বঞ্চিত হাওরবাসীর বুকে সঞ্চিত ব্যথা

63

“দুই বন্ধু এক সাথে প্রকৌশলী হিসাবে ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁদের একজন সড়ক ও জনপথ বিভাগে ও আরেকজন পানি উন্নয়ন বোর্ডে কাজ নেন। সওজ বিভাগের প্রকৌশলী কয়েক বছর পরে চাকুরি ছেড়ে দিয়ে একই বিভাগে ঠিকাদার হন। পাউবোর প্রকৌশলী তাঁর বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে এসে দেখেন বন্ধু অনেক বড়লোক হয়ে গেছেন।

প্রকৌশলী তাঁর বন্ধুর কাছে এ রহস্যের কারণ জানতে চান। বন্ধু তাকে একটি নদীর কাছে নিয়ে একটি সেতু দেখিয়ে বলেন যে, সেতুটির জন্য বরাদ্দের অর্ধেক টাকা দিয়ে তার বাড়ি তৈরি করা হয়েছে।

কয়েক বছর পর পাউবো প্রকৌশলীও চাকুরি ছেড়ে দিয়ে তাঁর প্রাক্তন প্রতিষ্ঠানে ঠিকাদার হলেন। কিছুদিন পর তার সওজ ঠিকাদার বন্ধু এসে দেখলেন যে তার বন্ধু তার চেয়েও অনেক আলিশান বাড়ি তৈরি করছেন। বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করা হলো কিভাবে এ বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ সম্ভব হলো। বন্ধু তাকে নদীর উপরে নিয়ে বললেন যে, নদীর বাঁধের অর্থে তিনি বড়লোক হয়েছেন। বন্ধু বললেন, তিনি কোন বাঁধ দেখছেন না। বন্ধুটি বললেন, বাঁধের একশ ভাগ বরাদ্দই তার বাড়িতে লেগেছে। তবে খাতাপত্রে বলা হয়েছে বন্যায় বাঁধটি ভেসে গেছে।”

বাংলাদেশে বন্যা নিয়ন্ত্রণের রাজনৈতিক অর্থনীতি’, আকবর আলি খান।‘‘

আলমগীর শাহরিয়ার138

১৯৩৮ সালে মহৎ উপন্যাসিক ও গল্পকার উইলিয়াম সমারসেট মম ভারতবর্ষে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও পাঠকনন্দিত লেখকদের অন্যতম। ভ্রমণশেষে তিনি যখন নিজ দেশে ফিরলেন বন্ধুবান্ধবরা জানতে চাইলেন ভারতবর্ষের কোন দর্শনীয় বস্তুটি তাঁর হৃদয়ে রেখাপাত করেছে।

জবাবে তিনি নাকি বলেছিলেন, তাজমহল, বেনারসের ঘাট, মথুরার মন্দির, অথবা ত্রাভাংকোরের পর্বতমালা এগুলোর কোনটিই আমাকে অভিভূত করতে পারেনি। ভয়াবহভাবে কৃশ, রোদে পোড়া মাটি চষা, এক টুকরো কাপড়ে নগ্নতা ঢাকা, পৌষ আর মাঘের শীতে কাঁপতে থাকা, দুপুরের প্রখর সূর্যতাপে ঘর্মাক্ত, ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়া ক্ষেতে সন্ধ্যা পর্যন্ত লাঙল বাওয়া, অবিরাম শ্রমে নিযুক্ত ক্ষুধার্ত, ভারতের উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম দিগন্তের বিলীন প্রান্তরে কর্মরত, এক মুঠো ভাতের কাঙ্গাল, ভোগ বিলাসীতাহীন জীবনে যার একমাত্র কামনা তার শরীর ও আত্মাকে কোনোরকমে একত্র রাখা, সেই নিদারুণ জীবনের কৃষকের ছবিই আমাকে সবচেয়ে বেশি অভিভূত করেছে। -সমারসেট মম, এ রাইটার্স নোটবুক, ১৯৪৯।

২০১৭ সাল। সমারসেট মমের ভ্রমণের পর পেরিয়ে গেছে প্রায় পৌনে শতাব্দী সময়। ভারতবর্ষের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের মানচিত্র বলতে গেলে আমূল পাল্টে গেছে। শুধু পাল্টায়নি কৃষকের চিরচেনা সেই রুগ্ন করুণ রূপ। বঞ্চনার ইতিহাস। কি ভারত, কি বাংলাদেশ। এখনো কৃষিঋণ পরিশোধ করতে না পেরে কৃষকের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা, আত্মহননের খবর পাওয়া যায়। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে কৃষকের আত্মহত্যার ঘটনাতো রীতিমতো উদ্বেগজনক।

আধুনিক চাষাবাদ ব্যবস্থায় কৃষিতে উৎপাদন বেড়েছে কয়েকগুণ। প্রতিবছর বাম্পার ফলন হয়। কিন্তু কৃষকের উন্নয়ন ও ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে গ্রাম আর শহরের পার্থক্যও ঘুচেছে। শুধু দুঃখ ঘুচে না প্রান্তিক কৃষকের। তাই বহুমাত্রিক উন্নয়নের ঢাকঢোল যখন আমরা পেটাই তখন ধনীরা দেখি আরো ধনী হয়। গরীবেরা বৈষম্যের যাঁতাকলে শুধুই পিষ্ট হতে থাকে। অলক্ষ্যে মরতে থাকে মরার আগে।

আমরা দেখি কৃষকের রক্ত জল করা শ্রমে সোনার ফসল ফলে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় দেশ। কিন্তু সেসব ফসল মুনাফাখোরদের ঠাণ্ডা গুদামে (কোল্ড স্টোরেজ) জমা হয়। মাঠ পেরিয়ে শহর আর গঞ্জেই কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হয়।কিন্তু যে কৃষক নির্ঘুম থেকে এ ফসল ফলায় সে চিরকাল বঞ্চিতই থাকে তার ন্যায্য পাওনা থেকে।

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভৌগলিক অবস্থান দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে একটু ভিন্ন। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রধানত হাওর-বাওর-বিল অধ্যুষিত। এ অঞ্চলে কৃষকের একমাত্র অবলম্বন এক ফসলি বোরো ধান। এর বাইরে উল্লেখযোগ্য কৃষিজাত ফসল এ অঞ্চলে খুব সামান্যকিছুই উৎপাদন হয়। চাতক পাখির মত সারাবছর কৃষকেরা এ ফসলের জন্য অপেক্ষায় থাকেন। এ ফসল ঘরে তুলেই কৃষক তাঁর পুরনো বছরের ঋণ পরিশোধ করেন। পরিবার পরিজন নিয়ে একটু আনন্দ উৎসব করেন। সংসারের সারাবছরের খরচ, চিকিৎসা, ছেলে-মেয়ের শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করেন। বেঁচে থাকার এ অবলম্বনও প্রায় বছরই ভারী বৃষ্টিপাত,পাহাড়ি ঢল ও অকাল বন্যায় তলিয়ে যায়।এ বছরও তাই ঘটেছে। ধান পেকে আসার আগেই ভেসে গেছে।

এ ঘটনা কৃষকের কাছে সন্তানের জন্য অপেক্ষায় থাকা মার অকাল গর্ভপাতের মতো। কৃষকের কাছে জমি ও তার ফসল সন্তানের মতোই চির আপন। গেল বছরও এ ঘটনা ঘটেছিল। তবে এবার অভাবনীয়ভাবে বৈশাখ মাস আসার আগে চৈত্র মাসেই টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ওই অঞ্চলের সবকটি হাওর তলিয়ে গেছে। সরকার প্রতিবছর হাওরাঞ্চলে সময়মত বাঁধ দেবার জন্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড বা পাউবোর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ করে। কিন্তু সে বাঁধ কখনোই সময়মত দেওয়া হয় না। অসাধু কর্মকর্তারা স্থানীয় প্রতিনিধিদের যোগসাজশে সে টাকা পুরোটাই আত্মসাৎ করেন অথবা নামেমাত্র লোক দেখানো কিছু কাজ করেন। দুর্বল অরক্ষিত বাঁধ ভেঙ্গে নদীর জল হু হু করে হাওরে ঢুকে আর অসহায় কৃষকেরা নিষ্ফল প্রতিরোধের চেষ্টা করে সে বাঁধের পাশে বসে অশ্রুপাত করে।এসব দুর্নীতির কোন প্রতিকার হতে দেখি না।

এই দুর্নীতির চিত্র বা বীভৎস রূপ বা রহস্য জানতে অর্থনীতিবিদ, সমাজ গবেষক, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আকবর আলি খানের ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’ বইয়ের আলোচিত সেই গল্পটি স্মরণ করা যেতে পারে।

তিনি তাঁর বইয়ে লিখেছিলেন,

“দুই বন্ধু এক সাথে প্রকৌশলী হিসাবে ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁদের একজন সড়ক ও জনপথ বিভাগে ও আরেকজন পানি উন্নয়ন বোর্ডে কাজ নেন। সওজ বিভাগের প্রকৌশলী কয়েক বছর পরে চাকুরি ছেড়ে দিয়ে একই বিভাগে ঠিকাদার হন। পাউবোর প্রকৌশলী তাঁর বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে এসে দেখেন বন্ধু অনেক বড়লোক হয়ে গেছেন।

প্রকৌশলী তাঁর বন্ধুর কাছে এ রহস্যের কারণ জানতে চান। বন্ধু তাকে একটি নদীর কাছে নিয়ে একটি সেতু দেখিয়ে বলেন যে, সেতুটির জন্য বরাদ্দের অর্ধেক টাকা দিয়ে তার বাড়ি তৈরি করা হয়েছে।

কয়েক বছর পর পাউবো প্রকৌশলীও চাকুরি ছেড়ে দিয়ে তাঁর প্রাক্তন প্রতিষ্ঠানে ঠিকাদার হলেন। কিছুদিন পর তার সওজ ঠিকাদার বন্ধু এসে দেখলেন যে তার বন্ধু তার চেয়েও অনেক আলিশান বাড়ি তৈরি করছেন। বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করা হলো কিভাবে এ বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ সম্ভব হলো। বন্ধু তাকে নদীর উপরে নিয়ে বললেন যে, নদীর বাঁধের অর্থে তিনি বড়লোক হয়েছেন। বন্ধু বললেন, তিনি কোন বাঁধ দেখছেন না। বন্ধুটি বললেন, বাঁধের একশ ভাগ বরাদ্দই তার বাড়িতে লেগেছে। তবে খাতাপত্রে বলা হয়েছে বন্যায় বাঁধটি ভেসে গেছে।” -‘বাংলাদেশে বন্যা নিয়ন্ত্রণের রাজনৈতিক অর্থনীতি’, আকবর আলি খান।

এ মোটেই গল্প নয়। প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের নির্মম অসাধু সত্যের এখনো কোন হেরফের ঘটেনি। প্রতিবছর ভাটির মানুষের জীবনের করুণ বাস্তবতাকে কটাক্ষ করে।

প্রান্তের কোটি মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখের খবর, এসব রক্তচোষা অসাধু কর্মকর্তাদের দুর্নীতির খবর কেন্দ্রে পৌঁছে না, মিডিয়ায় আসে না। কেন্দ্র ও মিডিয়ায় বরং কুমিল্লার নির্বাচনোত্তর আলোচনা, কুসিক, সিসিক, রাসিকের মেয়রের সিংহাসন আরোহণ-অবরোহণের সংবাদ নিয়ে ঢের বেশি ব্যস্ত। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের দেশ বিক্রির অভিযোগ-উপযোগ, সাফল্য-ব্যর্থতার রাজকাহন বা সাতকাহনে টকশোগুলো সয়লাব। সোনার ফসল ডুবে হাওর জলে সয়লাব হয়ে গেলেও তাদের বোধে কোন ভাবান্তর ঘটায় না। স্পর্শ করে না। অনেক হাওয়াই ইস্যুতে হইচই করা বুদ্ধিজীবীদের হাওরের লাখ লাখ মানুষের করুণ দুর্দিনে বিস্ময়কর নীরবতা দেখে সাইজিকে মনে পড়ে, “এ তো দেখি কানার হাট-বাজার”।

উত্তরবঙ্গের মঙ্গার দিন শেষ হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে হাওরের দুঃখপীড়িত মানুষের কষ্টের দিন শুরু। কবে শেষ হবে আমরা জানি না। আমরা হয়তো ভুলে গেছি, গোয়াল ভরা গরু, গোলা ভরা ধান আর পুকুরভরা মাছের যে সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলার গালভরা গল্প করি তা আদতে হাওরাঞ্চলের মানুষেরও সদ্য বিস্মৃত সমৃদ্ধ গল্প। ঘনবসতিপূর্ণ এ দেশে হাওর এখনো নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আঁধার। একে রক্ষা করতে হবে। অপরিকল্পিত, অদূরদর্শী উন্নয়ন হাওরের জীব-বৈচিত্র্য, জীবন ও পরিবেশকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই অপরিকল্পিত উন্নয়ন বন্ধ করতে হবে। নদী ও খালগুলো হাওরের জীবন সঞ্জীবনীধারা। ভরাট হয়ে গেছে। এগুলো খনন করতে হবে।

অনেক শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়বে। স্কুলগামী শিশুদের বিশেষ শিক্ষাবৃত্তি চালু করতে হবে। হাওরের মানুষের কাছে তাঁর গবাদিপশু সন্তানের মত। দুর্যোগের দিনে এদের বাঁচতে দিন। গো-খাদ্যে সহজলভ্য করুন। বিক্রির হাত থেকে রক্ষা করুন। এ অঞ্চলে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করুন। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা ও পরিধি বাড়াতে হবে। পিছিয়ে থাকা হাওর উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা আজ সময়ের দাবি। এ দাবি অবিলম্বে পূরণ করুন। সহজ সরল সংগ্রামী এ জনপদের মানুষ আজ বড়ো অসহায়।

মৎস্য পাথর ধান, জল জোছনা আর মরমিয়া গানের দেশে মানুষ অঝোর ধারায় নামা বৃষ্টির মত কাঁদছে। যুগ যুগ ধরে অসহায় বঞ্চিত হাওরবাসীর বুকে সঞ্চিত হচ্ছে ব্যথা অলক্ষ্যে। হে রাষ্ট্রের কর্ণধারেরা, নীতি-নির্ধারকেরা, মানুষের এ কান্না, এ রোদন কী আজ শুনছেন?

উত্তরবঙ্গে চাষাবাদের জন্য কৃষকের জমিতে পানি নেই। তাঁরাও অসহায় কাঁদছে। ভরা বরষায় তিস্তা মরে থাকে জলের অভাবে। দেন-দরবারে গলে না দিদির মমতাহীন মন। কে বোঝাবে এপারে ওপারে চারদিকে এ রোদন আজ মানুষের অস্তিত্বের, বেঁচে থাকার স্বপ্ন ও সংগ্রামের।উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অসময়ে বাঁধহীন, বাধাহীন, সীমান্ত রাজনীতি না মানা পাহাড়ি ঢল, ভারী বৃষ্টিপাত আর অসহায় কৃষকের অশ্রুপাতে টইটুম্বুর হাওরের দুঃখ ভারাক্রান্ত জল। রাষ্ট্র, রাজনীতি মমতাহীন নয়, ক্ষমতাবান নয়; মমতাবান হৃদয়ে কান পেতে মানুষের কান্না আজ শুনতে কি পাও?

আলমগীর শাহরিয়ার, কবি ও প্রাবন্ধিক