আমাদের যুদ্ধযাত্রা ও বিজয়ের কাহিনি

209

।।আবু মুসা হাসান।।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রমনা রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের ঘোষণা “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” শোনার পর কোনো বাঙালির মনেই আর দ্বিধা রইল না। সারাদেশের মানুষ প্রস্তুতি নিতে থাকল স্বাধীনতার জন্য। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশবাসী অসহযোগ আন্দোলনে যেভাবে সাড়া দিয়েছিল তার দ্বিতীয় নজির নেই। ঐ সময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি অফিস-আদালত ব্যাংক-বীমা সবকিছুই চলছিল তাঁর নির্দেশে।

অন্যদিকে সর্বত্র চলছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে চলছিল আমাদের ছাত্র ইউনিয়নের প্রশিক্ষণ। ছাত্রলীগও একইভাবে আয়োজন করেছিল প্রশিক্ষণের। ইউওটিসির (ছাত্র ক্যাডেট) সদস্যরা ডামি রাইফেল দিয়ে আমাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের ব্যাপক সংখ্যক ছাত্রী কর্মীও প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছিল। আমার মনে আছে, প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর আমরা ডামি রাইফেল নিয়ে ঢাকার রাজপথে মিছিল করে মহড়া দিয়েছিলাম।

মোট কথা, চারদিকে সাজ সাজ রব চলছিল। সবাই প্রস্তুত মুক্তিযুদ্ধের জন্য।

অসহযোগ আন্দোলন চলার সময় পাকিস্তানি সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান এবং তার দোসর জুলফিকার আলী ভূট্টো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার নাম করে একদিকে কালক্ষেপণ করছিল এবং অন্যদিকে বাঙালি জাতির ওপর হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ২৫ মার্চ রাতের আঁধারে হানাদার বাহিনী অতর্কিতে শুরু করল বাঙালি নিধনযজ্ঞ। তবে মুক্তিপাগল বীর বাঙালি এই নারকীয় বীভৎস হামলায় ভীতসন্ত্রস্ত না হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে গড়ে তুলল প্রতিরোধ। তাই ২৫ মার্চ শুধু কালোরাত নয়, প্রতিরোধের রাতও বটে। আমার দেখা সেই প্রতিরোধের বর্ণনা এখানে তুলে ধরছি।

২৫ মার্চ রাতে আজিমপুর নতুন পল্টন লাইনের আমরা কজন শাহীন নামে এক বন্ধুর বাসায় আড্ডা দিচ্ছিলাম। হঠাৎ শাহীনের বড় ভাই সালেহ এসে বললেন, “পাকিস্তানি সৈন্যরা হামলা শুরু করতে যাচ্ছে, আর তোরা এখনও বসে আছিস?”

সঙ্গে সঙ্গে বেড়িয়ে পড়লাম। আমাদের নতুন পল্টন লাইন এলাকাটা হচ্ছে বিডিআরের (তৎকালীন ইপিআর বা পিলখানা) পাশে। ইপিআরএর গেট থেকে নিউ মার্কেট পর্যন্ত রাস্তার দুধারে সারি সারি বড় বড় গাছ ছিল। ইপিআর গেটে এসে দেখলাম শত শত মানুষ কুড়াল নিয়ে রাস্তার দুপাশের গাছ কেটে ব্যারিকেড দেওয়ার কাজে লেগে পড়েছে। আরও একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলাম আর্ট কলেজের হোস্টেলের পাশে অবস্থিত সেই সময়কার সিএন্ডবির কম্পাউন্ড থেকে লোকজন একটি পরিত্যক্ত প্রকাণ্ড ভারী মেশিন টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে আসছে। রাস্তার ওপর মেশিনটি এনে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিতে দিতে প্রকাণ্ড ওই মেশিন উল্টিয়ে কাটা গাছের তৈরি একটি ব্যরিকেডের ওপর ফেলা হল।

আরও একটু এগিয়ে নিউমার্কেটের মোড়ে পৌঁছার পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিননীর নারকীয় হামলা শুরু হতে দেখলাম। প্রথমে মিরপুর রোড দিয়ে একটি মিলিটারি কনভয় আসতে দেখলাম। হলুদ হেডলাইট জ্বালিয়ে গাড়িগুলো এগিয়ে আসতে লাগল। এর আগে আমরা এ ধরনের হেডলাইট ঢাকা শহরে দেখিনি। এসব অত্যাধুনিক সামরিক যান পূর্ব পাকিস্তানে আনা হয়েছিল বাঙালি নিধনের জন্য।

হঠাৎ শহরজুড়ে শুরু হল প্রচণ্ড গোলাগুলি। আমরা কয়েক বন্ধু দেয়াল টপকে আজিমপুর কলোনিতে আশ্রয় নিলাম। সারারাত বাইরে কাটিয়ে ভোরবেলায় বাসায় ফিরে দেখি যে, ইপিআরএর দুই জোয়ান আমাদের ঘরে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা আমাকে জানালেন পাকিস্তানিদের হামলায় তাদের অনেকেই নিহত হয়েছেন। যারা সুযোগ পেয়েছেন তারা তাদের হাতিয়ার নিয়ে ব্যারাক থেকে পালিয়েছেন।

তাদের নিয়ে আসা থ্রি নট থ্রি রাইফেলগুলো একটি বাড়িতে জড়ো করা হল। ২৬ মার্চ আমাদের পাড়ার খসরু ভাই (প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা এবং পরবর্তীকালে ‘ওরা এগার জন’ ছবির নায়ক কামরুল আলম খান খসরু) এসে রাইফেলগুলো নিয়ে গেলেন।

২৭ মার্চ কারফিউ প্রত্যাহার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের মহল্লা ফাঁকা হয়ে গেল। ইপিআরএর পাশে থাকা কেউ নিরাপদ ভাবল না। আমিও আমার মা-বাবা এবং দুই বোন নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম অজানার উদ্দেশ্যে। হাজার হাজার মানুষের মিছিলে সামিল হয়ে পৌঁছুলাম জিঞ্জিরায়। কয়েক রাত কাটালাম এক বাড়িতে। সম্পূর্ণ অপরিচিত হলেও তারা যে আন্তরিকতা দেখিয়েছিল তা ভোলার নয়।

এদিকে, পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা এবং অগ্নিসংযোগে বাঙালির প্রতিরোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। সারাদেশে শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধ যুদ্ধ। আর্মি, ইপিআর এবং পুলিশের বাঙালি সদস্যরা জনতার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশব্যাপী এই প্রতিরোধ যুদ্ধে শামিল হন। জিঞ্জিরায়ও সংঘবদ্ধ হতে থাকলেন প্রতিরোধ যোদ্ধারা। তাঁরা ওই সময় ঢাকা শহরে কয়েকটি অপারেশনও চালিয়েছিলেন।

কয়েক দিন জিঞ্জিরায় থাকার পর আমরা নৌপথে মুন্সিগঞ্জ হয়ে নবীনগর গিয়ে পৌঁছুলাম। নবীনগর থেকে পরে গেলাম নিজ গ্রাম কসবা থানার রাইতলায়।

গ্রামও তখন বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য যুবসমাজ প্রস্তুত হয়ে আছে। আমাদের কসবা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া তখনও মুক্ত এলাকা। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে হানাদার বাহিনী যাতে আসতে না পারে সেজন্য বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিকরা জনগণের সহায়তায় কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়কে প্রতিরোধ সৃষ্টি করে রেখেছেন।

এদিকে ঢাকার ছাত্র ইউনিয়নের বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমি ছটফট করছি। ভাবছি কীভাবে কী করা যায়। কদিন পর আখাউড়ার নিকটবর্তী গঙ্গাসাগরে মামার বাড়িতে গেলাম। খালাতো ভাই মহিউদ্দিন আহমেদকে পেয়ে গেলাম সেখানে। দেখলাম, আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতা মামা গোলাম রফিক ইতোমধ্যেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ট্রেনিংএর জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের স্লিপ দিয়ে আগরতলায় পাঠানো শুরু করেছেন। আমি ও মহিউদ্দিন আমাদের দুজনকেও পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য মামাকে বললাম। মামা বললেন, “পাঠাতে পারি। কিন্তু তার আগে তোমাদের দুজনকেই যার যার মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আসতে হবে।”

দুজনই যার যার মায়ের কাছে ছুটে এলাম। অনুমতি নিয়ে পরদিন মামার বাড়ি ফিরে গেলাম। তার দুয়েক দিন পরই পাকসেনাদের হাতে গঙ্গাসাগরের পতন ঘটল। আমরা সবাই আগরতলা সীমান্তের কাছাকাছি নানাবাড়ি টনকিতে চলে গেলাম। বড়মামা গোলাম সফিক রয়ে গেলেন নিজ বাড়িতে। তিনি একটু দার্শনিক টাইপের ছিলেন। পরে তাঁর বাড়িতে পাক হানাদার বাহনীর লাগানো আগুনে ভস্মীভূত হয়ে তিনি শহীদ গেলেন।

এর পরদিনই আমরা আগরতলায় চলে গেলাম। দিনটা ছিল পহেলা বৈশাখ। মামারা বড় হয়েছেন আগরতলায়। ভারত বিভক্ত হওয়ার আগে নানা আগরতলা রাজবাড়ির স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তখন রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শচীন সেনসহ রাজ্যের কর্তাব্যক্তিদের প্রায় সবাই ছিলেন নানার ছাত্র। আগরতলায় পৌঁছে আমরা সিপিএম দলীয় এমপি বীরেন দত্তের ভাই ধীরেন দত্তের বাসায় উঠলাম।

ওদিকে মহিউদ্দিন আগরতলায় তার দলবল পেয়ে আমাকে না জানিয়েই চলে গেল দেরাদুনে বিএলএফএর ট্রেনিং নেওয়ার জন্য। ছাত্রলীগের কর্মীদের জন্য দেরাদুনে এই বিশেষ ট্রেনিংএর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিছুদিন পর আমিও আমার কমরেডদের সাক্ষাৎ পেয়ে গেলাম। আগরতলার ক্র্যাফট হোস্টেলে ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি এবং ছাত্র ইউনিয়নের ক্যাম্প করা হয়েছিল। কিন্তু ট্রেনিং বা অস্ত্রপ্রাপ্তির বন্দোবস্ত তখনও হয়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেস সরকার আমাদের মতো বামপন্থীদের আশ্রয় দিলেও ট্রেনিং ও অস্ত্র দিতে অনীহা প্রকাশ করছিল। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন আদায় করার জন্য এবং একই সঙ্গে সিপিআই (সর্বভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি) নেতাদের দেন-দরবারের ফলে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার আমাদের ট্রেনিংএর ব্যবস্থা করলেন।

ট্রেনিংএর দীর্ঘ অপেক্ষার কথা বিবেচনা করে কিছুদিনের জন্য গ্রামের বাড়ি চলে এলাম। দেখলাম পাকিস্তানি দস্যুদের হামলার আশংকায় আমার চাচা আর দাদি ছাড়া সবাই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। আম্মারা চলে গেছেন ফুফুর বাড়িতে। সেখানে থাকাকালীন মেহেরি গ্রামের বাজারে আমার সঙ্গে আকস্মিকভাবে দেখা হয়ে গেল নবীনগরের ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী শওকতের সঙ্গে। সে জানাল যে, ভৈরবের একটি মুক্তিযোদ্ধা দলের সঙ্গে সে আগরতলায় যাচ্ছে। দলটি যাচ্ছে গোলা-বারুদ আনতে। মুহূর্তের মধ্যে ওদের সঙ্গে আগরতলায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম।

শওকতের মাধ্যমে কমান্ডারের সঙ্গে দেখা করে আমার যাওয়ার বিষয়টি পাকাপোক্ত করে নিলাম। ভদ্রলোকের নাম, যতটুকু মনে পড়ে, হান্নান সাহেব। তিনি ভৈরব কলেজের কমার্সের অধ্যাপক ছিলেন। ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই নৌকাযোগে রওয়ানা দেবেন বলে কমান্ডার সাহেব জানালেন। আম্মা, ফুফু ও বাড়ির সকলের কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলাম। ফুফু দুধভাত খেয়ে যেতে বললেন। দুধভাত খেয়ে গেলে নাকি বালা-মুসিবত হবে না!

ফুফুর হাতে-মাখানো দুধভাত খেয়ে খালের পাশে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকাটির জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। পড়ন্ত বেলায় মেঘলা দিনে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। সেখানে এক যুবক জাল দিয়ে মাছ ধরছিল। আমি তাকে আমার অপেক্ষার কারণ বলার পর সে জানাল, খুব সম্ভব একটা ‘মুক্তির’ নৌকা চলে গেছে, দুই মাঝি নৌকাটি চালাচ্ছিল। তখন আমার মাথায় যেন বাজ পড়ল। এবার বাড়ি ফিরে গেলে আমার আর আগরতলায় যাওয়াই হবে না। যেভাবেই হোক, আমাকে আগরতলায় যেতে হবে।

কমান্ডার আমাকে বলেছিলেন যে, তারা আমাদের গ্রামের পার্শ্ববর্তী নিমবাড়ী গ্রামের এক নামকরা ‘ব্ল্যাকার’ সুদনের মাধ্যমে আগরতলায় যাবেন। খালের পাড়ে অসহায়ের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কর্তব্য স্থির করে ফেললাম। সরাসরি সুদনের বাড়িতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

তখন সন্ধ্যা হয়-হয় অবস্থা। ফুফুর গ্রাম থেকে কিছুদূর হেঁটে হাঁটু-পানি কোমর-পানি ভেংগে চারগাছ বাজারের কাছে সিএ্যান্ডবি রোড নামে একটি উঁচু রাস্তায় গিয়ে উঠলাম। ঐ রাস্তা থেকে আমাদের গ্রামটি আধ মাইল দূরে আর সুদনের গ্রামটি আমাদের পাশের গ্রামের লাগোয়া। আমাদের এলাকার গ্রামগুলো নিচু এলাকায় অবস্থিত। চারদিকে পানি থৈ থৈ করে। নৌকা ছাড়া যাওয়ার উপায় নেই। বেশ দূরে একজন নৌকা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁকে ডেকে আমার চাচার পরিচয় দিয়ে অনুরোধ করলাম আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। ভদ্রলোক দয়া করে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিলেন।

এরপর চাচা ও দাদির সঙ্গে কেবল দুয়েকটি আলাপ হল। পাশের বাড়ির এক ভাতিজাকে নিয়ে নৌকা করে সুদনের বাড়ির দিকে ছুটলাম। আমাদের নৌকাটি সুদনের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছুতেই মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকা থেকে টর্চ জ্বালিয়ে ‘হল্ট-হল্ট’ বলে একজন হুংকার দিয়ে উঠল। পরিচয় দেওয়ার পর কমান্ডার সাহেব অবাক। বললেন, “আমি তো মনে করেছিলাম তুমি বোধহয় আমাদের সঙ্গে যাবে না “

একটু পরে উঠানে এসে সুদন বললেন, “আইজ রাইতে ক্লিয়ারেন্স নেই, যাওন যাইব না, আপনাদেরকে অন্য কোনো জায়গায় থাকতে হইব, কাইল ক্লিয়ারেন্স পাইলে পার কইরা দিমু।”

অর্থাৎ পাকবাহিনীর যে কমান্ডার কালভার্টের পাহারার দায়িত্বে রয়েছে তার সঙ্গে সুদনের ‘লেনদেন’ হয়নি। রাতের বেলায় ২০-২২ জনের এই দলবল নিয়ে কোথায় গিয়ে উঠবেন তা নিয়ে কমান্ডার চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লে আমি বললাম, “আমাদের বাড়িতে চলুন, কোনো সমস্যা হবে না। আমার চাচা ডাক্তার ময়না মিয়া এই এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক। আপনারা গেলে বরং চাচা খুশি হবেন।”

এখানে উল্লেখ করা যায় যে, বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় পুত্র শেখ জামাল ঢাকার বন্দীদশা থেকে পালিয়ে আমাদের বাড়ি হয়েই আগরতলা গিয়েছিলেন। চাচা নিজে তাঁকে আগরতলায় পৌঁছে দিয়ে এসেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের দলটিকে নিয়ে বাড়ি যাওয়ার পর চাচা তড়িঘড়ি খাওয়ার আয়োজন করলেন। দাদি রান্না করে মুক্তিযোদ্ধাাদের খাওয়ালেন। আমাদের বাড়িতে তিনদিন থাকার পর ক্লিয়ারেন্স পাওয়া গেল এবং রাজাকার কর্তৃক পাহারারত কালভার্টের নিচ দিয়ে পার হয়ে আমরা নিরাপদে আগরতলায় গিয়ে পৌঁছুলাম।

কিছুদিন অপেক্ষার পর ট্রেনিংএ যাওয়ার সুযোগও এসে গেল। আমাদের ট্রেনিংএর ব্যবস্থা করা হয়েছিল আসামের তেজপুরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি বেইজে। ট্রেনিং ক্যাম্পে আমাদের ব্যাচে মোট চারশ জন ছিলাম। আমাদের দলনেতা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মর্তুজা খান। আমাদের চেয়ে বয়স অনেক বেশি ছিল তাঁর। ট্রেনিংয়ের প্রথম দিনের একটি ঘটনা আজও আমার মনে পড়ে।

প্রথমেই আমাদেরকে দৌড় দিয়ে একটি বিশাল মাঠ চক্কর দিতে বলা হল। তারপর কমান্ড এল লিডারের সঙ্গে পিটি শুরু করার জন্য। কিন্তু ততক্ষণে মর্তুজা ভাইয়ের দম ফুরিয়ে এসেছে, কমান্ডের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তাঁকে অবশ্য ঐদিনের জন্য ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

আমরা থাকতাম সারি সারি ব্যারাকের মধ্যে। রাতের বেলায় চলত গল্প-গুজব। আমার পাশের বেডেই ছিলেন গোপাল সাহা নামে কুলিয়ারচর ছাত্র ইউনিয়নের এক কর্মী। গোপাল তার প্রেমিকাকে দেশে ফেলে এসেছিলেন। প্রতিরাতেই প্রেমিকার স্মরণে একটি স্বরচিত গান গাইতেন আর অঝোরে কাঁদতেন। তার গানের একটি চরণ ছিল এ রকম, “হায়রে সাধের সাধনা, তুমি রইলা কোলকাতায় আর আমি আছি আগরতলায়।”

ট্রেনিং ক্যাম্পে আর একটি মজার ঘটনা মনে পড়ছে। জয়দেবপুর ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী মানব কুমার গোস্বামী মানিক মহাবিপাকে পড়েছিলেন থ্রি নট থ্রি রাইফেলের গুলি ছোঁড়ার প্র্যাকটিস করতে গিয়ে। এক চোখ বন্ধ করে নিশানা তাক করতে হয়। কিন্তু মানিক এক চোখ বন্ধ করতে পারতেন না। সেটা করতে গেলে তার দুচোখই বন্ধ হয়ে যেত। ভারতীয় আর্মির ইন্সট্রাক্টর ধমক দিয়ে হিন্দিতে বলতেন, “তুম ক্যায়সা মরদ হ্যায়, লাড়কি কো কাভি আঁখ নেহি মারা?”

ট্রেনিং ক্যাম্পের আর একটি ঘটনার কথা মনে পড়লে গা এখনও শিউরে উঠে। ক্যাম্পের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি সরু নদীতে আমাদের গোসল করতে হত। ঐ নদীর পানিতে ছিল বড় বড় জোঁক। আমরা লাফ দিয়ে জোঁকে গিজগিজ করা পানিতে নেমে কোনো রকমে একটা ডুব দিয়ে উঠে আসতাম।

ছোট অস্ত্রের ট্রেনিং শেষ হওয়ার পর এলএমজি, মর্টার ইত্যাদির প্র্যাাকটিক্যাল ট্রেনিংএর জন্য আমাদেরকে ক্যাম্পের বাইরে নিয়ে যাওয়া হত। বাইরেই দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু পিপাসা মেটানোর মতো প্রযোজনীয় পানি জুটত না। ভাত খাবারের আগে হাত ধোয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। আমরা গাছ থেকে বড় বড় টসটসে পাকা আমলকি পেরে পানির বিকল্প হিসেবে চালিয়ে দিতাম। এই হাত না ধুয়ে খাওয়ার অভ্যেসটি আমার দীর্ঘদিন রয়ে গিয়েছিল।

ট্রেনিং পেতে আমাদের যেমন বিলম্ব হয়েছিল তেমনি ট্রেনিংএর পর অস্ত্র নিয়ে দেশে ঢুকতে গিয়েও সমস্যায় পড়েছিলাম। মুক্তিযোদ্ধারা প্রবেশ করতে গিয়ে অকাতরে প্রাণ দিচ্ছিলেন। অবশেষে আমরা দেশে ঢুকতে সক্ষম হলাম। নৌকা করে ধীরে ধীরে ঢাকামুখী এগুতে লাগলাম। তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছে। স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছিল যে, হো চি মিনের ভিয়েতনামের মডেলে দীর্ঘমেয়াদী গেরিলা যুদ্ধ করার যে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিলাম, সেই সুযোগ আর থাকছে না।

আমরা ধীরে ধীরে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়লাম। আমাদের গ্রুপের অবস্থান ছিল মুন্সিগঞ্জে। আমাদের স্কোয়াড লিডার ছিলেন মাহবুব জামান। মাহবুব ভাই স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন।

মুন্সিগঞ্জে যখন আমরা অবস্থান করছিলাম তখন রেডিওতে দখলদার পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজীকে আত্মসমর্পণ করার জন্য ভারতীয় জেনারেল মানিক শাহএর ফরমান বার বার প্রচারিত হতে লাগল। ১৬ ডিসেম্বর নিয়াজী দলবল নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পণ করার পর বাংলাদেশ হানাদারমুক্ত হল। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা মুন্সিগঞ্জবাসীকে সঙ্গে নিয়ে বিজয় উৎসব পালন করলাম।

পরদিন ভোরেই আমরা নারায়ণগঞ্জ হয়ে একটি পিকআপে করে ঢাকায় চলে এলাম। নামলাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে। মিনারের করুণ পরিণতি দেখে আমরা রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়লাম। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অনুপ্রেরণার উৎস এই শহীদ মিনার। তাদের আক্রোশ ছিল শহীদ মিনার এবং এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বটতলার বটগাছটির প্রতি। আইয়ুব-ইয়াহিয়াবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ছিল এই বটতলা। তাই পাকিস্তানি বাহিনী শহীদ মিনার গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। উপড়ে ফেলে দিয়েছিল বটগাছটি।

তবু আমরা ১৭ ডিসেম্বর মিনারবিহীন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে রাইফেল উঁচিয়ে বিজয় উল্লাস করেছিলাম।

[১৭ ডিসেম্বর মিনারবিহীন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে রাইফেল উঁচিয়ে বিজয়উল্লাস করার সময় ফটোসাংবাদিক রশিদ তালুকদার উপরের ছবিটি তুলেছিলেন]

 লেখক:আবু মুসা হাসান,সাবেক কূটনীতিক ও সাংবাদিক।