‘তাইন তো প্রধানমন্ত্রী, কিতা কইবা হুনতাম’

43

দীপক চৌধুরী

২৯ এপ্রিল:  ‘সুনামগঞ্জের সবগুলো হাওর তলিয়ে গেছে’- এই শব্দগুলো আমরা এক বাক্যে লিখতে পারি। কিন্তু ক্ষুধার্ত কৃষকদের অসহায়ত্ব এক-দুই পাতায় লিখে বুঝানো যাবে না। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা-গ্রামে সরেজমিনে যা দেখা গেছে, সেই সত্য তথ্যটি হচ্ছে- সরকারি মূল্যে চাল নেওয়ার জন্য লম্বা লাইনে কয়েক হাজার কৃষক দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু তারা জানেন না, সবাই চাল নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন না। মাত্র দুশজনকে দেওয়া হবে। বাকিদের খালি হাতে ফেরত যেতে হবে। দিরাই থানার বোলনপুর এলাকার কপর্দকশূন্য কৃষক বুলবুল মিয়া। ২৬ এপ্রিল ভোরে দাঁড়িয়েছিলেন লাইনে। এদিন দুপুরে দেখলেন, তার মতো শত শত মানুষকে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। লাইনের শুরুর দিকের মাত্র ২শ জন চাল পেয়েছেন। রিক্তহাত দেখিয়ে কাঞ্চন বিবি জানালেন, ‘আমরা কিতা খাইমু, কই যাইমু।’ এর কোনও উত্তর নেই।

ওএমএস চালু হয়েছে। খোলা বাজারে চাল দেওয়ার গল্প কৃষকদের জন্য আরও কষ্টের। এতে শরীরকে বোঝাশূন্য করে না, বাড়ায়। এ যেন অসহায়দের নিয়ে এক ধরনের নিষ্ঠুর তামাশা। লাইনে দাঁড়িয়ে ১৫ টাকা কেজি দরে পাঁচ কেজি চাল, ১৭ কেজি দরে পাঁচ কেজি আটা কেনা যায়। একথা জানালেন একই এলাকার ঋণগ্রস্ত কৃষক। কিন্তু তাদের অসহায়ত্বের খবর প্রশাসন রাখে না। এমন অভিযোগ তার।

জামালগঞ্জের কয়েকজন ডিলারের সঙ্গে কথা বললে জানা যায়, মানুষের চাপ সামলানো যাচ্ছে না। তারা বিকল্প পথও পাচ্ছেন না। সরকারের উপরমহল থেকে যে পরিমান চাল-আটা দেওয়া হচ্ছে এতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা আস্থা হারাচ্ছেন তাদের প্রতি।  ওই বাজারে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম তাদের কথা। একথাও স্বীকার করলেন, মানুষের প্রত্যাশার তুলনায় ২০ ভাগও সাহায্য দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

জানতে চাইলে জেলা খাদ্য  নিয়ন্ত্রক  মোহাম্মদ আব্দুর রউফ বলেন, খাদ্য বিক্রয় কেন্দ্র এবং চাল-আটা বিক্রির পরিমান বাড়াতে মন্ত্রণালয় থেকে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। আমরা মন্ত্রণালয়ের কাছে বিষয়গুলো লিখেছি।  অপর এক প্রশ্নের জবাবে জানান, খাদ্য পর্যাপ্ত রয়েছে জেলায়।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কামরুজ্জামান জানান, বিক্রয় কেন্দ্র বাড়ানোর বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে সিদ্ধান্ত আসেনি।  সুনামগঞ্জে বিক্রয় কেন্দ্র মোট ৪২টি। এরমধ্যে ১১টি উপজেলায় তিনটি করে বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে। এতে ৩৩টি কেন্দ্র থেকে চাল-আটা দেওয়া হচ্ছে। সুনামগঞ্জ পৌরশহরে ৯টি। সুনামগঞ্জের তিনজন সংসদ সদস্য জানান, বিক্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা অপ্রতুল।  প্রত্যেক ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে বিক্রয় কেন্দ্র চালু হলে কৃষকদের কিছু উপকার হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক  জেলার আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্য আমাকে বললেন, মিডিয়ায় বলা আর হা-হুতাশ করা ছাড়া কোনও উপকার করতে পারছি না আমরা, কৃষকরাও মনে মনে ক্ষুব্ধ আমাদের প্রতি। তবে আশার কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোববার সুনামগঞ্জ আসছেন। তিনি স্বচক্ষে এখানকার অবস্থা দেখবেন, সিদ্ধান্ত জানাবেন, পরামর্শ দেবেন।

ফসল হারিয়ে দিশেহারা সুনামগঞ্জের প্রায় ১২ লাখ কৃষক পরিবার। কিন্তু কোনোভাবেই সরকারি হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতা মিলছে না। সরকারের দায়িত্বশীল মহল কিভাবে বা কোন ‘ক্রাইটেরিয়ায়’ ৩ লাখ ৩০ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করলেন। সরেজমিন ঘুরে কৃষকের দুঃখ-কষ্ট দেখার পর আমার এ প্রশ্ন ছিল- সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার কাছে। ভিজিএফ কার্ডসহ বিভিন্নভাবে নাকি এ তালিকা করা হয়েছে। জেলার বড় কর্মকর্তারা মুখ খুলছেন না এ তালিকার ব্যাপারে। আসলেই কি এটা ইচ্ছাকৃত?

শাল্লা উপজেলার সরষপুর গ্রামের অসহায় কৃষক অভিমানের সুরে আবদুল্লাহ জানালেন, তাদের তো পদে পদে দুর্গতি। নিরর্থক বাঁচার চেষ্টা করছেন তারা। কোনও আশা-ভরসা নেই চোখের সামনে। ঘরে নিয়ে চুলা দেখালেন। এই চুলা জ্বলছে না দুদিন ধরে। প্রতিবেশির দেওয়া পান্তাভাত খেয়ে কাটিয়েছেন দুদিন। তিনি জানালেন, আমার মতো হাজার হাজার কৃষক পরিবারেরই সবকিছু নির্ভর করতো বৈশাখে ঘরে তোলা বোরো ফসলের ওপর। রমজান-ঈদের খরচ, খোড়াকি (খাবার), সংসারের সদায়, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ এই ধানের ওপর। ফসল ফলানোর আগে কেরোসিন-সার-কীটনাশক  বাকি নিয়েছি, মহাজনের কাছ থেকে ‘সুদি’ নিয়েছি টাকা। টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল ফসল ঘরে তুলে ধান বিক্রি করে। এখন এগুলো পরিশোধ করবেন কিভাবে এমন প্রশ্ন ওই কৃষকের। একই উপজেলার শ্বাসকাই গ্রামের আরেকজন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মোহাম্মদ জলিল। চার সন্তান নিয়ে সংসার। একমাত্র ভরসা এই বোরো ধান। হয়েছিল চমৎকার ফসল। কিন্তু সব ফলন গেছে পানির নিচে। কাঁচা ধান কাঁচি চালাবেন কিভাবে? চোখের সামনে পানিতে তলিয়ে গেছে হাওর। গরু বিক্রি করবেন বলে নিয়ে গিয়েছিলেন হাটে। দাম অর্ধেক ওঠেনি। এরপরও গরুগুলো বেঁচে এসেছেন। এদের তো খাদ্য দিতে হয়। পাবেন কোথায় গোখাদ্য- এ প্রশ্ন তার।

গবাদিপশুর জন্য খড় নিয়ে এসেছেন দিরাই উপজেলার ধল গ্রামেরই এক ব্যক্তি। তার নাম কালা মিয়া। জমি বিক্রি করে টাকা পরিশোধ করবেন আষাঢ় মাসের প্রথম সপ্তাহে। উপজেলার ধলআশ্রম গ্রামের কৃষক আইদুল্যা মিয়া। তার প্রশ্ন টেলিভিশন-রেডিও-পত্রিকায় সরকারি সাহায্যের কথা জোরেসোরে বলা হচ্ছে বাস্তবে এর ছিটেফোটাও মিলছে না- এ অভিযোগ করে প্রস্তাব করলেন,  জেলা-উপজেলার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা ‘দেখভাল’ না করলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা সাহায্য সহযোগিতা পাবে না। প্রধানমন্ত্রী সবরকম সহযোগিতা দিচ্ছেন বলে শুনেছি। উপজেলার ভাইটগাঁয়ের মুক্তিযোদ্ধা সুকলাল দাস রায় জানালেন, এবছরের মতো কখনও নিরুপায় হয়ে পড়েননি। মানুষ ক্ষুধার কথা মুখ খুলে বলতে পারবে, হয়তো কষ্ট করে বাঁচবে। কিন্তু  গোবাদিপশুর খাদ্য আমরা কোথায় পাবো। এই সাহসী মুক্তিযোদ্ধা উচ্চারণ করলেন, ‘হুনছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমরারে দেকতে শাল্লা আইবা, তাইন (তিনি) কিতা কইন হুনতাম। কিতা কইবা হুনতাম।’

পাহাড়ি ঢলে ডুবে গেছে বোরো ফসল। ভেঙেছে লাখো কৃষকের স্বপ্ন। ফসলহানিতে হাওরপারের মানুষ এখন দিশেহারা। হাওরে এখন শুধুই হাহাকার। ধান গেছে, মাছ মরেছে। মাছের মড়ক, হাসের মড়ক হাওরবাসীকে পঙ্গু করে দিয়েছে।  সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওর এলাকার কৃষকদের দুঃখগাথা শোনার কী কেউ আছে। এই প্রশ্ন তাহিরপুরের ব্রজলাল দাসের। তার সামনে দাঁড়ানো কাঁচা ধানের আঁটি হাতে এক নারী আক্ষেপ করে বললেন, ‘এই ধান পাকলে হইতো সোনার ধান, দাম পাইতাম। অঙ্খা (এখন) চুচা (ধানের ভেতর চাউলের পরিমান খুবই কম) ধান লইয়া কিতা করমু’।

এখান থেকেই দেখা গেলো, হাওরের এক মাথায় কাটা হচ্ছে কাঁচা ধান। বিষণ্ন মনে বসে আছেন একদল কৃষকের স্ত্রী-সন্তান। কাঁচা ধানের পাশে মন খারাপ করে বসে আছেন এক তরুণ। কোমরের গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললেন, হাওরের শতকরা ৯০ ভাগ বোরো ফসল তলিয়ে  গেছে। সরকারি সাহায্য ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা পাবে না বলে তার বদ্ধমূল ধারণা। বললেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ নির্মাণকাজে সীমাহীন অনিয়ম-গাফিলতি-দুর্নীতির কথা এখন অনেকেই জানে। কিন্তু তাদের আদৌ শাস্তি হবে কিনা এ নিয়ে সংশয় আছে কৃষকদের। পাউবো ডুবিয়েছে, ঠিকাদার দুর্নীতি করেছে- ফলে কৃষকের ‘প্রাণ’ গেছে- এরকমই মূল্যায়ন ওই তরুণের। সুনামগঞ্জ শহরের কয়েকজন ব্যবসায়ী ‘কালীবাড়ি’ এলাকায় বসে সন্ধ্যার পর অলস সময় কাটাচ্ছিলেন। সাংবাদিক জেনে চা-বিস্কিট দিয়ে আপ্যায়নের সময় তাদের অভিযোগের কণ্ঠ-  জেলায় সীমাহীন দুর্নীতি হয়েছে পানিউন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ নির্মাণ কাজে।

১৪২টি হাওরের প্রতিটি বাঁধে এ দুর্নীতি হয়েছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুনামগঞ্জের একজন ঠিকাদার মন্তব্য করেন। তার বক্তব্য সরকারি দলের পরিচয়ে পাউবোর ঠিকাদারদের কেউ কেউ  দিনকে রাত করেছে।

হাওরে কয়েকদিন ধরে মাছের মড়ক লাগার বিষয়ে এবার পরিসংখ্যান দিয়ে মৎস ও প্রাণি সম্পদ অধিদফতর এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত কয়েকদিনে হাওরের পানিদূষণে ১ হাজার ২৭৬ টন মাছ মারা গেছে। যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৪১ কোটি টাকা।  জেলে ও কৃষকরা বলছেন,  প্রকৃতপক্ষে পাঁচ হাজার টন মাছ মরেছে। কমপক্ষে হাজার কোটি টাকার ক্ষতি।  মৎস ও প্রাণি সম্পদ অধিদফতর বলেছে, মারা গেছে ৩ হাজার ৮৪৪টি হাঁস। কৃষকরা দাবি করেছে প্রায় ৫০ হাজার হাঁস মরেছে। মাছের মড়কে কৃষক ও জেলেরা সবচেয়ে উদ্বিগ্ন। খোলা পানিতে মাছ ধরেন বর্ষায়। হাওরের মানুষ তারা। মাছের পোনাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মিঠাপানির মাছ মারা যাওয়ায় তারা এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। ‘দেখার হাওরের’ তীরের বাসিন্দা একাধিক জেলে জানালেন, তাদের মৎস্য সমবায় সমিতির সদস্যরা চরম দুশ্চিন্তায় মাছের মড়কে। দিরাইয়ের শয়তানখালি পঞ্চম খণ্ড নদীর ইজারা নিয়েছিলেন মাছরাঙ্গা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সদস্যরা। এর সভাপতি রাধা বিশ্বাসের সঙ্গে কথা হয়  সুনামগঞ্জে। তারা মূলত নিম্ন আয়ের মানুষ। জানালেন, মাছের মড়ক লাগায় সামনের বছরে মাছ পাওয়া যাবে না। এখন ডিম  দেওয়ার সময় মিঠাপানির মাছের। কিভাবে আমরা বাঁচবো এখন, জানি না। পেশা মাছ ধরা ও বিক্রি করা। ফসলি হাওরে এখন শুধু পানি আর পানি। কিন্তু এ পানিতে মাছ নেই। জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছিল। শতকরা ৯০ ভাগ আবাদ পানিতে তলিয়ে গেছে।  এরমধ্যে সিংহভাগই ছিল কাচা বোরো ধান।