শাকিলার কোলজুড়ে একুশ

51

  মিঠুন চৌধুরী

৬ এপ্রিল চট্টগ্রাম: সপ্তাহ অপেক্ষার পর একুশকে পেয়ে বুকে টেনে নিলেন শাকিলা আক্তার, চোখে আনন্দের অশ্রু নিয়ে।

কুড়িয়ে পাওয়া এই শিশুটিকে বুধবার চট্টগ্রামের প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ ও শিশু আদালতের বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস তুলে দেন শাকিলা আক্তার ও জাকিরুল ইসলাম দম্পতির হাতে।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে নগরীর আকবর শাহ থানার কর্নেলহাট প্রশান্তি আবাসিক এলাকায় একটি ভবনের পেছনে আবর্জনার স্তূপ থেকে নবজাতকটিকে উদ্ধারের পর তাকে রাখা হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

বাবা-মা ছাড়া এই শিশুটিকে বেশ কয়েকজন দম্পতি নিয়ে চেয়েছিল। ১৬ জনের আবেদন দেখে বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস চিকিৎসক জাকিরুল ও তার স্ত্রী শাকিলার হাতে এই শিশুটির ভার তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন গত ২৯ মার্চ।

বুধবার হস্তান্তরের আগে হাসপাতালের নবজাতক বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার দেবাশীষ কুমার রায় ও ওয়ার্ড ইনচার্জ শিখা ভটাচার্য্য বিকাল ৩টায় একুশকে নিয়ে আদালতে আসেন।

বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, “কেউ কেউ বলেছেন, শিশুটির প্রকৃত বাবা-মা ফিরে এলে তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার শর্ত কেন দিয়েছি? বাবা-মাকে কেন দিতে হবে?

“হয়ত তারা শিশুটিকে মারতে চায়নি। মারতে চাইলে গলা টিপেও মারতে পারত। হয়ত বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিল। আদৌ কি মা ছেলেটিকে ফেলেছিল কি না, আমরা জানি না। পারিপার্শ্বিকতাও জানি না। এখন হয়ত ইচ্ছে করে বলছে না, কিন্তু মা’র মধ্যে কখনও মনুষ্যত্ব জাগতে পারে।”

শিশুটির বাবা-মা কখনও তাকে দাবি করলে ডিএনএ টেস্ট করে নিশ্চিত হয়ে তাকে নিতে হবে। আর নিঃসন্তান জাকিরুল ও শাকিলাকেও তখন শিশুটির জিম্মা ছেড়ে দিতে হবে।

শাকিলা-জাকিরুল দম্পতির উদ্দেশে বিচারক বলেন, “আপনারা এই বাচ্চাকে মানুষের মতো মানুষ করেন। এমন একটা শিশুকে নিচ্ছেন, যার কথা গোটা জাতি জানে। আশা করি, এমনভাবে মানুষ করবেন সে যেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানুষ হয়।

“তার মা যদি আসেও ছেলেটার একটা মোহ আপনাদের প্রতি থেকেই যাবে। সে নিজে নিজে বুঝবে আমাকে এরাই লালন পালন করেছে।”

একুশকে জিম্মায় দিতে বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস বুধবার যখন আদালতে আসেন, তখন তিনিও ব্যক্তিগত বেদনায় ভারাক্রান্ত। তার স্বামী চট্টগ্রামের চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আব্দুর রশিদ ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন।

বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, “আমার স্বামী হাসপাতালে, সংকটাপন্ন। আইসিইউতে আছেন। উনাকে রেখে এসেছি, একটি নতুন জীবনকে বাঁচাতে। কারণ শিশুটির জীবনও সংকটাপন্ন।”

এরপর বিচার কক্ষেই ঘুমন্ত একুশকে শাকিলার হাতে তুলে দেওয়া হয়।

শাকিলার বাবা এম এ খালেক অসুস্থ অবস্থায় আদালতে আসেন ‘নাতি’ একুশকে দেখতে। হাসি মুখে তিনি বলেন, “খুব ভালো লাগছে।”

একুশ’র জন্য ‘সাজানো ঘর’

চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার এলাকার ধনিরপুলের বাসায় একুশের জন্য ঘর সাজানো হয়েছে বলে জানান ডা, জাকিরুল।

তিনি বলেন, “আইনি প্রক্রিয়া শেষ করার ব্যস্ততায় ছিলাম। তবুও যতটুকু পেরেছি, করেছি।

“ওর জন্য দোলনা এনেছি, বেলুন দিয়ে ঘর সাজিয়েছি। বিছানা-বালিশ, পোশাক-খেলনা, একজন শিশুর যা যা প্রয়োজন সব আনা হয়েছে। আজ আমার ঘরে ঈদের আনন্দ।”

এর আগে আদালতের দেওয়া শর্ত মেনে একুশ’র জন্য শিক্ষা বৃত্তি করেন জাকিরুল। এ সংক্রান্ত কাগজপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়।

বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, “একুশ’কে আমি দিচ্ছি, একুশ’কে নিবেন। এরপর যা খুশি নাম রাখতে পারেন,তবে একুশ নামটা পাল্টানো যাবে না।”

২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে উদ্ধারের পর আকবর শাহ থানার ওসি মো. আলমগীর এই নবজাতকের নাম ‘একুশ’ দিয়েছিলেন।

জাকিরুল সাংবাদিকদের বলেন, “একুশ ডাকনাম থাকবে। পরে আমরা একটা পারিবারিক নাম ঠিক করব।”

‘ভালো থাক একুশ’

২০ ফেব্রুয়ারি রাতে প্রশান্তি আবাসিক এলাকার একটি ভবনের নিচে আবর্জনার স্তূপ থেকে একুশকে উদ্ধার করেন মনোয়ারুল আলম চৌধুরী নোবেল, মোমিন শাহ, ঝিন্টু, ইফতেখারুল রানা ও সাব্বিরুল আলভী।

বুধবার নোবেল বলেন, “উদ্ধারের পর হাসপাতালে নেওয়া-চিকিৎসা সব মিলিয়ে ছেলেটার উপর মায়া পড়ে গিয়েছিল। খুব ভালো লাগছে। আশা করি, একুশের উজ্জ্বল জীবন হবে।”

মো. আলমগীর বলেন, “ডাস্টবিনে শিশু পড়ে আছে শুনে মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই কাজ শুরু করেছিলাম। অবহেলা করলে হয়ত একটি প্রাণ ঝরে যেত। এখন খুশি লাগছে একারণে যে শিশুটি সুস্থ আছে। তাকে একটা নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দিতে পেরেছি।”

‘ছেলে’ একুশকে নিয়ে বাড়ি যাচ্ছেন শাকিলা আক্তার ‘ছেলে’ একুশকে নিয়ে বাড়ি যাচ্ছেন শাকিলা আক্তার

চমেক হাসপাতালের নবজাতক বিভাগের প্রধান ডা. জগদীশ চন্দ্র দাশ বলেন, ওয়ার্ডের সবাই মিলে তাকে লালন-পালন করেছে। চেয়েছিলাম যত দ্রুত সম্ভব শিশুটি ঘরোয়া পরিবেশে ফিরে যাক।

“তার উপর মায়াই পড়ে গিয়েছিল। তবু আজ যখন চলে যাচ্ছিল তখন খারাপ লাগছিল। একুশ ভালো থাকুক। সুন্দরভাবে বড় হোক। আশা করি, ভবিষ্যতে সে ভালো কাজে সম্পৃক্ত থাকবে।”

২৯ মার্চ একুশকে পেতে করা আবেদনকারীদের শুনানি শেষে আদালত চার শর্তে শাকিলা-জাকিরুল দম্পতিকে একুশের জিম্মা দেন।

১৬ আবেদনকারীর একজন মোহাম্মদ হাসান বলেন, “যারা পেয়েছেন আশা করি তাদের কাছে সে ভালো থাকবে। যেখানেই থাকুক ভালো থাকুক এই কামনা।”

আদালতের কার্যক্রম শেষে লিফটে ওঠার সময় দৌড়ে আসেন চমেক হাসপাতালের ওয়ার্ড ইনচার্জ শিখা ভট্টাচার্য্য। তার হাতে একুশের মাথার টুপি। ভিড়ের মধ্যে কোথাও পড়ে গিয়েছিল।

তিনি টুপিটি এগিয়ে দিলেন শাকিলার দিকে। সেটি হাতে নিয়ে একটু কৃতজ্ঞতার হাসি হেসে একুশকে কোলে নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হন ভিন্নভাবে ‘মা’ বনে যাওয়া শাকিলা।