আসাদ মিয়া ছিলেন ‘ যে সহে সে বড়‘ এই মন্ত্রের পুজারি: শিক্ষাবিদ আসাদ মিয়া স্মরণসভায় বক্তারা

632

বিলেতবাংলা ২২ এপ্রিল: শিক্ষাবিদ আসাদ মিয়া ছিলেন ‘ যে সহে সে বড়‘ এই মন্ত্রের পুজারি। শিক্ষক হিসেবে পরিশ্রমী, ধৈর্যশীল এবং সরল চিত্তের অধিকারী মানুষ ছিলেন তিনি। সুবিধাবঞ্চিতদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল তাঁর অঙ্গীকার। শিক্ষাবিদ আসাদ মিয়ার স্মরণসভায় আলোচনায় এ  সব মন্তব্য করেন আলোচকরা।

কবি ও সাংবাদিক হামিদ মোহাম্মাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্মরণ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নর্থইস্ট ইউনিভার্সিটি সিলেট-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এডভোকেট ইকবাল আহমেদ চৌধুরী।

২২ এপ্রিল শনিবার পূর্ব লন্ডনের  হোয়াইটচ্যাপেল আইডিয়া স্টোর লাইব্রেরিতে শিক্ষাবিদ আসাদ মিয়া  স্মরণসভার আয়োজন করে নিউজ পোর্টাল বিলেতবাংলা ২৪ ডটকম।

 কমিউনিটি নেতা সৈয়দ এনামুল ইসলামের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত স্মরণসভার সভাপতি কবি হামিদ মোহাম্মদের সূচনা বক্তব্যের পর আলোচনায়  অংশ নেন টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের সাবেক কাউন্সিলার ও ডেপুটি মেয়র শহিদ আলী,জনতা কলেজ যুক্তরাজ্য কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাজনীতিক আলতাফুর রহমান মোজাহিদ, ঘাতক দালাল নির্মূল  কমিটির  কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আনসার আহমদ উল্লাহ,রাজনীতিক আমিনুল হক জিলু,কমিউনিটি নেতা নুরুল ইসলাম এমবিই, সাংস্কৃতিক নেতা আফতাব হোসেইন,বাংলাদেশের পুলিশ বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা (অবসরপ্রাপ্ত ওসি) আহবাব মিয়া, কমিউনিটি নেতা মকসুদ আহমেদ ও সেলিম আহমেদসহ উপস্থিত সুধীজনরা।Asad 1_n

প্রধান অতিথি ইকবাল আহমেদ চৌধুরী আসাদ মিয়াকে নির্বিরোধ মানসিকতার অধিকারী সজ্জন, ধৈর্যশীল মানুষ এবং একজন প্রকৃত শিক্ষক হিসেবে মূল্যায়ন করে বলেন, সিলেট শহরের চালিবন্দর রামকৃষ্ণ মিশন গালর্স হাই স্কুলটি ছিল অবহেলিত একটি স্কুল এবং স্কুলের শিক্ষার্থীরাও ছিল অবহেলিত পরিবারের সন্তান। সেই অবহেলিত স্কুলটিকে একটি অন্যতম ভালো স্কুলে রূপান্তরিত করার মূল অবদান আসাদ মিয়ার। বর্তমানে এ স্কুলে প্রতি বছর এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১২০ থেকে ১৪০। পাসের হার ৮০ থেকে ৯০ ভাগ।

তিনি বলেন, আসাদ মিয়া মধ্য নব্বইয়ের দশকে ৯৪ সালে  এই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব  নেন।তখন আমি ছিলাম এই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি। আমি তাকে এতোই কাছ থেকে দেখেছি,কিভাবে একটি প্রতিষ্ঠানকে তিলে তিলে  গড়তে হয়, সে যোগ্যতা তার মাঝে ছিল-যার তুলনা বিরল।

শিক্ষাবিদ আসাদ মিয়া ছাতক উপজেলার পালপুর গ্রামের সন্তান। মঈনপুর হাইস্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে ১৯৭২ সালে এসএসসি,সিলেট এমসি কলেজ থেকে এইচ এসসি ও অর্থনীতিতে অনার্স এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি প্রতিটি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করেন।একজন ভালো ক্রীড়াবিদ হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছিল এলাকায়। তাঁর ক্রীড়ানৈপুন্যে এমসি কলেজ বিভাগীয় পর্যায়ে কয়েকবার চ্যাম্পিয়নশীপের গৌরব অর্জন করে। পেশাগত জীবনে সোনালি ব্যাংকে সল্পকালিন কাজ করেন এবং কিছুদিন সৌদি আরবে প্রবাস জীবনের পর শিক্ষকতা পেশায়  যোগদান করেন।Asad2_n

স্মৃতিচারণে উপস্থিত সুধীজন এ পর্যায়ে  বলেন, নিজগ্রামে পালপুর হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা,পার্শ্ববর্তী খুরমা গ্রামের নবপ্রতিষ্ঠিত হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে হালধরা এবং স্কুলটিকে প্রতিষ্ঠিত করার কাজে যে দৃঢ়তা প্রদর্শন করেন তা অনুকরণীয়। এরপর তাঁর ঘাড়ে দায়িত্ব পড়ে গোবিন্দগঞ্জ পিএম হাইস্কুলটিকে গড়ে তোলা। সদ্যপ্রতিষ্ঠিত একটি নবীন বিদ্যালয়কে আদর্শ বিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলেন তিনি। আর সর্বশেষে সিলেট শহরের চালিবন্দর রামকৃষ্ণমিশন গালর্স হাইস্কুল ছিল তাঁর কর্মক্ষেত্র।

সিলেট শহরে সুবিধাবঞ্চিত সন্তানদের  একমাত্র  ভোলানন্দ নাইটহাইস্কুলটিরও প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন একাধারে। অন্যদিকে,ওপেন ইউনির্ভাসিটির সিলেট ক্যাম্পাসে খ-কালিন শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন আসাদ মিয়া। তিনি শিক্ষা ও মেধা বিনিময় প্রোগ্রামের আওতায় যুক্তরাজ্য,চীন ও যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার সফর করেন এবং বিভিন্ন প্রোগ্রামে অংশগ্রহন করেন।

স্মরণ সভার আলোচকরা বলেন, বিস্ময়ের ব্যাপার এক সাথে এতোটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শ্রমদান এবং শিক্ষার্থীদের প্রিয়ভাজন থাকা সহজ ব্যাপার নয়।তাঁর ছোঁয়ায় এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের বিদ্যমান অচলায়াতন সমাজে আলো ছড়াচ্ছে।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আসাদ মিয়ার ভ্রাতুষ্পুত্র বিলেতের স্বনামধন্য বাংলা ও ভারতীয় সঙ্গীতচর্চা প্রতিষ্ঠান সৌধ ও রাধারমণ সোইসাইটির অন্যতম পরিচালক কবি টি এম আহমেদ কায়সার আবেগ তাড়িত বিহবল হয়ে পড়েন। আহমেদ কায়সার বলেন, তিনি আমার অভিভাবক হিসেবে ছিলেন অতুলীয়। তাঁর সাথে আমার দ্বন্ধ ছিল,তিনি বলতেন রেজাল্ট ভালো করতে। আমি রেজাল্ট ভালো করেছি, জেলার শ্রেষ্ঠ রেজাল্ট আমার।তিনি সন্তুষ্ট না হয়ে বলতেন দেশের সেরা হওয়া দরকার ছিল।আমি আউটবই পড়তাম তাকে লুকিয়ে,তিনি বুঝে ফেলতেন। দ্ধন্ধটা এখানেই ছিল,তিনি বলতেন-জীবনটা গড়ো, এসবের জন্য সারা জীবন রয়েছে। আমাকে,আমাদেরকে মানুষ করার তাঁর তাগিদ যখন বুঝলাম তখন তাঁকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি। আমার জানা মতে, তাঁর সব ছাত্রছাত্রীদের বেলায় একই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তাঁর।

আলোচনা ও স্মৃতিচারণে  ঋদ্ধ স্মরণসভাটি শেষ হয় হাফিজ সাজ্জাদুর রহমানের মোনাজাতের মধ্য দিয়ে।

উল্লেখ্য,শিক্ষাবিদ আসাদ মিয়ার জন্ম ১৯৫৬ সালে এবং ৬১ বছর বয়সে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সিলেটের একটি হাসপাতালে দুরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন।তাঁর দুইপুত্র আশরাফুল আলম রুহিত ও রাহাত আলম শোভন ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাবিদ্যালয়ে সুস্নাতকে অধ্যয়ন করছেন । সহধর্মিণী  ফাহমিদা খাতুন রেহানা পালপুর প্রথামিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা।