‘তৃতীয়বাংলায় মুক্তিযুদ্ধ ’ ৩৫ – : মাহমুদ এ রউফ

76

বিলেতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, রাজনীতিক,কমিউনিটি নেতা মাহমুদ এ রউফ দেশে প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতিতে যুক্তছিলেন। ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের  সক্রিয়  কর্মী ও ছাত্রনেতা। সিলেটের খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মদনমোহন  কলেজের শিক্ষার্থী  ছিলেন ষাটের দশকের গোড়ার দিকে। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশে লন্ডনে আসেন ষাটের দশকের  শেষার্ধে। জড়িয়ে পড়েন বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বিলেত হয়ে ওঠে তৃতীয় রণক্ষেত্র। মাহমুদ এ রউফ বিলেতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সংঘটিত আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন প্রথম সারির নেতা। তাঁর  লেখনিতে উঠে আসছে  ‘তৃতীয় বাংলায় মুক্তিযুদ্ধ‘।

বিলেতবাংলা২৪.কম ধারাবাহিক প্রকাশ করছে বিলেতে বাঙালির প্রত্যয়দীপ্ত এই আগুনঝরা দিনের ইতিহাস। প্রতি সপ্তাহে  থাকছে ‘তৃতীয়বাংলায়  মুক্তিযুদ্ধ ‘।-নির্বাহী সম্পাদক।

কিস্তি ৩৫

পাকিস্তানি ক্রিকেট টিমের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদেও একটা বিক্ষোভের স্মৃতি বিশেষ করে মনে পড়ছে। সেটা ছিল লন্ডন থেকে অনেক দূরে বার্মিংহাম শহরের কাছে ডরস্টার শহরে। মাস ও তারিখটা সঠিক যতটুকু মনে পড়ে তারিখটা হচ্ছে একাত্তরের মে মাসের ১ লা তারিখ। খবর পেলাম যে পাকিস্তানি ক্রিকেট টিম ডরস্টারে টেস্ট ম্যাচ খেলতে যাবে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কার্যালয় ৩৫ গ্যামেজ বিল্ডিংয়ে এক বৈঠক বসলো। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলোÑ পাকিস্তানি নরঘাতকরা যেখানে বাংলাদেশে নির্বিবাদে গণহত্যা আর ধর্ষণ করছে তখন তাদের ক্রিকেট টিম বিনা প্রতিবাদে ব্রিটেনে খেলা করে যাবে তা হতে পারে না। আমরা প্রত্যেকটা খেলার সময় মাঠে প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে যাব,আর বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের  অত্যাচারের প্রচারণা চালিয়ে যাব।এর জন্য একটা পূর্ণ কর্মসূচীও সঙ্গে সঙ্গে প্রণয়ন করা হলো।

সংগ্রাম পরিষদের  সদস্যদের মধ্যে দায়িত্ব বন্টন করা হলো।এবং সবাইকে বলা হল,বিভিন্ন খেলার মাঠে যেন প্রত্যেকে সম্ভব হলে নির্দিষ্ট সময় মত উপস্থিত হয়ে বিক্ষোভকে জোরদার করার চেষ্টা করা করেন। লন্ডনের লর্ডসে বা ওভাল ক্রিকেট মাঠে বিক্ষোভের আয়োজন করা যত সহজ অন্য কোনো বাইরের শহরে কিন্তু এতো সহজ নয়। কারণ  বাইরের শহরে লন্ডন শহর থেকে কোচ বোঝাই করে মানুষ নিয়ে যেতে হয়। আর এর সঙ্গে সেখানকার স্থানীয় কিছু লোক যোগদান করেন।

বার্মিংহামের ডরস্টার শহরের ক্রিকেট মাঠে বিক্ষোভ প্রদর্শনের জন্য লন্ডন থেকে যাওয়ার সব রকমের আয়োজনের দায়িত্ব দেয়া হলো আমাকে(মাহমুদ এ রউফ) ও শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে( বাংলাদেশের সাবেক বিচারপতি,সুপ্রীম কোর্ট এ্যাপিলেট ডিভিশন)।এবং যতটুকু মনে পড়ে খন্দকার মোসাররফ হোসেনকে (প্রাক্তন জ্বালানী মন্ত্রী)। আমার উপর দায়িত্ব ছিল নির্দিষ্ট দিনে সকাল ৯টার মধ্যে কোচ পূর্ব লন্ডনের ব্রিকলেনের একমাত্র সিনেমা হল ‘নাজ‘ এর সামনে হাজির করা।আর পূর্ব লন্ডনের বাঙালিদের  দিয়ে কোচ পূর্ণ করে  ডরস্টারেরর দিকে যাত্রার ব্যবস্থা করা। নির্দিষ্ট দিনে  ব্রিকলেন থেকে রওয়ানা দেয়ার আগে শামসুদ্দিন মানিক ও খন্দকার মোশাররফ হোসেন লন্ডনের অন্যান্য স্থান  থেকে আরো কিছু মানুষ সংগ্রহ করে  আরেকটা কোচ নিয়ে আমাদের সাথে যোগ দেন। তাদের সাথে নর্থ লন্ডন  থেকে ‘এ্যাকশন বাংলাদেশ‘র চেয়ারম্যান পল কনেট ও সেক্রেটারি ম্যারিয়েটাও বিক্ষোভে যোগ দেয়ার জন্য আসলেন।

পল কনেট ও ম্যারিয়েটা ( যিনি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন পর আত্মহত্যা করে মারা যান)। প্রসঙ্গক্রমে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে বলতে হয়, এই দুই মহানুভব অবাঙালি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য নি:স্বার্থভাবে যা করেছেন তার নজির খুব কমই আছে। তারা আমাদের  বিক্ষোভে যোগ দিয়ে অবাঙালি স্থানীয় লোকদের কাছে আমাদের আন্দোলনকে কয়েকগুণ বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলেন।

যাই হউক, দ্বিতীয় কোচ ব্রিকলেনে পৌছার পর দেখা গেল জনসংখ্যা যথেষ্ট নয়। যেহেতু কথা ছিল কোচ ভাড়া  বাবত প্রত্যেক যাত্রীকে ১ পাউন্ড করে চাঁদা দিতে হবে।কারণ, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কোচের ভাড়া দেয়ার মত টাকার ব্যবস্থা ছিল না। সেহেতু, কোচের ভাড়ার ব্যবস্থার জন্য আরো যাত্রীর প্রয়োজন। অন্য কোনো উপায় না দেখে রাস্তা থেকে যাকে পরিচিত পাওয়া যায় তাকেই আমাদের সাথে যাওয়ার অনুরোধ করতে শুরু করি। অবশ্য শেষ পর্যন্ত উভয় কোচই পূর্ণ হল। কিন্তু বেলা তখন সকাল ১১টারও বেশি। ডরস্টার খেলার মাঠে  বিক্ষোভ প্রদর্শনের জন্য সময়( (স্থানীয় পুলিশ দ্বারা) নির্ধারিত বা বরাদ্দ হয়েছে দুপুর ১টা থেকে দু‘টার মধ্যে। অবশ্য এই অনুমতি বার্মিংহাম থেকে নেয়া হয়েছিল। সেখান থেকে আসল বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়েছিল। জনাব জগলুল পাশার নেতৃত্বে সেখান থেকে প্রায় ছয় শত লোক খেলার মাঠে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।চলবে