কিংবদন্তীতুল্য রাজনীতিক বীর মুক্তিযোদ্ধা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত‘, সেই মানুষটির চির বিদায়ে স্যোসাল মিডিয়ায় কষ্টের অশ্রুধারা

188

বিলেতবাংলা প্রতিবেদক,৫ ফেব্রুয়ারি:কিংবদন্তীতুল্য রাজনীতিক,কথার জাদুশিল্পী,অসামান্য দেশ্প্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধা  সুরঞ্জিত  সেনগুপ্ত‘র অর্ন্তধান মেনে নিতে এতো দ্বিধা কেন,এতো কষ্ট কেন-কেউ কি বলবেন? জানি, কারো বলার শক্তি নেই।

যার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল বাঙালির হৃদয়ে,মননে,প্রাণে এবং মনোবলে।সেই মানুষটির চির বিদায়ে স্যোসাল মিডিয়ায় যে কষ্টের অশ্রুধারা বয়ে যায়,তার সামান্য সন্নিবেশ করা হলো।তাঁর প্রয়াণ অকাল নয়, তবুও অকাল প্রয়াণ,সব তিরোধানই অকাল। সবার মন তাঁর প্রয়াণে ক্ষতবিক্ষত এবং রক্তাক্ত। জননেত্রী  শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে ২০০৪ সালে যেভাবে রক্তাক্ত হয়েছিলেন তিনি,আজ কষ্টের রক্ত ঝরছে মানচিত্রে-। সেই কষ্টমাখা স্ট্যাটাসগুলোর ক‘টি-

 গণজাগরণমঞ্চ যুক্তরাজ্য নেত্রী অজান্তা দেব রায় ফেইসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন-

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত যে বাংলাদেশে ক্রম বর্ধমান সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে এক বাঁধার দেয়াল হয়ে ছিলেন তার মৃত্যুতে ছাগুদের বিকৃত উল্লাসেই তা প্রমান হয়।

রাজপথ কাঁপানো স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের দর্পিত এক সময়ে ছাত্রনেতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর লিখেন-

শোক এবং বিনম্র শ্রদ্ধা ————————

মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য , বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য, উপমহাদেশের বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান, সাবেক মন্ত্রী,

বর্ষীয়ান জননেতা শ্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের মৃত্যুতে , জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। ভাটি বাংলা থেকে হয়ত আরো অনেকেই নেতা হবেন তবে বক্তব্যের রাজা বাবু সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত আর আসবেন কি?কষ্ট হয় এই ভেবে প্রতিভা বিকাশের শেষ সোযোগটা তিনি পেয়েছেন কি?

বিলেতবাসী সংস্কৃতিকর্মী দিনার হোসেন লিখেন-

শ্রী সুরন্জিত সেন গুপ্ত আর নেই।

তুমি ছিলে বিরামহীন পাবলিক সার্ভেন্ট।

হে নেতা তোমার প্রতি অনেক অনেক শ্রদ্ধা রইলো।

আমি শোকাহত।

সিলেটের সংস্কৃতিকর্মী শামসুল বাসিত শেরো লিখেন-

বাংলাদশের রাজনৈতিক অংগনের এক ‘বটবৃক্ষের’ চিরবিদায়।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের আত্মার শান্তি কামনা করি।

কবি মাসুক ইবনে আনিস লিখেন-

বাঙালী জাতির সূর্য সন্তান শ্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যতে শোকাহত।বৃহত্তর সিলেটের রাজনীতির অভিভাবক প্রিয় “সেনদা”কে বিনম্র শ্রদ্ধা। যেখানেই থাকুন, শান্তিতে থাকুন! স্যেলুট দাদা

স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের ছাত্রনেতা সাংবাদিক ইখতিয়ার উদ্দিন লিখেন-

 যখন ছোট ছিলাম, সেই উনসত্তর-সত্তরে- আমার মেঝো ভাই রাজ উদ্দিন (এডভোকেট) শহরে থেকে পড়তেন। ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। ছুটিতে গ্রামে এসে আমাদের নিয়ে মিছিল করতেন। আমরা স্লোগান দিতাম ‘জেলের তালা ভাঙবো,মনি সিংকে আনবো’ অথবা ‘ভোট দিবো কিসে, কুঁড়েঘর চিহ্নে’। তখন আমি ভাইয়ের কাছে তার নেতার গল্প শুনতাম। সেনদা-র গল্প। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। সেই থেকে আমার কাছে তিনি রাজনীতির হিরো। বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। আমার মতো অগণিত বাঙালির প্রিয় নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত চলে গেলেন। এই ক্ষণজন্মার চলে যাওয়াকে কি বলা যায়, মহাপ্রস্থান?… মহীরূহের মহাপ্রয়ান। নমস্কার প্রিয় সেন-দা। তোমাকে নমষ্কার।

বিলেতবাসী বাসদ নেতা-গয়ছুর রহমান গয়াছ লিখেন-

না ফেরার দেশে চলে গেলেন রাজনৈতিক জগতের উজ্জল নক্ষত্র মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বিশিষ্ট পার্লামেন্টেরিয়ান আমাদের সকলের প্রিয় নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত। প্রিয় নেতার শোকাহত পরিবারের সকল সদস্যদের প্রতি সমবেদনা ও গভীর শোক প্রকাশ করছি।

সাংবাদিক সুজাত মনসুর মনোগ্রাহী একটি লেখা লেখেন, যিনি কাছ থেকে দেখেছেন তাকে-

ভাল থাকুন পরপারে দাদা ‘দুখু সেন’

খবরটা আকস্মিক হলেও অপ্রত্যাশিত ছিল না। তিনি দীর্ঘদিন যাবত দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছিলেন। হৃদযন্ত্রের সমস্যাতো ছিলই প্রায় তিনদশক থেকে। অসীম মানসিক শক্তির অধিকারী বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে হৃদরোগ তিন দশকেও কাবু করতে না পারলেও সাম্প্রতিক দুরারোগ্য ব্যাধি কাবু করে ফেলেছিল। তাই সমগ্র জাতিই জানতো তাঁদের প্রিয় পার্লামেন্টারিয়ান, বক্তৃতার যাদুকর সেনদার জীবন প্রদীপ ধীরে ধীরে নিভে আসছে। কিন্তু তিনি তাঁর কার্যকলাপে সবাইকে বুঝতে দিতেন না, তোমরা যা ভাবছো তা নয়। আমি আছি আরো অনেকদিন।

সর্বশেষ তিনি তা প্রমাণের জন্য নিজ এলাকাও ঘুরে এসেছেন। যদিও যেতে হয়েছে হেলিকপ্টারে। তাই সংবাদটি যখন এল তখন আকস্মিকই মনে হয়েছে। ভেবেছিলাম হয়তো এই গ্রীষ্মে দেশে গেলে দেখা হতে পারে। কিন্তু সে সৌভাগ্য আর হলো না।

দিরাই-শাল্লাবাসীকে কাঁদিয়ে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। সুরঞ্জিতদার মৃত্যু সংবাদটি আমাকে আনঅফিসিয়ালী দেশ থেকে ফোন করে জানায় বন্ধু নাজমুল হোসেন চৌধুরী চান মিয়া। তখন বাংলাদেশ সময় বিকেল পৌনে তিনটে (৪ জানুয়ারি)। আমি বিশ্বাস করিনি, সেও নিশ্চিত ছিল না। আমাকে খবর নিতে বলেছিল। দেশে ফোন করে জেনেছিলাম, গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ল্যাব এইডে ভর্তি করা হয়েছে। আমার ধারণা তিনি ঐ সময়ই তাঁর মৃত্যু হয়, তবে ডাক্তাররা শেষ রাতে তা নিশ্চিত করেন।

সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আর নৌকার বাঁধভাঙা জোয়ারের বিপরীতে কুঁড়েঘর প্রতীক নিয়ে প্রাদেশিক পরিষদে দিরাই-শাল্লা থেকে নির্বাচিত হয়ে চমক সৃষ্টি করেন বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, যিনি এলাকার বয়স্কদের কাছে ছিলেন শুধুই দুখু সেন। বন্ধুদের কাছে সুরঞ্জিত, আমাদের কাছে সেনদা কিংবা সেন কাকা। তাঁদের পূর্ব পুরুষের বসতি শুনেছি ঢাকার বিক্রমপুরে। পেশাগত কারণে তাঁর বাবা দিরাইতে বসতি স্থাপন করেন। সেনগুপ্তের আর কোন ভাই-বোন জীবিত আছেন কিনা জানা নেই। শুধু এটুকু শুনেছি, তাঁর বাবা-মার অবর্তমানে দিরাইয়ের কয়েকজন মানুষের স্নেহ-ভালোবাসায় বেড়ে উঠেন দুরন্ত বালক সুরঞ্জিত।

মেধাবী ও তীক্ষ্ণ ধীশক্তির অধিকারী হওয়া সত্বেও বালক দুখু সেনের লেখাপড়ার প্রতি তেমন আগ্রহ ছিল না, যতটা না ছিল নাটক আর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি। সেই নাটক পাগল লোকটির একরকম হেসে-খেলেই রাজনীতিতে পথচলা সত্তরের নির্বাচনের মাধ্যমে। তারপর আর থেমে থাকতে হয়নি। মাঝে-মধ্যে হয়তো হোঁচট খেয়েছেন। বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে সমালোচিত হয়েছেন। অন্যের কালিমা নিজের গাঁয়ে মেখেছেন ইচ্ছে না থাকা সত্বেও। স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থানকে নিরঙ্কুশ করার জন্যে চলতি রাজনীতির গড্ডালিকা প্রবাহে গাঁ না ভাসিয়ে পারেননি। তাঁকে ব্যবহার করে কিছু মানুষ হয়তো আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। তাঁর কিছু কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারিনি বলে নিজেই অনেক সময় কড়া ভাষায় কলম ধরেছি তাঁর বিরুদ্ধে, এসবই বাস্তবতা। কিন্তু একটি কথা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, সেনগুপ্তরা ক্ষণজন্মা। তাঁদের জন্ম যুগে যুগে হয় না, হয় শত বছরান্তে।

যে দুজন জননেতা আমাদেরকে বিশেষ করে ভাটি বাংলাকে বহির্বিশ্বে পরিচিতি দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে একজন হলেন বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। আরেকজন হলেন আব্দুস সামাদ আজাদ। রাজনীতিতে দুজনের মধ্যে সদ্ভাব ছিল না। কিন্তু সামাদ আজাদ সব সময়ই সেনগুপ্ত সম্পর্কে সমীহ করে কথা বলতেন। সামাদ আজাদের মৃত্যুর পর সেনগুপ্ত এক আলাপচারিতায় বলেছিলেন, এখন আর রাজনীতি করে শান্তি পাব না। কেননা, সামাদ সাহেব রাজনীতির অংকটা অত্যন্ত ভাল বুঝতেন, তাঁর বিপরীতে রাজনীতি করে মজা পাওয়া যেত।

ঐ যে বললাম সামাদ আজাদ ও সেনগুপ্ত আমাদের ভাটি বাংলা বিশেষ করে দিরাই-শাল্লাকে বহির্বিশ্বে ব্যাপক পরিচিতি দিয়েছেন তা একটু সংক্ষেপে বর্ণনা করার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। কেননা, ঐ সময়টিই হল সেনগুপ্ত নামক পুষ্পটির পূর্ণ বিকশিত হবার সময়। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গণপরিষদের একমাত্র বিরোধীদলীয় সাংসদ ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্যও ছিলেন। একে তো একমাত্র বিরোধীদলীয় নেতা, তেজদীপ্ত, বক্তৃতার যাদুকর সুতরাং তিনি একাই মাতিয়ে রাখতেন সংসদ। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে অকুতোভয়ে সরকারের সিদ্ধান্তগুলোর বিরুদ্ধে কথা বলা, সর্বোপরি, নতুন সংবিধানে স্বাক্ষর না করা প্রভৃতি কারণে তিনি বিশ্ব মিডিয়ার নজর কাড়তে সক্ষম হন। তাই তিনি যখন তেয়াত্তরের নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্টমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের বিরুদ্ধে দিরাই-শাল্লা আসন থেকে প্রার্থী হন এবং তীব্র প্রতিদ্বন্ধিতা গড়ে তুলেন, তখন সারাবিশ্বের মিডিয়া হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল ভাটি-বাংলার এ নির্বাচন কাভার করার জন্য। নির্বাচন চলাকালীন সময় প্রায় প্রতিদিনই দিরাই-শাল্লা বিষয়ক খবর অন্তত: বিবিসির সংবাদের অংশ হত। সে নির্বাচনে তিনি হেরে যান। সত্তর থেকে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনেই তিনি প্রতিদ্বন্ধিতা করেছেন, আটাশির নির্বাচন ব্যতিত। দুবার হেরেছেন সরাসরি আরেকবার আদালতের মাধ্যমে।

উনসত্তর-সত্তর সাল থেকে খুব কাছ থেকে দেখার-জানার সুযোগ হয়েছে। অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে মেশার সুযোগ হয়েছে দুবার। একবার ছিয়াশি অথবা সাতাশি সালে তিনি তখন ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরেরবার চুরানব্বই সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেবার পর যখন দিরাইতে সিরিজ জনসভা করেন। সে সময় আমিও বছর খানেক দিরাইতে ছিলাম বিলেত প্রবাসী হবার আগে। সেই সময় প্রতিটি জনসভাতেই উনার সাথে যোগদান এবং বক্তব্য রাখার সুযোগ হয়েছিল। আর আশির দশকের মাঝামাঝি তিনি যখন সোহরাওয়ার্দীতে চিকিৎসাধীন ছিলেন তখন আমিও সে সময় হাসপাতালে ছিলাম আমার বড় ভাগ্নির চিকিৎসার জন্য। রাতে দাদার কেবিনেই আমি থাকতাম। কেননা, জয়া বৌদির পক্ষে রাতে তাঁর সাথে অবস্থান করা সম্ভব ছিল না।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা যে উনাকে কতটুকু পছন্দ ও শ্রদ্ধা করতেন তার একটি প্রমাণ সেদিন আমি পেয়েছিলাম হাসপাতালে। দিরাইতে সবেমাত্র ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। সম্ভবত: দাদার সমর্থিত কোন প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন কিংবা এমন কোন ঘটনা ঘটেছে দাদা রাগ করে দরজা বন্ধ করে বসে আছেন। বাইরে বৌদি মুখ কালো করে বসে আছেন আর নীরবে চোখের জল ফেলছেন। আমি ঘুমুতে এসে এ দৃশ্য দেখে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, দাদা কারো অনুরোধেই দরজা খুলছেন না, সুতরাং বিষয়টি অত্যন্ত ভয়ের, হার্টের রোগি। ডাক্তাররাও ভরসা পাচ্ছেন না। আমার মাথায় তাৎক্ষণিক একটা কথা খেলে গেল। বৌদিকে বললাম, উনি যদি সরাসরি বত্রিশ নম্বরে গিয়ে আপাকে (শেখ হাসিনা) বিষয়টি বলেন, তাহলে তিনি চলে আসতে পারেন। দাদা আওয়ামী লীগে যোগদান না করলেও আট দলীয় জোটের একজন অন্যতম নেতা হিসেবে আপার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। বৌদি তাই করলেন এবং আধা ঘণ্টা পরে দেখি সত্যিই সত্যিই জননেত্রী শেখ হাসিনা এসে হাজির, দেখে মনে হচ্ছিল তিনি হয়তো ঘুমুনোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আপা এসেই দরজায় নক করে ডাক দিতেই ভিতর থেকে দরজা খোলে গেল আর বৌদির মুখের কালো দুশ্চিন্তাময় ভাব দুর হয়ে একটা প্রশান্তির ভাব ফুটে উঠলো। সেই সময় দাদা রাতের বেলা আমাকে তাঁর জীবনের অনেক কথাই বলতেন। দিরাই-শাল্লা নিয়ে অনেক পরিকল্পনা তাঁর ছিল। কতটুকু করতে পেরেছেন জানিনা।

শেষবার দেখা হয়েছিল প্রায় এগারো বছর পরে ২০১৫ সালের নভেম্বরে। শুধু তাঁর সাথে দেখা করার জন্যই আমি সাড়ে তিনশ মাইল দুরের শহর থেকে লন্ডন ছুটে গিয়েছিলাম। সেদিন অনেক কথাই হয়েছিল। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, দেশের রাজনীতি দূষিত হয়ে গেছে। তিনিও সেই দূষণ থেকে দুরে থাকতে পারেননি। বাস্তবতার কারণেই তাঁকে এমন কিছু মানুষের উপর নির্ভর করতে হয়েছে, যারা কিছুদিন আগেও পোষ্টারে বঙ্গবন্ধু ও আর তাঁর ছবি দিয়ে খুনের মামলা থেকে বাঁচার চেষ্টা করে বঙ্গবন্ধু ও তাঁকে অপমান করেছে। তাঁর সাথে রাজনৈতিক বিরোধের ইতিহাস যত দীর্ঘ, মেলবন্ধনের ইতিহাস তেমন নয়। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তাঁর অবস্থান ও সিদ্ধান্ত আমাদের মধ্যে দূরত্বের পরিধি এতো বাড়িয়ে দিয়েছিল যে, তিনি যখন অতি সম্প্রতি লন্ডন ঘুরে গেলেন, অনেকটা লজ্জায় দেখা করতে যাইনি। কিন্তু তিনি যে অতি দ্রুতই চলে যাবেন তা যদি জানতাম, তাহলে হয়তো সকল দ্বিধা পরিত্যাগ করে দেখা করতে যেতাম। বলতাম, দাদা গড্ডালিকা প্রবাহে গাঁ না ভাসিয়ে বিপরীত স্রোতে নৌকা বেয়ে হলেও যদি দিরাই-শাল্লার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে পারতেন তাহলে আপনি অমর হয়ে থাকতেন কোন ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি না হয়েও। কিন্তু বাস্তব বড় রূঢ়।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তরা পৃথিবীতে ভুল-শুদ্ধ মিলিয়েই অমর হয়ে থাকবেন। পরপারে ভাল থাকুন দাদা দুখু সেন। আপনার আত্মা চিরশান্তি লাভ করুক।

যুক্তরাষ্ট্রবাসী সাংবাদিক ইব্রাহিম চৌধুরী খোকন লিখেন-

শৈশবে তিনি যাত্রা পালার নায়ক হতে চেয়েছিলেন।

সাহস করে একদিন বলেওছিলাম,দাদা -সেখানেও আপনি দাপট দেখাতে পারতেন অবলীলায়।

মুকুটহীন সম্রাট হতে পারতেন পালা মঞ্চে।

রাজনীতিরর মঞ্চে তো নাটক করেই গেলেন।জনতাকে মোহিত করেছেন বারবার।মোহিত করেছেন আমাদের মতো অগুনতিজনকে।

বাংলাদেশের জন্ম থেকে আজ অব্দি শুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে সমীহ করে চলতে হয়েছে এপাড়া,ওপাড়ার সবাইকে।

কাছে থেকে, দূরে থেকে জানা অনেক গল্পের নায়ক।

অনেক ঘটনার,অনেক বিতর্কের ঘটক,অনুঘটক।

জনতা আর বিমোহিত হয়ে শুনবে না।

স্বজন সুহৃদরাও আর তন্ময় হয়ে চেয়ে থাকবে না।

একে একে সব যায়।

যাচ্ছে।

আমরা জনিওনা , কতোটা হারাচ্ছি!

খন্ড,অখন্ড স্মৃতির প্রতি অপার শ্রদ্ধা, ভাটির নায়ক সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।

সেলাম।

বিলেতবাসী এক সময়ের সাহসী ছাত্রনেতা খসরুজ্জামান খসরু লিখেন-

শেষ পরশ

স্বাধীন বাংলাদেশে বিএনপি আর রাজনৈতিক সামরিক বাহীনীর আসকারায় বেড়ে উঠা জামাত শিবিরের হাতে সিলেটের প্রথম নির্যাতনের ( রগ কাটার ) শিকার হয়ে আমি সিলেট এম সি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বিপুল ভোটে নির্বাচীত ভিপি যখন মরণাপন্ন অবসহায় ঢাকার পংগু হাসপাতালে ট্রান্সফার হই তখন মাননীয় নেএী আজকের প্রধান মনএী শেখ হাসিনা ও অন্যান্য জাতীয় নেতাদের সাথে ছুটে গিয়েছিলেন ভাটি বাংলার সিংহ পুরুষ সদ্য প্রয়াত বাবু সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত। তারপর কয়েক বার দেখা হয়েছে, বিভিন্ন বিষয়ে ছোট খাটো কথা ও হয়েছে।

সব শেষ দেখা এই মাএ কদিন আগে। পরম স্নেহে আমার কাটা রগের উপর হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন আর বলছিলেন চলতে কোন অসুবিধা হয় না তো!

দাদার এই শেষ পরশ শ্রদ্ধায় মনে থাকবে অনেক দিন।

আজ যুক্তরাজ্য বংগবনধু সাংস্কৃতিক ফোরাম থেকে অত্যন্ত স্বল্প সময়ে আয়োজীত প্রথম শোক সভায় দাদা কে স্মরণ আর শ্রদ্ধানজলী।

সিলেটের সংস্কৃতিকর্মী অম্বরীশ দত্ত লিখেন-

কি এক অজানা চাঞ্চল্যে কেটে গেল সারাটা দিন, সেই সকাল থেকে ।

বাঙালী মনে রাখবে কি না জানিনা – বাংলার মাটি ঘাস জল, মেঘ রোদ মাখা বাংলার আকাশ ঠিক মনে রাখবে , রাখবেই । আমাদের শেষ প্রনাম টা গ্রহন করুন দাদা । আপনি ব্রহ্মলোক বাসী হোন

বিলেতবাসী কবি দিলু নাসের একটি শোকবিহবল কবিতা লিখেছেন-

‘শোকগাঁথা

ভাটি বাংলার সিংহ পুরুষ

হে বীর মুক্তিযোদ্ধা

তোমার অম্লান স্মৃতির প্রতি

আজ বিনম্র শ্রদ্ধা

মানুষের প্রিয় নেতা ছিলে তুমি

ছিলে মানুষের জন্য

মানবতা আর মুক্তির গানে

জীবন করেছো ধন্য

ন্যায়ের পক্ষে আজীবন তুমি

ছিলে এক সংগ্রামী

গণমানুষের দাবির মিছিলে

ছিলে যে অগ্রগামী

বাঙালি জাতির স্বাধীনতা আর

স্বাধীকার আন্দোলনে

প্রাণপণে তুমি লড়েছো হে বীর

মুক্তির অন্বেষণে

সারাটি জীবন গেয়ে গেছো তুমি

স্বদেশের জয়গান

তোমাকে চেনে পদ্মা মেঘনা

কালনীর কলতান

কালনি নদীর তরঙ্গে বেড়ে

উঠেছিল যেই প্রাণ

আমৃত্যু সেই তাজা প্রাণ থেকে

ঝরেছে অগ্নিবাণ

সংগ্রামে আর বিপ্লবে তুমি

ছিলে যে আপোষহীন

তোমার কাছে বাংলাদেশের

রয়েছে অনেক ঋন

তোমার প্রয়াণে তাইতো আজিকে

অশ্রু সিক্ত নয়ন

বিদায় বেলায় হে জননেতা

তোমাকে অভিবাদন।‘

 .সংস্কৃতিকর্মী ও কবি টি এম আহমেদ কায়সার বিলেত থেকে লিখেছেন-

বড় নিষ্ঠুর এই শীতকাল। প্রিয়জনের মৃত্যু সংবাদ শুনে বিছানায় যাই, আবার জেগে উঠেও সেই মৃত্যু,সেই জরা, .. ক্ষয়… পরাজয় … গ্লানি!

সেনদা, আপনি খুব মানুষ ভালবাসতেন! মিত্রকে তো বটেই, এমনকি পাঁড় শত্রুকেও।

মানুষ থেকে দূরে এক অজানার পথে এবার আপনার নতুন যাত্রা শুরু হল ….সর্বমঙ্গলম ভবতু ভবতু ভবতু!!

তাঁর মৃত্যুতে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লেখক হাসান মোরশেদ ফেসবুকে লিখেছেন- বিবর্ণ রাজনীতিতে এমন রঙিন মানুষ আর হবে না

মুক্তিযোদ্ধা, প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মারা গেছেন।

বিদায় নিলেন ‘দাসপার্টির খোঁজে’ র আরেক উজ্জ্বল চরিত্র।

লিখেছিলাম ‘ সিদ্ধান্ত হয় যে কোন মূল্যে শেরপুর, সাদিপুর জয় করে সিলেটের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। ইতিমধ্যে সংগ্রাম পরিষদের ছাত্র-জনতার সাথে অস্ত্র হাতে যোগ দিয়েছে বিভিন্ন থানার পুলিশ ও সীমান্ত ফাঁড়ির ইপিআররা। দিরাই শাল্লার তরুণ এমপি

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও নৌকা লঞ্চভর্তি রসদ নিয়ে এগিয়ে এসেছেন শেরপুর মুক্ত করার যুদ্ধে।

৯ এপ্রিল বিমান হামলা শুরু হলে সিলেটে শহরের আবার পতন হয়, শেরপুর ও দখল হয়ে যায়, সুনামগঞ্জের ও পতন ঘটে পরে। ক্যাপ্টেন মুত্তালিব ফিরে যান ডাউকি, কয়েস চৌধুরী আগে থেকেই ওই অবস্থানে ছিলেন। শেরপুরের পতন ঘটলে বালাট হয়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত শিলং এর দিকে চলে আসেন।

শরণার্থীর ঢল নামতে থাকে। বালাট শরণার্থী শিবির ও ইয়ুথ ক্যাম্প চালু করেন সুনামগঞ্জের এমএনএ দেওয়ান ওবায়দুর রাজা। ছাতকের বাঁশতলায় সেখানকার এমএনএ আব্দুল হক। সুরঞ্জিত ঘুরতে থাকেন টেকেরঘাট, বালাট, বাঁশতলা, ভোলাগঞ্জ, ডাউকি হয়ে শিলং পর্যন্ত। এদিকে কয়েস চৌধুরী ও ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ রক্ষা করতে থাকেন। মুলতঃ এঁদের কর্মতৎপরতাতেই পাঁচ নম্বর সেক্টর গঠিত হয়।

জুলাই মাসে মুজিবনগর সরকার মেজর মীর শওকতকে সেক্টর কমান্ডার করে পাঠানোর আগে কয়েস চৌধুরীই আনঅফিসিয়ালি সেক্টর সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন। টেকেরঘাট সাব-সেক্টর সরাসরিই সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের সৃষ্টি। এখানে পাঠানোর মতো সামরিক অফিসারের সংকট থাকায় সেন সাব-সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব ও পালন করেন, পরে মেজর মুসলেমউদ্দীন দায়িত্ব প্রাপ্ত হন’

তাঁর তীব্র কঠোর সমালোচনা ও করেছি। বইয়েই লিখে রেখেছি সেই সমালোচনা। আজ শেষ বিদায়ের দিনে সেইসব অনুচ্চারিত থাকবে। আজ কেবল শোক ও শ্রদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা শ্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। বিবর্ণ দিনকালে রাজনীতিতে এমন রঙিন মানুষ হয়তো আর হবে না।

কবি ও সাংবাদিক হামিদ মোহাম্মদ লিখেছেন-

গতকাল ৪ ফেব্রুয়ারি থেকেই ফেইসবুক ভরে ওঠেছিল সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের অসুস্থ হয়ে পড়ার নানা খবর,উদ্বেগ,শংকা। তাঁর মৃত্যুসংবাদও প্রচার হয়ে গিয়েছিল। মৃত্যু পিছ ছাড়েনি। ৫ ফেব্রুয়ারি ভোর রাতে তাঁর জীবনাবসান হয়েছে। পার্লামেন্টের কথা মনে হলেই মনে হতো সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের কথা। তিনি ছাড়া অপূর্ণই মনে হতো পার্লামেন্ট। মুক্তিযুদ্ধের বীর সূর্য সন্তান,গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামের অগ্রসেনা ছিলেন তিনি।আমাদের তরুণ বয়সটা জুড়ে তিনি ছিলেন আমাদের নায়ক। ছিলেন রোল মডেল। সুরঞ্জিত বাবু,তোমার ঋণেভরা বাংলাদেশের মানচিত্র।

ভাটিবাংলার দুই মহানায়ক আবদুস সামাদ আজাদ আর সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত,যারা ভাটিবাংলাকে বিশ্বপরিসরে পরিচিত করে দিয়েছিলেন সংগ্রামী মানুষের চারণভূমি হিশেবে,লাল সালাম।

শাহ ফারুক আহমদ এডভোকেট লিখেছেন লন্ডন থেকে-

দাদা শেষমেষ তুমি চলে গেলে !

বাংলাদেশের রাজনীতির এক কিংবদন্তি পুরুষ বিশিষ্ট parliamentarian বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবু সুরন্জিত সেন আর নেই ! সংসদকে মাতিয়ে রাখতে, প্রাণবন্ত করে যুক্তিপূর্ণ নাটকীয় ভাষা প্রয়োগ করে পতিপক্ষকে কোনটাসা করে বক্তব্য রাখতে আর তিনি আসবেননা। চলে গেলেন না ফেরার দেশে। দাদা তুমি অমর। একজন মুক্তিযোদ্ধা একজন জনগনের প্রকৃত নেতার মুত্যু নেই। দাদা তোমাকে নিয়ে পরবর্তীতে অনেক কিছু লিখব। অনেক স্মুতি অনেক কথা। এখন মন ভাল নেই । তুমি চিরশান্তিতে, চিরনিন্দরায় ঘুমাও দাদা।

উজ্জল  চৌধুরী লিখেছেন-

মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য, ভাটি বাংলার সিংহ পুরুষ, বর্ষীয়ান পার্লামেন্টারিয়ান, বৃহত্তর সিলেটের কৃতিসন্তান, বাংলাদেশের অন্যতম সংবিধান প্রণেতা জননেতা শ্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের সৃতির প্রতি জানাই পরম শ্রদ্ধাঞ্জলি।

তার শোকাহত পরিবারের প্রতি হৃদয়ে৭১ পরিবারের পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।

লন্ডন থেকে রাজনীতিক ও কবি শাহ শামীম আহমেদ লিখেছেন-

আমরা গভীরভাবে শোকাহত!

না ফেরার দেশে চলে গেলেন সিলেটের রাজনৈতিক অভিভাবক সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত,

মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য, ভাটি বাংলার সিংহ পুরুষ, বর্ষীয়ান পার্লামেন্টারিয়ান, বৃহত্তর সিলেটের কৃতিসন্তান, বাংলাদেশের অন্যতম সংবিধান প্রণেতা জননেতা শ্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত আজ ভোর রাত ৪:১০ মিনিটের সময় ঢাকা ল্যাব এইড হাসপাতালে পরলোকগমন করেছেন।

তাঁহার মৃত্যুতে আমরা হারালাম একজন অভিভাবক কে, এ ক্ষতি অপূরণীয়।

তাঁহার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করছি এবং তার শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।

প্রভাস আমিন লিখেছেন-

শোক সকাল

রাতটা কেটেছে উৎকণ্ঠায়, ভোর রাতে আমাদের রিপোর্টার মহসিন কবির জানালেন, দাদা আর নেই। দাদা মানে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। এলাকার মানুষ ডাকতো সেনদা, ঢাকায় আমরা ডাকতাম সুরঞ্জিতদা। জীবনের শেষ বেলায় কিছু অনাকাঙ্খিত বিতর্কে জড়ালেও দাদা ছিলেন, বাংলাদেশের রাজনীতির উজ্জ্বল একটি অধ্যায়। তার মত পড়াশোনা জানা নেতার সংখ্যা কমে যাচ্ছে। প্রখর সেন্স অব হিউমার আর প্রজ্ঞা মিলে তার বক্তৃতা, বিশেষ করে সংসদের বক্তৃতা শোনাটা ছিল দারুণ অভিজ্ঞতা। সারাজীবন বাম রাজনীতি করলেও শেষ জীবনে যোগ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগে। ৭ বার এমপি হয়েছেন, এমনকি ৭০এর নির্বাচনেও প্রবল আওয়ামী জোয়ারের বাইরেও নির্বাচিত হয়েছেন। সম্ভবত জীবনে প্রথম হেরেছেন আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার পর ৯৬ সালের নির্বাচনে। তবে সে সংসদে তিনি এসেছিলেন উপ-নির্বাচন হয়ে। আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি হন প্রধানমন্ত্রীর সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা। আমি তখন ভোরের কাগজের রিপোর্টার, সংসদ বিট। প্রায় নিয়মিতই দাদার সাথে দেখা হতো। তার কাছ সংবিধান, কার্যপ্রণালী বিধি, সংসদের রীতি নীতি শিখেছি। রাজনীতির এই বর্ণাঢ্য পুরুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

 অপু  উকিল লিখেছেন-

বাঙ্গালীর ইতিহাসের হাজারো সাক্ষীর বিদগ্ধজন,

অগাধ পান্ডিত্যের জননন্দিত নেতা

শ্রী সুরনঞ্জিত সেন গুপ্ত দাদা

চিরতরে চলে যাওয়াতে

আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক

অঙ্গনে

অপূরণীয় শূন্যতা বিরাজ করছে।

প্রার্থনা করি দাদা যেখানেই থাকুন ভাল থাকুন।

সেলিম রেজা লিখেছেন-

উপমহাদশের বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ,মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য, ভাটি বাংলার সিংহ পুরুষ, বৃহত্তর সিলেটের কৃতিসন্তান, বাংলাদেশের অন্যতম সংবিধান প্রণেতা জননেতা শ্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত আজ ভোর রাত ৪:২৪ মিনিটের সময় ঢাকা ল্যাব এইড হাসপাতালে পরলোকগমন করেছেন।

তাঁহার মৃত্যুতে আমরা সুনামগঞ্জবাসি হারালাম একজন রাজনৈতিক অভিভাবক কে, এ ক্ষতি অপূরণীয়।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামীলীগ ও দক্ষিন সুনামগঞ্জ আওয়ামী পরিবার তথা দক্ষিন সুনামগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষের পক্ষথেকে আমরা গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করছি এবং তার শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।

কবি হিলাল সাইফ লিখেছেন-

সবার যখন তোমাতে কোলাহল

কেবল তুমিই রয়েগেলে সুপ্ত

যেখানেই থেকো ভালো থেকো দাদা

বাবু শ্রী -সুরন্জিত সেনগুপ্ত।

শিক্ষাবিদ আ ন স হাবিবুর রহমান লিখেছেন-

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন এক আজীবন সংগ্রামী। ক্ষমতাসীন দলে থেকেও নিজের সংগ্রামী স্বত্বাকে বিসর্জন দেননি। সুনামগঞ্জের দিরাই শাল্লা সংসদীয় আসনে জেতার জন্য তাঁকে তেমন প্রচারও চালাতে হয়নি। ভাটি এলাকায় তাঁর মতো জনপ্রিয় নেতা আর কেউ ছিলেন না। আমি তরুণ অবস্থায় ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে তাঁর সাথে ছিলাম। কী তেজস্বী বক্তা যে ছিলেন তা এখনো মনে দাগ কাটে। তাঁর প্রয়াণে জাতি অনেক অপ্রিয় সত্য শোনা থেকে বঞ্চিত হবে। মহান এ প্রগতিশীল রাজনীতিবিদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাঁর স্ত্রী জয়া সেনগুপ্তসহ পরিবারের সবার প্রতি গভীর সমবেদনা।

সাংবাদিক ও আইনজীবী তবারক হোসেইন নিবিড় আক্ষেপে লিখেছেন-

সুরন্জিত সেনগুপ্ত, আমাদের অতি কাছের একজন, যিনি রাজনীতির মন্চের এক বর্ণাঢ্য চরিত্রের নায়ক, ভাটি বাংলার গণমানুষের নেতা , তাঁর চিরবিদায়ে খুব ব্যথিত । এক অসাধারণ পারলামেন্টারিয়ান ছিলেন তিনি। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাজানাই।

সংবাদকর্মী বিলেতবাসী জুয়েল রাজ লিখেছেন-

 আমাদের ছেলেবেলায় নায়কের চেয়েও বেশী কিছু…

যার নাম শোনলেই আগে পিছে বহু বিশেষণ যোগ করতো সবাই। ভাটির হাওরের জল কাদা গায়ে মেখেই কাঁপিয়ে দিয়েছেন সংসদকে।

বাংলাদেশের সংবিধানের কথা আসলেই তাঁর কথা আসে, রাজিনীতির কথা আসলেই, তাঁর কথা আসে। মুক্তিযুদ্ধের কথা আসলেই তাঁর কথা আসে, ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সাব সেক্টর কমান্ডার। আমরা যারা অজোপাড়া গাঁয়ে জন্ম ও বেড়ে উঠা তাদের কাছে সর্বোচ্চ সীমানা ছিলেন তিনি। তাঁর নির্বাচনী এলাকা নয় শুধু ভাটি অঞ্চলের জীবন্ত কিংবদন্তী ছিলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য শুনতে মাইলের পর মাইল পায়ে হেটে মানুষ যেত তাঁর জনসভায়। যেন এক উৎসবে মেতে উঠতেন হাওড় পাড়ের মানুষ। তাদের প্রিয় সেনবাবুর জন্য।

রাজনীতির মাঠেও কেউ জিতে কেউ হারে…

জীবনের শেষ সময়ে এসে রাজনীতির মাঠে হেরে গিয়েছিলেন হয়তো। তাঁকে ঘিরে ধরেছিল কালো বিড়াল।

আর আজকে জীবনের কাছেই হেরে গেলেন..

ভালো থাকবেন অপারে…

সুরঞ্জিত সেনরা বারেবারে আসেনা…

যুগে যুগে একবার আসে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদ এই রাজনীতিবিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন, ” আমাদের দেশের সংবিধানটি খুলে দেখুন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে দেখতে পাবেন”।

তিনি লিখেছেন,

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত হচ্ছেন হাতে গোনা সেইসব কয়েকজন ব্যক্তির একজন যারা বাংলাদেশ নামক দেশটি গঠনের জন্যে মৌলিক অবদান রেখেছেন। আমাদের দেশের সংবিধানটি খুলে দেখুন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে দেখতে পাবেন। বিশেষ করে দ্বিতীয় ভাগ, যেখানে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিমালাগুলি লেখা আছে, সেখানে একটু ভাল করে দেখলেই আপনি বুঝতে পারবেন কোন কোন বিধানগুলি সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের তৎপরতায় যেখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

না, তিনি একা সেগুলি করেননি। একটা সংগঠিত উদ্যোগের মুখপাত্র ছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগ, উৎসাহ, দক্ষতা ও দৃঢ়তা না থাকলে সোশ্যালিস্ট ধরনের সেইসব মৌলিক ধারনা আমাদের সংবিধানে কি থাকতো? সম্ভবত থাকতো না। এই প্রসঙ্গে আমার সৌভাগ্য হয়েছিল একদিন একই অনুষ্ঠানে ডঃ কামাল হোসেন আর সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত দুইজনেরই কথা শোনার। ততদিনে দুইজনেরই অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আওয়ামী লীগে আর ডঃ কামাল হোসেন আওয়ামী লীগের বাইরে। ইন্টারেস্টিংলি, সোশ্যালিস্ট ধরনের এইসব মৌলিক রাষ্ট্রীয় নীতিমালার ব্যাপারেও ততদিনে দুইজন অবস্থান পাল্টে একে অপরের জায়গায় চলে এসেছেন। সেই কথা আরেকদিন বলি।

ভোরবেলা আমার স্ত্রী ধাক্কা দিয়ে আমাকে ঘুম থেকে তুলে জানালেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আর নেই। সূর্যাস্তের একটু আগেই নাকি তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ আর কোনদিনই জানবেন না অনেক সমালোচনা ও রাজনৈতিক বিরোধের পরেও তাঁর প্রতি ইমতিয়াজ মাহমুদের অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসাও ছিল। একাকী লড়েছেন এই যোদ্ধা, আমাদের ইতিহাসে তাঁর অবস্থান উজ্জ্বল ছিল, উজ্জ্বলই থাকবে। বিদায়।

রোববার ভোর রাত ৪টা ১০ মিনিটে রাজধানীর ল্যাব এইড হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান এই নেতা।  গত মে মাসে শ্বাসকষ্ট নিয়ে এই একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। মাঝখানে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালেও চিকিৎসা নেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করা সুরঞ্জিত দেশ স্বাধীনের পর সংবিধান প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন।সত্তরের প্রাদেশিক পরিষদে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন অন্যতম কনিষ্ঠ সদস্য; স্বাধীন দেশের প্রথম সংসদসহ চার দশকের প্রায় সব সংসদেই নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ষাটের দশকের উত্তাল রাজনীতি থেকে উঠে আসা বামপন্থী এই নেতা বর্তমানে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য।

সংস্কৃতিকর্মী দিলওয়ার এলাহি বিলেত থেকে লিখেছেন-

সেন বাবু

আমাদের অঞ্চলে সেন বাবু ছিলেন ঘরের মানুষের মতো। হবিগঞ্জ আর সুনামগঞ্জ যেন একই নদী, একই হাওর, পুবাল হাওয়ার তোড়ে বুকপিট দেখানো কলাগাছের একই পাতা, মুখের কথার সামান্য রকমফের বাদে জীবনযাত্রার আকাশফাটানো একইরকম চিৎকার!

ভোটে তাঁর অঞ্চলে সাফল্য না পেলে ঘরের ছেলে মনে করে বানিয়াচুঙ্গের মানুষই তাঁকে সংসদে পাটাতো। যেন সেন বাবুর এই ভোট প্রাপ্তির অধিকার জন্মগত। ধনী গরিব, হিন্দু মুসলমান, জেলে কৈবর্ত, কামার কুমার, জমিচার বর্গাচাষী, ব্যারিস্টার ছিচকে চোর সবারই বিপদে আশ্রয় সেন বাবু!

আমার শ্বশুর আমির আলী চৌধুরীকে ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন। তুই তুই সম্পর্ক ছিল আমার শ্বশুরের সাথে। দুজনের কথার ধরনও ছিল একইরকম।

ভরাট কণ্ঠে আমির আলীকে ডাক দিয়ে রসিকতা করতেন। আকাশ ফাটানো হাসির রসিকতায় ভরিয়ে রাখতেন ঘরদোর। ১১ সালে আমার শ্বশুর বিদায় নিয়েছেন। টিভিতে সেনবাবুর উপস্থিতি দেখলে আমার শ্বশুরকে স্মরণ করতাম মনে মনে।

হবিগঞ্জ অঞ্চলে সেন বাবুর আলাপ আলোচনা উঠলে মনে হতো তিনিই পাশে বসে আছেন কোথাও!

এ অঞ্চলের মানুষের মনের আসন থেকে খুব সহজে তাঁকে মুছে ফেলা যাবেনা। রাজনীতিজ্ঞ হিসেবে সারাদেশের মানুষের মন থেকেও। একজন জননেতার আর কী-ই-বা চাওয়ার থাকতে পারে!

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের অম্লান স্মৃতির প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা!