কবি মুজিব ইরমকে দেখেছি,তাঁর কবিতা দেখিনি। ‘মুজিব ইরম ভনে শোনে কাব্যবান‘ পাঠ-৩

130

কবি মুজিব ইরমকে দেখেছি,তাঁর কবিতা দেখিনি। না, কথাটা এরকম কেউ বলবে না। পাঠকরা জানেন-তাঁর কবিতার উচ্চতা হিমালয়ের উচ্চতম শিখর এভারেস্টকে ছুঁয়ে ফেলার প্রয়াসী কতটুকু। মুজিব ইরমের এভোরেস্ট অভিযানটা এরকমই দুর্দান্ত। ব্যক্তিগত নয়-কাব্যধারায়। তাই কি না এমনি প্ররোচনা। কেন বলতে হবে এরকম,এতো বেহিশেবী কথা? অনেকে ভেবে নিতে পারেন-এটা তো বেশি করে বলে ফেলা হলো।

মুজিব ইরমের কাব্য চিহ্নায়ন এতো সহজ নয়,যদিও খুব সহজ বাক্য বিন্যাস,কথার জাদুচেরা,গ্রাম্য পরশ মাখিয়ে বুনে যান কবি মাটিমাখা চরণ।

কবি মুজিব ইরম বাংলা কাব্য মন্ডলে উদিত নয়া নক্ষত্র। অবিরাম নির্মাণ, কাব্য-ধুপছাঁয়ায় সৃষ্টি করেন পাঠকের অধিবাস। তাঁর কাব্যসৃষ্টির বিভা সেই নক্ষত্রের ঝলকানি,আলোর বাগান। তাই, পাঠানুসঙ্গে কেঁপে ওঠে বুক,বিপন্নতা কিংবা অস্তিত্ব বিলীন নয়,নিজেকে স্পর্শ করার তুমুল কীর্তনে। আসুন, ডুব দিয়ে দেখি, পাঠক হওয়া যায় কি না ইরমসংহিতা,শ্রীহট্ট কীর্তন,কবি বংশ ও চম্পূকাব্যে।

কাব্যশিল্পী মুজিব ইরমের কাব্যসমগ্রের পাঠ-নিমগ্ন নির্যাস শিগিগরই ধারাবাহিক প্রকাশ করছে বিলেতবাংলা ২৪ডট কম। লিখছেন-হামিদ মোহাম্মদ। পাঠক পড়তে থাকুন।-সম্পাদক,বিলেতবাংলা।Suney kabbho

 ‘মুজিব ইরম ভনে শোনে কাব্যবান‘ পাঠ-৩

বাউল শাহ আবদুল করিম বলেছিলেন-‘দুনিয়াটা এক সময় বাউলদের হবে‘এটা তার বিশ্বাস। আর সদ্যপ্রয়াত কালিকা প্রসাদের ‘দোহার‘র প্রেরণাটাও এরকম-‘গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও‘। দুটো বিষয়ের মধ্যে বিনিসুঁতোর যোগসূত্র। মুজিব ইরমের কবিতা পড়ে অবলীলায় খুঁজে পাই এর প্রতিধ্বনি। নগরবাসী কবি বার বার ছুটে যাচ্ছেন গ্রামে, লোকজ ধারায়। যেন জীবনকে ছুঁইতে,স্পর্শ করতে,চিমটি কেটে দেখতে হলে গ্রামে, লোকজ ঐতিহ্যে না গেলে নিজেকে পাওয়াই যায় না।এর বাইরে নিজের  কোনো অস্থিত্বই নেই যেন। শাহ আবদুল করিম, কালিকা প্রসাদ আর মুজিব ইরমের পোশাক এক। এক চাদর বা শামিয়ানার নীচে অধিবাস। লদ্ধ ও আলোড়িত চেতনা, মনন,স্বপ্ন একই কল্পলোকে ধীবতী,ধাবমান।

নদী হাওর বেষ্ঠিত গ্রাম, শস্যদানায় ভরা সবুজ মাঠ, যেখানে মানুষজন বাস করে প্রকৃতির ছন্দদোলায়। সেই  মানুষজন যে ভাষায় কথা বলে, প্রেম করে,জীবন চালায়-সেই মুখের ভাষা,শব্দ এবং লোকজ জীবনবাহিত চিন্তা চেতনা বোধ কবিকে ঘুমুতে দেয় না। কবির  রক্তে সেই উন্মাদ পলিমাটি মুদ্রিত। রঙিন  নগরজীবন বড় ব্যস্ত কবির কাছে। এ রঙিন আয়নায় নিজেকে আর দেখেন না। যা দেখেন,তা কৃত্রিম অবয়ব। বৈচিত্রময় জীবন,স্বপ্নজাগা ধরিত্রীর সন্ধান,শেকড় -নাগরিক বোধে নয়। কবি যেন শহরকে উড়িয়ে নিয়ে যান গ্রামে,গড়ে তুলেন নতুন এক মাত্রিকতা,সাধনা-যেখানে প্রাণ সন্তরণরত,উজ্জীবিত,সৃষ্টিশীলতায় মগ্ন,উদ্দীপ্ত আলোময়। প্রকৃত প্রেম বা প্রেমের প্রকৃত গহন রূপ নদী তীরে,হাওরে দুলে ওঠা ঢেউয়ে। কবির বিশ্বাস-আফালে আছড়ে পড়া সংগ্রাম,হার না-মানা মানুষের সুখদু:খ ভাগভাগির গল্পই তো আমার,আমাদের।

আমার তো মনে হয় কবি মুজিব ইরম এরকমটাই ভেবে পাড়ি দেন সুরমা,কুশিয়ারা,মনু,হাকালুকি। জীবনের ছন্দ,গতি এর চেয়ে বেশি মুখরিত আর কোথাও নেই।এই আনন্দই কবিকে আচ্ছন্ন করে,মানুষ থেকে আড়াল হন না কখনো।

উপরের কথাগুলো কবি মুজিব ইরমের কাব্যমানসের গীত বা বন্দনা। কিন্তু কিভাবে কবি যান বা যেতে চান তার শিশুজীবনবৃত্তান্তে,শৈশব-কৈশোরের দরিয়ায়?এর উত্তর মেলে তার কবিতায়। শৈশবই যৌবনকে তাড়া করছে। যৌবনের শেকড় কি তাই নয়? তাই নয় কি কবি মনের উচাটন?

‘স্রোত‘ কবিতায় ছটপট করে কবি হৃদয়। যন্ত্রনা দগ্ধ উচ্চারণ- ‘বাঁশি তোদের বাজে কানের কাছে।/আমার বাজে হিয়ার মাঝে‘।

এর আগে ‘বূহ্য‘ কবিতাংশে বলেন-‘মাছের পাখা ঋণ করে শিখেছি সাঁতার।. . .বুঝে নিতে সাধ হয়,কী করে বুঝি!‘ আর ‘স্রোত‘ কবিতার ধ্বনি ‘. . .অঘাটে-কুঘাটে যাই,এমন জীয়ন বুক কার কাছে পাই,. . .।‘

‘খোয়াব‘কবিতার মাঝে অপরূপ অনুসন্ধান গ্রথিত।কবি বলেন-‘তার চোখে শুধুই মাছরঙ খোঁজ পাই। কেমন চেয়ে থেকে থেকে স্বপ্ন চাষ করি। হাঁটতে হাঁটতে ঘুমের অংশ হই। ঘুমে আসে ডানাওয়ালা ডিম। ভনভন ঘুরতে ঘুরতে খেয়ে ফেলে বাড়ি। প্যাঁচার ডাক পাই। কেবলই শাদা শাদা বাড়ি দেখি। বুক কাঁপে। কী করে মিথ্যে বলি, বেঁচে থাকা ভয় পাই!‘

‘তার চোখে শুধুই মাছরঙ খোঁজ পাই।‘ এতো সহজ ও এতো কঠিন কথা এই ছত্রে পুষ্পিত। কবি স্বপ্ন চাষ করেন তখন। স্বপ্ন বুকে পোষে হেঁটেও ঘুমান,আর  স্বপ্নও দেখেন। ‘মাছরঙ‘কথার ভেতরেই গ্রাম্য জীবনের সমূহ চালচিত্র অংকিত, গোপন বসবাস। কবি ঘুমের ভেতর যে স্বপ্ন দেখেন সে স্বপ্নে অলক্ষুণে পেঁচার ডাক পান,বুক কাঁপে।শাদা শাদা বাড়ি দেখেন। আর মনে জেগে ওঠে ভয়। ভৌতিক কোনো ভয় নয়-বেঁচে থাকার।  বেঁচে থাকার  যে সংগ্রাম তা কি এতো সহজ? মিথ্যা দিয়ে বেঁচে থাকা যায় না।কবি এই শ্বাশত উচ্চারণটাই করেছেন স্বপ্ন-কৌশলে।

কবি আরো আত্মমগ্ন হয়ে বলেন ‘অন্য গল্প‘ কবিতায়-‘ দ্বিধা নেই। বলতে পারি। তাকালেই ঘর। কাছেই সমুদ্র। আনাজপাতি। কমলালেবু। কাঁচা লঙ্কা। তরতাজা পানি। মাকড়সার ডিমভাঙা কাঁচা শৈশব। . .

গ্রামটাই এরকম-‘তাকালেই ঘর।কাছেই সমুদ্র। আনাজপাতি, কমলালেবু। কাঁচা লঙ্কা। তরতাজা পানি। মাকড়সার ডিমভাঙা কাঁচা শৈশব।‘

কবির এ অবলোকনটাই নিজস্ব বোধ,প্রাণের অলংকার। এই বোধ থেকেই বলেনÑ‘.আরেকটু দূরে গেলে অন্ধকারে ছিটিয়ে দেবো অন্ধকার। তারপর অন্যগল্প।‘

অন্ধকার তাড়াতে চান কবি।কিন্তু বলছেন  ছিটিয়ে দেবেন অন্ধকার।তারপর নির্মিত হবে ‘অন্যগল্প।‘ কি করে অন্ধকার তাড়াতে হয়,তাও কবির জানা। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা-এ রকম কি কিছু? অন্ধকার কি ছিটানো যায়?যায় না। কিন্তু কবির মানস-শক্তিটাই প্রধান অস্ত্র।

‘ব্যক্তিগত নোট‘ কবিতার চরণ এক অন্তহীন সংবেদ।‘ গোবর খনিতে জন্ম নেওয়া আমি এক প্রাচীন পালক।‘ ‘ গোবর খনি‘ শব্দবন্ধটির প্রয়োগ খুঁজতে হলে গ্রামেই যেতে হবে পাঠকের। পাঠকের চোখে তখনই ভেসে ওঠে গবাদি-পশু,হালচাষ ঘর গেরস্তি।এখানেই এই ‘গোবর খনি‘তে জন্ম কবির মানস চরিত্র এক। নিখাদ। কবি নাম দিয়েছেন ‘প্রাচীনপালক‘।

মুজিব ইরম কবিতায় একটি অস্ত্র শানিয়ে নেন। অস্ত্রটি কবি মানস।এই ধারালো অস্ত্রটি ঝন ঝন করে প্রতিটি কবিতা পাঠে। কবিতার উদ্ধৃতিতে পাই-‘কে তবে তুমি? অলীক মুকুট পরে শব্দ চরাতে এলে? তোমারও কি ছিল তবে গোপন তালুক?‘

এ কবিতায় ‘শব্দ চরাতে‘ এবং ‘গোপন তালুক‘প্রয়োগ ব্যঞ্জনা সৃষ্টি শুধু নয় একটি অর্থও তৈরি করে। গ্রামীন জীবনাচরণে গরু মাঠে চরানো হয়। যার অর্থ ঘাস খাওয়ানো। আর ‘গোপন তালুক‘ মানে ভূমির গোপন মালিকানা।কবিতায় শব্দ চরানো আর গোপন তালুক বলতেই উঠে আসে সমূহ গ্রামীন জীবন।কবি গ্রাম থেকে গ্রামে,মাঠ থেকে মাঠে ছুটে চলেন কল্পলোকের মানসীকে নিয়ে। খুঁজে খুঁজে বের করেন শব্দ এবংনির্মাণের নানান কলকব্জা।

এ রকম অনেক কথাই বলার তাগিদ বা তাড়া পাই। কবি মুজিব ইরমের অন্য এবং পরের  কবিতাগুলোও বুক চিরে কথা কয়।‘রূপান্তর‘‘জ্বর‘পড়ছি ১‘ ঈর্ষা‘হাঁস‘বৃষ্টি‘ টোটকা‘ ভয় ১‘ভয় ২‘ আছর‘ রূপকথা ১‘ তাবির‘ পথ‘ধাধা‘উপকথা‘সহি বড় আদি ও আসল খাবনাম‘ লৌকিক‘তুকতাক‘নিরাপদ বাক্যালাপ‘ সন্ধ্যা‘কবিতার ভেতর কবি এমন  কল্পলোক সৃষ্টি করেছেন,তা পড়ে পাঠকও কল্পনায় ভাসেন। কবির কল্পনার ভাষা,ভাষার সৌন্দর্য,অনুভুতির ইন্দ্রজাল শুধু সৃষ্টি করেন না জীবনেরও অর্থ খোঁজেন। রঙিন স্বপ্ন আর প্রত্যাশা অন্ধকারে এক চিলতে চাঁদের আলো।এ আলো আশা ও স্বপ্ন জাগানিয়া। এসব অগ্নিময় কবিতাসমূহে শব্দের খেলাও কম নয়।আর উপমা উতপ্রেক্ষার ব্যবহারে পাঠকও মুগ্ধ। যেমন-

‘লৌকিক‘ কবিতায় ‘ডানাওয়ালা নারী‘‘তুমি সেই অগ্নিগোলক‘‘এক জনমে ছুঁতে পারলাম কই?‘অলক্ষী হাইঞ্জায়‘ আমরা হই ভয়হীন আদিম যুগল‘‘কাউয়াদিঘির ওই পাখি উড়ে গেলে ডরের জলে ভাসে ছমছম হাওয়া।

নারীকে কবি যখন ডানাওয়ালা নারী বলেন তখন যে চিত্রকল্প তৈরি হয় তাতে পাঠকও কল্পনায় ভেসে যান।  আবার পরক্ষণেই বলেন ‘তুমি সেই অগ্নি গোলক‘। ‘ভয়হীন আদিম যুগল‘ বলতে কবি পাঠককে কোথায় নিয়ে যান? ভাবনার অতীত নয়। ‘সিলেট অঞ্চলের মানুষ ‘সন্ধ্যাবেলাকে ‘হাইঞ্জাবেলা‘ বলে। আবার আল বেঁধে জল সেচে মাছ ধরাকেও হাইঞ্জাসেচা বলে। শুধু ব্যবহারেই অর্থের হেরফের। ঋদ্ধ কবিতায় নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করেছেন কবি। এ কৃতিত্ব কবি মুজিব ইরমের একারই।একইভাবে ‘ডর‘। আমরা ভয় শব্দের অর্থ জানি ডর। কিন্তু সিলেট অঞ্চলে নদীর জল কু-লি পাকিয়ে নদীকে উত্তাল রাখে যে জলসীমা তাকেও ডর বলা হয়।এই জায়গাটিতে নদী গহীন ও আকারে বড় থাকে। প্রচলিত ধারণা জলদেবতার প্রভাবেই নদীর রূপ এমন।

নিরাপদ বাক্যালাপ‘কবিতার ভেতর আরো গা ছম ছম করা কথার মায়া।‘ তোমাকে গাইছিলাম অসম্ভব এক দৃশকল্প‘আততায়ী কুয়াশা‘ ‘তোমার অনল স্পর্শে নূয়ে পড়ল মাটি‘ আমরা পান করলাম নৈসর্গিক হাসি‘। এসব বাক্য ও এতো অলংকারিক ভাষা এবং বিষয় প্রকাশের দুর্মরতা পাঠককে অভিভূত,স্বপ্নবান হতে সাহস  যোগায়।

কবি মুজিব ইরমের কবিতার গতিময় ছোটা চলতেই থাকে। কবি বলেন-‘এক জনমে ছুঁতে পারলাম কই! কাউয়া দিঘির ওই পাখিদের সাথে একবার চলো তবে দূরে চলে যাই। তুমি তো কবিতা বোঝ, অপেক্ষা বোঝ না‘। প্রেমে  লৌকিকতার উর্ধে যে শিহরণ,তা এ কবিতায় ঝনঝন করে বেজে ওঠে। না পাওয়ার বেদনা ঝরে।পাখি হয়ে ওড়ে যাওয়ার ইচ্ছা হয়,অন্য সুদূরে। দয়িতার কাছে অনুযোগ-‘তুমি তো কবিতা বুঝ,অপেক্ষা বুঝ না।‘‘. . .তোমাকেই মনে করে লিখে যাই অরূপ কবিতা!‘ কবি স্তবক রচনা করেন, যে স্তবক বা কবিতার রূপ নেই,শুধুই আর্তি।

এক সময় আনন্দে ঝলসে ওঠেন কবি। বলেন-‘তুমি বরং আরো বেশি নারী হয়ে গেলে। আরো বেশি মানবী হয়ে গেলে।  তোমার আদরে আমি কেঁদে ফেলি।‘ পাওয়ার আনন্দ বক্ষভেদ করে পাঠকেরও।‘তোমার আদরে আমি কেঁদে ফেলি‘ এ পাঁচটি শব্দ স্থাপন করে অর্নিবাণ স্নিগ্ধতা।

এরপর,অতৃপ্তি ঝেড়ে ফেলে কবি আরো বলেন-‘ এ শহরে তুমি ছিলে, কবিতা ছিল না।‘প্রেমিকার উপস্থিতিই কবিতা। যেখানে স্বয়ং মানস মানবীর আর্বিভাব!। ‘তোমার হাসির ঝাঁপটায় ভোররাতে ভিজে যায় বর্ষার ঘুম। সিঁড়ির শরীর জুড়ে চেনাজানা রোদ।‘ ‘হাসি‘র ও যে শক্তি আছে তার বর্ণনা কীভাবে অপার এক ছটায় পাই আমরা। হাসির ঝাঁপটায় বা ঝড়ে লন্ডভন্ড  ভোররাত, এমনকি সব উপলদ্ধিও ভিজে যায়। বর্ষা মানেই বৃষ্টিধারা,অঝোর।‘ ভোররাতে ভিজে যায় বর্ষার ঘুম‘। তারপর  কবি বলেন-‘ সিঁড়ির শরীর জুড়ে চেনাজানা রোদ।‘ সিঁড়িতে যে রোদ পড়ে ভোরে, যে রোদ প্রতিদিন  কবিকে সম্ভাষণ জানায় সেটা তো চেনাজানা-ই। ভোররৌদ্রের  বর্ণনার কাব্যিক সৌকর্য পাঠক চৈতন্যে দীপ্তি ছড়ায়,ছড়িয়ে দেয়।‘সিঁড়ির শরীর‘ ‘চেনাজানা রোদ‘  প্রয়োগ পাঠক মনকে স্পর্শ করার অনন্য কারুকাজ,এ যেন নিত্য ব্যবহার্য ধারালো কিছু।

শব্দকে কারুখচিত কিংবা দুত্যিবাহী  শব্দবন্ধ রচনার নাম  যদি দিতে নাও পারি কবিকে নাম দিতে পারি তীরন্দাজ কবি।  যে কবি  যা চান তা পারেন, অনেকটা  ভৌতিক অদৃশ শক্তি তার কাব্যভর্তি। তা  কি ফালতু বলা?

‘যে কিশোরী ভালোবেসে কেঁদে ফেলেছিলো-যাবতীয় আবেগ তার মিশেছিল শীতের পিঠায়, তাকে নিয়ে শব্দচর্চা বড়ো বেশি দেরি হয়ে যায়। আর যে আমাকে বলেছিল-তুমি বড়ো ভিতুলোক, সে এখন আগলে রাখে টেমসের জল।‘

কবি নিজেই এক বিষ্ময়। বিষ্ময়ে ভরা তার চিত্রসৃষ্টি । বিষ্মিত হতে হয়, কিভাবে বলতে পারেন এতো সহজে, যা বলা সহজ নয়। কিন্তু অতি সহজে বলতে পারেন কবি। মানুষের মনের মাঝে থাকা সুপ্ত কথাটি, যে কথাটি সব মানুষের জীবন চিত্র। সবার  জীবনেই ‘কৈশোর প্রেম‘ রোরূদ্যমান।এমনকি নানা স্মৃতি জড়ানো  প্রেমানুভুতি, কান্নার নীরব ধ্বনির গহীন হ্রদ জেগে থাকে কোথাও।এ গহীন চিহ্নটিকে দেখানো বা দেখাতে কয়জন পারেন। কবি পেরেছেন।এটা  কি কম পাওয়া? কবি তাকে,এই ঘনকৃষ্ণ স্মৃতিকে  ধরে আনেন বজ্রাহত পাখির ডানায়। কবিতার চরনের পর চরণ পাঠ করতে গিয়ে নিজেকেও পাঠ করছি মনে হয়। পাঠকের চোখেও নামে ঝাপসা জল। জল  ছলছল চোখ, আর শীতের পিঠার ওমে স্মৃতি একাকার।

‘মুজিব ইরম ভনে শোনে কাব্যবান‘পুরো গ্রন্থেই ছোট ছোট কাব্যপদ বা কল কল ধ্বনি একেকটি কবিতা। কবিতার পর কবিতা এক নি:শ্বাসে পড়ে শেষ করা যায়। ধীরে ধীরে জল ছল ছল সময় পেরিয়ে কবি থিতু হন, দৃঢ় অবস্থান নেন। তাই,পরের কবিতায় কবি বলেন-‘যে আমাকে বলেছিল-তুমি বড়ো ভিতুলোক, সে এখন আগলে রাখে টেমসের জল।‘

কোথায় বাংলাদেশ,মনু কুশিয়ারা কাউয়াদিঘি আর কোথায়‘টেমস নদী‘। অভিবাসী বাঙালির পলি-রোদমাখা জীবন যে টেমস নদীর তীরেও। যিনি নিতান্ত  গ্রামের পাশে যে শহর, সেখানেও গনগণে নাগরিক ব্যস্ততায় দম বন্ধ,সেই কবি ছুটে আসেন টেমসের জলের পারে,ব্যস্ত লন্ডন নগর বেষ্টিত জলের কাছে,বিদেশ বিঁভুই। যে আমাকে বলেছিল-‘তুমি বড়ো ভিতুলোক, সে এখন আগলে রাখে টেমসের জল।‘

বিদেশ বাস,বিদেশের জল হাওয়ার মমতা আকড়ে থাকার মায়াজালের হাতছানি নানা ঢঙের। এর রঙিন চোখের জটিল উচ্চারণ ভিতু লোকটিরও রপ্ত হয়ে যায় কিভাবে যেন। যে এক সময় প্রেমে সাড়া দিতেও কম্পিত,ভিতু ছিল- সে ‘আগলে রাখে  টেমসের জল‘। অচেনা জীবনাচারণে অভ্যস্ত হওয়া, অচিন মানুষ আর অদেখা ভুবনকে আগলে রাখারও শক্তি অর্জন সম্ভব হয়ে ওঠে কবির  এ ভিতু মানসচরিত্রটির। এটা কি কম ভুবন জয়?

আগেই বলেছি-পলি-রোদমাখা ভুুবন থেকে নাগরিক ভুবনে বিচরণ-কখনো ফিরে দেখা, ছুঁয়ে আসা, নিজ গ্রাম, লোকায়ত বেহুলা সুগন্ধী ঘাম শুঁকে পড়ে থাকার প্রবল কীর্তনে বিভোর কবি। যৌবন আর শৈশব মাখামাখি করেই চোখ রাখে হাওর-নদীর আাঁকাবাঁকা পদরেখায়,কান পাতে মোহন জীবনে,গড়ে ওঠে অবিনাশী মেঘরঙ চিত্রনাট্য। সেই চিত্রনাট্যের কবি বা যদি বলি পাঠক, নাগরিক জীবনেও নিজেকে মানিয়ে নিতে বিষ্ময়কর স্রষ্টা। কবির কাব্য আঁধার-তাই,চিরায়ত শিশিরের অনন্য ফুল। যে ফুল ঝরে,ঝরতে ঝরতে আবার ফোটে দেশে-বিদেশে।