মন্ত্রীর সামনেই মারমুখী নাসিরনগরের ইউএনও

48

বিলেতবাংলা ডেস্ক, ৪নভেম্বর: হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলার ঘটনায় প্রশাসনের গাফিলতির অভিযোগের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে সাংবাদিকের উপর চড়াও হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মোয়াজ্জেম হোসেন।

বুধবার এই সরকারি কর্মকর্তা সাংবাদিকদের দিকে তেড়ে যাওয়ার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস‌্য এবং মৎস‌্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হকও।

ইউএনওর মতো মন্ত্রীও সাংবাদিকদের দোষ দিয়ে বলেন, ঘটনা ‘তেমন কিছু না’, তা বাড়িয়ে বলা হচ্ছে।

নিজের এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের দেড়শ বাড়ি-ঘর ও ১৫টি মন্দিরে হামলার তিন দিন পর নাসিরনগরে যান ছায়েদুল হক।

সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে এক ‘রাজাকারপুত্র’কে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী করার পর ছায়েদুল হককে দল থেকে অব‌্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগ।

এক হিন্দু যুবকের ফেইসবুক পাতায় ইসলাম অবমাননার অভিযোগ তুলে গত রোববার নাসিরনগরে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ও হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের পর সাম্প্রদায়িক হামলা হয়।

আহলে সুন্নাতের সমাবেশে ইউএনও মোয়াজ্জেম, স্থানীয় থানার ওসি আবদুল কাদের বক্তব‌্য রেখেছিলেন। তাদের বক্তব‌্য উস্কানিমূলক ছিল বলে দাবি নির্যাতনের শিকার হিন্দুদের।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারাও প্রশাসনের গাফিলতির অভিযোগ তুলে ইউএনও ও ওসির অপসারণের দাবি তোলে। বুধবার ওসি কাদেরকে প্রত‌্যাহারও করা হয়।

এদিন ঘটনাস্থলে গিয়ে নির্যাতিতদের সঙ্গে কথা বলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতারাও প্রশাসনের গাফিলতির অভিযোগ তুলে ইউএনও মোয়াজ্জেমকে অপসারণের দাবি জানান।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি জয়ন্ত দেব দীপু ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইউএনও মোয়াজ্জেমকে প্রত্যাহারের আলটিমেটাম দিয়েছেন সরকারকে। নইলে আন্দোলনের হুমকি দিয়েছেন।

দুপুরে নাসিরনগর উপজেলা ডাক বাংলোতে মন্ত্রী ছায়েদুলের সঙ্গে থাকা ইউএনও মোয়াজ্জেমের কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি মারমুখী হয়ে ওঠেন।

‘ঘটনার দায় এড়াতে পারেন কি না’ – এই প্রশ্নে মোয়াজ্জেম আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে আঙুল উঁচিয়ে বলতে থাকেন- “ওই মিয়া আপনি এগুলি কী বলেন? মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ।”

ওই সময় পাশের আরেক সাংবাদিক ইউএনওকে আস্তে কথা বলতে বললে তার দিকে আঙুল তুলে মোয়াজ্জেম বলেন, “ওই মিয়া, আপনাকে — আপনি আমারে চিনেন? আপনি আমারে চিনেন?”

সাংবাদিকের দিকে তেড়ে যাচ্ছেন ইউএনও চৌধুরী মোয়াজ্জেম আহমেদ, পাশে মন্ত্রী ছায়েদুল হক

এরপর উত্তেজিত হয়ে সোফা থেকে উঠে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিনিধির দিকে তেড়ে আসতে আসতে ইউএনও বলেন, “এই মিয়া, হোয়াই ডিড ইউ ব্লেম মি? হোয়াই ডিড ইউ ব্লেম মি? আপনি বলেন কেন আমি ইনভলবড? আপনি কেন বললেন আমি ইনভলবড? আপনি প্রমাণ দেখান।”

তখন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিনিধি ‘প্রমাণ দেবেন’ বললে পাশে বসা মন্ত্রী ছায়েদুল বলে ওঠেন, “এখন দেন। যা ইচ্ছে তা বলা শুরু করছেন!”

হামলার শিকার কাশীপাড়ার জগন্নাথ দাশ দুদিন না খেয়ে আছেন বলে জানানো হলে মন্ত্রী বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের মধ্য থেকে জগন্নাথ দাশকে ডাকতে বলেন।

এরপর কিছুটা শান্ত হয়ে মন্ত্রী বলেন, “ঘটনা ঘটার পর স্বাভাবিক কি না। উল্টা কথা কন কেন?”

অপরাধীদের বিচার হবে কি না- মন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আল্লারে জিগান গা। কী প্রশ্ন! আশ্চর্য প্রশ্ন। বিচার হবে না কেন? দেশে বিচার হচ্ছে না?”

মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, “ঘটনা তো তেমন কিছুই না। আপনারা ঘুরে দেখেন সবকিছু স্বাভাবিক আছে।”

আহলে সুন্নাতের ওই সমাবেশে আওয়ামী লীগের স্থানীয় কয়েকজন নেতাও ছিলেন।

ছায়েদুল হক বলেন, “তবে আমার দলের যে সব নেতা টাকা পয়সা খায়। এদেরকে দূরে সরিয়ে দিয়েছি। এরা এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে।”

বুধবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের সংসদ সংদস্য র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। তবে হরিণবেড় গ্রামের একটি মন্দির ও বাড়ি পরিদর্শন করেই ফিরে যান তিনি।

হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন করা হলেও হিন্দুদের মধ‌্যে আতঙ্ক কাটেনি।

বেশ কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা ‘রাজনৈতিক কোন্দলের বলি’ হয়েছেন।

তারা বলেন, গত ইউপি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগে যে বিভক্তি এবং কোন্দল তৈরি হয়। তা এতেও ভূমিকা রেখেছে।

বিকালে মোহেন্দ্র চন্দ্র দাসের সভাপতিত্বে নাসিরনগর শহীদ মিনার চত্বরে সমাবেশ থেকে ইউএনও মোয়াজ্জেমকে অপসারণের দাবি জানায় কমিউনিস্ট পার্টি।

সমাবেশে দলটির কেন্দ্রীয় নেতা রাগিব আহসান মুন্না, জেলা সম্পাদক শাহরিয়ার মোহাম্মদ ফিরোজ ও মনিরা বেগম বক্তব্য রাখেন।

দুপুর ১২টায় পরিদর্শনে আসেন দুই অধিকারকর্মী সুলতানা কামাল ও খুশি কবির। প্রশাসনের গাফিলতি থাকতে পারে বলে মন্তব‌্য করেন তারা।

সুলতানা কামাল বলেন, একে রামুর ঘটনার পুনরাবৃত্তি বললে ভুল হবে না। পরিকল্পিতভাবে যাজক, শিক্ষক, পীর, সাধক, সংস্কৃতিকর্মী ও পুরোহিতদের যেভাবে হত্যা করা হয়েছে। ঠিক একইভাবে একই উদ্দেশ‌্যে এখানকার হিন্দুদের বসত ঘরে হামলা চালিয়ে অঘটন ঘটানো হয়েছে।

বুধবার সকালে হরিণবেড় গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ইসলাম অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার রসরাজ দাসের পরিবার ও তার দুই চাচার বসতঘর ছন্নছড়া অবস্থায় পড়ে আছে। গ্রামের অলিগলি সড়কে বিভিন্ন বয়সের লোকজন ঘোরা ফেরা করছে। তাদের চোখে মুখে আতঙ্ক।