গল্পটি কি আসলেই ‘মোগলি’র?

37

৯ এপ্রিল:  প্রথমে শিশুটিকে ডাকা হচ্ছিল ‘মোগলি’ নামে। এরপর ‘দুর্গা’, ‘পূজা’ নাম দেওয়া হয় ওর। তবে ওর ধর্ম বা পরিচয় সম্পর্কে কিছু না জানা যাওয়ায় এবার ওর নাম দেওয়া হলো ‘এহসাস’।

টাইমস অব ইন্ডিয়া অনলাইনের খবরে জানানো হয়, গত ২৫ জানুয়ারি ভারতের উত্তর প্রদেশের বাহরাইচ এলাকার একটি বন থেকে একটি শিশু উদ্ধার করে পুলিশ। উপপরিদর্শক (এসআই) সুরেশ যাদব মতিপুর রেঞ্জের বন্য প্রাণীদের অভয়ারণ্য কাটারনিয়াঘাটে টহল দিচ্ছিলেন। সেখানেই খুঁজে পান শিশুটিকে। বানরের দলের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যেই ছিল সে। শিশুটিকে উদ্ধারের সময় বানরগুলো কিচিরমিচির করছিল। শিশুটিও চেঁচাচ্ছিল। অনেক চেষ্টার পরে পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করে। প্রথমে বয়স বছর আটেকের মনে হলেও পরে হাসপাতালে পরীক্ষার মাধ্যমে ধারণা করা হচ্ছে, মেয়েটির বয়স ১১ হতে পারে।

যখন ছোট্ট মেয়েটিকে পাওয়া যায়, তখন ওর গায়ে কোনো কাপড় ছিল না। লম্বা জটা চুল, বড় বড় নখ ছিল। কারও ভাষা বোঝে না। মানুষ দেখলে ভয় পায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রথমে সে পলিথিন খেত। এমনকি হাসপাতালের যে বিছানায় তাকে শুতে দেওয়া হয়েছিল, ওখানকার একটি কম্বল কামড়েছে সে। বাথরুম ব্যবহার করতে জানত না। কথা বলত না, তবে অস্পষ্ট শব্দ করত। চিকিৎসার পর ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে মেয়েটির। পায়ে ভর দিয়ে হাঁটা শিখছে সে।

গতকাল শনিবার লখনৌতে নতুন ঠিকানা পেল এহসাস। নির্ভান নামের একটি শিশু আশ্রমে জায়গা হয়েছে তার। নির্ভানের প্রেসিডেন্ট সুরেশ ধাপোলা বলেন, ‘আমরা জানি না ও কোন ধর্মের। আমরা এমন একটা নাম দিতে চেয়েছি, যা কোনো ধর্মের পরিচয় বহন করবে না।’

অনেকেই মেয়েটিকে রুডিয়ার্ড কিপলিংয়ের অমর উপন্যাস ‘জাঙ্গল বুক’-এর প্রধান চরিত্র মোগলির সঙ্গে তুলনা করছেন। তবে অনেক বিষয় খতিয়ে দেখে বোঝা যাচ্ছে, বাচ্চাটির জীবনের গল্প মোগলির মতো নয়। ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হচ্ছে।

যে চিকিৎসকেরা শিশুটির দেখছেন, তাঁরা বিশ্বাস করেন, ও মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী। এমনটা মনে করেন উত্তর প্রদেশের প্রধান বন কর্মকর্তা জে পি সিংও। তাঁর ধারণা, যারা শিশুটিকে দেখাশোনা করত, তারাই তাকে বনে ফেলে দিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘রাস্তার পাশের ওই বন খুব বেশি গভীর নয়। এখানে বছরের পর বছর কেউ থাকলে তা রেঞ্জারদের নজরে পড়তই। আমার মনে হয়, পরিবারের সদস্যরা জানতেন শিশুটি কথা বলতে পারে না। আর তাই তাঁরা তাকে রাস্তার পাশের ওই বনে ফেলে রেখে গেছেন।’

বানরের সঙ্গে খুব বেশি দিন মেয়েটি ছিল না বলেই বিশ্বাস করেন জে পি সিং। তিনি বলেন, বনটিতে সব সময় সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে রেঞ্জাররা পর্যবেক্ষণ করেন। এটা খুবই অস্বাভাবিক যে সে ওখানে অনেক দিন ধরে থাকছে অথচ কোনো চিহ্ন থাকবে না।

তবে বাহরাইচ জেলার প্রধান মেডিকেল কর্মকর্তা অঙ্কুর লাল বলেন, বাচ্চাটি প্রতিবন্ধী কি না, তা এখনো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে বনে বেড়ে উঠেছে—এটা অস্বাভাবিকই মনে হচ্ছে। প্রথমে যখন তাকে পাওয়া যায়, আচরণ খুব হিংস্র ছিল। বাথরুম ব্যবহারের অভ্যাস ছিল না, কারও সঙ্গে মিশতেও পারত না। আর তাই সবাই ধরেই নেয় সে বনে বেড়ে উঠেছে।

এদিকে মানবাধিকারকর্মীরা জোর দিয়ে বলছেন, এটা কন্যাশিশু বঞ্চনার আরেকটি গল্প।

নারীনেত্রী রঞ্জনা কুমারী বলেন, ‘সত্যি ঘটনা হচ্ছে মেয়েটির পরিবার তাকে আর দেখভাল করতে চায়নি। আমাদের দেশে অনেক পরিবারে মেয়েশিশুর চেয়ে ছেলেশিশুর গুরুত্ব বেশি। এমনই একটি পরিবার হয়তো এই মেয়েশিশুটির জন্য আর কোনো অর্থ খরচ করতে চায়নি। আমাদের সমাজে প্রতিবন্ধী মেয়েশিশুকে বড় করা অনেকের জন্যই কঠিন।’