হাওর দূর্যোগ : সংকটে গৃহস্থরা

84

এ লেখাটি ফেইসবুক থেকে নেয়া। লিখেছেন জগন্নাথপুর উপজেলার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট লেখক মুক্তাদির  আহমেদ মুক্তা। বর্তমান অবস্থায় প্রাসঙ্গিক বিবেচনায়  লেখাটি বিলেতবাংলা পাঠকদের জন্য সংযোজিত হলো।-সম্পাদক।17629864_10155069896405053_252682671458823559_n

।।মুক্তাদির  আহমেদ মুক্তা।।

হাওর অঞ্চল বরাবরই দূর্যোগ প্রবন এলাকা।এ অঞ্চলের মানুষ দূর্যোগের সঙ্গে যুদ্ধ করেই বাঁচে।কিন্তু এবারের দূর্যোগ এতোটা ভয়াবহ মানুষ জীবনের প্রতি আস্থা হারিয়ে অনেকটা দিশেহারা।সংবাদ মাধ্যমের বদৌলতে হাওরের সংকট এখন জাতীয়ভাবে অনেকের দৃষ্টি কেড়েছে।সরকারও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নানামুখী সাহায্য, প্রনোদনার ঘোষণা দিয়েছেন।মহামান্য রাষ্ট্রপতি দূর্গত এলাকা সফর করেছেন।মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও আসার ঘোষণা দিয়েছেন।বুঝা যাচ্ছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে হাওর সংকট বিবেচনা পাচ্ছে।এ লক্ষ্যে কিছু তৎপরতাও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এটা আশার কথা।কিন্তু সংকট উত্তরনে দূর্গতদের সাহায্য দানের সনাতনী পদ্ধতিতে ভূক্তভোগীরা আস্থা রাখতে পারছেন না। এ কদিনে বেশ কয়েকটি হাওর এলাকা ঘুরে মানুষজনের সঙ্গে আলাপ করে যা মনে হয়েছে।মানুষের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা না হলে এ অঞ্চলের মানুষদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পরবে। ক্ষতিগ্রস্থতদের তালিকা নিয়ে যেনো স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ আর দুর্বৃত্তপনা না হয় তা নিশ্চিত করা জরুরী।পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্থ নির্ধারনের মাপকাঠি নিয়েও ভাবতে হবে। সকল এলাকা সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি, সকল এলাকা শুধু এক ফসলী এলাকা নয়। উপজেলা আর ইউনিয়নের বরাদ্দের চিন্তা না করে দূর্যোগের ভয়াবহতা চিন্তা করে কর্মসূচি নির্ধারণ করা বাস্তবসম্মত হবে।17626692_10155070370610053_1672109113843062707_n

হাওর এলাকায় এই মুহুর্তে সবচেয়ে সংকটের শিকার মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্য বিত্তরা। হাওর এলাকার বেশীর ভাগ স্বচ্ছল গৃহস্থ নিজের জমি চাষ করেন।এই জমির আয়ের উপর নির্ভর করে সন্তানদের লেখাপড়া করান,সামাজিক আচার অনুষ্ঠান সামলে জীবিকা নির্বাহ করেন।ছোট বড়ো গৃহস্তের সংখ্যা হাওর অঞ্চলে সিংহ ভাগ।এরা একবার ক্ষতিগ্রস্থ হলে জায়গা জমি বিক্রি করে বা ধার কর্জ করে সংকট উত্তরনের চেষ্টা করেন।বছরের পর বছর দূর্যোগে এই গৃহস্থরা এখন সবচেয়ে বেশী নাজুক অবস্থায়। নিজের সামাজিক অবস্থান চিন্তা করে না পারেন কারো কাছে সাহায্য চাইতে না পারেন রিলিফের লাইনে দাঁড়াতে। দিনমজুর বা দুঃস্থরা সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় কোনো না কোনো ভাবে উপকার ভোগী।এরা অধিকাংশ নির্ভেজাল কৃষক নন।সময়োপযোগী পেশায় জড়িয়ে জীবন রক্ষা করেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ধর্না দিয়ে এরা সরকারী তালিকায় নাম অন্তর্ভূক্ত করে কিছুটা হলেও ক্ষতি পোষিয়ে নিচ্ছেন।কিন্তু গৃহস্থরা ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা ক্ষতিগ্রস্থের তালিকায়ও নিজেকে অন্তর্ভূক্ত করছেন না লোক লজ্জার ভয়ে। ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের প্রনোদনা বিভিন্ন ভাবে অন্য পেশার লোকজন হাতিয়ে নেয়।কত ভাগ কৃষক ব্যাংক ঋণ নিয়ে চাষবাস করেন। প্রকৃতপক্ষে ব্যাংক ঋণ মওকুফের সুফল ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা পায় না। এর সুফল পায় পক্ষান্তরে ব্যবসায়ীরা ।স্বচ্ছল কৃষকদের প্রনোদনার আওতায় এনে সংকট উত্তরনের টেকসই সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।যারা বছরের পর বছর ভর্তুকি দিয়ে নিজের জমি জিরাদ বংশ পরস্পরায় রক্ষা করে চলছেন সেই গৃহস্থরা কোথায় যাবেন?কার কাছে বলবেন?এটা ভাবনার বিষয়।এমন অনেক পরিবার যারা প্রতিনিয়ত নিকটাত্মীয়দের নানাভাবে সহযোগিতা করেন,দান খয়রাত করেন,ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান,শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৃষ্টপোষকতা করেন এখন এরাই অসহায়। কারো কারো বিকল্প আয় থাকলেও যারা শুধু কৃষির উপর নির্ভরশীল সেই পরিবার গুলো এখন গভীর অনিশ্চয়তায়।বছর ব্যাপী শ্রমিক রেখে চাষবাস করান আবার মৌসুমি শ্রমিক নিয়ে ফসল ঘরে তুলেন। অনেকেই অগ্রিম টাকা দিয়ে এসব সামলান। আবার আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি কেনে ধানের জন্য বিনিয়োগ করেন।এই মানুষগুলো কিভাবে ঘুঁরে দাঁড়াবে।অনেকেই ছেলে মেয়েদের শহরে রেখে লেখাপড়া করান,আবার অনেকেই নিজেরাও কাছের শহরে থেকে কৃষিতে বিনিয়োগ করে সংসার চালিয়ে নেন।এরা এখন সবচে বেশী দুর্দশাগ্রস্ত। এই গৃহস্থদের কিভাবে প্রনোদনার আওতায় নিয়ে এসে কৃষি অর্থনীতি বাঁচিয়ে রাখা যায় সেই ভাবনার এখনই উপযুক্ত সময়।এই শ্রেণী ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে অস্তিত্ব হারালে পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর মারাত্বক প্রভাব পড়বে।বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের চিন্তা ভাবনা সময়ের দাবী।17760194_10155086467065053_1038629246564348684_n