‘মানবিক মুখোশ পরে সম্পদ আত্মসাত’ রাগীব আলীর বিরুদ্ধে মামলার রায়:১৪ বছর কারাদণ্ড জরিমানা

38

বিলেতবাংলা ২ ফেব্রুয়ারি: মানবিক মুখোশ পরে অবৈধ প্রক্রিয়ায় জনসম্পদ আত্মসাতের বিরুদ্ধে এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে রাগীব আলী ও তার ছেলে আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও জালিয়াতি মামলায় দেওয়া এই রায়।

বৃহস্পতিবার (২ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৩টায় সিলেটের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মোঃ সাইফুজ্জামান হিরো রায় ঘোষণার সময় আদালতের পর্যবেক্ষণে এ উক্তি করেন।

এই ঐতিহাসিক রায়ে রাগীব আলী ও তার পুত্র আব্দুল হাইকে ১৪ বছরের কারাদন্ড দিয়েছে আদালত। তারাপুর চা বাগান লিজের ক্ষেত্রে ভূমি মন্ত্রণালয়ের স্মারক জালিয়াতির বিষয়ে দায়ের করা মামলায় আজ (বৃহস্পতিবার) বিকেল ৩টায় সিলেটের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুজ্জামান হিরো এ রায় ঘোষনা করেন। এপিপি অ্যাডভোকেট মাহফুজুর রহমান জানান, আসামীদের বিরুদ্ধে সন্দেহাতিত ভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত ৪৬৬ ধারায় রাগীব আলী ও তার পুত্রকে ৬ বছরের সশ্রম কারাদন্ড, ১০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে ৩ মাসের কারাদন্ড, ৪৬৮ ধারায় সমপরিমান সাজা প্রদান করা হয়। ৪২০ ও ৪৭১ ধারায় ১ বছর করে ২ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয় তাদের। পৃথক ৪টি ধারায় মোট ১৪ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয় সিলেটের কথিত দানবীর রাগীব আলী ও তার পুত্র আব্দুল হাইকে।

এদিকে, রায়কে ঘিরে সিলেটের আদালতে ছিল উপচেপড়া মানুষের ভিড়। সকাল থেকেই মানুষজন আদালত প্রাঙ্গনে ভিড় জমান। রায়কে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গনহ আশপাশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সকাল ১১টা ৩ মিনিটে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) একটি প্রিজন ভ্যানে করে আদালতে আনা হয় রাগীব আলী ও তার ছেলে আবদুল হাইকে। আদালত সূত্র জানায়, মাত্র ৪০ কার্য দিবসের মধ্যে মামলাটির রায় ঘোষণা হয়েছে। মামলার মোট ১৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ১১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। এ ছাড়া, আসামি পক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে রাগীব আলীর পক্ষে তার মালিকানাধীন মালনীছড়া চা-বাগানের দু’জন ব্যবস্থাপক আদালতে সাফাই সাক্ষ্য দেন।

আদালত তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘রাগীব আলী ও তার ছেলে আবদুল হাই অর্থবিত্তে বলিয়ান দেশের অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি। এই ধরনের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বর্তমান বাংলাদেশে তাদের অবৈধ প্রভাবকে ব্যবহার করে অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য কিভাবে গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক ডকুমেন্টকে জালিয়াতিমূলে সৃষ্টি করে সৃষ্ট জালিয়াতি কাগজপত্র প্রতারণামূলকভাবে খাঁটি হিসাবে ব্যবহার করে, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে এই রায়’।

রাগীব আলী ও তার ছেলে আব্দুল হাইয়ের বিরুদ্ধে ২০০৫ সালে সিলেটের তৎকালীন সহকারি কমিশনার (ভূমি) কোতয়ালী থানায় একটি স্মারক জালিয়াতি মামলা দায়ের করেন। পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, স্থানীয় পুলিশ, প্রশাসন এবং প্রসিকিউশন টিম এই মামলায় আনা অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

২০০৯ সালে এ মামলায় স্থগিতে উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন করেন রাগীব আলীর ছেলে আব্দুল হাই। মামলার পর্যবেক্ষণে আদালত উল্লেখ করেন, এ রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে সুপ্রীমকোর্ট যেসব পর্যবেক্ষণ এবং সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন ঐ সব পর্যবেক্ষণ এবং সিদ্ধান্তের আলোকে রাষ্ট্রপক্ষ আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

এ মামলার রায়ে আদালত রাগীব আলী ও তার ছেলে আবদুল হাই এর বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ এবং জালিয়াতি ও সরকারি কাগজ জাল করে হাজার কোটি টাকার দেবোত্তর সম্পত্তি তারাপুর চা বাগান দখলের অভিযোগে ৪৬৬/৪৬৮/৪৭১/৪২০ ও ৩৪ ধারায় দুই আসামির প্রত্যেককে পৃথকভাবে ১২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন।

মামলার রায় ঘোষণার পর আদালতের সরকারি কৌঁসুলি মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, রাগীব আলী ও তার ছেলে আব্দুল হাইয়ের মত প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে মুখ্য মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ঘোষিত এ রায় একটি ঐতিহাসিক রায়। এ রায়ে প্রমাণিত হয়েছে তারাপুর চা বাগান দখলের ঘটনা একটি মহা জালিয়াতির ঘটনা। এ রায়ে প্রমাণ হয়েছে দেশের বিচারবিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন।