অনেক ধোঁয়াশা থেকে গেল

58

আবুল মোমেন

হেফাজতে ইসলামের মূল ঘাঁটি চট্টগ্রাম। তাদের বিরোধী আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতেরও শক্ত অবস্থান চট্টগ্রামে। চার বছর আগের প্রতিকূল অবস্থা কাটিয়ে হেফাজত এখন সরকারের, অন্তত সরকার প্রধান ও তাঁর কোনো কোনো ঘনিষ্ঠ নেতাদের আস্থায় রয়েছে। কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রিকে সাধারণ ধারার সর্বোচ্চ অর্থাৎ – স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমমানের বলে স্বীকৃতি দিতে সম্মত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তড়িঘড়ি করে এ বিষয়ে সরকারি প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়েছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রির এই স্বীকৃতি দিতে সম্মত হয়েছিল। সে সময় তারা অবশ্য প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক ও আইনগত কাজ সম্পন্ন করতে পারে নি। তবে বোঝা যাচ্ছে দেশের প্রধান দুই দলই এ বিষয়ে একমত।

আমরা জানি বাংলাদেশে শিক্ষায় সর্বোচ্চ স্নাতকোত্তর এবং এর ওপরের (যেমন পিএইচডি) ডিগ্রি দেওয়ার বৈধ প্রতিষ্ঠান হল বিশ্ববিদ্যালয় অন্তত এতকাল তাই ছিল। পুরোনো পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে চলে, তাদের স্বায়ত্বশাসনের অধিকার থাকলেও কিছু নিযন্ত্রণ আছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু কওমি মাদ্রাসাকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির ব্যবস্থা ছাড়া। পত্রিকা মারফৎ জানা গেছে বিভিন্ন ধারার কওমি মাদ্রাসাগুলো মিলে তড়িঘড়ি করে একটি বোর্ড গঠন করেছে যেটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পরীক্ষা গ্রহণ করবে ও সনদপত্র দেবে।

সরকারের সাথে সমঝোতার ফলে উচ্চতর ডিগ্রি প্রদানের জন্যে গঠিত এই বোর্ডের ক্ষমতায়ন করবে সরকার। কিন্তু যথাযথ অ্যাকাডেমিক ও মানবসম্পদের ব্যবস্থাপনা ছাড়া এর মর্যাদা ও কার্যকারিতা কি প্রশ্নসাপেক্ষ থাকবে না? বোর্ডকে পরীক্ষা দেওয়ার মত ক্ষমতাও না হয় সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে দিতে পারবে, কিন্তু উচ্চতর ডিগ্রির সাথে জ্ঞানচর্চার যে উচ্চতা, তার জন্যে যে আয়োজন ও সক্ষম ব্যক্তিবর্গের প্রয়োজন তা কখন কীভাবে পূরণ হবে এসব বিষয় ধোঁয়াশায় থেকে গেল। কওমি ধারার মাদ্রাসাগুলো যেহেতু সরকারের কোনো রূপ তদারকি বা হস্তক্ষেপ ছাড়া নিজস্ব নিয়মে ও আওতায় চলছে তাই এ সংক্রান্ত তথ্যগুলো সাধারণভাবে মানুষের জানা নেই। তাদের শিক্ষার মান, শিক্ষকবৃন্দের যোগ্যতা ইত্যাদিও কোনো পাব্লিক বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের তদারকিতে নেই।

কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় তারা যতই সরকারে প্রতিনিধিত্ব, তদারকি মুক্ত থাকতে চান না কেন ডিগ্রিটি যেহেতু প্রকাশ্যে দেওয়া হবে, এই ডিগ্রিপ্রাপ্তরা সমমানের ডিগ্রিপ্রাপ্তদের সাথে চাকুরির দৌড়ে থাকবেন তাই এসব আর আড়াল বা নিরঙ্কুশভাবে তাঁদের আওতায় থাকবে না। সনদপ্রাপ্ত ছাত্ররা চাকুরিপ্রার্থী হলে তাঁদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান এবং সেই সূত্রে ব্যবস্থাপনার তথ্যাদি জনগণের যাচাইয়ের মুখোমুখি হবে। তাঁদের নিজস্ব বোর্ডের স্বীকৃত  এই ডিগ্রি সরকার মানবেন, কিন্তু এর বাইরে – দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক মহল? সে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের সব স্তরের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকার জাতিসঙ্ঘের সহ¯্রাব্দ লক্ষ্য পূরণে সফল হয়েছে কিন্তু টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য বা এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে বেশ সমস্যায় রয়েছে। কারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে মান অর্জনই মূল লক্ষ্য তথা মূল চ্যালেঞ্জ। আমাদের প্রাথমিক থেকে এম. এ. পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই মানের সংকট চলছে। দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই আন্তর্জাতিক রেটিঙে পাঁচশর মধ্যেও নেই। আমাদের গবেষণায় বিশ্বমানের অর্জন বিশেষ নেই। ইসলামি ধারাতেও নেই। এখন দরকার শিক্ষাকে গোড়া থেকে গুছিয়ে নেওয়া, সব ধারার শিক্ষার বুনিয়াদ শক্তিশালী করা, প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রন্থাগার, লাইব্রেরিসহ সবরকম সুযোগসুবিধা বাড়ানো ও এগুলোর ব্যবহার নিশ্চিত করা, শিক্ষকদের উপযুক্ত শিক্ষা ডিগ্রি প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা। এসব বিষয় উপেক্ষা করা হলে আখেরে লাভ বিশেষ হবে না।

শিক্ষার মূল কাজ জ্ঞানার্জন, ডিগ্রি ও সনদপত্র অর্জন নয়। এ ডিগ্রি ও সনদ হল জ্ঞানার্জনের ফলাফল। কিন্তু আমাদের সমাজে প্রকৃত জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানচর্চা ভীষণভাবে উপেক্ষিত আজ। ব্রিটিশ আমলে মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত এক কমিটির একজন সদস্য দু:খ করে বলেছিলেন, আমাদের মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষার আধেয় ও ব্যবস্থা বাদশাহ আলমগীরের আমলে পড়ে আছে। তাঁর কথা সেদিন শোনা হয় নি। তবে বিভিন্ন সময়ে আলিয়া ও সাধারণ মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার হয়েছে। এ ধারার অধিকাংশ মাদ্রাসায় গ্রন্থাগার ও বিজ্ঞান গবেষণাগার, কম্প্যুটার ল্যাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যদিও সব ধারার প্রতিষ্ঠানের মতই এখানেও এসবের ব্যবহার সীমিত এবং ডিগ্রিসনদ ও মুখস্থবিদ্যার বাইরে সত্যিকারের জ্ঞানচর্চা হচ্ছে না। ফলে সেদিক থেকে হয়ত বলা সম্ভব অন্য দশটা ধারার মতই ওরাও চলবে।

তাতেও অবশ্য সমস্যা মেটে না। কারণ ইতোমধ্যে সংবাদপত্রে যেসব তথ্য বেরিয়েছে তাতে দেখা যায় জঙ্গিদের একটি বড় অংশ কওমি মাদ্রাসা থেকে এসেছে। এরকম অভিযোগ বাড়তে থাকলে সরকার কতদিন চুপ করে থাকতে পারবে? যে কোনো সরকারের বড় দায় হল  দেশে আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখা, শান্তি বজায় রাখা। বর্তমান সরকারের একটি ঘোষিত নীতি হল জঙ্গিবাদের ব্যাপারে  শূন্য সহিষ্ণুতা বা জিরো টলারেন্স। এ অবস্থান দেখিয়েই পশ্চিমা পুঁজিবাদী বিশ্বের সমর্থন আদায় করছে সরকার। ফলে এ ক্ষেত্রে সবটাই যে সরকারের হাতে আছে তা-ও নয়।

কিন্তু মোদ্দা যে কথাটা ধোঁয়াশা হিসেবে থেকে গেল তা হল তাড়াহুড়ার মধ্যে গঠিত বোর্ডই কি স্নাতকোত্তর ডিগ্রিটা দিচ্ছে?

এতকাল ডিগ্রি ও  স্নাতকোত্তর ডিগ্রি কোনো স্বীকৃতি বিশ্ববিদ্যায় থেকেই নেওয়া যেত, বোর্ড  স্নাতকের নিচের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাব্লিক পরীক্ষার সনদ দিতে পারত। এই যে কওমি মাদ্রাসার উদ্যোগে গঠিত বোর্ড ডিগ্রি ও সনদ দেবে তার স্বীকৃতি তারা দেবে, কিন্তু অন্যরা কেন দেবে সেটা পরিস্কার নয়। আদতে এম. এ. ডিগ্রির স্বীকৃতি ও মর্যাদা আদায় করতে হলে কওমি মাদ্রাসাকে কিছু চাহিদা পূরণ করতে হবে। শিক্ষকদের স্বীকৃত এম. এ. ডিগ্রির প্রশ্ন উঠবে, শিক্ষকদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষণা ও গবেষণালব্ধ ডিগ্রির প্রশ্ন উঠবে, প্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত পাঠাগার, গবেষণাগার থাকা দরকার, নিয়মিত সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হওয়া প্রয়োজন। জ্ঞানের আদান-প্রদানের ব্যবস্থা থাকা চাই। এসব তো একলা চলো রে কিংবা আলাদা চলার নীতিতে অটল থাকলে করা সম্ভব হবে না। ডিগ্রি যেহেতু প্রকাশ্যেই দিতে হবে, এর প্রক্রিয়াটিও প্রকাশ্যই হতে হবে এবং এ নিয়ে নানা মহলের মূল্যায়ন, আলোচনা, সমালোচনাও শুনতে হবে। গঠনমূলক আলোচনা সমালোচনাকে স্বাগতও জানাতে হবে। তবে সবকিছুর আগে দশ লক্ষ ছাত্রকে যে স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে তার মর্যাদা ও বৈধতার প্রশ্নটি ভালোভাবে সমাধান করতে হবে। প্রশ্নবিদ্ধ ডিগি, কিংবা নিজস্ব একটি সনদপত্রের মূল্য সমাজে বা আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিষ্ঠিত হবে না।

ধোঁয়াশামুক্ত হয়ে পুরো বিষয়টি বোঝার জন্যে ভবিষ্যতের দিকেই তাকাতে হবে আমাদের।