বোরখা, নেকাব পর্দা: সংস্কৃতি না ধর্ম

137

রফিকুল হাসান খান

সম্প্রতি পর্দার নামে মহিলাদের পৃথকীকরণ এবং নেকাব বোরখার প্রচলন বেড়েই চলেছে।  শুধু মুসলিম দেশগুলোতে নয় পশ্চিমের পথেঘাটে বোরখা নেকাবের ছড়াছড়ি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মহিলাদের পৃথকীকরণ। ঐ প্রবণতা ব্যক্তিগত পছন্দ বা অপছন্দ নির্ভরশীল কোনো কার্যক্রম হলে কোনো আলোচনার বিষয় হতো না, এর  পেছনে ধর্মীয় অনুশাসন এবং ফতোয়া কাজ করছে বলে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বোরখা, নেকাব এবং পৃথকীকরণ ধর্মীয় নির্দেশনা, না কোনো গোত্র বিশেষের প্রচলিত বা সৃষ্ট সংস্কৃতি সেটা ঐতিহাসিকভাবেই বিশ্লেষণ করা দরকার। এর মধ্যে কতটুকু ধর্ম আর কতটুকু পরম্পরায় মহিলাদের উপর চাপিয়ে দেয়া পুরুষ শাসিত সমাজের অনুশাসন তা নিয়ে ভেবে দেখার সময় এসেছে।

প্রতিটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর মহিলা সমাজকে ধর্মের দোহাই দিয়েই অন্তপুরে আবদ্ধ করে রাখার প্রবণতা ছিলো এবং এখনো আছে। কিন্তু শিক্ষা, বিশ্লেষণ এবং সচেতনতার মাধ্যমেই অনেক সমাজ এই প্রবণতা যুক্তির মাধ্যমেই তিরোহিতের পথে। অথচ মুসলিম সমাজে কতিপয় দেশ ও সঘোষিত ধর্মীয় নেতাদের ফতোয়ার ফলে পেছনে টেনে নিয়েই যাচ্ছে মহিলাদেরকে। অথচ ইতিহাস দেখলে আমরা দেখি এই নতুন প্রবণতার সঙ্গে,এই পৃথকীরণের ফতোয়ার প্রচেষ্টার সঙ্গে ধর্মীয় প্রকৃত ঐতিহ্যের প্রচুর গড়মিল।

ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি হজরত মুহাম্মদ(সা:আ ) বিবি খাদিজার ব্যবসা দেখাশোনা করেছিলেন আল আমিন বা বিশ্বস্ত কর্মচারি হিসেবে। উনার কনিষ্ঠ স্ত্রী বিবি আয়েশা শুধু একজন ধর্মীয় বিশেষজ্ঞই ছিলেন না উটের পিঠে চড়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। ১৪ শতকে সিরিয়ান একজন আলেম ফাতিমা আল বাথিয়ার ধর্ম বিষয়ে বক্তৃতা শোনবার জন্য মদিনার মসজিদ আল নববীতে জমায়েত হতেন পুরুষ মহিলা বহু মুসল্লি। নবীজীর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে উনি বক্তৃতা করতেন যেখানে পুরুষ মহিলাদের বসবার কোন পৃথক  জায়গা ছিলো না। হজরত মুহাম্মদ(সা: আ ) এর সময় সবাই এক সাথেই নামাজ পড়তেন।

মহিলারা পেছনে বা সামনে দাঁড়াবে এমন কোনো নিয়ম প্রচলিত ছিলো না। পর্দা দিয়ে বিভাজন কেউ করেনি। হজরত সবাইকে মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য বলেছেন শুধু মহিলাদের শিশু পালন ও গৃহকর্ম পালনের প্রাধান্যের কারণে তার ব্যতিক্রমের অনুমতি দিয়েছেন।

ভারতের একজন বিখ্যাত ইসলামী স্কলার মোহাম্মদ আকরাম নাদভী  ৪৫ খ-ে ইসলামের ৯০০০ মহিলা ব্যাক্তিত্বের ইতিহাস প্রকাশ করেছেন। তার মতে, নেকাব,বোরখা ও পৃথকীকরণের এই উগ্র প্রচেষ্টার সঙ্গে ঐতিহাসিক এবং বাস্তব ইসলামিক অবস্থার প্রচুর অসংগতি। অনেকের মতে, এই প্রবণতার সৃষ্টি শুরু হয় বিভাজিত পুরুষ শাসিত সামন্ততান্ত্রিক ও রাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তাই একই  রকম পর্দার প্রচলন হিন্দু,খ্রীস্টান ধর্মেও দেখা যায়। বিগত শতাব্দীতে তাই আমরা  দেখি উচ্চ পরিবারের সব ধর্মের মহিলারা পৃথকীকরণের শিকার হয়েছেন এবং এটাকে ধর্মের দোহাই দিয়েই হালাল করা হয়েছে।

 খোদ সৌদি আরবের গ্রাম অঞ্চলে আমি শ্রমজীবী মহিলাদেরকে দুদশক আগেও হেজাব নেকাব ছাড়া ছাগল, মেষ চরাতে দেখেছি। পশ্চিম ইউরোপে শ্রমজীবী মহিলারা যখন হেজাব পরতেন না তখন ধনী মহিলারা মাথা না ঢেকে ভেইল না লাগিয়ে চার্চে ঢুকলে তাদেরকে উচু সমাজের বলে গণ্য করা হতো না। এবং অনেক চার্চে মাথা না ঢেকে মুখের সামনে ভেইল না টেনে ঢুকতেই দেয়া হতো না। অথচ দাভিঞ্চি তার বিখ্যাত চিত্রকর্ম লাস্ট সাপারে মেরি ম্যাক ডোনাল্ড বা অন্য বিখ্যাত কোনো চিত্রকর্মে  মাতা মেরিকে কেউ নেকাব পরিহিত দেখাননি। কেননা, ওটার তখন প্রচলন ছিলো না।

অতএব নিশ্চিত করে বলা যায় যে বোরখা, নেকাবের এই প্রচলন হজরত ইব্রাহিম এর  বংশভুত তিনটি এক ঈশ্বরবাদী ধর্মে এর প্রচলন শুরু ধর্ম প্রতিষ্ঠার অনেক পর, সংযোজিত হয়েছে সামজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর সামগ্রিক ঐতিহ্যে- কোনো যৌক্তিক ধর্মীয় দিক নির্দেশনার কারণে নয়।

লন্ডন, ১৭. ০৯. ২০১৫।