুলিশ বাসা তল্লাশি করে। পরিচয় জানতে চাইলে পুলিশের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, ‘সরদার ফজলুল করিম বরিশালের বিএম কলেজ থেকে বিএ পরীক্ষায় ফেল করেছেন।’ একহারা গড়নের সরদারকে দেখে পুলিশ অফিসারের প্রতিক্রিয়া, ‘নো নো, সরদার ফজলুল করিম ইজ এ বিগ গাই।’ পুলিশ চলে যাওয়ার পর কবি আহসান হাবীবের বাসা থেকে বের হয়ে তিনি অন্ধকারে অজানা গন্তব্যে মিশে যান।

কিছুদিন বিভিন্ন ঠিকানায় অবস্থান শেষে ১৯৪৯ সালের প্রথমদিকে নিজ দেশে ফিরে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায়। কমিউনিস্ট পার্টি ও সরদার ফজলুল করিম_ উভয়েই তখন ঘোরতর প্রতিকূল অবস্থায়। পার্টির আত্মগোপনকারী নেতাদের কাছ থেকে কুরিয়ার কর্মীর মাধ্যমে ছোট চিরকুটে করণীয় বিভিন্ন নির্দেশ আসতো। ১৯৪৯ সালে সংবাদবাহকের মাধ্যমে নির্দেশ আসে_ ‘তুমি পত্রবাহকের সঙ্গে চলে যাও।’ কিন্তু কোথায় যেতে হবে সেটা চিরকুটে উল্লেখ ছিল না। নির্দেশ অনুযায়ী সরদার ফজলুল করিম সংবাদবাহকের সঙ্গে গিয়ে দেখেন জায়গাটা নরসিংদীতে। কিছুকাল ঢাকার গ্রামাঞ্চলে, কৃষকদের সঙ্গে নরসিংদীর চালাকচর, পোড়াদিয়া, সাগরদি, হাতিরদিয়া অঞ্চলে আত্মগোপনে থাকেন। নরসিংদীতে অন্নদা পাল নামে একজন আন্দামান-ফেরত বিপ্লবী ছিলেন। তাছাড়া মনোহরদীর চালাকচরে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ও বারুইরা অর্থাৎ পানচাষিরা কমিউনিস্টপন্থিদের জন্য সহানুভূতিশীল ছিল। পরিচয় গোপন করে তিনি সেখানে অবস্থান করেন। চালাকচরে মুসলমানদের মধ্যে কখনও মজিদ নামে পরিচিত ছিলেন অথবা কখনওবা অশোক নামে কোনো হিন্দু বাড়িতে আশ্রিত হয়েছেন। প্রয়োজনের তাগিদে উভয় সম্প্রদায়ের কিছু রীতিনীতিতেও অভ্যস্ত হয়েছিলেন। অনেকটা পরিবারের সদস্যদের মতো পারিবারিক আবহে চালাকচরে তার আত্মগোপনের দিনগুলো কাটছিল। ১৯৪৯ সালে তিনি মুসলমান বাড়িতে থেকে ছাত্র পড়াতেন। তার পরিচয় বাড়ির যিনি কর্তা শুধু তিনিই জানতেন। অন্যদের কাছে পরিচয় গৃহশিক্ষক। কোনো পরিচিত জায়গায় রাতে থাকতেন না। কখনও কখনও গরুর ঘরেও রাতযাপন করেছেন।

চালাকচরে তিনি যেখানে আত্মগোপন করেছিলেন, সেখানের মানুষ সবসময় তিনবেলা ভাতও খেতে পেতেন না। একবেলা তাদের কম খেতে হতো। কাঁঠালের ফলন সে এলাকায় খুব ভালো হওয়ার কারণে কোনোদিন হয়তো শুধু কাঁঠাল খেয়েই দিন পার করতে হয়েছে। চালাকচরে আত্মগোপনের জীবনকালকে তার জীবনে খুব ‘রোমান্টিক লাইফ’ বলে অভিহিত করেছেন পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন লেখায়।

সে সময়ে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে কমিউনিস্টদের ওপর হামলা শুরু হয়ে যায়। একদিন সে এলাকার অষ্টম শ্রেণি পড়ূয়া এক ছাত্র মজিদ সাহেব নামধারী সরদারকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি ঢাকা শহরের সরদার ফজলুল করিম নামে তাদের একজন বড় নেতাকে চেনেন কি-না? সরদার ফজলুল করিম তাকে বলেন, তিনি তার নাম শুনেছেন, কিন্তু দেখেননি।

১৯৪৯ সালের শেষ দিকে সংবাদবাহকের মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বার্তা আসে, জেলা কমিটির মিটিংয়ে ঢাকায় আসতে হবে। ডিসেম্বর মাসে চালাকচর থেকে সরদার ফজলুল করিম ঢাকায় আসেন। আত্মগোপনে থাকাকালীন একা আসা-যাওয়ায় পার্টির নিষেধাজ্ঞা ছিল। বাহক বা এস্কর্টের সঙ্গে চালাকচর থেকে মাঝে মধ্যে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। সেবার পার্টির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুরান ঢাকায় সন্তোষ গুপ্তের বাসায় তার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। ইতিমধ্যে সরকারের নিষেধাজ্ঞা ও ধরপাকড়ের কারণে নেতৃস্থানীয় অনেকেই গ্রেফতার হয়ে যান। পার্টির জেলা কমিটিতে সে সময়ে এমন একজন প্রয়োজন যে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে পারবেন। কমিউনিস্ট পার্টির সে সভায় সরদার ফজলুল করিম জেলা কমিটির সেক্রেটারি পদে মনোনীত হন।

সন্তোষ গুপ্ত ছিলেন আইজি অব প্রিজনসের কনফিডেন্সিয়াল ক্লার্ক। সন্তোষ গুপ্তের বাড়িটা ছিল ক্যামুফ্লেজের মতো। রাতের বেলায় গোপনে পার্টির বিভিন্ন সদস্য আসা-যাওয়া করতেন সে বাড়িতে। কমিউনিস্ট পার্টিকে সরকার তখনও বেআইনি ঘোষণা করেনি; কিন্তু সংগঠনের নেতাকর্মীরা পুলিশের নজরদারির তালিকায় ছিল। সরকারের নির্দেশে সে সময়ে একের পর এক কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কারণেও অনেককে গ্রেফতার করা হয়। শিক্ষক ও অঙ্কবিদ সুকুমার চক্রবর্তী ও ফণী গুহ নামে একজন বড় নেতাও সে সময়ে কমিউনিস্ট কর্মীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার জন্য গ্রেফতার হন।

সরদার ফজলুল করিম মনে করতেন, পুরো জীবনটাই লাভের_ ১১ বছরের জেলজীবন, ৫৮ দিনের অনশন, বিলেতের বৃত্তির আমন্ত্রণপত্র ছিঁড়ে ফেলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাওয়া_ এসব অভিজ্ঞতার কোনো কিছুই তার হিসাবে লোকসান নয়। তার স্বপ্ন, আদর্শ আর কর্মের প্রবহমানতায় নিশ্চিতভাবে আমাদের সমাজ ও প্রজন্ম অগ্রসর হবে আশা আর বিশ্বাসের মৃত্যুঞ্জয়ী অভিযাত্রায়।