সাক্ষাৎকার: ‘সরকারকে বুঝতে হবে হেফাজত বা কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠী তার বন্ধু না’ ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল

41

স্কুল পর্যায়ের শিক্ষা নিয়ে অনেকেই চিন্তিত৷ পাঠ্যপুস্তকে ‘গোপনে’ ব্যাপক পরিবর্তনের পর দুশ্চিন্তা আরো বেড়েছে৷ ডয়চে ভেলেকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এর বাইরেও অনেক বিষয়েই কথা বলেছেন শিক্ষক এবং জনপ্রিয় লেখক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল৷

 ড. জাফর ইকবাল, আপনার মতে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থাটা কেমন হওয়া উচিত? এই প্রশ্ন দিয়েই শুরু হয়েছিল টেলিফোন সাক্ষাৎকার৷ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মনে করেন, ‘‘ছোট বাচ্চাদের শিক্ষাব্যবস্থাটা এমন হওয়া উচিত যেন তা পরীক্ষানির্ভর না হয়, এটা যেন শিক্ষানির্ভর হয়৷” তবে তিনিও উপলব্ধি করছেন যে, ‘‘আনফরচুনেটলি আমাদের দেশে ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে গেছে৷ এখন ছেলে-মেয়েরা সবাই জানে যে, পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়াটা লেখাপড়ার উদ্দেশ্য৷”

ড. জাফর ইকবালের মতে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষায় এটাই মূল সমস্যা৷ এ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য হলো, ‘‘ছোট ক্লাসে লেখাপড়ার মধ্যে পরীক্ষা-টরীক্ষা থাকাই উচিত না৷ ওরা জাস্ট জানার জন্য পড়বে, শেখার জন্য পড়বে৷ আমাদের পরীক্ষা করার প্রয়োজনও নেই সে কী জানল, কী শিখল৷ তারা তো শিখবেই, তারা জানবেই৷ আরেকটু বড় ক্লাসে গেলে তখন হয়ত মূল্যায়নটা দরকার হয়, কারণ, তখন তো বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়৷ অথচ সমস্ত রকমের সুযোগ নেই৷ কাজেই কাদেরকে সুযোগটা দেয়া উচিত, কোথায় সুযোগটা দেয়া উচিত, সেটা বোঝার জন্য মূল্যায়ন করতে হয়৷ তবে ছোট ক্লাসে মূল্যায়নের নামে, পরীক্ষার নামে ছেলে-মেয়েদের কষ্ট দেয়ার আমি বিরোধিতা করি৷”

 ‘‘আনফরচুনেটলি আমাদের দেশে ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে গেছে’’

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল এবং তড়িৎ কৌশল বিভাগের শিক্ষক মনে করেন পরীক্ষার মাধ্যমে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নটা শুরু হওয়া উচিত অষ্টম শ্রেণি থেকে৷ সাক্ষাৎকারে তিনি জানালেন, জামিলুর রেজা শিক্ষানীতি বিষয়ক কমিটির সুপারিশে তাঁরা ইন্টারমিডিয়েট, অর্থাৎ উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত মাত্র দুটো পরীক্ষার কথা বলেছিলেন৷ কিন্তু পরে তিনি বিস্ময় নিয়েই দেখেছেন, ‘‘চারটি পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে৷ একটা প্রাইমারি, একটা ক্লাস এইটে, একটা ক্লাস টেনে এবং আরেকটা টুয়েল্ভথ ক্লাসে৷”

ড. জাফর ইকবাল হতাশা নিয়েই লক্ষ্য করেছেন, ‘‘বাবা-মা, ছেলে-মেয়েদেরকে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ানোর জন্য এত পরিশ্রম করা শুরু করল, তাদেরকে কোচিং করানো, প্রাইভেট পড়ানো, মানে ওদের শৈশবটা একদম নষ্ট করে দিয়েছে আর কি৷ এখন জিপিএ ফাইভ পেতে হবে, গোল্ডেন এ পেতে হবে, না পেলে জীবন ব্যর্থ৷”

অথচ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী কাজ হলে প্রাথমিক স্তর এখনকার মতো পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত থাকত না, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হতো৷ অষ্টম শ্রেণিতেই হতো প্রাথমিক পর্বের প্রথম পরীক্ষা৷ আরেকটা পরীক্ষা হতো দ্বাদশ শ্রেণিতে৷

জনপ্রিয় বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক ড. জাফর ইকবাল জামিলুর রেজা চৌধুরী শিক্ষানীতি কমিটির সুপারিশ অগ্রাহ্য করে পরীক্ষার নামে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন৷ সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামির দাবি মেনে স্কুলপর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকে যে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে সে বিষয়ে তার ঘোরতর আপত্তির কথা জানিয়েছেন ডয়চে ভেলেকে দেয়া এ সাক্ষাৎকারে৷

বিশ্বের সেরা ১১টি শিক্ষা ব্যবস্থা

নবম: জাপান (৫.৬)

সাহিত্য, বিজ্ঞান ও গণিত চর্চার ক্ষেত্রে ওইসিডি দেশগুলোর মধ্যে জাপানের বেশ নামডাক আছে৷ সেখানকার শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে ছয় বছর৷ তারপর তিন বছর জুনিয়র হাইস্কুলে পড়ালেখা শেষ করে আরও তিনবছর হাইস্কুলে যায়৷ এরপর আসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময়৷

তাঁর মতে, ‘‘হেফাজতের চাপে আমাদের পাঠ্যবইগুলোতে যে পরিবর্তন করা হয়েছে, সেটা সরকার স্বীকার করুক বা অস্বীকার করুক কিছু আসে যায় না, কিন্তু আমরা সেটা জানি৷ আমরা নিজের চোখে দেখেছি ঘটনাটা ঘটেছে৷ এবং এটা খুবই আনফরচুনেট৷ প্রথমে অবহেলার কারণে হতে পারে এমন কিছু ভুলত্রুটি চোখে পড়ল৷ সেটা নিয়ে আমরা একটু বিচলিত ছিলাম৷ কিন্তু কিছুদিন পরে হঠাৎ করে আমরা আবিষ্কার করলাম যে ওই ভুলগুলি আমাদের চোখে আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারই নয়, কারণ ফান্ডামেন্টাল যে পরিবর্তনগুলো করা হয়েছে হেফাজতের কারণে, সেটা আসলে অনেকই গুরুত্বপূর্ণ৷ এটা একেবারে পুরোপুরি নতি স্বীকার করে নেয়া৷ এতে মনে হচ্ছে সরকার হেফাজতের জন্য পাঠ্যপুস্তকগুলো পরিবর্তন করতে রাজি আছে এবং পরিবর্তন করেও ফেলেছে৷ এখন ভবিষ্যতে তারা আরো কী করবে সেটা নিয়ে আমরা খুবই দুর্ভাবনায় আছি৷”

বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকরা ‘জিম্মি’

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে স্কুল-কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন আছে৷ এ সব কমিটিতে শিক্ষানুরাগীদের ঠাঁই নেই৷ কমিটিগুলো পুরোপুরি স্থানীয় সংসদ সদস্য, ক্ষমতাসীন দলের নেতা বা প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে৷ (26.05.2016)

‘শিক্ষা যদি শ্রেণিবৈষম্য সৃষ্টি করে, তা ভালো হতে পারে না’

বাংলাদেশে ৮০ ভাগ শিশুই শারীরিক শাস্তির শিকার

মুক্তিযুদ্ধে পিতৃহারা হওয়া ড. জাফর ইকবাল আক্ষেপ করে বললেন, ‘‘আমরা যখন স্বাধীন হয়েছিলাম তখন ধরে নিয়েছিলাম আমাদের স্বাধীন দেশে সব সুন্দরভাবে হবে, ঠিকভাবে হবে, কিন্তু দেখা যাচ্ছে দেশটি স্বাধীন হওয়ার পরেও অনেক বিষয় নিয়ে আমাদের চিৎকার করতে হচ্ছে, চ্যাচামেচি করতে হচ্ছে, অনেকটা যুদ্ধ করতে হচ্ছে৷ এক মুহূর্তও আমরা শান্তিতে ঘুমাতে পারছি না৷”

এ অবস্থার জন্য ধর্ম নিয়ে কিছু মানুষের বাড়াবাড়িকেই দায়ী মনে করেন তিনি৷ তাঁর ভাষায়, ‘‘আসলে সমাজের ভেতরে অনেক ব্যাপার ঢুকে গেছে৷ এটাকে ঠিক করতে হবে৷ যেমন ধর্মটাকে এমনভাবে নেয়া এবং আমার ধর্মের প্রতি আমার ভালোবাসা এবং অন্যের ধর্মের প্রতি অসহিষ্ণুতা – এমন তো হওয়ার কথা ছিল না৷”

এ অবস্থার পরিবর্তন কিভাবে সম্ভব? এ প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের পক্ষে সোচ্চার ড. জাফর ইকবাল বললেন, ‘‘সরকারকে বুঝতে হবে তাদের বন্ধু কারা৷ হেফাজত কিংবা ধর্মীয় যে সমস্ত গোষ্ঠী আছে তারা কখনোই সরকারের বন্ধু না৷ তারা সরকারকে সাহায্য করবে, সরকার যদি এটা আশা করে, সেটা খুবই ভুল আশা৷ আশা করবো যে সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে, তারা বুঝতে পারবেন যে হেফাজতের কাছে নতি স্বীকার করে কোনো লাভ হয় না৷”

কিন্তু সরকারের যদি বোধোদয় না হয়? সেক্ষেত্রে সর্বস্তরে প্রতিবাদ এবং আলোচনার প্রয়োজনের কথাও বলেছেন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল৷ সাক্ষাৎকার শেষ করেছেন আশার কথা শুনিয়ে৷ বলেছেন, ‘‘আমরা যারা একাত্তরটা দেখে এসেছি, সেখানে এমন একটা অবস্থা ছিল যে আমরা যে একটা স্বাধীন দেশে নিঃশ্বাস নিতে পারবো, সেটা কল্পনাও করা যেতো না৷ সেখানে আমরা একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি৷ কাজেই এখনকার অবস্থাটাকে আমি মনে করছি এক ধরনের সাময়িক বিপর্যয়৷”