সাংবাদিক সাহিত্যিক আবদুল গাফফার চৌধুরীর জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

55

।।হামিদ মোহাম্মদ।।

‘কিংবদন্তী‘ শব্দটির উচ্চতার মাপ আমি জানি না। তবে অনুমান করতে পারি আমার পক্ষে এর চূড়া স্পর্শ করা কঠিন,অসাধ্য। সাংবাদিক সাহিত্যিক আবদুল গাফফার চৌধুরী আমাদের জীবন্ত কিংবদন্তী। তাঁর উচ্চতার মাপ খড়কুটো আর সাধারণ মানুষ ছাড়িয়ে অনেক উপরে। কেউ এর উচ্চতা দেখে, কেউ দেখে না। মুক ও বধিরদের না দেখার মধ্যেও একটি দেখা আছে, সেটা তার উচ্চতা মেনে না নেয়া। আবদুল গাফফার চৌধুরীর মতো এতো স্পষ্ট উচ্চতার অবস্থান ইতিহাসে কম মানুষের ভাগ্যে জুটে। আমরা এরকমই এক বিরল মানুষকে কাছ থেকে দেখছি, ছুঁয়ে দেখছি,চিমটি কেটে দেখছি,তার বক্তব্য শুনছি,মতামত নিচ্ছি। আমাদের স্থবিরতায় ভবিষ্যত দিগনিদের্শেনা দিচ্ছেন। যেখানে যে সময়ই জাতি অন্ধকারে পথ হারাতে বসেছে বা দিগচিহ্নহীন হয়ে পড়েছে সেখানে সে সময়ে আবদুল গাফফার চৌধুরী এগিয়ে আসেন অসম্ভব শক্তিধর,সাহসী এবং স্পষ্ট আলোধারী হয়ে। যার মহিমা কীর্তন কেউ করে না, কিন্তু তিনি মহিমামহিম।
আবদুল গাফফার চৌধুরী ২০১৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ৮২বছরে পর্দাপন করছেন। ৮৩তম জন্মদিন।
আমাদের জন্য,বাঙালির জন্য সৌভাগ্য,এমন একজনকে ৮৩তম জন্মদিনে অভিবাদন জানাচ্ছি,যিনি আমাদের আলোকিত করে আছেন, তাঁর আলোয় দাঁড়িয়ে তাকেই দেখছি আমরা।
বিলেতের প্রবাসী বাঙালির জন্যে আরো সৌভাগ্যের ব্যাপার যে,দেশ ছাড়িয়ে যিনি বিশ্ব পরিসরে বাঙালির পরিচয়ের ঝান্ডা বহন করছেন, আমরা তাঁর পাশে,আমাদের সাথে তিনি জীবন্ত। বাঙালির ঐতিহাসিক ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামী বীজ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর যা শাণিত তরবারি হয়ে আছেÑতাঁর রচিত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি‘গান-তা বাঙালি বহন করবে চিরকাল। যতদিন বাঙালি থাকবে, বাংলাভাষা থাকবে ততদিন আপনি আছেন, আছে আপনার রচিত এই প্রেরণাদায়ক হিম রক্ত উছলে দেয়া এই অমর গানÑসংকটে,সংগ্রামে।
আবদুল গাফফার চৌধুরীর বর্তমান পরিচয় সংবাদপত্রের কলামিস্ট। কিন্তু তাঁর পরিচয় মূলত কথা সাহিত্যিক। ইতিহাস ও শিকড় সন্ধানি কথাসাহিত্য রচনায় যিনি অসাধারণ ক্ষমতা রাখেন, তাকে আমাদের সংবাদপত্রের মানুষেরা নানা স্বার্থে কলামিস্ট বানিয়ে ফেলেছি। কেউই তাকে কথাসাহিত্য সৃষ্টিতে প্রণোদনা দেন না। অনেকটা তাকে মূল পথ থেকে সরানোর কাজটি নীরবে,অগোচরে করতে চেষ্টা করেছি। তবে যিনি পথ হারান না,তিনি দৃঢ় থাকেন তার পথেই। যা কথাসাহিত্যে বলার প্রয়োজন ছিল,তা কলামেই সোজাসাপটা বলেই ক্ষান্ত হন না, ঋজু,বলিষ্ট শিরদাড়া নিয়ে আরো সোপার্জিত হন। যার কোনো পদস্খলন নেই,দ্বিধাদ্বন্ধ নেইÑঅভিবাদন গাফফার ভাই।
আবদুল গাফফার চৌধুরী বিলেতে থাকেন, দেশে থাকতে ভাবতাম,লন্ডনে গেলে গাফফার চৌধুরীকে কাছে থেকে দেখবো, আমার মতো অনেক তরুণের বিলেত দর্শনে আবদুল গাফফার চৌধুরী দর্শনও একটি এজে-া হয়ে থাকে। আকাঙ্খাটি এমনই হয়, যা এক ধরনের স্বপ্ন-ই বলতে হয়। আমি এবং আমার মতো অনেকেই বিলেতে তাঁর সান্নিধ্যে পরিপুষ্ট, দেশের মানুষও বঞ্চিত নয়,প্রায় প্রতি সপ্তাহে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রের মাধ্যমে হাজিরা দেন,কথা বলেন দেশ ও জাতিকে নিয়ে,সংকটে দিশা দেন-যার জন্যে উন্মুখ থাকেন কত শত মানুষ,পাঠক।
গাফফার ভাই বলতে ইচ্ছে করে, আবার লিখুন, স¤্রাটের ছবি‘র মতো উপন্যাস,লিখুন গল্প। আপনার অসাধারণ কলম থেকে আমরা আরো পেতে চাই গল্পগ্রন্থÑকৃষ্ণপক্ষ (১৯৫৯),চন্দ্রদ্বীপের উপখ্যান(১৬০),সুন্দর হে সুন্দর(১৯৬০),নাম না জানা ভোর(১৯৬২),নীল যমুনা(১৯৬৪), শেষ রজনীর চাঁদ(১৯৬৭), শিশুতোষগ্রন্থÑডানপিঠে শওকত(১৯৫৩),আাঁধার কুঠির ছেলেটি(১৯৫৪)।
আমার মনে পড়ে,১৯৮৮ সালে লন্ডনে বইমেলা আয়োজনের কথা। আমরা ক‘জন তরুণ সংস্কৃতিকর্মী মরিয়া হয়ে ওঠেছি বাংলাদেশের বইমেলা‘র আয়োজন করতে। প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী যুক্তরাজ্য শাখা গঠন করেছি সবেমাত্র। উদীচীর উদ্যোগে পূর্ব লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেল রোডের ডেভেনাণ্ট সেন্টারে ১২ অক্টোবর ১৯৮৮ আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী বইমেলা উদ্বোধন করেছিলেন আবদূ গাফফার চৌধুরী। উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেছিলেন,বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস,লন্ডনে আয়োজিত আজকের ‘বাংলাদেশের বইমেলা‘য় উঠে এসেছে, এ বইমেলা প্রবাসী বাঙালির জন্যে পরম গৌরবের‘।
সত্যিকার অর্থেই এ বইমেলা ছিল প্রবাসে গৌরবজনক। সপ্তাহব্যাপী বাংলাদেশের বইমেলা আজ ২৮ বছর অতিক্রান্ত হলেও আর অনুষ্ঠিত হয়নি। শুধু বইমেলার ব্যাপারে নয়,আপনার দুরদৃষ্টি বাঙালির অগ্রযাত্রায় ঐতিহাসিক,অজেয় এবং অনুকরণীয়। সকল ধরনের উগ্রতার বিরুদ্ধে আপনার কলম,সকল অন্ধকার বিতাড়নে আপনার অবস্থান জয় হউক। সেই জয়মাল্য আপনার জন্যেই একমাত্র।
. . . . . .
আবদুল গাফফার চৌধুরীর জন্মদিনে পঙক্তিমালা

যখন আগুন বৃষ্টি হয়,দাবানল ধেয়ে আসে আমাদের দিকে
তখন আমরা ছুটি ঘরদোর বাঁচাতে,মাথায় ঠাঁই খুঁজি বটগাছটার ছায়ায়
আমরা ছুটে যাই আশার বাতিঘরে, আমরা আগুন নেভানোর সাগর খুঁজি
আমরা হারাতে চাই না আমাদের
আমরা দাঁড়াতে চাই আ-ভূমি সুরুজ এবং চাঁদের দেশে
৫২ থেকে ৭১ এবং ৭১ থেকে ২০১৬ কত আগুন এসেছে ধেয়ে
বটগাছটার ছায়ায় গেলেই আগুন নেভাতে পারি
বটগাছটার ছায়ায় গেলেই শীতল মধুবন জেগে ওঠে
বটগাছটার ডালে ডালে সবুজ পাতা গজায়
বাতাস নাচে বাউল সুরে।

চিরসবুজ বটগাছটা ধানসিঁড়ি ঢেউয়ের দেশে ছিল একদা
কোনো এক ভোরের আলোয় ঝলমল করেছিলো এক মায়ের কোলে
যে মায়ের তুলনা নাই, যে দেশের তুলনা নাই।
কী করে বুঝাই-
আরো বটগাছ চাই
আমাদের বটগাছ আরো জরুরি
যারাই আমাদের পুড়িয়ে মারতে চায়,আগুন লাগায় আমাদের ভিটেয়
তাদের তাড়াতে,সংহার করতে সাপ ও বিচ্ছু
বাসভূমি নিরাপদ,ছায়া-শীতল রাখতে হলে আরো বটগাছ চাই
পরগাছা চাই না,চাই বটগাছ।