ধর্ষণ আর মিডিয়া

52

 নাদীম কাদির

নিজে একজন সংবাদকর্মী হওয়াতে, স্বাভাবিকভাবেই পত্র-পত্রিকা পাঠ করতে হয়। পত্রিকা সবসময় আমাকে আকৃষ্ট করে, বিশেষত করে যখন বিদেশে ঘুরে বেড়াই। তখন নানান রকমের পত্র-পত্রিকা দেখার সুযোগে আমি পুলকিত বোধ করি।

আমি বলতে পারি যে বাংলাদেশের মতো স্বাধীন মিডিয়া পৃথিবীতে কোথাও নেই। শুধু স্বাধীন না, আমরা কোনো বিবেচনা না করেই বহু খবর প্রকাশ করতে থাকি, যেটা আমি আর কোথাও দেখি নাই।

আমার সহকর্মীরা আমার উপর রাগ করতে পারেন, মন্দ বলতে পারেন। কিন্তু আমিতো সারাজীবন সত্যি আর সরাসরি সব কথা বলি। ‘আন্দাজে কথা বলা’ আমার অভ্যাস না। যদিও এখন কূটনৈতিক দায়িত্বে আছি, তারপরও তো সাংবাদিকতা চিরজীবনের আর তাই এই লেখা।

অতি সম্প্রতি দেখলাম ধর্ষণ নিয়ে প্রতিদিন রিপোর্ট হচ্ছে, যার কিছু কিছু বিদেশি গণমাধ্যমে আসছে অথবা অনলাইন হওয়াতে যারাই ক্লিক করছে তারাই নিউজগুলো পড়তে পারছেন। মনে হচ্ছে বাংলাদেশ যেন ধর্ষকদের দেশে পরিণত হয়েছে।

আমার এক ব্রিটিশ সাংবাদিক বন্ধুর কাছে জিজ্ঞাসা করলাম যে ওদের দেশে ধর্ষণ হয় না? ও বলল নিশ্চয় হয় কিন্তু কেনো তোমার এই প্রশ্ন? আমি বললাম তোমাদের পত্রিকায় দেখি নাই। শুধু একজন সিরিয়াল কিলার এর কথা শুনেছি যে ধর্ষণ করে তার ভিকটিমকে খুন করতো।

আমার এই বন্ধু হাসল। বলল, এটা তো সামাজিক সমস্যা আর এখন যুক্তরাজ্যে অনেক জনসংখ্যা আর বিভিন্ন দেশের মানুষ থাকে। তাই এই রকম ধর্ষণ, চুরি তো হবেই। আমরা খুব মজার ঘটনা যেমন কোনো বড়লোকের গয়না চুরির মতো হলে তখন কিছুটা জায়গা দেই। কারণ তার সামাজিক পরিচিতি আছে এবং তার গয়নার মূল্য কয়েক বিলিয়ন পাউণ্ড।

তারা এক্সক্লুসিভ নিউজ বেশি করে, অন্যায়ের খবর, স্বাস্থ্য বিষয়ক যেগুলো মানুষের জীবনের সাথে জড়িত, যেগুলো মানুষের উপকারে আসবে।

ধরুন আজকের গার্ডিয়ান পত্রিকা (০১/১১/২০১৬)র প্রথম পাতায় এসেছে এক্সক্লুসিভ খবর – রাশিয়া আর যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক নিয়ে। তারপর একটা দুর্নীতির খবর আছে, ‘Rolls-Royce agents allegedly used bribes to win contracts.’ আর আছে কিছু ছবি। তাদের ন্যশনাল বা জাতীয় খবরের পৃষ্ঠায় আছে লরি ড্রাইভার যে চারজনের উপর গাড়ি উঠিয়ে দিয়েছিল, তার দশ বছরের জেল হয়েছে, বিস্তারিত ছবিসহ।

আছে এক পৃষ্ঠার খবর যেখানে বলা হয়েছে যুক্তরাজ্যে সন্ত্রাসী হামলা হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি এবং গায়িকা এডেলে’কে নিয়ে আরেকটা খবর আছে কারণ সে খুবই জনপ্রিয়। তার পোশাক নিয়ে অনেক স্টোরি হয়েছে।

আমরা রাজনীতি আর ক্রাইম নিয়ে এত ব্যস্ত যে অন্য অনেক খবরই জায়গা পায় না। যেমন ধরুন আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতুর কি অবস্থা, কর্ণফুলী সেতু কি হচ্ছে? কোথাও কি নতুন চাষাবাদ হচ্ছে? কোনো বিদ্যালয়ে কম বেতনে ভালো পড়াশুনা, আইনের অপব্যবহার ইত্যাদি।

পিতা-মাতার সামনে ধর্ষণের খবর পড়তে আমাদের লজ্জা লাগতে পারে। ১৬ কোটি মানুষের দেশে ১০টা ধর্ষণ অস্বাভাবিক না। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো ধর্ষণ প্রমানিত হওয়ার আগেই বলা হচ্ছে ‘হয়তো ধর্ষণ এর ঘটনা’।

সোনার বাংলাদেশ কি শুধু ধর্ষণ, জঙ্গিবাদ আর অন্যায় অপরাধের দেশ? এখান থেকে আমাদের বের হতেই হবে।

এমনকি প্রতিবেশি ভারতের পত্রিকা কিংবা টিভির দিকে তাকান, তাদের দেশ প্রেম কতো গভীর! তাই তারা দেশের ভাবমূর্তি যাতে নষ্ট না হয় তা সবসময় বিবেচনায় রাখছে।

অনেক কিছু ভেবে চিন্তে নিউজ করতে হবে বলে আমি মনে করি। নতুন ধারা আনতে হবেই। মানুষের রুচি পরিবর্তন করা আমাদের দায়িত্ব। যেমন কম্পিউটার পছন্দ ছিল না এক সময়ে, কিন্তু এখন কম্পিউটার ছাড়া কোনো কাজ হয় না। তেমনি নতুন ভাবে খবর পরিবেশন করতে হবে। নতুন আঙ্গিকে দেশের উন্নতির জন্য, দেশের ভাবমূর্তির জন্য।

আমার সেই ইংরেজ বন্ধু আমাদের পত্রিকার কভারেজ দেখে খুবই অবাক! সে বলল যে, ওদের যে কন্ট্রোলিং অথরিটি আছে, তারা অনেক খবরের ব্যাপারে আপত্তি জানাতে ও শাস্তি দিতে পারে।

আমি বললাম আমরা স্বাধীন এবং মুক্ত! ওর উত্তর, ‘তোমাদের স্বাধীনতা দায়িত্বের সাথে ব্যবহার কর। আমার হিংসা হচ্ছে’।

আমার প্রার্থনা আমাদের দেশের সুন্দর খবর দেখে বিদেশিরা হিংসা করুক, কিন্তু হাসবে না বা ছোট করে দেখবে না।

আপনারা কষ্ট পেলে মাফ করবেন।

নাদীম কাদির : সাংবাদিকতায় জাতিসংঘের ড্যাগ হ্যামারসোল্ড স্কলার এবং লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার।

nadeemqaadir1960@gmail. Com