নারায়ণগঞ্জে সাত খুন: জনগণের আস্থা জাগানো রায়

34

সোহরাব হাসান

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সড়ক ধরে শহরে ঢোকার আগে বাঁয়ে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের ফটক পার হলেই তিনতলা আদালত ভবন। চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলার রায় সামনে রেখে গতকাল এলাকায় ছিল নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের এজলাসে সকাল ১০টায় এই রায় দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক আগে থেকেই আইনজীবী ও সংবাদকর্মীরা ভিড় জমাচ্ছিলেন।

ফটকে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীরা পরিচয় পরখ করে একেকজনকে ঢুকতে দিচ্ছেন, যাঁদের মধ্যে নিহত ব্যক্তিদের স্বজন ও উৎসুক মানুষও আছেন। চত্বরে দাঁড়াতেই দেখলাম নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম ভেতরে ঢুকছেন। তাঁর মুখাবয়বে বেদনা ও উৎকণ্ঠার ছাপ। দুবছর সাত মাস ধরে আরও ছয়জনের পরিবারের সঙ্গে মিলে তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

আমরা যাওয়ার কিছুক্ষণ পর আসামিদের নিয়ে একটি পুলিশ ভ্যান আদালত চত্বরে প্রবেশ করল। তারপর আরও একটি। তাঁদের সবাইকে রাখা হয়েছিল গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে। সকাল নয়টার দিকে এজলাস কক্ষে গিয়ে দেখি বিচারকের আসনের বাঁ দিকে লোহার বেড়া দেওয়া একটি জায়গায় আসামিদের রাখা হয়েছে। তবে তারেক সাঈদসহ তিনজন ছিলেন বেড়ার বাইরে। ভয়, বেড়ার ভেতর থাকলে যাঁদের দিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, তাঁরা চড়াও হতে পারেন।

ঠিক ১০টা ১ মিনিটে এজলাসে প্রবেশ করলেন জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন। সাদা শার্টের ওপর কালো কোট পরা বিচারককে দেখে সবাই দাঁড়ালেন। তিনি কোনো দিকে না তাকিয়ে চেয়ারে বসে রায় পড়া শুরু করলেন। সংক্ষিপ্ত রায়ে শুধু বলা হলো, ৩০২ দণ্ডবিধি অনুযায়ী অভিযুক্ত ৩৫ জনের মধ্যে ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। বাকি নয়জন বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত। তবে রায়ের পর নূর হোসেন, তারেক সাঈদ, এম এম রানা ও আরিফ হোসেন ছিলেন নির্বিকার।

এটি কেবল হত্যার বিচার নয়, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে আদালতের সমুচিত জবাবও। সরকারপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি এই দুর্ধর্ষ অপরাধীদের সম্পর্কে বলেছেন, মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পরও যাঁদের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না, তাঁরা খুবই নিষ্ঠুর প্রকৃতির অপরাধী।

গতকাল আদালত অঙ্গনে আইনজীবীরা রায়কে স্বাগত জানিয়ে যে আনন্দ মিছিল করেছেন, তাতে বিবাদীপক্ষের কয়েকজন আইনজীবী ছিলেন বলেও আমাদের এক সহকর্মী জানান। তার মানে তাঁরাও বিচারিক সত্যকে মেনে নিয়েছেন। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে ২০১৪ সালে হত্যাকাণ্ডের পর নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আসামিদের পক্ষে কেউ দাঁড়াবেন না। কিন্তু পরবর্তীকালে রাজনৈতিক কারণে আইনজীবীদের মধ্যে বিভাজন দেখা দেয় এবং ওই সিদ্ধান্ত রহিত হয়ে যায়। আওলাদ হোসেন নামে একজন আইনজীবী জানান, মামলাটি বেগবান করতে গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খানের ভূমিকাও ছিল প্রশংসনীয়। তাঁর রিটের পরিপ্রেক্ষিতেই হাইকোর্টে শুনানিতে অংশ নিয়েছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী ড. কামাল হোসেন। ২০১৪ সালের ১১ মে হাইকোর্ট র্যা বের চাকরিচ্যুত তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দেন।

খুনের বিচার পুরোপুরি খুন বন্ধ করতে পারে না, কিন্তু অপরাধের মাত্রা কমাতে পারে। আর খুনের বিচার না হলে তৈরি হয় বিচারহীনতার সংস্কৃতি। নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার রায় আমাদের সেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি দিয়েছে। কেননা, বিচারপ্রার্থী মানুষের কাছে আদালতই শেষ ভরসা।

এই প্রেক্ষাপটে সাত খুনের ঘটনাকে আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করব? এটি ছিল সংঘবদ্ধ ও পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এর মূলে ছিল দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি। একদা বাসের হেলপার নূর হোসেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থনে হয়ে ওঠেন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। মাদক ব্যবসা, বালুমহাল দখল, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজিসহ এমন কোনো অপরাধ নেই যা তিনি করেননি। এই নূর হোসেনই তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শেষ করে দিতে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সরকারি বাহিনীর সদস্যদের ব্যবহার করেছেন। গতকালের রায়ের মাধ্যমে এজাহারভুক্ত ৩৫ আসামিই শাস্তি পেয়েছেন। কিন্তু তাঁদের বাইরেও অনেকে ছিলেন। নিহত নজরুলের শ্বশুর শহিদুল ইসলাম বলেছেন, ‘আংশিক বিচার পেয়েছি। এজাহার থেকে নূর হোসেনের কয়েকজন সহযোগীর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যারা এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল।’

খুনের পেছনে যেমন খুনি থাকে, গডফাদারের পেছনেও গডফাদার থাকে। হত্যাকাণ্ডের পরপরই কারা নূর হোসেনকে বাঁচাতে চেয়েছিল, কে তাঁকে বিদেশে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল, সেসব গণমাধ্যমে নানাভাবে এসেছে। তার সূত্র ধরে খুদে গডফাদারের পেছনের বড় গডফাদারকেও বিচারের আওতায় আনা উচিত বলে ভুক্তভোগীদের স্বজনেরা জানান।

বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এটি একটি ঐতিহাসিক রায় এ কারণে নয় যে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর সর্বোচ্চসংখ্যক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি যেমন জড়িত ছিলেন, তেমনি ছিলেন অপরাধ দমনে নিয়োজিত একটি সরকারি বাহিনীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদাধিকারীও। এই রায় প্রমাণ করেছে যে অপরাধী যত ক্ষমতাধর হোক না কেন তাঁকে শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু সেটি দৃষ্টান্ত না হয়ে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হওয়া উচিত।

সাত খুন মামলার বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই ধন্যবাদ পেতে পারেন। এ ধরনের নির্মম ও নৃশংস হত্যার বিচার হলে অপরাধীরা কিছুটা হলেও খামোশ হবে। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন কমবে। বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের মামলার রায়ের পর ২০১৩ সালে সংঘটিত তানভীর মোহাম্মদ ত্বকী হত্যার বিচারের দাবিটিও সামনে এসেছে। সরকার কোনো মামলায় ‘বিবেকের’ দায়িত্ব পালন করবে, আর কোনো কোনো মামলায় নির্বিকার থাকবে, সেটি হতে পারে না।