‘কথা বলছি না কেন’

37

বিলেতবাংলা ডেস্ক, ২১ নভেম্বর:  ধর্মান্ধতা কিংবা মানবাধিকার হরণ রুখে দাঁড়াতে অজুহাত না দেখাতে নারী আন্দোলনের কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সুলতানা কামাল।

মা সুফিয়া কামালকে দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেছেন, এখন ব‌্যক্তি স্বার্থের বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়ে সবাই পিছু হটার প্রবণতা দেখাচ্ছে।

মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বলেন, “আচ্ছা, কথা বললে কী হবে? কথা না বললে তো কোনো লাভ নাই। কথা বল না কেন? না বলার কী আছে? বিদেশি পয়সা তো নিয়ে আসছে কথা বলার জন্য, বলছ না কেন? কারণ যদি কিছু ঝুঁকি নিতে হয়, যদি কিছু করতে হয় । অনেক স্বার্থ বজায় রেখে আজ সংগঠন করছি আমরা।

“আমরা স্বার্থের আবরণে নিজেদের গুটিয়ে ফেলছি। অনবরত নিজেদের পেছনে নিয়ে যাচ্ছি এবং অজুহাত দিচ্ছি কোনো কথা বলা যায় না, কিছু করা যায় না।”

কবি সুফিয়া কামালের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি আয়োজিত এক স্মরণসভায় একথা বলেন তার মেয়ে সুলতানা কামাল।

পাকিস্তান পর্ব থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রতিটি আন্দোলনে সদর্প উপস্থিতি ছিল সুফিয়া কামালের। ধর্মান্ধতা, অসাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলেন তিনি।

বর্তমানে সমাজে যে আত্মকেন্দ্রিকতার চর্চা চলছে, তার বিপরীতে সুফিয়া কামালের জীবনাচরণ তুলে ধরেন তার মেয়ে।

 “আমরা যে বুক চাপড়াই, আমাদের সামনে কেউ নাই, তাই কথা বলতে পারছি না, কিছু করতে পারছি না, সামনে যেতে পারছি না। সব কিছু আমাদের হয়ে গেছে এখন ঐ নিয়ে। ভাবছি, আগে আমার পিঠটা বাঁচাতে হবে।”

“সুফিয়া কামাল সেইটারই বিরুদ্ধে ছিলেন। সুফিয়া কামাল যে সময়ে কাজ করেছেন, তার একেবারে কিশোর বয়স থেকে, তখন কি খুব ভালো অবস্থা ছিল? সুফিয়া কামাল কীসের ভয় করেছিলেন? আইয়ুব খানকে তিনি কি করে বলে দিলেন, ‘আমরা যদি হায়েবান হই, আপনি হায়েবানদের প্রেসিডেন্ট’। তিনি তো ভয় করেননি।”

বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে সুফিয়া কামালের সংগ্রামের প্রাসঙ্গিকতাও তুলে ধরেন সুলতানা কামাল।

“মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি ক্ষমতায় বসে কোনো দায়-দায়িত্ব নিচ্ছে না। তারা সাম্প্রদায়িকতা বাড়তে দিচ্ছে, জঙ্গিবাদ বাড়তে দিচ্ছে, যারা মৌলবাদী, গোঁড়া, ধর্মান্ধ, নারীবিদ্বেষী, তাদের সঙ্গে আপস করছে। আমাদের তো দুঃখের কোনো সীমা নাই।”

“কথা বললে কী হবে, বড় জোর জেল হবে। আর জঙ্গিরা যদি মেরেই ফেলতে চায়, তবে কথা না বললেই মারবে না, এমন কোনো ব্যাপার নেই। ভয় করে আমি কোথাও বাঁচব না, উটপাখি হয়ে বাঁচার দিন চলে গেছে,” বলেন তিনি।

আওয়ামী লীগের ‘ভোটের রাজনীতি’র সমালোচনা করে সুলতানা কামাল বলেন, “সারা বছর ইসলামপন্থি হিসেবে পরিচয় দিয়ে তারা ভাবেন, তারা বেশি ভোট পাবেন। কেন তারা ভাবেন না, আমি যত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সরব তত বেশি ভোট কম পাব। সেই বোধ বা চেতনা কে দেয় তাদের?”

রাজধানীর সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে ৩০টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত এই ফোরাম আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান আসে।

প্রিপ ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক অ্যারোমা দত্ত বলেন, “আজ চারপাশে এত অত্যাচার, বৈষম্য, তার বিপরীতে কতটুকু প্রতিবাদ হচ্ছে? আমি বলব, সুফিয়া কামাল সৌভাগ্যবান, তাকে এসব দেখতে হয়নি। এসব দেখলে তিনি ভেতরে ভেতরে রক্তাক্ত হতেন।

“আমরা আজ এতই দেউলিয়া হয়ে গেছি, যে তার মতো ইমেজকে সামনে রেখে আমরা এগোতে পারছি না।”

মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খাতুন, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি চঞ্চনা চাকমা, নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের নেতা নাসিমুন আরা হক, স্টেপ টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক রঞ্জন কর্মকার, উইমেন অ্যান্ড উইমেন-এর নির্বাহী পরিচালক জাকিয়া কে হাসান, এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সেলিনা আহমেদ।

সভা থেকে কবি সুফিয়া কামালের জীবনব্যাপী মানবমুক্তি ও গণতন্ত্রের সংগ্রাম, অসাম্প্রদায়িক মানবিক মূল্যবোধ ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা নির্যাতন প্রতিরোধের আহ্বান জানান বক্তারা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর এবং গাইবান্ধার বাগদাফার্মের ঘটনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের দাবি জানান তারা।