আমরা কি পরাশক্তির ছায়াযুদ্ধের বলি হব?

57

।মহিউদ্দিন আহমদ |

 ডিসেম্বর ২৯, দুনিয়াটা খুব জটিল। সর্বত্র দ্বন্দ্ব আর সংঘাত, মারামারি-কাটাকাটি। ইচ্ছা থাকলেও নির্ঝঞ্ঝাট থাকার উপায় নেই। নিজের জন্য একটা পথ বের করে নেওয়া সহজ নয়, বিশেষ করে একটা দুর্বল ও পশ্চাৎপদ দেশের পক্ষে। সবাই যেন তাকে গিলে খেতে চায়। নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবেই অনেক দেশ গড়ে তোলে জোট। ‘দশের লাঠি একের বোঝা’।

ভূরাজনীতিতে জোটের গুরুত্ব অনেক। জোটের শরিক হয়ে একটি দেশ যেমন নিজেকে কিছুটা নিরাপদ ভাবতে পারে, স্বস্তি পায়, তেমনি বিরোধী দেশ বা জোটের আক্রোশ ও আক্রমণের লক্ষ্য হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মুরব্বিরা তৎপর হয়ে ওঠে। মুরব্বিরা যদি বিবদমান কোনো একটা পক্ষে যোগ দেয়, তখন পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে পড়ে। এমনকি জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানকেও নাস্তানাবুদ হতে হয়। এ প্রসঙ্গে স্পেনের কূটনীতিক-লেখক সালভাদর মাদারিয়াগার মন্তব্য উদ্ধৃত করা যেতে পারে:

জাতিসংঘে যদি দুটি ছোট দেশের ঝগড়ার প্রসঙ্গ তোলা হয়, তাহলে বিরোধটির নিষ্পত্তি হয়। কিন্তু যদি একটা ছোট দেশ একটা পরাশক্তির সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে এবং তা জাতিসংঘে তোলা হয়, তাহলে ছোট দেশটির সেখানেই শেষ। আর যদি দুই পরাশক্তির মধ্যকার বিরোধ জাতিসংঘে ওঠে, তাহলে জাতিসংঘই উবে যায় (সূত্র: দিনকর রাও মানকেকার, পাক কলোনিয়ালিজম ইন ইস্ট বেঙ্গল)।

বাংলাদেশ জন্মলগ্নেই বৈশ্বিক ভূরাজনীতির ঘূর্ণিপাকে পড়ে গিয়েছিল। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় তৈরি হওয়া সমীকরণের ফলে বাংলাদেশের কপালে রুশ-ভারত বলয়ের উপগ্রহের তকমা জুটেছিল। এ জন্য আমরা বিস্তর সুবিধা পেয়েছিলাম। তবে অসুবিধাও হয়েছিল অনেক। সেসব আমরা অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পেরেছি।

একদা ‘ইন্টারন্যাশনাল বাস্কেট কেস’ থেকে বাংলাদেশের উল্লম্ফন ঘটেছে। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের ৪৫তম বৃহৎ অর্থনীতি হয়েছে। আয়তনের তুলনায় বিপুল জনসংখ্যার এই দেশটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সিঁড়ি বেয়ে আরও ওপরে উঠবে, এটা আইএমএফের পূর্বাভাস জানান দিচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির তালিকায় ২০৩০ সালে বাংলাদেশের স্থান হবে ২৯তম এবং ২০৫০ সালে হবে ২৩তম। তত দিনে বাংলাদেশ মালয়েশিয়া, ইরান, স্পেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ডসকে টপকে যাবে। ২০১৫-৫০ সময়কালে যে তিনটি দেশের বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার ৫ শতাংশের ওপরে থাকবে, বাংলাদেশ তার অন্যতম। চুরিচামারি আর অপচয় কমাতে পারলে ওই অবস্থানে আমরা আরও আগেই যেতে পারব।

দেশের যত তরক্কি হচ্ছে, ততই আমরা বেশি করে অন্যের নজরে পড়ছি। ১৬ কোটি মানুষের এত বড় বাজার সামনে পড়ে থাকলে অনেকের চোখই চকচক করে। জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে বা জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যে গতিতে কমছে, তাতে অনুমান করা যায়, ২০৩০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা হবে প্রায় ১৯ কোটি এবং ২১০০ সালে হবে প্রায় ২৫ কোটি (সূত্র: ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রজেকশনস)। জনগোষ্ঠী যদি উৎপাদনশীল ও সৃজনশীল থাকে, তাহলে এ দেশ যে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা এ মুহূর্তে পুরোপুরি অনুমান করা সম্ভব নয়। তবে এটা ঠিক যে বাংলাদেশ এ অঞ্চলের একটি ‘অর্থনৈতিক হাব’ হয়ে উঠছে এবং আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি বেশ চাউর হয়েছে। আমরা এটা ভেবে শ্লাঘা অনুভব করতে পারি।

কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা কোনো কিছুতেই খুশি নন। সব ব্যাপারেই খুঁত ধরেন। তাঁরা অনেকেই আন্ডা-বাচ্চা নিয়ে, জমিজমা বেচে, হুন্ডিতে টাকা পাচার করে, দেশের বাইরে সেকেন্ড হোম করেছেন। তাঁদের মধ্যে আমলা, ঠিকাদার, রাজনীতিবিদ, সুশীল—সবাই আছেন। তাঁদের বাদ দিলে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ আমজনতা আশাবাদী ও জীবনবাদী। তাঁরাই দেশের রক্ষাকবচ এবং তাঁরাই দেশকে শ্রম, ঘাম আর মেধা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

স্বাধীনতার পর আমাদের সাড়ে চার দশকের পথচলা সহজ ছিল না। পথে গোলাপের পাপড়ি ছিটানো ছিল না, কাঁটা ছিল বিস্তর। আমাদের অগ্রযাত্রা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আমরা হোঁচট খেয়েছি। আবার উঠে দাঁড়িয়েছি। আমরা এখন টেকসই উন্নয়নের কথা বলছি। এর অর্থ হলো, আমাদের যা কিছু অর্জন, তা ধরে রাখতে হবে এবং এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে সামনে এগোতে হবে। বাইরে থেকে কোরামিন ইনজেকশন দিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে রাখার দিন শেষ হয়ে গেছে। প্যারিসে এইড কনসোর্টিয়ামের বার্ষিক বৈঠকের সময় ভিক্ষার থালা হাতে নতজানু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার বিষয়টি এখন অতীত। বৈশ্বিক মহাজনেরা এখন টাকার ঝুলি নিয়ে আমাদের দরজায় টোকা দিচ্ছে। ইতিমধ্যে আমরা ঋণ করে ঋণ শোধ করার ক্ষমতা অর্জন করেছি। তাই মহাজনেরা এখন আমাদের উঠোনে এসে হাঁক দিচ্ছে, টাকা নেবে গো?

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। ওরা আমাদের ১০০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দেয়। পরে কুড়ি কোটি ডলার অনুদান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই ঋণের টাকা আমাদের যোগাযোগ অবকাঠামোর পেছনে খরচ হচ্ছে। অবশ্য এই ঋণের শর্ত ও ব্যবহার নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। টাকাটা সরাসরি আমাদের উন্নয়নে লাগছে নাকি তাদের প্রয়োজনে ঋণের টাকায় আমরা রাস্তাঘাট বানাচ্ছি?

কিছুদিন আগে চীনের প্রেসিডেন্ট ঘুরে গেলেন। ঋণ ও বিনিয়োগের একটা বড় ফর্দ ধরিয়ে দিলেন আমাদের হাতে। অঙ্কটা দুই হাজার কোটি ডলারেরও বেশি। টাকাটা আসবে ধাপে ধাপে, আলাদা আলাদা চুক্তির মাধ্যমে। তবু একটা নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে যে আমরা যদি তৈরি থাকি, সাহায্যটা পাব।

পদ্মা সেতু প্রকল্প নেওয়ার সময় থেকেই বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে মন-কষাকষি চলছে। টানাপোড়েন আগেও ছিল। বিশ্বব্যাংকের শর্তগুলো বেশ কঠিন। আমাদের আমলা আর ঠিকাদারেরা অত কঠিন শর্তের জালে জড়াতে চান না। ব্যাংকের শক্ত নজরদারিও তাঁদের না-পছন্দ। বরং পাবলিকের টাকায় প্রকল্প হলে সুবিধা বেশি। জবাবদিহি না করলেও চলে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংককে খলনায়ক বানানোর মজাই আলাদা। এত দিন এটা ছিল বামদের একচেটিয়া। এখন সরকারের কর্তারাও এর সঙ্গে জুটেছেন। তবে দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতা কোন দেশটি আমাদের কোলে বসিয়ে আদর–সোহাগ করে, সেটা এখনো জানতে পারিনি।

ঢালাও চীনা সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পেতে না পেতেই বিশ্বব্যাংক গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। প্রথমে স্বাস্থ্য খাতে ২০০ কোটি ডলার ঋণের প্রস্তাব দিল ব্যাংক। এর পরপরই অন্য একটি খাতে পাওয়া গেল আরও ১০০ কোটি ডলারের আশ্বাস। বিশ্বব্যাংকের পথ ধরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ঘোষণা দিল, তারাও আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশকে ৫০০ কোটি ডলার ঋণ দেবে। একসময় তারাও পদ্মা সেতু থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।

বিশ্বব্যাংক ও এডিবির ঋণের একটা সুবিধা হলো, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় থাকার সুবাদে আমরা স্বল্প সুদে ‘সফট লোন’ পাই। দায় মেটানোর সময়সীমা থাকে ৪০ বছর। অর্থনীতির হিসাবে এই ঋণ প্রায় অনুদানের পর্যায়ে পড়ে। সে তুলনায় দ্বিপক্ষীয় ঋণের সুদের হার অনেক বেশি এবং দেনা শোধের সময়সীমা কম।

রাশিয়া আরেকটা পরাশক্তি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মিত্র। সমাজতন্ত্র ঝেড়ে ফেলে দিয়ে দেশটির সমৃদ্ধি বেড়েছে অনেক, কোষাগারে পড়ে আছে বিস্তর অলস টাকা। তারা বাংলাদেশের সবচেয়ে খরুচে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে ঋণ দেবে। প্রকল্পটি তারা গছিয়ে দিচ্ছে বলে গুঞ্জন আছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশে টাকা ঢালতে এগিয়ে আসছে অনেকেই। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হলেও বাংলাদেশকে তারা বিনিয়োগের জন্য উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছে। আমরা এখন ঋণ প্রস্তাবের জোয়ারে ভাসছি। আড়ালে-আবডালে আমাদের নিয়ে টানাহেঁচড়াও চলছে। গরিবের সুন্দরী বউয়ের দিকে পাড়া-প্রতিবেশীর নজর একটু বেশিই থাকে। তাই আমাদের সাবধান থাকা দরকার।

টাকার গন্ধ পেলেই এ দেশের প্রকল্প ব্যবসায়ী-ঠিকাদারেরা গোঁফে তেল দেন, তাঁদের জিব দিয়ে লালা পড়ে। দুষ্ট লোকে বলে, একটা মেগা প্রজেক্ট বাড়াতে পারলে চৌদ্দগুষ্টির সেকেন্ড হোম তৈরি হয়ে যায় বিদেশে। তাই ‘সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটের’ দিকে তাঁদের নজর থাকে সব সময়। অর্থাৎ প্রকল্প গছাতে পারলে ওরাই ঋণের ব্যবস্থা করে দেবে। আমি এসব বিশ্বাস করতে চাই না। আমি ভাবতে চাই, এসব সন্দেহ এবং মন্দ কথা; সবই রাবিশ ও বোগাস।

অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে আমার উপলব্ধি হলো, এখন যেসব ঋণ নেব, আগামী পাঁচ-দশ বছর পর তার আসল ও সুদ শোধ করতে গিয়ে আমাদের কোষাগারে টান পড়বে। এ অঞ্চলে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান এ ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছে। লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ তো ‘দাতাদের’ বন্ধকি সম্পত্তিতে পরিণত হয়ে গেছে।

বাংলাদেশকে ছিঁড়ে-খুঁড়ে পথঘাট আর সেতু তৈরি হচ্ছে। ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট যা-ই বলি না কেন, ভারতের মালামাল যাবে পশ্চিম থেকে পুবে, চীনের পণ্য যাবে বঙ্গোপসাগর থেকে কুনমিংয়ে। প্রশ্নটা হলো, তাতে আমাদের কী এবং কতটুকু লাভ? দুই উদীয়মান পরাশক্তি চীন ও ভারত বাংলাদেশের দিকে যে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, তার থাবার নিচে আমরা নড়াচড়া করতে পারব কি না। নাকি আমরা তাদের ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের একটা ক্ষেত্র তৈরি হব। ইতিমধ্যে তার কিছু আলামত দেখা যাচ্ছে। বেইজিং থেকে একজোড়া সাবমেরিন কেনায় নয়াদিল্লি অখুশি। ওদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী একজন অ্যাডমিরালকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা ঘুরে গেছেন। কী কথা হয়েছে, সবটুকু আমরা জানি না। আমরা দেখেছি পরাশক্তির দ্বন্দ্বে পড়ে আফগানিস্তান, সিরিয়া আর উত্তর কোরিয়ার কী হাল হয়েছে। ইরান টিকে আছে কেবল প্রাচীন ঐতিহ্যের শক্তি আর সৎ নেতৃত্বের গুণে।

আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে জাতীয় স্বার্থে। কিন্তু আমাদের জাতীয় স্বার্থটা কী, তা নিয়ে আমরাই একমত নই। আমরা কি আবারও একটা ঠান্ডা লড়াইয়ের ক্ষেত্র হব, পরাশক্তির ছায়াযুদ্ধের বলি হব? আমাদের দেশে চীনপন্থীর আকাল পড়েনি। ভারতপ্রেমিকের সংখ্যাটাও নেহাত কম নয়। দরকার এখন বাংলাদেশপন্থী হওয়ার। সামনের মাস ও বছরগুলো এ নিয়ে ভাবতে হবে আমাদের।

মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক।

mohi2005@gmail.com